পাখির নাম সবুজ তাউড়া

পায়ের তলায় শর্ষে আছে- আমার এই পরিচয়টা অনেকেই জানেন। আর সুযোগ করে দিলে সেই সর্ষে গড়িয়ে দিতে আর তাতে সওয়রি হতে আমি বিন্দুমাত্র কসুর করি না। তাই হুট করে এক আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাকে আওয়াজ দিল- হাতে যদি কিছু সময় থাকে আর কিছু টু-পাইস কামাতে চাও তাহলে বাংলাদেশের যে সমস্ত জংগলে তোমার পা পড়েনি- ঘুরে এসো। সময় এক মাস।সে আর বলতে- জংগলের টানে তাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া।

পায়ের তলায় শর্ষে আছে- আমার এই পরিচয়টা অনেকেই জানেন। আর সুযোগ করে দিলে সেই সর্ষে গড়িয়ে দিতে আর তাতে সওয়রি হতে আমি বিন্দুমাত্র কসুর করি না। তাই হুট করে এক আন্তর্জাতিক সংস্থা আমাকে আওয়াজ দিল- হাতে যদি কিছু সময় থাকে আর কিছু টু-পাইস কামাতে চাও তাহলে বাংলাদেশের যে সমস্ত জংগলে তোমার পা পড়েনি- ঘুরে এসো। সময় এক মাস।সে আর বলতে- জংগলের টানে তাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া।

এই ট্রিপেই পেলাম আনকোরা নতুন এক জাতীয় উদ্যানের খোঁজ। বারৈয়ারঢালা।সীতাকুন্ড ইকোপার্ক থেকে খুব বেশি দূরে নয় এই অসাধারণ পাহাড়ি জঙ্গল। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অফিসে গিয়ে সাত সকালে তাদের দেখা পাওয়ার আশা করাটা বোকামি।কিন্তু জঙ্গলের আসল সৌন্দর্য এই ভোরবেলা আর বিকেলেই। তবুও নতুন জঙ্গল- তাই হানা দিলাম অফিস-ঘেষা কোয়ার্টারে। ঘড়ির কাটায় তখনও সাতটা বাজেনি। সুয্যি মামা উঠব উঠব করেও আলস্যের কাছে পরাজিত- কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। এমন সময় রেঞ্জ অফিসারের স্ত্রীর হাক কানে এল। অচেনা মানুষ সাত সকালে বাড়ির আঙিনায় ঘুর ঘুর করলে এটা তো পাওনাই। তবে খানিক বাদেই বুঝলাম তিনি হাকটা ছেড়েছেন আমার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই, আর উদ্দেশ্য অতি মহৎ- সকালের নাস্তার ভাগ অতিথিকে দিতে চান। নাস্তাটাও সেইরকম- খেজুরের রস দিয়ে তৈরি দুধ চিতই পিঠা আর ভাপা পিঠা। আহা- আর কী লাগে। (আমি বরাবর পেটুক এই বেলায় এটা বলে রাখি) বারান্দায় বসে খেতে খেতে দেখছি শালিক- বুলবুলির ঝাক। মাঝে মাঝে টিয়ার কর্কশ গলার চিৎকার আর কাঠঠোকরার সাইরেন। পাশের পুকুরে ছোট মাছরাঙা শীত উপেক্ষা করেই মাছের জন্য ডুব মারছে। আর তার সাথেই রেঞ্জ অফিসার আর বিট অফিসারের বকবক- ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা করলেই হল- কোন অবকাঠামো উন্নয়ন নেই- কেউ বেড়াতে এলে পিকনিক করার জায়গা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। বেচারাদের মাথায় ন্যাশনাল পার্ক মানেই পিকনিক করার জায়গা!! এদের এই ধারণা বদলানো খুব সহজ ব্যাপার নয়। তাদের সাথে কথা বলা শেষ করে ঢুকলাম জঙ্গলে।

পাহাড়ি ঝিরিতে শীতের সময়ে একদম পানি থাকে না- খটখটে শুকনো। স্রোতের অপেক্ষায় তাই কোথাও কোথাও দলছুট কিছু পানি আটকে আছে। সূর্যের আলো এই শীতে মাটিকে আদরের প্রলেপ মাখাতে চাইলেও বেয়াড়া গাছের পাতাগুলোর জন্য পারছে না। তাই আলোর রশ্মিগুলো পাতার আড়াল থেকেই যেখানে ফাঁক পাচ্ছে সেখান থেকেই গলে বেরনোর চেষ্টা করছে। জমে থাকা পানির কাছে দেখা পেলাম গ্রে ওয়াগটেলের, খানিকদূরে ব্ল্যাক-ব্যাকড ফর্কটেইলের। হঠাৎ করেই সন্ধান পেলাম একটি মিক্সড স্পিশিজ হান্টিং পার্টির অর্থাৎ অনেক প্রজাতির পাখি একসাথে মিলে মিশে শিকার ধরে। বড় মালা পেঙ্গা পাখির ঝাঁকের সাথে ফিঙে আর ভীমরাজ। তাদের ঝগড়াতে কান পাতা দায়। কোনভাবেই এদের এই ঐকতানকে ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীতের ধারে কাছেও ফেলা যাবে না, যদি এই মিশ্র কলতানকে কোন কিছুর সাথে তুলনা দিতেই হয়- তবে সেটা হেভি মেটাল ব্যান্ডের! এর মধ্যেই হঠাৎ করে কাঠঠোকরার মত লাফিয়ে আর ভোকাল চড়িয়ে বেশ জোরে ডেকে যাচ্ছিল- এমন একটি পাখির দিকে দৃষ্টি আটকে গেল। পাখির ডাকের মধ্যেই মিশে ছিল করুণ বিলাপের মত:……. আয়েইউ………… ডাক। রঙের কারবারি এই পাখিটির দিকে তাকিয়েই রইলাম মুগ্ধ বিস্ময়ে।

জানি বিশ্বাস করানোটা কষ্টকর।কিন্তু পাওলো কোয়েলহোর সেই উক্তি ‘And, when you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it.’ তে বিশ্বাস করতেই হল। আগের রাতেই এই পাখিটাকে নিয়ে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী গবেষণার অন্যতম মহীরূহ দুবাই চিড়িয়াখানার কিউরেটর ড. আলী রেজার লেখা পড়ছিলাম- আর মনে মনে ভাবছিলাম এই পাখিটা দেখার কপাল কী আছে আমার। কারণ রেজা স্যার এই পাখিটিকে একবারই দেখেছেন এদেশের মাটিতে।

রক্ত লাল চোখ, আর প্রবাল লাল পা- তামাটে মেরুন রঙের ডানাসহ পিঠ পাতার সাথে মিশে যাওয়া সবুজ। শরীরের নিচের দিকে সবুজ রং হালকা হয়ে এসেছে। ছোট্ট একটা সবুজ ঝুটি মাথার পিছনে। মোটা কালো ডোরা ঘাড়ের পিছন পর্যন্ত গিয়ে ঝুটিকে দেখার মত করে তুলেছে। ডানার গোড়ার পালক আর লম্বা লেজের পালকের আগা সাদা। পাখির নাম পাতি সবুজতাউরা। জীবনে প্রথমবারের মত এই পাখিকে দেখে রীতিমত বিস্মিত! বাকরূদ্ধ!! পুরো দলে এই একটি গ্রিন ম্যাগপাই- রাজার মতই। এই পাখিটির ছবি দেখেছি, তবে সামনাসামনি আমার মতন নিতান্ত নবিশ পাখিপ্রেমীকে তিনি দেখা দেবেন তা ভাবিনি। এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম cissa chinensis – অর্থাৎ চিনের ল্যাঞ্জা দোয়েল।

পাতি সবুজতাউরা ঘন চিরসবুজ বনে বা আর্দ্র পাতাঝরা বনে ঘুরে বেড়ায়- কখনো একা, কখনো জোড়ায়। আবার কখনো এই রকম মিশ্র ঝাকে। ব্যাং, টিকটিকি, সাপ, পাখি, পাখির ডিম, বড় পোকা, পচা মাংস কিছুতেই অরুচি নেই। এই পাখিটি বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম, সিলেটের বনে দেখা মেলে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় এই পাখি রয়েছে। বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত এই পাখি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত এবং অপ্রতুল তথ্য শ্রেণিতে রয়েছে।
এই পাখি দেখার সুখ স্মৃতি নিয়েই ছুটলাম হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের দিকে।

২৮ thoughts on “পাখির নাম সবুজ তাউড়া

  1. বাহ দারুন তো! আপনি বেশ ভালো
    বাহ দারুন তো! আপনি বেশ ভালো ফটোগ্রাফি জানেন বলে প্রথম ছবিটি দেখে ধারনা করছি। এই পাখির নাম এই প্রথম শুনলাম। ভালো লাগল। আপনার পায়ের নীচে সরষের আড়ত তৈরি হোক। 😀

        1. তোর জন্য খুলনা সার্জিক্যাল এর
          তোর জন্য খুলনা সার্জিক্যাল এর আল আরাফার চই ঝাল দেয়া খাসির মাংস!!!! :বুখেআয়বাবুল:

  2. সবুজ তাউড়া সম্পর্কে জানলুম।
    সবুজ তাউড়া সম্পর্কে জানলুম। ছবিগুলো খুব সুন্দর। পোস্টে একটা ট্যাগ লাগিয়ে দিন।

      1. আচ্ছা, ইঞ্জিনের প্রতিশব্দ কি
        আচ্ছা, ইঞ্জিনের প্রতিশব্দ কি মেশিন হইতারে? :মানেকি: :চিন্তায়আছি: :দেখুমনা: :হাহাপগে:

  3. ফটোগ্রাফি দারুন লেগেছে ।যেন
    ফটোগ্রাফি দারুন লেগেছে ।যেন এক জীবন্ত ছবি!ক্রেডিটটা ক্যামেরার না গ্রাফারের?

  4. চমৎকার। বন-জঙ্গল নিয়ে আমার
    চমৎকার। বন-জঙ্গল নিয়ে আমার আগ্রহ সবসময়ই বেশি। গভীর অরণ্য আর তাঁর বাসিন্দাদের ছবি তোলার সুযোগ পেলে ছাড়ি না। বাংলাদেশের সবগুলো অরণ্য নিয়ে “অরণ্যের দিনরাত্রি” নামে একটা ধারাবাহিক লিখছি ব্লগে। চাইলে এই লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। এই বনে যাওয়া হয় নি। আপনি খুব খ্রাফ। আমার ভিতরে আবার ঘোরাঘুরির আগ্রহটা জাগিয়ে দেওয়ার জন্য আপনারে অপিসিয়ালি মাইনাচ। :কথাইবলমুনা:

    1. ব্যাপার না….. আপ্নেরে কোন
      ব্যাপার না….. আপ্নেরে কোন পোস্ট দেখলেও আমি মাইনাচ দিমুনে…. কাটাকুটি!!!! :নৃত্য:

  5. প্রথমে ছবিগুলো দেখলাম । কোন
    প্রথমে ছবিগুলো দেখলাম । কোন নতুনত্ব খুঁজে পাইনি । আপনার লেখা পড়ে বুঝলাম কাক আর কাউয়া ছাড়া খুব বেশি পাখি আমি চিনি না । আচ্ছা জীবনানন্দ দাশ পাখি বিষয়ে কোন বই টই লিখে গেছেন কি ? আমার মনে হয় উনি একজন পাখি বিশেষজ্ঞ ছিলেন ? ব্যাপারটা আপনি ভালো বলতে পারবেন !
    আপনাকে ধন্যবাদ ! আপনাকে যাতে সর্ষের মধ্যে ভূত খোঁজার দায়িত্ব পেতে না হয় এই কামনা করছি … :ফুল: :ভেংচি:

    1. পাখির ছবি যারা তুলি, তারা
      পাখির ছবি যারা তুলি, তারা নতুনত্ব খুজি না…. বরং এটা এক ধরণের ডকুমেন্টেশন। কিছুদিন আগে ভারতের এক ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফারের সাথে দেখা হয়েছিল- উনি বলেছিলেন এবটা পাখির ছবি তোলার জন্য- অন্তত তাকে ২ দিন ধরে অবজার্ভ করতে হয়! এত কাঁচা সময় কোথায়?
      জীবনানন্দ দাশ পাখির নাম জানতেন প্রচুর, চিনতেনও। কারণ এখনকার বরিশাল বা কোলকাতার সাথে তার সময়ে এই শহরগুলোর তফাত অনেক- অনেক জলা জঙ্গলে পূর্ণ ছিল।তাই পাখিও ছিল অনেক। জীবনানন্দের পাখি নিয়ে কোন বই নেই।
      বনফুল ডানা নামের তিন খন্ডের উপন্যাস লিখেছেন। সেখানে তিনি অনেক পাখির বাংলা নাম দিয়েছিলেন।

      1. কোন নতুনত্ব খুঁজে পাইনি

        কোন নতুনত্ব খুঁজে পাইনি

        — এইটা একটা স্যাটায়ার নিজের জন্য । পরের লাইনেই স্পষ্ট করেছি ।
        আশা করি আপনি ভুল বোঝেন নি ।

  6. আপনি ইস্টিশন ব্লগকে অন্য
    আপনি ইস্টিশন ব্লগকে অন্য আরেকটা মাত্রা দিলেন… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    অসাধারণ! তবে এমন নাস্টালজিক করার জন্যে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করবার মঞ্চায়!
    আহঃ শীতের সকাল খেজুরের গুড়, চিতই পিঠা, অরন্যে হাঁটা, শুকনো পাতার মড়মড় চূর্ণ হওয়ার ছন্ধ, ইশ কতদিন বেড়াতে যাওয়া হয় না!! :দেখুমনা: :দেখুমনা: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ:

    1. ধইন্যবাদ! এই শীতে পুরো
      ধইন্যবাদ! এই শীতে পুরো সীতাকুন্ডের পাহাড় চষে বেড়ানোর ইচ্ছে আছে। প্রতি শুক্র-শনি। দেখা যাক- কী আছে কপালে। :ভাবতেছি:

          1. ট্রাভেলারের বেড়ানোর ব্যাপারে
            ট্রাভেলারের বেড়ানোর ব্যাপারে হিংসা করলে কিন্তু ট্রাভেলারের পায়ের তলায় শর্ষে বাড়ে আনুপাতিক হারেই!!! 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *