জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার স্মরণে

গেল ১৬ তারিখ আমি এই বাংলার পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথিকৃৎ রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের স্মরণে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। ঐদিন ছিল ঐ মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীর জন্মদিন আর আজ যাকে নিয়ে লিখতে বসেছি তিনি হলেন আমার জানা মতে ২য় ব্যক্তি যিনি বাংলায় জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছেন। আজ আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের মৃত্যু দিবস। তাঁর কোন মৌলিক আবিষ্কার বা পর্যবেক্ষণ না থাকেলও তিনি আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চাকে বেগবান করতে ও জনপ্রিয় করতে প্রচুর লিখালিখি করেছেন। তাঁর লিখা ‘তারা-পরিচিতি’ নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন “মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিজ্ঞানের রাজ্যে এমন একখানা পুস্তক ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যার তোলনা করা যেতে পারে এমন কোন বই দুই বাংলায় বেরোয়নি,আগামী শত বৎসরে বেরুবে কিনা সন্দেহ। পন্ডিত আবদুল জব্বার রচিত এই ‘তারা-পরিচিতি’ গ্রন্থখানিকে ‘শতাব্দী গ্রন্থ’ বলে তর্কাতীত দার্ঢ্যসহ পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়।” (তথ্যসূত্রঃ দেশ, চৈত্র ২৪, ১৩৭৯);এর থেকেই বুঝা যায় তাঁর কাজ ও লিখনি আমাদের দেশের বর্তমানের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার মূল চালিকা শক্তি।

মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (১৯১৫ – ২০ জুলাই ১৯৯৩)

বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এই অগ্রদূত অধ্যাপক আবদুল জব্বার জন্মগ্রহন করেন পাবনার সুজানগর থানার গোপালপুর গ্রামে ১৯১৫ সালে, তাঁর জন্ম তারিখের কোন নির্দিষ্ট দিন কেউ বলতে পারে নি। তিনি ছিলেন রাধা গোবিন্দ চন্দ্রের বিপরীত, অসাধারন মেধাশক্তি ও প্রতিভার জন্য তিনি প্রাথমিক থেকে এমএসসি পর্যন্তই বৃত্তি পেয়েছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে শুদ্ধ গনিতে (Pure Mathematics) এমএসসি (অনার্সসহ) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে বিলেতে যান। ২য় মহাযুদ্ধের কারণে ১ বছর পরেই পড়াশুনা শেষ না করেই দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত আবদুল জব্বার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গনিতের লেকচারার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজে ও পরে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি গনিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে যোগদান করেন। সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি কলেজের প্রশাসনিক কাজেও জরিয়ে পরেন। ১৯৬২ সালে কলেজটি পূর্ব পাকিস্থান (তৎকালীন) প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নীত হলে তিনি প্রথম রেজিস্টার পদে যোগদান করেন। এরপর তিনি ১৯৬৮ সালে হন ছাত্র কল্যান পরিচালক, তাঁর বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮০ সালে। ১৯৮৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ অধ্যাপক এম এ রশীদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ডঃ রশীদ ফাউন্ডেশন, আর আপন প্রতিভা ও যোগ্যতা বলে অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার প্রথম ‘ডঃ রশীদ অধ্যাপক’ পদে নিযুক্ত হন।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা ও রচনাবলীঃ
জ্যোতির্বিদ্যায় অধ্যপক আবদুল জব্বার বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬২-৮২ এই দীর্ঘ সময় তাঁর অঙ্কিত তারা চিত্র ‘রাতের আকাশ’ নামে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও পরিকল্পনায় বাংলাদেশে প্রথম সেলেসশিয়াল গ্লোব বা ‘খ-গোলক’ নির্মিত হয় যা এখন বাংলাদেশ এস্ট্রোনোমিকাল এ্যাসোসিয়েশনে সংরক্ষিত আছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের গ্রন্থগুলো-
বিশ্ব রহস্যে নিউটন ও আইনস্টাইন (১৯৪২)
খ-গোলক পরিচয় (১৯৬৫)
তারা পরিচিতি (১৯৬৭)
প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা (১৯৭৩)
বিশ্ব ও সৌরজগৎ (১৯৮৬)
আকাশ পট (১৯৮৯)
টেক্সট বইসমুহঃ
টেক্সট বুক অব ইন্টারমিডিয়েট স্টাটিসটিক্‌স
টেক্সট বুক অব ইন্টারমিডিয়েট ডাইনামিক্‌স
টেক্সট বুক অব ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস
টেক্সট বুক অব ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ
বাংলা একাডেমীর ফেলো নির্বাচিত হন ১৯৮৪ সালে।
ডঃ কুদরত-ই-খুদা স্মৃতি পদক (১৯৮৫)
বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩)
একুশে পদক (১৯৮৫)
কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, অনুসন্ধিৎসু চক্র ও বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন যৌথভাবে তাকে ১৯৯০ সালে ব্রুনো পদকে ভূষিত করে।

যে গ্রন্থটি পড়ে আমার তাঁর সম্পর্কে জানা সেই শতাব্দী গ্রন্থ ‘তারা পরিচিতি’ নিয়ে লিখতেই হয়। ‘তারা পরিচিতি’-এর প্রথম প্রকাশের ভুমিকায় স্যার লিখেছেনঃ
‘যে বিরাট বিষয় নিয়ে লিখবার চেষ্টা করেছি, সে বিষয়ে আমার অজ্ঞতা ও অযোগ্যতা সমন্ধে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। আমার মনের আনন্দে এই বই লিখেছি, মনের আনন্দেই এর মাল -মশলা সংগ্রহ করেছি। অন্য কারো মনে এই আনন্দ সঞ্চারিত হ’লে নিজেকে ধন্য মনে করব।’
তিনি ধন্য কারন আজ বাংলাদেশে মহাকাশ বিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করে তাদের হাতের বাইবেল হয়ে থাকে এই শতাব্দী গ্রন্থ ‘তারা পরিচিতি’; বাংলাদেশ এস্ট্রোনোমিকাল এ্যাসোসিয়েশন ১৯৮৮ সালে –মুলত সৌখিন এবং তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞান মনষ্কদের সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই মহান গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় মে, ১৯৬৭ তে আর ২০০৫ সালে গ্যাগারিন বিজ্ঞান মেলা উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন বইটি পুনরায় প্রকাশ করে। বইটি পুনরায় ২০১২ সালে একুশে বই মেলা উপলক্ষে নতুন সংস্করন বের হয়।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল রাজ্জাক পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে ২০ জুলাই ১৯৯৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর গ্রন্থের ভুমিকায় তিনি যা চেয়েছে তাই যেন আমরা অন্তত করতে পারি। তাঁর সেই গ্রন্থখানা পড়ে রাতের আকাশের সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হয়ে আনন্দিত হলেই তিনি ধন্যবোধ করবেন। যারা আকাশ দেখেন বা মহাকাশ সম্পর্কে আগ্রহ তাদের সবাইকেই অনুরোধ বইটি সংগ্রহ করে তাঁর পরিশ্রমকে সার্থক করুন।

১৭ thoughts on “জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার স্মরণে

  1. এনার সম্পর্কেও কিছু জানা ছিল
    এনার সম্পর্কেও কিছু জানা ছিল না। আপনার দেখছি মহাকাশ সম্পর্কে ভাল আগ্রহ…

    1. ভাই দুইটা ব্যপার নিয়া চরম
      ভাই দুইটা ব্যপার নিয়া চরম আগ্রহ, ঠিকই ধরেছেন!
      এক উপরের মহাকাশ আর বুকের মাঝের মাতৃভূমি বাংলাদেশ…
      ধন্যবাদ… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. আসতে ভাই!! পরে মাথা ভাইঙ্গা
      আসতে ভাই!! পরে মাথা ভাইঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের সব পানি বাইর হইয়া যাইব…
      ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই…’
      আমি বলিঃ ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা অবিরত তাই…’

  2. ব্যস্ত আছি বেশি… এজন্য
    ব্যস্ত আছি বেশি… এজন্য ব্লগে বেশি একটা বসতে পারি না… সম্ভব হলে সারাদিন বসে থাকতাম… এত এত ভিন্ন ধরনের মানুষ এখানে এত এত ভিন্ন জিনিস নিয়ে লিখে…!!! নিজের দেশেরই এতবড় একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সম্পর্কে কিছু না জেনেই হয়তোবা মরে যেতাম… বাকিদের কথা জানিনা, আমি আমার পক্ষ থেকে পোষ্টের জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি… এরকম আমার থেকে ভিন্ন জগতের মানুষ সম্পর্কে তথ্যবহুল পোষ্ট আমার নিজের কাছে ভালই লাগে…

    1. ধন্যবাদ নাজিব ভাই…
      ধন্যবাদ নাজিব ভাই… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
      আসলেই ইস্টিশন একটি বহুমাত্রিক ব্লগ! এইখানে নানান বিষয় নিয়ে লিখা হয়…
      আর কবিতার কথা বলতে গেলে; এত কবিতা অন্যকোন ব্লগে লিখা হয় কিনা সন্দেহ!

  3. দারুন। এইটাকে একটা সিরিজ
    দারুন। এইটাকে একটা সিরিজ হিসেবে চালিয়ে যান। দেশের বিভিন্ন সেক্টরের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে সিরিজ। দারুন একটা কালেকশন হবে।

    1. আতিক-ভাই আপনারা পাশে থাকলে
      আতিক-ভাই আপনারা পাশে থাকলে চেষ্টা করব…
      ধন্যবাদ দুর্দান্ত এই আইডিয়াটা দেয়ার জন্যে!! :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. ভেজা খড়কুটো -ভাই আপনি বোধহয়
      ভেজা খড়কুটো -ভাই আপনি বোধহয় খেয়াল করেন নি! আমি পোস্টে লিখেছি…
      এই মহান গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় মে, ১৯৬৭ তে আর ২০০৫ সালে গ্যাগারিন বিজ্ঞান মেলা উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন বইটি পুনরায় প্রকাশ করে। বইটি পুনরায় ২০১২ সালে একুশে বই মেলা উপলক্ষে নতুন সংস্করন বের হয়।

    1. ধন্যবাদ
      হুমায়ুন আহমেদ

      ধন্যবাদ :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
      হুমায়ুন আহমেদ কে নিয়ে ১০০% জানলেও ৭০% তাকে নিয়ে পোস্ট দেয় তাই ভাবলাম যেইসব গুণীজনকে ১০% মানুষও চিনে না তাদের সম্পর্কে জানে না তাদের সম্পর্কে বাকিদের জানার সুযোগ করের দেই… এইটাই নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার দায়িত্ব; অন্তত আমি তাই মনে করি… ভাল থাকবেন— :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *