বিদ্যানন্দ : প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠার অপরাধ!

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নাম পরিবর্তন করে ‘শেখ ফাউন্ডেশন’ এবং পরিচালনা পরিষদে শেখ হাসিনা’কে আজীবন চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে দিলে সংগঠনটি নিয়ে সকল সমস্যার শতভাগ সমাধান হয়ে যাবে। কারণ এই সংগঠনটির মূল সমস্যা নামে বা সংগঠনটির চেয়ারম্যানের ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে ‘বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন’ নামের সংগঠনটি খুব অল্প সময়ে প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেশ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। অগণতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান হিসাবে যদি কোন সংগঠন শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, জনগণে জন্য উপকারী হলেও ভবিষ্যতে সেটা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভবনা তৈরি হয়। অন্তত অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শাসকগণ এমনটাই মনে করেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরির ৫০ বছর পার হতে চললেও বাংলাদেশে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তেমন একটা গড়ে উঠতে পারেনি। বিগত সময়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার অনেকগুলো উদ্যোগ আমাদের নজরে আসলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়াতে পারেনি রাষ্ট্রকর্তৃক বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার কারণে। বড়বড় এই উদ্যোগগুলোকে অঙ্কুরে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। শত প্রতিকুল পরিবেশে লড়াই করে ২/১টি ব্যক্তি উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেও প্রতিনিয়ত এরা টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার এই লড়াই দেশের মানুষ সাথে নয়- লড়াইটা করতে হয় রাষ্ট্রের সাথে, রাজনীতির সাথে। অদম্য লড়াইয়ে টিকে থাকা এমন একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই ধরনের আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান লড়াই করে এখনো টিকে আছে।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এতদিন নীরবে বেশ ভালই কাজ করে যাচ্ছিলো, কোন সমস্যা তৈরি হয়নি। ১ টাকা দিয়ে কম ভাগ্যবান শিশুদের খাবার পরিবেশন করে আসছিল ভালভাবেই। কেউ কোন কথা তুলেনি। বরং এদের উদ্যোগকে সবাই ভূঁয়সী প্রশংসাই করছিল। এদের সেবামূলক উদ্যোগে কেউ ধর্ম খুঁজতে আসেনি। কারণ ধর্ম ও রাষ্ট্র ব্যর্থ বলেইতো বিদ্যানন্দের মত উদ্যোগ নিতে হয়। দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ থাকলেও মসজিদকে কী কখনো এমন সেবামূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ত হতে কেউ দেখেছেন? কেউ দেখেননি, দেখবেনও না। ধর্মালয়গুলোর কাজ মানুষের সেবা করা না, মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। এজন্যই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এগিয়ে আসতে হয় কিশোর কুমার দাস বা তার নিজ হাতে গড়া বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে। যদি ধর্মালয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন এর মত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারত তাহলে দেশ বিদেশের মানুষজন করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মসজিদ বা ইসলামী ফাউন্ডেশনকে দান অনুদান দিত, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে কেউ বিশ্বাস করে অনুদান দিত না।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকে আজকের পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। বৈশ্বিক এই মহামারী পরিস্থিতি বাংলাদেশে সামাল দিতে আমাদের রাজনীতি, ধর্ম, সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলেই বিদ্যানন্দকে দেশ ব্যাপী বিপন্ন ও ক্ষুদার্ত মানুষের আহার যোগানোর যুদ্ধে নামতে হয়েছে। মানুষের দান অনুদান সংগ্রহ করে সরকারী লজিষ্টিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশ ব্যাপি দূর্গম এলাকাগুলোতেও বিদ্যানন্দকে পাওয়া গেছে মানুষের পাশে। কিন্তু রাষ্ট্রের এত বড়বড় অবকাঠামো ও লজিষ্টিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রকে মানুষের পাশে পাওয়া যায়নি, এতএত বড়লোক ধার্মিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এদেরকে বিপন্ন মানুষের পাশে পাওয়া যায়নি। বরং সরকারী উদ্যোগে ত্রাণের চাল ও বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে চলেছে লুটপাট।

যে কাজ রাষ্ট্র পারেনি তার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেই কাজ বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন করতে পারাটাই হচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের অপরাধ। যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, কোষ্টকার্ড, পুলিশ, বিজিপির লজিস্টিক সামর্থ্য ব্যবহার করে এত বড় কর্মযজ্ঞ চালাতে পারে সেটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক সফল। অতএব রাজনৈতিকদের টেক্কা দিয়ে প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া বিদ্যানন্দের কোমড় ভেঙে দিতে হবে। সেই কাজটিই চলছে ধর্ম-অধর্মের রাজনৈতিক মারপ্যাচ দিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হিন্দু ধর্মের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকাতে আরো সুবিধা হয়েছে। সকল ইস্যুতে ধর্ম দিয়ে কিভাবে খেলতে হয় সেটা সরকার ভালই জানে। সংগঠন পরিচালনা থেকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাকে সরিয়ে দেওয়ার মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির গলা টিপে মেরা ফেলা। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে যাওয়া আরো একটি প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে ধর্মীয় বিভেদের ম্যারপ্যাচে ফেলে ধ্বংস করে দেওয়া হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *