হেফাজতের কথিত ‘ভোট ব্যাংক’, কতটা সত্য?

হেফাজত-এ-ইসলাম নামের ভুঁইফোর সংগঠনটির জন্ম ২০১০ সালের জানুয়ারীতে হলেও এবছরের মার্চ মাসের আগে কোথাও তেমন নাম শোনা যায়নি, শুনলেও গুরুত্ব দেওয়ার কোন কারণ ছিল না! জন্মসূত্রে ‘অরাজনৈতিক’ হলেও কাজকর্মে, কথা বার্তায় এরা পুরোপুরি রাজনৈতিক একটা সংগঠন। জামায়াত-এ-ইসলামী নামের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীণতা বিরোধী সংগঠনের সাথে এদের দহরম মহরম এখন সর্বজন বিদিত! তাদের ঘোষীত ১৩ দফায় (প্রথম এবং দ্বিতীয় বার) কোথাও ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ সংশ্লিষ্ট কোন একটা অক্ষরও নেই, জামায়াতের ‘ইসলাম বিরোধী’ তৎপরতার ব্যাপারেও এই সংগঠনটি বরাবরই ‘কৌশলগত’ নিরবতা’ অবলম্বন করেছে!


হেফাজত-এ-ইসলাম নামের ভুঁইফোর সংগঠনটির জন্ম ২০১০ সালের জানুয়ারীতে হলেও এবছরের মার্চ মাসের আগে কোথাও তেমন নাম শোনা যায়নি, শুনলেও গুরুত্ব দেওয়ার কোন কারণ ছিল না! জন্মসূত্রে ‘অরাজনৈতিক’ হলেও কাজকর্মে, কথা বার্তায় এরা পুরোপুরি রাজনৈতিক একটা সংগঠন। জামায়াত-এ-ইসলামী নামের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীণতা বিরোধী সংগঠনের সাথে এদের দহরম মহরম এখন সর্বজন বিদিত! তাদের ঘোষীত ১৩ দফায় (প্রথম এবং দ্বিতীয় বার) কোথাও ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ সংশ্লিষ্ট কোন একটা অক্ষরও নেই, জামায়াতের ‘ইসলাম বিরোধী’ তৎপরতার ব্যাপারেও এই সংগঠনটি বরাবরই ‘কৌশলগত’ নিরবতা’ অবলম্বন করেছে!

হেফাজতের নাম, ধরণ এবং দাবি’র কারণে এটা নি:সন্দেহে প্রতীয়মান হয় যে তাদের নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাংখী সবাই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত! বাংলাদেশে মুসলিমরা সবসময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হেফাজতের নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাংখীর মধ্যে কেউ কি গত তিন বছরে বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসেছে? উত্তর অবশ্যই ‘না’! শুধু মাত্র নতুন ভোটার যারা গত পাঁচ বছরে বা সামনের কয়েকমাসে ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে বা করবে তারা ছাড়া বাকি সবাই ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই বাংলাদেশেই ছিল (প্রবাসী বা ধর্ম বদলকারীরা নিতান্তই নগন্য এখানে, বিধায় হিসাবে ধরা হচ্ছে না)! তাহলে নতুন যারা ভোটাধিকার অর্জন করেছে বা করবে তাদের আবার কতজন হেফাতকে সমর্থন করবে বা ভোট দিবে? সেটা নিয়ে তর্ক করা যায়!

যাইহোক, এখন আসি হেফাজতের এই কথিত ‘ভোট ব্যাংক’ বিশ্লেষণে! হেফাজতের নামে এবং বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ইত্যাদি দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় হেফাজত ঢাকায় দুইটা সহ ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটা ‘বড়’ সমাবেশ করেছে, মানে সে সমাবেশে উপস্থিতি কোন অংশেই খাটো করা যাবে না! কিন্তু কে কি কারণে সেখানে উপস্থিত হয়েছে, সেটা বিস্তর তর্ক ও আলোচনার বিষয় হলেও তিনটা বড় কারণ মনে হয় উল্ল্যেখ করা যায়! ১. মাদ্রাসার হুজুরের নির্দেশ, ২. রাজনৈতিক, ও ৩.ধর্মানুভুতি! অন্যগুলো বিশ্লেষণে যাচ্ছিনা আমি, কারণ আশা করি সবাই এ ব্যাপারে একমত হবেন!

এখন প্রশ্ন হলো, হুজুরের নির্দেশ পালনে যারা বিভিন্ন সমাবেশে যোগ দিয়ে সমাবেশের শোভা বাড়িয়েছে তারা ‘হেড কাউন্ট’ বিবেচনায় একজন হলেও এদের বেশীরভাগই ভোটার হওয়ার মত বয়সে এখনো পৌছেনি, তাই ‘ভোট ব্যাংক’ বিবেচনায় এদের আলোচনার বাইরে রাখা যায়! দ্বিতীয়ত, যারা রাজনৈতিক কারণে ওই সমাবেশে গিয়েছে তারা ইতিমধ্যে কোন না কোন দলের সাথে ইতিমধ্যেই যুক্ত, গত নির্বাচনে এরা কোন না কোন দলকে ভোট দিয়েছে! এরা সবাই যদি হেফাজতের কথায় ভোট দেয় সামনের নির্বাচনে তবুও দেশের মোট ভোটের হিসেবে কোন তারতম্য হওয়ার কথা না! তৃতীয়ত, ধর্মানুভুতি রক্ষায় এবং মুসলিমদের এই ‘গণ জোয়ার’ দেখে অনেক মুসলমানই হেফাজতের সাথে গলা মিলিয়েছে (আমার পরিচিত কয়েকজন খুব উৎসাহী হয়েছিলেন ৫ মে’র আগপর্যন্ত যারা অন্য কোন ইসলামী দলকে আগে পছন্দ করতেন না। যদিও ১৩ দফার সব সমর্থন করে এরকম কাউকে পাইনি এখনো এবং কোরাণ পোড়ানো এবং ‘তেঁতুল তত্ত্ব’ আবিস্কারের পরে তাদের মনোভাবও জানা হয় নি) যাদের প্রায় সবাই গত নির্বাচনে ভোটার ছিল! মানে দাড়াচ্ছে হেফাজতের নেতা কর্মী সহ কেউই ‘এলিয়েন’ না, ভিনগ্রহ থেকে কেউ উড়ে আসেনি, হঠাৎ করে তাদের সংখ্যাধিক্যও ঘটেনি, ভোটের হিসেবেও তাদের খুব একটা হিসেবে ধরা যাচ্ছে না কারণ তারা প্রায় সবাই আগে থেকেই ভোটার! নতুন যারা ভোটার হয়েছে বা হবে তাদের হয়ত হিসেবে নেওয়া যায় হেফাজতের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে, কিন্তু তাদের মোট সংখ্যা কত?

সামনের নির্বাচনে যেটা আসলেই আশংকা করার মত ব্যাপার সেটা হলো হেফাজতের ভন্ডামীতে সায় দিয়ে কতজন ‘ভাসমান ভোটার’ (যাদের কোন দলান্ধতা নেই, সীল মারার আগ পর্যন্ত নিজেও নিশ্চিত না কাকে ভোট দিবেন এবং যারা কোন প্রচার ব্যাতিরেকেই আবেগতাড়িত হয়ে ভোট দেন) হেফাজতের ‘পক্ষে’ যাবে! হেফাজত যেহেতু দাবি করছে তারা কোন রাজনৈতিক দল না এবং জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মত সাংগঠনিক যোগ্যতাও তাদের নেই, তাই স্বাভাবিকভাবেই হেফাজত কোন দল বা জোটের হয়ে প্রচারণা চালাবে (চোখ বন্ধ করেই বলা যায় সেটা বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে হওয়াটাই স্বাভাবিক)! কতজন ‘ভাসমান ভোটার’ তাদের প্ররোচনায় তাদের কথায় ভোট দিবে!

সরকারের গত কয়েক বছরের দেশ চালনায় ব্যার্থ্যতার পাশাপাশি সফলতাও আছে, কোনটা বেশী সেটা অবশ্য তর্কের ব্যাপার, কিন্তু অনেকেই তাদের উপর খুশি না (পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দ্রষ্টব্য), যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও অনেকেই দ্বিধান্বীত! সামগ্রীক বিচারেই বলা যায়, হেফাজতের কোন ‘ভোট ব্যাংক’ বলে কিছু নেই, কখনো ছিলও না!

২০০১ সালের নির্বাচনে চার দলীয় জোট বিপুল ব্যাবধানে জয়ী হয়েছিল, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট জয়ী হলো, কারোরই কিন্তু ‘হেফাজত’ নামক কোন ভোট ব্যাংক প্রয়োজন হয়নি! সামনের নির্বাচনেও বলা যায় যারা জয়ী হবে তারা বিপুল ব্যাবধানেই জয়ী হবে! অযথাই হেফাজতকে গুরুত্ব দেওয়ার কোন কারণও নেই, মানেও নেই! কেউ যদি খুব গুরুত্ব দিয়ে ‘হেফাজত’ ইস্যুটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তবে ধরে নেওয়া যায় সে দূরভীসন্ধিমূলক কাজ করছে, উদ্দেশ্যপ্রনোদিত হয়েই সেটা করছে। পাঁচটা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেফাজত যে কথিত ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে, সেটার পিছনের কারণ হলো, একপক্ষ চায় সামনের নির্বাচনি টালমাটাল অবস্থায় নিজেদের ‘বারগেইনিং পাওয়ার’ মজবুত করতে, আর অন্য পক্ষ চায় নিজেদের ব্যার্থতা হেফাজত ফ্যাক্টর দিয়ে ঢেকে রাখতে!

১৩ thoughts on “হেফাজতের কথিত ‘ভোট ব্যাংক’, কতটা সত্য?

  1. [১. মাদ্রাসার হুজুরের
    [১. মাদ্রাসার হুজুরের নির্দেশ, ২. রাজনৈতিক, ও ৩.ধর্মানুভুতি!]
    এখানে ১নং এ আপত্তি আছে ।১নং টা হবে টাকা ।বেশির ভাগই টাকার জন্য এসেছে।

    1. ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য,
      ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য, কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তেমন না আমার মতে!

      টাকার জন্য ‘বড় হুজুর’ নামের কিছু নেতা আসতে পারে, কিন্তু সমাবেশে যোগ দেওয়াটা অনেকটা আবেগের সাথে জড়িত! তাদের যে আসা যাওয়ার খরচও দেওয়া হয়নি অনেককে সেটাও সত্যি! হেফাজতের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের ‘ধর্মীয় অনুভুতিতে’ সরাসরি নাড়া দিয়ে নিজেদের পক্ষে আনা, সেখানে টাকা পয়সার লেনদেন হলে স্বাভাবিক ভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার কথা!

      টাকার লেনদেন হয়েছে, এবং বেশ বড় রকমের হয়েছে, তবে আমার এই লেখায় মনে হয় ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গীক, তাই অনুল্লেখ্য আছে!

  2. ১. মাদ্রাসার হুজুরের নির্দেশ,
    ১. মাদ্রাসার হুজুরের নির্দেশ, ২. রাজনৈতিক, ও ৩.ধর্মানুভুতি! এই তিন শ্রেণী দিয়ে শো ডাউন করেছে। এরা ভোট ব্যাংক হিসেবে নতুন করে প্রভাব ফেলতে না পারলেও, অন্য ভোটারদের উপর কিছুটা প্রভাব তো ফেলেছেই। দেশে আবালের সংখ্যা কি কম মনে হয় আপনার?

    1. হ্যা, এই ব্যাপারটাই আসলে
      হ্যা, এই ব্যাপারটাই আসলে আলোচনা করতে চেয়েছি! এই ‘প্রভাব’ ফেলা ভোটারের মোট সংখ্যাটা কত, সেটা আদৌ জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার মত বৃহৎ সংখ্যা কিনা! আবালদের বুদ্ধি না থাকলেও তাদের ভোটের মূল্যমান কিন্তু একজন জ্ঞানীর ভোটের সমান! ধন্যবাদ আপনাকে!

    1. না শুনা গেলেই দেশ ও দশের
      না শুনা গেলেই দেশ ও দশের মঙ্গল…
      আর এই ১৩ দফার একটা ব্যবচ্ছেদ করেছিলাম, যখন উত্থাপন করেছিল তেঁতুলবিদেরা!

      “জ্ঞানের জঘন্যতম শত্রু অনভিজ্ঞতা ও শিক্ষার অভাব নয়, এইটা হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি মোহ”
      এই কথাটা অকাট্য ও নির্জলা সত্যাচার…

  3. ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের
    ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার টা হল গিয়ে কৃষিতে রাসায়নিক সার-কীটনাশক এর ব্যবহার মত। অধিক ফলনের জন্য খুব জরুরি। কেন দেখেননি ভোটের আগে তসবিহ-হিজাব-জায়নামাজ-উমরাহ ‘র পোজ দেয়া পোস্টার-প্রচারনা , স্লোগান শোনেন নি লা ইলাহা ইল্লালাহ নৌকার মালিক তুই আল্লাহ/ লা ইলাহা ইল্লালাহ ধানের শীষে বিসমিল্লাহ? দেখসেন না নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন অমুক পীর,তমুক অলির মাজার জিয়ারত করে! দেখেন নি ২০০৮ এ খেলাফত-আ লীগ চুক্তি!আফিম না খাইয়ে কি আকাম করা যায়?

    >ভোটের খেলায় জরুরি হেফাজত খুব জরুরী।

    1. আপনার সাথে দ্বিমত করার কিছু
      আপনার সাথে দ্বিমত করার কিছু নেই, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যাবহার খুব পুরনো, আর আমাদের রাজনীতিবেদেরা সেটা খুব সফলতার সাথে করে থাকেন! একটু কোট করছি উপরের লেখা থেকে,

      //পাঁচটা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেফাজত যে কথিত ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে, সেটার পিছনের কারণ হলো, একপক্ষ চায় সামনের নির্বাচনি টালমাটাল অবস্থায় নিজেদের ‘বারগেইনিং পাওয়ার’ মজবুত করতে, আর অন্য পক্ষ চায় নিজেদের ব্যার্থতা হেফাজত ফ্যাক্টর দিয়ে ঢেকে রাখতে! //

      এটাই আসলে হেফাজত ফ্যাক্টর, যেটা সামনের রাজনীতিতে অতীব জরুরী!

  4. গণ জাগরণ মঞ্চ বা এর অনুসারী
    গণ জাগরণ মঞ্চ বা এর অনুসারী যারা তারা একটা ফ্যাক্টর হয়েছিলো । আবার ভুঁইফোড় হেফাজত একটা ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি । বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি, জামাত এদের আবার আছে নিজস্ব কট্টর ভোট । ভাসমান ভোটের সংখ্যাও ও কম নয় । আসল ফ্যাক্টর কারা ? বা আসল ফ্যাক্টর কি হতে যাচ্ছে আসন্ন নির্বাচনে ?
    বিএনপি – আওয়ামীলীগ – এই দুই দল ই প্রতিটি নির্বাচনে অপর কোন না কোন দলকে ফ্যাক্টর হিসেবে ট্রিট করছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য । সেই বিবেচনায় এবার হেফাজত ওনাদের কাছে হট কেক ! কিন্তু আদৌ হেফাজত কি সংখ্যায় বা ভোটের হিসেবে সেকুলার, ভাসমান ( ভোটার ) শাহাবাগিদের তুলনায় বেশি ? আমার তা মনে হয়না ।

    1. //কিন্তু আদৌ হেফাজত কি
      //কিন্তু আদৌ হেফাজত কি সংখ্যায় বা ভোটের হিসেবে সেকুলার, ভাসমান ( ভোটার ) শাহাবাগিদের তুলনায় বেশি ? আমার তা মনে হয়না । //

      আমার লেখার মূল উদ্দেশ্যটা আপনিই ধরতে পেরেছেন, ধন্যবাদ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *