তুমি, সে ও পদব্রাজকের গন্তব্যহীনতা

।।১।।

খয়েরী শেঁওলায় পূর্ণ সবুজাভ জল ভরা টলটলে পুকুরটা বিকেলের মৃদু বাতাসের সাথে মিলে গিয়ে যেন সম্পূর্ণ হয়েছে। সূর্যটা হেলে পড়তে চাইছে এখন, ইচ্ছে পূরণের সে আনন্দে আকাশের মেঘগুলো আবীর সাজে সেজেছে, অপূর্ব সুন্দর। একটু বেমানান বিষণ্ণতা হয়ে দীপ্ত বসে রয়েছে পুকুর পাড়ে। পুকুরের শেঁওলাগুলোর বন্ধনে থেকে থেকে ছেদের কারণ বোঝা যায়, ঢিল ছুড়ছে দীপ্ত, একের পর এক। কাল ওর বিয়ে, অনেক খুশী হবার কথা ওর, তার পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ে হচ্ছে, কিন্তু মনটা ঠিক খুশী নয়। কিন্তু ধরতে পারছে না কেন এই বিষণ্ণতা। সব পাওয়ার শূন্যতা বলে কি কিছু রয়েছে? হবে হয়ত।



।।১।।

খয়েরী শেঁওলায় পূর্ণ সবুজাভ জল ভরা টলটলে পুকুরটা বিকেলের মৃদু বাতাসের সাথে মিলে গিয়ে যেন সম্পূর্ণ হয়েছে। সূর্যটা হেলে পড়তে চাইছে এখন, ইচ্ছে পূরণের সে আনন্দে আকাশের মেঘগুলো আবীর সাজে সেজেছে, অপূর্ব সুন্দর। একটু বেমানান বিষণ্ণতা হয়ে দীপ্ত বসে রয়েছে পুকুর পাড়ে। পুকুরের শেঁওলাগুলোর বন্ধনে থেকে থেকে ছেদের কারণ বোঝা যায়, ঢিল ছুড়ছে দীপ্ত, একের পর এক। কাল ওর বিয়ে, অনেক খুশী হবার কথা ওর, তার পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ে হচ্ছে, কিন্তু মনটা ঠিক খুশী নয়। কিন্তু ধরতে পারছে না কেন এই বিষণ্ণতা। সব পাওয়ার শূন্যতা বলে কি কিছু রয়েছে? হবে হয়ত। আজ ওর বাসায় থাকা অনেক জরুরী, কতো কাজ! একের পর এক ফোন আসছিল, কিছুক্ষণ আগে তাই ফোনটা পানিতে ছুঁড়ে দিয়েছে। সবাই নিশ্চয়ই খুঁজছে, বাসায় যাওয়া দরকার… উঠতে গিয়েও থেমে গেলো সে। ঘাসের উপরে সটান শুয়ে পড়লো। সুন্দর করে আঁচড়ানো চুলগুলো কপালটা বিস্তৃত করেছে, তবু কিছু অবাধ্য চুল বাতাসের সাথে সন্ধি করে কপালে ছড়িয়ে গেছে। নিজেই নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিতে থাকলো। আবেশে চোখ বুঁজে এলো দীপ্তর। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলো না কে এমন করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো। চোখ বন্ধ করেই বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, ‘কি হয়েছে আমার? আমিই তো ওকে চেয়েছিলাম! কতো পাগলামি, কতো সুন্দর মুহূর্ত আমাদের! তবে আজ যখন তাকে পেতে চলেছি একান্ত করে, এমন কেন লাগছে?’ নিরুত্তর রইবে বাতাস, বিকেলের আলো কিংবা পুকুরের জল, জানা রয়েছে। তবু জিজ্ঞাসা! মনকে? হবে হয়ত, কিন্তু দীপ্ত মনের সাথে কথা বলতে পারে না, সেই কবে কি এক অভিমানে আড়ি হয়ে গেছে, আর হয়নি সন্ধি। মনটা যেন মলাটের নীচে লেখা কবিতার পঙতি কোন! কতো পাশাপাশি অথচ চিরকাল কি এক শত্রুতায় দেখা হয় না মলাটের সাথে কবিতার। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, পাখীগুলো ঘরে ফিরছে দেখে বিষাদ বাড়লো বরং। পাখী হবার বড্ড ইচ্ছে ছিল, মুক্ত আকাশ ছোঁবার ছিল কামনা। তবে ঘরে ফেরা পাখী হবার ইচ্ছে ছিল না, ঘরছাড়া পাখী হতে চাইত মন। হাঁসি পেলো ওর, ঘরে ফিরতে হবে! বেটার লাক নেক্সট টাইম! উঁহু, নেক্সট জন্ম হয়ত! হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরতে প্রায় রাত হয়ে এলো, ভেতরের হইচই বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে। গেটের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেলো দীপ্ত! একটা লাইন, একটা কবিতা মনে পড়ে গেলো। ‘সে অতল গহীনের কালো বেদনে, আমি জেনেছি তোমায়, মরেছি প্রতিনিয়ত তোমাতে, তোমার মায়া লোচনে।’
কার লেখা? একটু ভাবতেই মনে পড়ে গেলো। অনেক অনেক আগে, সে নিজেই লিখেছিল। সে চোখদুটো কার তাও মনে পড়ে গেলো। আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলো, ভুলে গিয়েছিল সে! কি করে ভুলতে পারলো! বাসায় গেলো না দীপ্ত, আরও বেশ কিছুটা পথ হাটতে হবে তার…

।।২।।

নিশার আজ বাড়াবাড়ি রকমের মন ভালো। কেন যেন অনেক ভালো লাগছে, যা দেখছে সব সব কিছু অনেক ভালো লাগছে। আজকের আকাশটা যেন একটু বেশীই সুন্দর, সন্ধ্যাটা অপূর্ব, ঠিক তার মনের মতো। ব্যালকনির চেয়ারে শরীর এলিয়ে উপভোগ করবার জন্যে সিমপ্লি পারফেক্ট! গুনগুন করে প্রিয় কোন সূর ভাঁজছে আনমনে। পা’দুটো সামনে ছড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এলোমেলো চিন্তায় হারাতে লাগলো। অদিতির ফোনটা তখনই এলো, ওর প্রিয় বান্ধবী।

রিসিভ করতেই অদিতি বলে উঠলো, ‘নিশা জানিস, কাল দীপ্ত’র বিয়ে!’ ভ্রু কুঁচকে গেলো নিশার, ‘কোন দীপ্ত রে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো অদিতি, ‘ভুলে গেছিস? ওই যে যখন কলেজে ছিলাম?’ চিনতে পেরে নিশা বলল, ‘ও! তো কি হয়েছে?’ একটু হেঁসে অদিতির জবাব, ‘না, এমনিতেই বললাম। কি করিস?’ ‘কিছুনা! কাল দেখা হবে না?’ একটু ভেবে উত্তর দিলো অদিতি, ‘হ্যা ক্লাস তো নেই, তোর বাসায় আসছি বিকেলে।’ ‘ওকে, দেখা হবে, রাখি রে।’

নিশার ভালোলাগাটা কেন জানি মিলিয়ে গেলো হঠাতই। কফির মগ রেখে পায়চারী করতে লাগলো বারান্দায়। আঁধার ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে… নিশা রুমে ফিরে এলো। চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দু’একটা গান শোনার চেষ্টা করলো কিন্তু ঠিক জমলো না। আচ্ছা, ওর কাছে দীপ্তর একটা ছবি আছে না!? মনে পড়তেই ড্রয়ার খুলে কিছু কাগজের জঞ্জাল আর দু’চারটি ফাইল সরাতেই ছবিটা বেড়িয়ে পড়লো। সদ্য যুবক একজনের স্বভাবসুলভ তারুণ্য! হাঁসিটা অনেক মায়াময়, চোখদুটোও… ! আজ ওর বিয়ে! ভাবতেই অবাক লাগছে সময় এতো দ্রুত চলে যায় কি করে! প্রতিদিন ফোন করে চোখদুটোর সে কি নব নব বর্ণনা দিতো এই ছেলেটাই! অবাক হয়ে শুনতাম শুধু, নিজের চোখের এতো বৈশিষ্ট্য আয়নায় ধরা পড়তো না তো! ও কীভাবে দেখতো? সে যাই হোক, কাল অন্য কারো চোখে ওর প্রতিচ্ছবি পড়বে, আটকে যাবে চিরতরে। দীপ্তর ছবি বসে বসে দেখা আমার সাজে না, ও তো আমার নয়। ছবিটা আনমনেই চার টুকরো করে ফেললো নিশা। নিজেতে ফিরতেই আবিষ্কার করলো গাল বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু অধর ছুঁয়ে যাচ্ছে! অবাক হলো চার টুকরো ছবিটা দেখে, ছুঁড়ে ফেলে দিলো দূরে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কি মনে হতে ছবিটা নিজেই আবার টেপ দিয়ে জুড়ে যথাস্থানে রেখে দিলো। ওর কুণ্ঠা হচ্ছিল, প্রশ্ন জাগছিল মনে, ‘যার উপরে অধিকারটুকু অনেক বছর আগে ছেড়ে দিয়ে এসেছে তার ছবিটা রেখে দেবার মতো ছেলে মানুষী কেন করছে ও?’

।। ৩।।

প্রচণ্ড হইচই বাড়িটা জুড়ে, মৃণ্ময়ীর অসহ্য লাগছে এতো শব্দ। তার নীরবতা ভালো লাগে! যেমন দীপ্ত! ছেলেটা কম কথা বলে, তবে যখন বলে তাক লেগে শুনতে থাকে সে! যখন কবিতার লাইনগুলো আওড়ায়, সব শব্দ তার সামনে সামান্য হয়ে পড়ে যেন। ওদের মাঝে দারুণ বোঝাপড়া। দীপ্ত একনাগাড়ে বকবক করে চলা মৃণ্ময়ীর রিনিঝিনি কথাবলা সূর ভালোবাসে আর মৃণ্ময়ী ভালোবাসে দীপ্তর স্থিরতা। তাদের অনেক কথা হয়, শব্দহীন, কিছু হয় এক পাক্ষিক! তবে সবসময়ই তা হয় প্রাণবন্ত। দীপ্তর কি কি ভালো লাগে, কি কি খারাপ লাগে, সব মুখস্থ ওর! আর দীপ্ত যেন অসেচতনভাবেই তার ভালোলাগার সব করে ফেলে, খারাপ লাগা কোন কিছুই কখনও করে না। করবে কি করে, দীপ্তর সবকিছুই যে মৃণ্ময়ীর অসম্ভব ভালো লাগে! একটা ফ্যাসিনেশনের মায়াজাল যেন ছেলেটি। সবকিছুতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। আজ আনন্দে আত্মহারা লাগছে ওর। কাল ওর আর দীপ্ত’র বিয়ে! এতো দিনের সম্পর্ক, অবশেষে পেতে যাচ্ছে একে অপরকে, একান্ত আপন করে। আয়নার দিকে মুখ তুলে চাইলো মৃণ্ময়ী, অনেক সেজেছে সে, সাথে কাজল পড়েছে, দীপ্তর ফেবারেট। কিছুটা হিন্দুদের প্রতীমার মতো লাগছে নিজেকে দেখতে। সাজগোজ অবশ্য দীপ্ত বেশী পছন্দ করে না। কখনও বেশী সেজে সামনে গেলে তাকে উৎফুল্ল হতে দেখা যায় নি। তবে তাকে যে অনেক সুন্দর লাগে সেটা কবিতায় বলা তার চাইই চাই। মৃণ্ময়ী জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কবিতা কেন? আমায় ভালো লাগলে শব্দে বলতে পারো না?’ দীপ্ত হেঁসে বলে, ‘কবিতাই আমার শব্দ, ও ছাড়া আমার দেবার কিছুই নেই।’ মেনে নিয়েছে এমন কিছু নয়, মৃণ্ময়ীর এটাই বেশী ভালো লাগে। দীপ্ত ইউনিক, দীপ্ত অসামান্য! ভাবতে ভাবতে কেমন জানি লজ্জা লজ্জা করতে লাগলো ওর। ফর্সা গালে লালচে আভাটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে, দীপ্ত’র ছোঁয়া যেন সে এখানে বসেই অনুভব করতে পারছে। একটু বাঁকা করে তাকিয়ে আয়নাকে বলল, ‘আমায় সুন্দর লাগছে না? দীপ্ত পছন্দ করবে তো?’ আরেকদিকে বাঁকা হয়ে নিজেই উত্তর দিলো, ‘করবে, করবে!’ নিজের সৌন্দর্যে পুলকিত মৃণ্ময়ীর এবার সত্যিই লজ্জা করতে লাগলো, লালচে আভাটুকু প্রকট হচ্ছে! দীপ্তর কথা ভাবলেই কি সব চিন্তা মাথায় আসছে কদিন থেকে! উঠে পড়লো সে আয়নায় সামন থেকে, মেহেদী লাগাতে হবে, অনেক সাজবে সে! বিয়ে তো একবারই হবে, এখন সাজবে না তো কখন সাজবে!

কিছুক্ষণ পরে দীপ্ত ফোন করলো, অপরিচিত কোন নাম্বার থেকে। ‘এটা কার নাম্বার থেকে তুমি?’ ‘ফোন-ফ্যাক্স এর দোকান থেকে বলছি’ দীপ্তর উত্তর। উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে মৃণ্ময়ী, ‘তোমার কন্ঠ এমন লাগছে কেন, ঠিক আছো তো?’ দীপ্ত ইতস্তত উত্তর দেয়, ‘তোমার চোখের প্রশংসা করে অনেকবার কবিতা শুনিয়েছি না? ওগুলো বলার সময় আমার অন্য কোন চোখ মনে ভাসতো! আজ আমি মনে করতে পেরেছি চোখজোড়া কার…।’ ‘কার দীপ্ত?’ উত্তরে দীপ্ত বলে, ‘আমায় যেতে হবে মৃণ্ময়ী, আমায় সত্যিই যেতে হবে।’ কান্না পাচ্ছে মৃণ্ময়ীর, কিন্তু কাঁদা চলবে না, মানুষটা সহ্য করতে পারেনা ওর চোখের জল, ‘যেতে চাইছো যাও, ফিরবে তো?’ দীপ্তর জানা ছিল না কি বলবে, নীরবে ফোনটা কেটে দিয়ে আবার পথে নামলো সে।

পথ সামনে বিস্তৃত, আলো-আধাঁরির লুকোচুরি আছে বটে, কিন্তু এগোবার আহ্বানটা স্পষ্ট, আবার চলতে শুরু করলো সে। এখন সে সত্যিই জানে না কোথায় যাচ্ছে সে। মৃণ্ময়ীর কান্নামাখা গলাটা কানে বাজছে এখনও, ফিরতে বলেছে মেয়েটি। কিন্তু একজোড়া চোখও তো ভুলতে পারছে না! সামনে পথটুকু কাকতালীয়ভাবে আঁধার। ঠিক সে পথের পথিকের অনিশ্চিত গন্তব্যের ন্যায়, তবু দীপ্তকে হাঁটতে হতো…

৪ thoughts on “তুমি, সে ও পদব্রাজকের গন্তব্যহীনতা

  1. “পথ সামনে বিস্তৃত,
    “পথ সামনে বিস্তৃত, আলো-আধাঁরির লুকোচুরি আছে বটে, কিন্তু
    এগোবার আহ্বানটা স্পষ্ট, আবার চলতে শুরু করলো সে। এখন
    সে সত্যিই জানে না কোথায় যাচ্ছে সে। মৃণ্ময়ীর
    কান্নামাখা গলাটা কানে বাজছে এখনও,
    ফিরতে বলেছে মেয়েটি। কিন্তু একজোড়া চোখও
    তো ভুলতে পারছে না! সামনে পথটুকু কাকতালীয়ভাবে আঁধার।
    ঠিক সে পথের পথিকের অনিশ্চিত গন্তব্যের ন্যায়, তবু
    দীপ্তকে হাঁটতে হতো…”

    শেষটা খুভ ভাল হয়েছে….

Leave a Reply to অলি আহমেদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *