উত্তরাধিকার # ৭ম পর্ব

আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ থেকে হঠাত করে অন্ধকার পরিবেশে এসে থমকে গেল রুমন। প্রথমে কিছুই চোখে পড়ল না। অল্প সময় পরেই অবশ্য আবছাভাবে চারপাশটা দেখা গেল। এই মুহূর্তে বদ্ধ একটা রুমে সে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক উপরে ছোট একটা ভেন্টিলেটর দিয়ে আলোর আভাস দেখা যায়। সম্ভবত মাটির নিচের কোন কক্ষ এটা। কিন্তু সে তো এইমাত্রই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলার কক্ষ থেকে আসল। ঘটনাটা কি? রুমনের সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। নাহ, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তাঁর কেন জানি মনে হচ্ছে এই বাড়ির রহস্য ভেদ করার দ্বারপ্রান্তে সে দাঁড়িয়ে আছে। জাস্ট কিছু ক্লু দরকার।


আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ থেকে হঠাত করে অন্ধকার পরিবেশে এসে থমকে গেল রুমন। প্রথমে কিছুই চোখে পড়ল না। অল্প সময় পরেই অবশ্য আবছাভাবে চারপাশটা দেখা গেল। এই মুহূর্তে বদ্ধ একটা রুমে সে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক উপরে ছোট একটা ভেন্টিলেটর দিয়ে আলোর আভাস দেখা যায়। সম্ভবত মাটির নিচের কোন কক্ষ এটা। কিন্তু সে তো এইমাত্রই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলার কক্ষ থেকে আসল। ঘটনাটা কি? রুমনের সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। নাহ, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। তাঁর কেন জানি মনে হচ্ছে এই বাড়ির রহস্য ভেদ করার দ্বারপ্রান্তে সে দাঁড়িয়ে আছে। জাস্ট কিছু ক্লু দরকার।

আধো অন্ধকার ঘরটা বেশ লম্বা। শেষ মাথায় কি আছে দেখা দরকার। রুমন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। কিছুদূর যাবার পর রাস্তাটা ডান বাঁক খেয়ে নিচে নেমে গেল। একবার ইতস্তত করে রুমন পা বাড়াল সেদিকে। যা হওয়ার হবে। কিন্তু এই রহস্য ভেদ না করে সে যাবে না কোথাও।

এতক্ষন তবুও কিছুটা আলো ছিল কিন্তু এখন যেন অন্ধকারের রাজত্ব শুরু হয়েছে। রুমন সিধান্ত নিল আর অগ্রসর হবে না সে। ফিরে যাবার জন্য পেছন ফিরেছে মাত্র এমন সময় শব্দটা কানে আসল তাঁর। পুরুষকণ্ঠের কেউ একজন গুনগুন করে গান গাইছে মনে হচ্ছে। আশ্চর্য, এই অন্ধকারে গান গাইবে কে?

রুমনের গা ছমছম করে উঠলো। এতক্ষণ ধরে অনেক সাহসের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। নার্ভগুলো আর সহ্য করতে পারছে না। তারপরেও, কিভাবে কোথা থেকে সাহস পেল সে জানে না। একটু গলা চড়িয়েই সে জিজ্ঞাসা করল –

“কেউ কি আছেন এখানে?”

*****
পিছনে কিছু একটা শব্দ শোনা গেল মনে হয়। নুসরাত পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু শব্দ শোনা গেছে এই ব্যাপারে সে নিশ্চিত। গা ছমছম করে উঠল তাঁর। সবাই বলে নুসরাত খুব সাহসী মেয়ে এবং সে নিজেও তা বিশ্বাস করে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঝে কিছুদিন ক্রাইম রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করবার সময় রাতবিরাতে কম জায়গায় সে যায় নি কিন্তু এই জমিদারবাড়ির ব্যাপারটা সম্পূর্ণই আলাদা।

ভাল করে তাকিয়েও কাউকে চোখে পড়ল না নুসরাতের। আবার পুকুরঘাটের দিকে ফিরে তাকিয়েই চমকে গেল সে। আরে, আজিজ সাহেব কোথায় গেলেন? এইমাত্রই তো পুকুরপাড়ে বসে ছিলেন। এক নিমেষেই কোথায় হাওয়া হয়ে গেলেন তিনি? আরেকটু ভাল করে দেখার জন্য এগিয়ে এসে বেলকনির রেলিঙয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো সে। তাঁর খেয়ালই নেই যে চাঁদের আলোয় তাঁকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ইদ্রিস তিনতলায় উঠে এসেছে আগেই। এতক্ষণ নুসরাতকে তাঁর চোখে পড়ে নি। এইবার চোখে পড়ল। সাথে সাথেই তাঁর মুখে পৈশাচিক হাসি খেলা করে গেল। এখন তাঁর হাত থেকে এই মেয়েকে কেউই রক্ষা করতে পারবে না।

*****
“তারাপদ, সব তৈরি তো?”

“জি ছোট হুজুর, সব তৈরি।“

“কালকের পর আর আমাদের হয়ত কোনদিন দেখা হবে না। এত বছর ধরে তুমি আমার সেবা করে আসছ। আমি তোমার উপর খুব খুশি। বল, তুমি কি চাও?”

“আমি যা চাইব সেটা কি আপনি আমাকে দিবেন ছোট হুজুর?”

“আমার সাধ্যের মাঝে থাকলে অবশ্যই দিব তারাপদ।“

“যা চাইব সেটা আপনার সাধ্যের মাঝেই আছে। কেবল আপনি চাইলেই হবে।“

“ঠিক আছে, কথা দিলাম তারাপদ। তুমি যা চাইবে তাই পাবে। এখন তোমার ইচ্ছা বল।“

“আপনি যা পেতে চলেছেন, সেটার অংশীদার আমিও হতে চাই। এইটুকু দয়া যদি করেন, তাহলে বাকি সময়টুকুও আপনার সেবা করেই কাটিয়ে দিব। আপনার আপত্তি থাকলে থাকুক। এ ছাড়া আর অন্য কিছুই আমার চাওয়ার নেই।“

খন্দকার আজিজ সাহেবের কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় অবশ্য লাগলো না।

“ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছার জয় হল তারাপদ। তুমি যা চাইছ তাই হবে। তবে একটাই শর্ত, আমার কাছ থেকে এই উপহার পাওয়ার পর তুমি চিরদিনের জন্য আমায় ছেড়ে চলে যাবে। আমার আর সেবাযত্নের দরকার নেই। যা আমরা করতে চলেছি সেটা সফল হলে আর কোনদিন সেবাযত্নের কোন প্রয়োজন পড়বে না সেটা তো বুঝতেই পারছ। অনেক করেছ তুমি আমার জন্য। আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট। তাই তোমাকে আমি মুক্তি দিলাম। কালকের পর থেকে তুমি স্বাধীন।“

“আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে অপমান করব না ছোট হুজুর।“

তারাপদ মাথা নিচু করে আজিজ সাহেবের হাঁটুতে ঠেকায়। গভীর কৃতজ্ঞতায় তাঁর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে। আজিজ সাহেবের কঠিন হাতগুলো তারাপদের মাথায় বিচরণ করতে থাকে। সেই হাতে মিশে আছে স্নেহ, মায়া এবং মমতা।

*****
কি ব্যাপার, আজিজ সাহেব গেল কোথায়? ভেবে শেষ করতে পারে নি এমন সময় প্রচন্ড ধাক্কায় পড়ে গেল নুসরাত। লোমশ একটা হাত তাঁর মুখ চেপে ধরল। বিকট গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসল নুসরাতের। চাঁদের আলোয় ইদ্রিসের হাসি মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের লালসা খেলা করছে ইদ্রিসের চোখে। কেন ইদ্রিস তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়েছে সেটা জানার জন্য বিজ্ঞানী হতে হয় না। স্বাভাবিক মনোবৃত্তিই নুসরাতকে বলে দিল ধর্ষণ করার জন্যই ইদ্রিস এসেছে এবং সেটা না করে সে যাবে না। ইদ্রিসের হাতে কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলল নুসরাত কিন্তু ইদ্রিস হাত ছাড়ল না। ইদ্রিসের গায়ে অনেক শক্তি। নুসরাত বুঝতে পারছে ইদ্রিসের হাত থেকে আজ আর তাঁর মুক্তি নেই। ঘৃণা, লজ্জা এবং অসহায়ত্তের অনুভূতিতে চোখে পানি চলে আসল নুসরাতের।

*****
গুনগুন গান গাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার ঘরের নৈঃশব্দ্য ধাক্কা মারতে থাকে রুমনকে। নিজের হার্টবীট স্পষ্ট শুনতে পারছে সে। এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে একটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে আসে।

“আয়। তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। অনেক দেরী করে ফেলেছিস। ফিরতে পারবি তো?”

“কে আপনি? কোন জায়গায় বসে কথা বলছেন? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?”

ভীষণ জোরে হেসে উঠল অজ্ঞাত ব্যক্তি।

“চোখের দেখাই সব নয় রে। দেখতে হলে মনের ভিতরের চোখটার ঘুম ভাঙাতে হয়। ভয় পাচ্ছিস নাকি? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুই যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস তাঁর ডান পাশে একটা প্রদীপ আছে। তোর পকেটে যেই জিনিস আছে সেটা দিয়ে প্রদীপটা ধরা।“

রুমন পকেটে হাত দিয়ে অবাক হয়ে গেল। ম্যাচটা যে পকেটে রাখা ছিল সেটা তাঁর মনেই নেই। কিন্তু তাঁর পকেটে যে ম্যাচ আছে সেটা এই অজ্ঞাত ব্যক্তি জানল কি করে? জায়গামতই প্রদীপটা পাওয়া গেল। ম্যাচের কাঠি জ্বালাতেই অন্ধকার আরও গাড় হয়ে আসল। কিছুক্ষণ পর চারপাশটা দেখা গেল। সামনের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল রুমন। লম্বা চুলের উস্কুখুস্কু চেহারার একটা লোককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ঠোঁটগুলো কেটে যাওয়ায় লোকটাকে বীভৎস লাগছে।

“কে আপনি? আর আপনাকে বেঁধে রাখা হয়েছে কেন?”

“মেরে ফেলার জন্য। আগামীকাল আমার মৃত্যু দিবস।“

প্রচন্ড শব্দ করে হেসে উঠল লোকটা। এমন অট্টহাসি শুনে রুমনের শরীর কেঁপে উঠল আতঙ্কে। লোকটা হাসতে হাসতেই উপর দিকে তাকিয়ে কাউকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকল –

“তোর ইচ্ছা কখনও পূরণ হবে না রে জমিদার। কোনদিনও হবে না।“

হঠাত করেই শান্ত হয়ে ফিরে তাকাল সে রুমনের দিকে।

“আমি জানতাম তোরা আসবি। তোদের সামনে অনেক বড় বিপদ। এখনই পালা।“

“সেটা না হয় পালাবো। কিন্তু আপনি কে? কিভাবে জানলেন যে আমি এখানে আসব। আমার সাথে আরও কেউ আছে সেটাই বা জানলেন কিভাবে?”

আবারও অট্টহাসি দিল রহস্যময় ব্যক্তি।

“কেন, মোহন পাগলার নাম শুনিস নি আগে?”

******
ইদ্রিস খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। মেয়েটার প্রতিরোধ তাঁর উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এইরকম বাঁধা না আসলে কি রেইপ করে মজা পাওয়া যায় নাকি? পতিতালয়ের মাগিগুলোর সাথে শুয়ে কোন মজা নাই। কাম শেষ করার আগেই সবগুলো টাকার ধান্দা করে। এইরকম একটা মেয়েকে রেইপ করার মজাই আলাদা।

বেশি উত্তেজিত ছিল বলেই ইদ্রিস বুঝতে পারে নি যে কেউ তাঁর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথায় প্রচন্ড আঘাত পাওয়া মাত্রই সে সজোরে চিৎকার করে উঠল। শরীরের উপর থেকে ভারী বোঝাটা নেমে গেছে বুঝতে পেরেই বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়াল নুসরাত। তাঁর রক্ষাকারীর দিকে চোখ যাওয়া মাত্রই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে। এটা কিভাবে সম্ভব? যেই মহিলার ছবি সে তাঁর বেডরুমে দেখেছে সেই মহিলা কিভাবে এখানে আসলেন?

একজন মহিলার শরীরে এত শক্তি কোথা থেকে আসে সেটা ভেবে অবাক হল নুসরাত। এক আঘাতেই ইদ্রিসের মাথা ফেটে গেছে এবং বোঝাই যাচ্ছে নড়াচড়া করার ক্ষমতা ইদ্রিসের আপাতত নেই। কিন্তু এরপর যা ঘটল সেটার জন্য কোনভাবেই প্রস্তুত ছিল না সে। মহিলা অবলীলায় ইদ্রিসকে দাড় করালেন এবং ধাক্কা দিয়ে ইদ্রিসকে তিনতলা থেকে ফেলে দিলেন।

তিনতলা থেকে পড়বার সাথে সাথেই মারা গেল না ইদ্রিস। অনেক কষ্টে সে চোখ খুলতে পারল। কিন্তু যা দেখল তাতে মরবার আগেই আতঙ্কে জ্ঞান হারাল সে। উপর থেকে নুসরাত দেখল কোথা থেকে যেন কুকুর তিনটা ছুটে এসে ইদ্রিসকে কামড়ানো শুরু করেছে। শরীর আর মনের উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। আর সহ্য করতে পারল না নুসরাত। বেলকনির রেলিঙ ধরে হড়হড় করে বমি করে দিল। এমন সময় কথা বলে উঠল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান চেহারার মহিলা –

“তোমার সামনে অনেক বিপদ। আর এক মুহূর্তও এখানে থেকো না। এখনই এই জমিদারবাড়ি ছেড়ে পালাও। আমি তোমার সাথেই থাকব। আমি তোমাকে রক্ষা করব।“

উত্তরে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়ে আবারো চমকে গেল নুসরাত। তাঁর সামনে কেউ নেই। কেবল শুন্যতা। ছবির মহিলা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেণ; যেন কোনোদিন ছিলেনই না তিনি।

******
নারীকণ্ঠের চিৎকার, উপর থেকে কিছু পতনের শব্দ এবং তারপর কুকুরের গর্জন শুনে সচকিত হলেন আজিজ সাহেব। এই আশঙ্কাই করছিলেন তিনি। নাহ, আর দেরী করার কোন মানে হয় না।

“তারাপদ, সব প্রস্তুত কর। পূর্ণিমা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময় আর আমাদের হাতে নেই। যা করার এখনই করতে হবে।“ …….. (চলবে)

আগের পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

১৭ thoughts on “উত্তরাধিকার # ৭ম পর্ব

  1. যাক এবারের পর্ব টা একটু জলদি
    যাক এবারের পর্ব টা একটু জলদি পেলাম । তার জন্য ধন্যবাদ । পরের পর্বের অপেক্ষা । :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

  2. কোন কথা হবে না… জাস্ট
    কোন কথা হবে না… জাস্ট :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:
    পরের পর্বের জন্য তর সইছে না। :জলদিকর:

  3. সাসপেন্স এ ভরা, কি হচ্ছে, শেষ
    সাসপেন্স এ ভরা, কি হচ্ছে, শেষ প্রান্তে এসেও বোঝা যাচ্ছেনা!! পারফেক্ট লিখা :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    আর অপেক্ষায় রাইখেন না :ভালাপাইছি: :ভালাপাইছি:

    1. হঠাত করেই অফিসিয়াল কাজে চরম
      হঠাত করেই অফিসিয়াল কাজে চরম ব্যস্ত হয়ে গেছি তাই শেষ পর্ব লেখার সময় পাচ্ছি না। :মনখারাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *