ভালো থেকো রমা’দি………..

রমাদিকে প্রথম দেখি চেরাগী পাহাড়ের রাস্তায় । চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে আমাদের অন্তহীন আড্ডা চলতো । প্রতিদিনই সকাল থেকে মাঝরাত অবধি এবং কখনও কখনও রাত ভোরেও শেষ হতো না আমাদের আড্ডা । এই রকমই এক বিকেলে শিবুদা’র হোটেলে বসে আছি…আমি আর প্রীতম । রাস্তা দিয়ে রমা চেীধুরী যাচ্ছিল । প্রীতম আমাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, ঐ যে রমা চেীধুরী যায় । আমি জিজ্ঞেস করি…রমা চেীধুরী কে ? তখন রমা চেীধুরীর সম্পর্কে জানতে পারি কিছু তথ্য…রমা চেীধুরী শহীদ জননী…শহীদের রক্তঋণ শোধ করতে বা তাদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য খালি পায়ে হাটেন । আমি একটু নড়েচড়ে বসি । যখনকার কথা বলছি…তখন ২০০২ সাল । বিশেষ দিবস ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ..শহীদ এসব নিয়ে কে আর মাথা ঘামায় (যদিও তখন শোভা পেত রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ) । এরপর মাঝে মাঝেই রমা চেীধুরীর সাথে দেখা হতো । আস্তে আস্তে পরিচয় এবং রমা চেীধুরী আমার ও আমাদের রমা’দি হয়ে ওঠেন ।যতবারই রমা’দির সাথে রাস্তায় দেখা হতো-আমার মনটা এক অদ্ভুত গ্লানিতে ভরে উঠত । একজন রমা চেীধুরী রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছেন খালিপায়ে.. চৈত্রের রোদ…শ্রাবণের বৃষ্টি…..ডাস্টবিনের ময়লা কোন কিছুর ভ্রুক্ষেপ করছেননা; আর আমরা দিব্যি চটিজুতো বা কেডস মচমচিয়ে রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছি, রমাদিকে দেখছি বই ফেরি করছেন..অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন-তা নিয়ে কেউই তেমন চিন্তিত নয় ।সবাই রমা’দির এই ত্যাগকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে (দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া)-তার অন্তর্দহন বা প্রতিবাদকে আমলে নেয়নি কেউ, কেউ খোজেঁনি তার বিষাদের ঠিকুজি । ৭১-এ অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে এবং নীরবে বেদনা পুষে রেখেছে-তাদের সবার খবর আমরা জানি না । কিন্তু রমা’দি জীবিকার তাগিদেই সাহিত্যকর্মকে বই আকারে প্রকাশ করে সমাজের মধ্যবিত্ত এবং কখনও কখনও ধনী সম্প্রদায়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন । কেউ কেউ তার বই কিনতো..কেউ কিনতো না । যারা বই কিনতো তারা হয়তো তাদের দায়িত্ব পালন হয়েছে ভেবে আত্মতুষ্টি পেতো, কিন্তু কেউই তার বিষাদ এবং প্রতিবাদটাকে ওইভাবে ধরতে পারেনি । আমাদের এই সমাজে একজন শহীদ জননীকে নিজের রচিত বই ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, আবার একজন বীরশ্রেষ্ঠ-এর সন্তানকে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়!

রমা’দির সহকারী সংস্কৃতিকর্মী আলাউদ্দিন খোকন ভাইয়ের সুবাদে রমা’দির সব খবরই পেতাম । মাঝে মাঝে যেতাম তার সাথে দেখা করতে ।একজন মানুষের জীবনের চাহিদা কত কম হতে পারে এবং কত কম গৃহস্থালী সরঞ্জাম দিয়ে যে একজন মানুষ দিন যাপন করতে পারে সে সম্পর্কে আমার ধারণাকে ভেঙ্গে-চুরে দিয়ে এই সন্নাস্যীনিতুল্য মানবী শোনাতো তার স্বপ্নের কথা,তার যণ্ত্রণার কথা । পরপর দুই শিশ্ত সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধসময়কালীন অসুস্থতায় রমাদি হারায় যথাক্রমে ৭১’এর ডিসেম্বরে এবং ৭২ এর ফেব্রুয়ারীতে । আরো পরে সে হারায় তার কিশোর সন্তান কবি দীপংকর টুনু’কে । আত্মজের প্রতি অতৃপ্ত ভালবাসা বোধ করি রমা’দি অনেকখানি দিয়েছেন প্রাণীকূলকে । বিড়াল পুষেন রমা’দি ।গন্ডা খানেকের কম বিড়াল কখনও তার লুসাই ভবনের খুপড়ি ঘরে দেখিনি । অনেক কষ্টে উপার্জিত অর্থে বিড়ালকে খাওয়াতেন মাছ-দুধ । নিজের খাওয়া নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখতাম না,কোনমতে শাক-পাতা হলেই চলে যেত ।তখন খুব রাগ হোত এ নিয়ে (মুখে অবশ্য কখনও কিছু বলিনি, খোকন ভাইকে বলতাম )। এখন অবশ্য বুঝি রমা’দির আকুলতাটা কোথায় । জীবনকে নতুন করে চেনার যে প্রক্রিয়া তার শুরু রমা’দি, সিদ্দিক ভাই ( সিদ্দিক আহম্মেদ) এদের হাতেই । সমাজের প্রত্যাশিত মূল্যায়নে মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেরা নিজেদের কাজটি করে যাচ্ছেন নীরবে-নিভৃতে ।নতুন কোন লেখা লিখলে যেমন মন দিয়ে শুনতাম..তেমনি রমাদি’র অনেক লেখা নিয়ে বিতর্কও করতাম সেই সময়ে, কিন্তু সেসবও খুব একটা প্রাসঙ্গিক কিছু না । প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে এ সমাজে একজন শহীদ জননী,একজন বীরাঙ্গনা,একজন লেখিকা,একজন প্রাবন্ধিক একজন কবির নিরন্তর লড়াই । লড়াইটা যেমন নিজের টিকে থাকার,তেমনি মুক্তিযুদ্ধ-যা কারো কারো রাজনিতক সুবিধা আদায়ের একটা প্রপঞ্চ-সেখানে এই সমাজকে,সমাজের মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া..৭১ কে ভোলা যায় না, একাত্তরকে ভোলা উচিত নয় । বছরে ৩-৪ দিন মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ নয়,রমা’দি আমাদের বুঝিয়ে যাচ্ছেন লড়াইটা নিরন্তর …স্মরণটা সার্বক্ষণিক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের । সে একা একা লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন-কোন কিছুর প্রত্যাশা ছাড়াই ।
রমা’দি কখনও কারো অনুকম্পা নেননি, এখনও তা প্রত্যাশা করেন না । তিনি নিজে একজন সাহিত্যিক, সাহিত্যকেই বেছে নিয়েছেন তার মাধুকরী জীবনে । এখন আর আগের মত হাঁটতে পারেন না । অসুস্থ রমা’দির তার সেই ছোট্ট এক কামরার ঘরটাতেই কেটে যাচ্ছে সময় । আমরা আমাদের নিজেদের নৈতিকতার জায়গা থেকেই তার বই কিনে তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেব-এমনই নিবেদন করছি সবার প্রতি ।

রমাদীর আয়ু হোক আরো দীর্ঘ আর সংগ্রাম হোক নিরন্তর । কত আলতু ফালতু লোক দীর্ঘ জীবন পাচ্ছে…রমাদি তোমার বাঁচাটা ভীষণ জরুরী ।ভালো থেকো রমাদি…সবসময় ।

২১ thoughts on “ভালো থেকো রমা’দি………..

    1. হুম…এক ধরনের যণ্ত্রণার
      হুম…এক ধরনের যণ্ত্রণার মধ্যে আছি….রমাদি’কে সবার সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার…ওনার লেখা বই কিনে । অনুকম্পা নয় একজন লেখকের বই কিনেই তাকে সহযোগিতা । আগ্রহী হলে আমার ফেসবুক প্রোফাইলে দেখেন ওনার বইয়ের তালিকা ।

      ধন্যবাদ সত্যিকারের একজন যোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।

  1. সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত এই
    সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত এই ব্লগের উৎকৃষ্ট লেখার মধ্যে এটি অন্যতম !!! লেখক আমার পরিচিত বন্ধুজন বলে নয় । রমাদি’কে নিয়ে লেখার উপযুক্ত মানুষ তিনি । :ফুল: :বুখেআয়বাবুল: :গোলাপ:

    ছিপছিপে ফর্সা রমাদি আমার চোখ কে পেরিয়ে গভীরে কোথাও আছে । নাহলে তাকিয়ে দেখিনা কেন । উনি তাকিয়ে দেখার মানুষ নন । ওনাকে দেখতে অন্তর্দৃষ্টি লাগে । ওনার ব্যক্তিগত প্রতিবাদ কখনো ওনাকে এতো টুকু অহংকারী করেনি । অথচ সবটুকু অহংকার ওনাকেই বেশি মানাত । প্রিয়জন হারানোর যে যন্ত্রণা পুষে উনি হয়েছেন ফেরিওালি – আহারে কী আফসোস – কষ্টের কিছুটা বোঝা এই দেশ কি পারতোনা নিজের কাঁধে নিতে ?
    রমাদি আপনার নশ্বর দেহ থাকুক বা না থাকুক তাতে কিছু আসে যায় না । কতোজনই আছে বেহায়ার মতো । আপনার সংগ্রাম প্রতিবাদ অনূদিত হবে নতুনের আহ্বানে নতুন দিনে । মরমে ভাল থাকুন যতদিন বেঁচে আছেন ।
    ( আমজাদ, লেখাটা আরও কিছু প্যারা আকারে দিলে পড়তে আরও আরাম লাগতো । নিয়মিত লেখনা কেন ? এই ব্লগে ভাল লেখকরা চুপ করে থাকলে কীভাবে চলবে ? আবারো বলছি তোমার গদ্য লেখার হাত কবিতার চেয়ে কম সুন্দর নয় । আর একজন কবি যখন গদ্য লেখে সেই গদ্য কবিতার অমোঘ স্পর্শ পাবেই । এই লেখাতেও তাই হয়েছে । )

    1. খুবই মনকষ্ট থেকে লেখা । ক’দিন
      খুবই মনকষ্ট থেকে লেখা । ক’দিন ধরেই ভাবছিলাম রমা’দি-কে নিয়ে লিখবো । হটাৎ অফিসে বসেই লিখে ফেললাম । আরো অনেক কিছুই বাদ পরে গ্যাছে । যাই হোক ধন্যবাদ রাহাত আপনাকে । রমা’দির বেঁচে থাকাটা (ভাল ভাবে) জরুরী..অন্তত আরো কিছু দিন …যাতে করে ৭১-এর ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে পারেন । আমাদের সমাজতো রমা চেীধুরীদের মূল্যায়ন করতে পারে না…..নতুন প্রজন্ম যদি কিছু করতে পারে ।

  2. মাগো, তোমার কান্না আমরা সইতে
    মাগো, তোমার কান্না আমরা সইতে পারব না। তুমি কেঁদো না, মা। আমরা আসছি …

    মধ্যাহ্নের কাঠফাটা রোদ, তীব্র, ভ্যাপসা গরম। চট্টগ্রাম শহরের যে কোন রাস্তায় পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ করে চোখে পড়ে যেতে পারে কাঁধে বইয়ের ঝোলা নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক আপাতবৃদ্ধা। আগুনের মত তপ্ত পিচ ঢালা রাজপথে তার খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া দেখে থমকে যেতে হয় পথিককে। তিনি রমা চৌধুরী, একাত্তরের বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধের ঝাপটায় ঘরবাড়ি, নিজের সৃষ্টি সর্বোপরি দু’সন্তান হারানো বিপর্যস্ত জীবনসংগ্রামী…
    –ফেসবুক থেকে! যারা এখনও লিখাটি পড়েন নি; তাদের জন্যে… এইখানে

    এক পর্যায়ে রমা চৌধুরী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, `মুক্তিযুদ্ধ আমার কাঁধে ঝোলা দিয়েছে। আমার খালি পা, দু:সহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান। আমার ভিতর অনেক জ্বালা, অনেক দু:খ। আমি মুখে বলতে না পারি, কালি দিয়ে লিখে যাব। আমি নিজেই একাত্তরের জননী।`

    তোমাকে হাজার হাজার :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:
    আমজাদ ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে লিখবার জন্যে… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. তারেক ভাই…শুধু লিখে মন ভরছে
      তারেক ভাই…শুধু লিখে মন ভরছে না…একটা কিছু করা দরকার । আমরা সবাই যদি রমাদির একটা করে বই কিনি…সেটাও অনেক । উনার সহকারীর নাম- আলাউদ্দিন খোকন, মোবাইল নাম্বার ০১৭১৬৮৮২৩১৯….(দীর্ঘ ১৯ বছর যাবৎ যিনি রমাদি’কে মায়ের মত দেখা-শুনা করছেন…আমার বন্ধু..আজই কথা হলো ) বিবেবের দায় বড় দায় । সবাইকে উৎসাহিত করুন উনার বই কেনার জন্য । কোন সম্মিলিত উদ্যোগ যদি নেয়া যায় খুব ভালো হয় । আমরা কত টাকা-পয়সা নষ্ট করি, কিন্তু একজন রমা’দি ঝরে গেলে বা অবহেলায় মারা গেলে সেটা আমাদেরই পরাজয় ।

  3. অসাধারণ ……..অনেক দিন পর
    অসাধারণ ……..অনেক দিন পর মন ছুয়ে যাওয়ার মতই একটা লেখা পরলাম ।লেখাটা থেকে এটাও বোঝা যাছে আপনি ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির হয়ে আছেন।হয়তো সে অস্থিরতা থেকেই এমন সুন্দর একটা লেখার আর্বিভাব।যা হোক আপনার লেখার একটা লাইন বিশেষ ভাবে ভালো লেগেছে ……..

    লড়াইটা নিরন্তর …স্মরণটা সার্বক্ষণিক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ।

    দোয়া করছি খুব দ্রুতই আপনার অস্থিরতা যেন শান্তিতে পরিনত হয়।

    1. ধন্যবাদ । ঠিকই বলেছেন..এক
      ধন্যবাদ । ঠিকই বলেছেন..এক ধরণের অস্থিরতা বিরাজ করছে । কিছু না করতে পারার যণ্ত্রণা …কিছু করতে পারার চেষ্টা….আসুন না সবাই মিলেই রমা’দির জন্য কিছু একটা করি ।….ভালো থাকবেন।

    2. লড়াইটা নিরন্তর …স্মরণটা

      লড়াইটা নিরন্তর …স্মরণটা সার্বক্ষণিক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ।

      —- হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত লাইনটি … তাই মনে হয় হৃদয় ছুঁয়ে গেল …

  4. রমা’দির বই কোথায় পাওয়া যাবে,
    রমা’দির বই কোথায় পাওয়া যাবে, কিনতে চাই ।
    বই কিনে ওনাকে ওনার অবদানকে কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা করতে পারবো ।

  5. উনার বই কিনে সবাই অন্তত একটু
    উনার বই কিনে সবাই অন্তত একটু সম্মানজনকভাবে বাকী জীবন কাটানোর সুযোগ করে দিবেন প্লীজ। আর কতো গ্লানিময় হবে আমাদের ইতিহাস? আমজাদ ভাই, লেখাটার জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে এখানে নিয়মিত লেখক হিসেবে চাই।

    1. আতিক ভাই…আমি সাধারণত কবিতা
      আতিক ভাই…আমি সাধারণত কবিতা ছাড়া কিছু লিখি না । আর কবিতা সবসময় আসে না । চেষ্টা করবো লেখার । ধন্যবাদ ।

      1. কবিতা যখন আসবেনা তখন গদ্য ‘র
        কবিতা যখন আসবেনা তখন গদ্য ‘র হাতুড়িকে হানতে হবে …

        কাজ নেই কবিতার স্নিগ্ধতায়/ গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো

        — সুকান্তে ভট্টাচার্য ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *