“এক ঢাকা হেফা” না-কি “এক দেশ বাঙ্গালী”?

বালকটি যখন হাটহাজারী মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতে আসে,তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। সে সময় ছাত্ররা বৃত্তবানদের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করতো। বালক যে বাড়িতে লজিং থাকতো, সে বাড়ির মহিলারা প্রায়ই বিভিন্ন কাজে তার সামনে চলে আসতো, যা সে খুবই অপছন্দ করতো। একদিন সে বাড়ির মহিলাদের বলেই বসল যে, তার সামনে তারা এভাবে হুট যেন করে চলে না আসেন এবং মহিলাদের পর্দার বিষয়টি সে তাঁদের স্মরন করিয়ে দেয়। মহিলারা তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো এখনো ছোট,সন্তানসম। সামনে আসলে গুনাহ হবে কেন? বালকটি তারপরও বার বার অনুরোধ করার পরেও বাচ্চা ছেলে বলে কেউ তাঁর কথার কোন গুরুত্ব দেয়নি বলে জানা যায় (সংগৃহিত)।


বালকটি যখন হাটহাজারী মাদ্রাসায় পড়াশুনা করতে আসে,তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর। সে সময় ছাত্ররা বৃত্তবানদের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশুনা করতো। বালক যে বাড়িতে লজিং থাকতো, সে বাড়ির মহিলারা প্রায়ই বিভিন্ন কাজে তার সামনে চলে আসতো, যা সে খুবই অপছন্দ করতো। একদিন সে বাড়ির মহিলাদের বলেই বসল যে, তার সামনে তারা এভাবে হুট যেন করে চলে না আসেন এবং মহিলাদের পর্দার বিষয়টি সে তাঁদের স্মরন করিয়ে দেয়। মহিলারা তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো এখনো ছোট,সন্তানসম। সামনে আসলে গুনাহ হবে কেন? বালকটি তারপরও বার বার অনুরোধ করার পরেও বাচ্চা ছেলে বলে কেউ তাঁর কথার কোন গুরুত্ব দেয়নি বলে জানা যায় (সংগৃহিত)।

তখনকার সেই বাচ্চা ছেলেটির বয়স আজ ৯৩ বছর। নাম আহমেদ শফি। বোধগম্য না হলেও টাইটেল হিসেবে নামের আগে আল্লামা লিখে থাকেন। বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত এবং সর্বোপরি ধিকৃত ব্যক্তি এই আহমেদ শফি। বাংলাদেশ হেফাজত ইসলামের আমির তিনি। বিভিন্ন বিবেচনায় তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির নিরাময়ক হিসেবেও পরিগণিত হচ্ছেন বর্তমানে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তাঁর আদিপূরুষের কথা। এক বিহারী পরিবারে তাঁর জন্ম। ওয়াজে ভাষার ধরন এবং উচ্চারনও তাঁর অবাঙ্গালীত্বের স্বাক্ষর বহন করে। সম্প্রতি আহমেদ শফির এক ওয়াজের ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন সামাজিক ওয়েব সাইটে প্রচার হওয়ার পর বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর সুবাদে ডঃ মুহম্মদ ইউনূসের নোবেল জয়ের পর বাংলাদেশের নাম বিশ্বে আরও একবার উচ্চারিত হচ্ছে বেশ জোরেশোরে। সে উচ্চারনের ভাষায় এবার মিশ্রিত হয়েছে বিস্ময় ও ধিক্কার। আধুনিক জগতে হেফাজতে ইসলামের এহেন শব্দখেলন স্তব্ধ করে দিয়েছে বিশ্ববিবেককে। অনেকে এটাকে উচ্চমার্গীয় কোন রসিকতা হিসেবেও ভুল করছেন।

ভিডিও ফুটেজের দীর্ঘ ওয়াজে তিনি অনেক কথাই বলেছেন। তার সবটা জুড়েই শুধু নারীবিদ্বেষ এবং কোরানের তালেবানি ব্যাখ্যা। শফি সাহেব কখনো নারীকূলের জন্য ওয়াজ করেন না। তার ওয়াজের শ্রোতা শুধুই পুরুষেরা এবং যাদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালকেরা। অন্তত তার ভিডিও ফুটেজে তা-ই দেখা যায়। তিনি এই শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে যে কু-পরামর্শ (ওয়াজ) দেন, তা শুধুই নারীকে কিভাবে পশুসম ব্যবহার করা যায়, সে ব্যাপারে। তিনি নারীকে শুধু ভোগবিলাস এবং সন্তান উৎপাদনের মেশিন হিসেবেই বিবেচনা করার আদেশ দেন তার অনুসারীদের। এইসব গ্রাম্য, মাদ্রাসীয় শ্রোতাদের কাছে তিনি প্রায় খোদাসম। বাংলাদেশের আলেমকূলের শিরোমনিও নাকি তিনি, বলে অনেকে অবণমিত হন। আসলে তিনি কি? ওয়াজে তিনি বলেছেন-

মহিলারা মার্কেট করতে যাবেন না। স্বামী আছে সন্তান আছে তাদের যাইতে বলবেন। আপনি কেন যাবেন? আপনি স্বামীর ঘরের মধ্যে থাইকা উনার আসবাব পত্র এগুলার হেফাজত করবেন। ছেলে সন্তান লালন পালন করবেন। এগুলা আপনার কাজ। আপনি বাইরে কেন যাবেন?….
আপনার মেয়েকে কেন দিচ্ছেন গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য? চাকরি তো অনেক করতেছেন। আপনি নিজে করতেসেন,আপনার বউ করতেছে,মেয়েরা করতেছে। কিন্তু কুলাইতে তো পারতেসেন না। খালি অভাব আর অভাব। আগের যুগে রোজগার করত একজন, স্বামী। সবাই মিইলা খাইত। এখন বরকত নাই। সবাই মিইলা এতো টাকা কামাইয়াও তো কুলাইতে পারতেসেন না। গার্মেন্টসে কেন দিচ্ছেন আপনার মেয়েকে? সকাল ৭/৮ টায় যায়, রাত ১০/১২ টায়ও আসেনা। কোন পুরুষের সাথে ঘোরাফেরা করে তুমি তো জান না। কতজনের সাথে মত্তলা হচ্ছে আপনার মেয়ে তা তো জানেন না। জেনা কইরা টাকা কামাই করতেসে,বরকত থাকবে কেমনে?
আপনারা মেয়েদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে লেখাপড়া করাইতেছেন। কেন করাইতেছেন? তাদের ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়াইবেন যাতে বিবাহ শাদী দিলে স্বামীর টাকা পয়সার হিসাব রাখতে পারে। বেশি বেশি আপনার মেয়েকে স্কুল কলেজ ভার্সিটিতে পড়াইতেসেন,লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতেছেন। কিছুদিন পর আপনার মেয়ে, স্বামী একটা নিজে নিজে জোগাড় কইরা লাভ ম্যারেজ কোর্ট ম্যারেজ কইরা চইলা যাবে। আপনার কথা স্মরণ করবে না। মহিলাদের ক্লাসের সামনে বসানো হয়। পুরুষরা কি লেখাপড়া করবে? মেয়ে মানুষ হচ্ছে তেঁতুলের মত। ছোট্ট একটা ছেলে তেতুল খাইতেসে, তা দেখলে আপনার মুখ দিয়া লালা ঝরবে। তেতুল গাছের নিচ দিয়া আপনি হাইটা যান তাইলেও আপনার লালা ঝরবে। দোকানে তেঁতুল বিক্রি হইতে দেখলেও আপনার লালা ঝরবে। ঠিক তেমনি মহিলাদের দেখলে দিলের মাঝে লালা ঝরে। বিবাহ করতে মন চায়। লাভ ম্যারেজ কোর্ট ম্যারেজ করতে মন চায়। দিনরাত মেয়েদের সাথে পড়ালেখা করতেছেন, আপনারা দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। রাস্তাঘাটে মেয়েদের সাথে চলাফেরা করতেছেন, আপনার দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। যতই বুজুর্গ হন আপনার মনের মাঝে কু খেয়াল আইসা যাবে। এইটা মনের জেনা, দিলের জেনা। এইটা একসময় আসল জেনায় পরিণত হবে। কেউ যদি বলে মেয়ে মানুষ দেখলে আমার দিলের মাঝে লালা ঝরে না, তাহলে বলব তোমার ধ্বজভঙ্গ রোগ আছে। তোমার পুরুষত্ব নস্ট হয়া গেসে। তাই মহিলাদের দেখলে তোমার কু ভাব আসে না। ”
(এর পরের অংশ চাটগাইয়া ভাষায়। মূল অংশটি তুলে ধরা হল)
“জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল হল পুরুষদের মরদ থাইকা খাসী কইরা ফেলা। মহিলাদের জন্মদানী সেলাই কইরা দেয়া। এরই নাম বার্থ কন্ট্রোল। বার্থ কন্ট্রোল করলেও ডেথ তো কন্ট্রোল করতে পারবা না। রিজিকের মালিক হচ্ছে আল্লাহ। খাওয়াইবো তো উনি। তুমি কেন বার্থ কন্ট্রোল করবা? বড় গুনাহের কাজ এইটা। পারলে চাইরটা পর্যন্ত বিবাহ করবা। খাওয়াইবো তো আল্লাহ। বার্থ কন্ট্রোল করবা না। এইটা বড় গুনাহের কাজ।”

তার ওয়াজের কিছু অংশ উপরে দেয়া হয়েছে। বাকী অংশ দেয়ার খুব বেশী প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। এতো প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি স্যাডিষ্ট ধরনের নোংরামী করেছেন যে, এর বিষদ ব্যাখ্যা দেয়াও খুব জরুরী নয়। তবে এই প্রাঞ্জলতার ভিতর দিয়ে যে ভয়ংকর চিত্রটি ফুটে উঠেছে, তার ব্যাখ্যার দাবি নিশ্চয়ই রাখে। কারন এই ওয়াজ কোন গ্রাম্য সনাতনি ওয়াজ নয়। এটা আহমেদ শফির পাঠানো জাতির কাছে সুস্পষ্ট একটি বার্তা। নিজেকে ভাবছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজনীতিতে তিনি প্রযোজকই শুধু নন; সেই সাথে পরিচালকও। তিনি ইতিমধ্যে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে তার অপরিহার্যতার ঢাল-তলোয়ার। তিনি ঢাকা অবরোধ করেছেন, সারাদেশে হেফাজতিদের শক্ত দূর্গ গড়ে তুলে তান্ডব চালিয়েছেন। ১৩টি দফার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সরকারকের প্রতি। সরকার পতনের হুমকী-ধামকী তো অনেকটা নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে সরকারী দলের ভরাডুবির পেছনেও নাকি তার অবদান অনস্বীকার্য। আহমেদ শফির নারীবিদ্বেষী বর্নবাদী বক্তব্যকে জঘন্য বলে ইতিমধ্যে নিন্দা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন নারী সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে শফিকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে। বিরোধী দল বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া যদিও একেবারেই চুপচাপ। শফির বিরুদ্ধে সংবিধান তথা নারী অবমাননার মামলা করা যেতে পারত। বাদি হতে পারত সরকার বা যেকোন বাঙ্গালী অথবা কোন নারীবাদী সংগঠন। অথচ কোন এক অদৃশ্য কারনে অদ্যাবধি তা হয়নি। আহমেদ শফি শুধু সংবিধান অবমাননাই করেননি, সেই সাথে কোরানের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়েও অন্যায় করেছেন। আহমেদ শফির বর্তমানে যে নারীবিদ্বষী কথাবার্তা, তার গোড়াপত্তন ঘটেছিল তার সেই ১০ বছর বয়সেই। এই বিকারগ্রস্ত, উন্মাদ লোকটি যে ভাষায় নারীকে অবমূল্যায়ন এবং অপমান করেছেন, তা নজিরবিহীন এবং ক্ষমার অযোগ্য। তবে একটা বিষয় এখানে পরিস্কার যে, বর্তমান সরকার নারীর উন্নয়নকল্পে যে অসাধারন কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছে, হেফাজতিদের নারীবিদ্বেষী আক্রমন তারই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ।

মৌলবাদীদের মূল সমস্যা আরো গভীরে। বাংলাদেশে একাত্তরে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার হচ্ছে বর্তমানে। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলার রায়ও হয়ে গেছে। কয়েকটির রায় যে কোন মূহুর্তে হয়ে যাবে। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন জানতে পারলাম, ১৫ জুলাই গোলাম আযমের রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। এছাড়াও, আভ্যন্তরিন রাজনৈতিক চিত্রও সরকারের প্রতিকুলে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে বিভিন্ন কারনে। বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত সরকারের উন্নয়নমূখী সাফল্যগুলো অদৃশ্য কারনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বা হালে পানি পাচ্ছে না। নির্বাচনের বাকী আর মাত্র কয়েকটি মাস। অথচ সরকারী দলে অভ্যন্তরে সীমাহীন বিশৃংখলা। জামায়াতে ইসলামীর দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে বিরামহীন দেশবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়েই যাচ্চে। সুশীল সমাজের মুখোশের আড়ালে তথাকথিত তৃতীয় শক্তির ইতিউতি আনাগোনাও কারো দৃষ্টি এড়াচ্ছে না। সব মিলিয়ে একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি বিরাজমান।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেও মহাজোট সরকারের কেন এই অবস্থা, তা নিয়েও বিতর্কেরও শেষ নেই। তবে একটা বিষয় মোটামুটি পরিস্কার যে, বিরোধী শিবিরে অবস্থান নেয়া স্বাধীনতাবিরোধীরা যেকোন মূল্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর এবং এজন্য যেকোন হীনকাজ করতে তারা পিছপা হবে না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তহীনতা এবং স্ববিরোধী কার্যকলাপের কারনেও তারা এই কাজটি করতে পারছে বেশ অপ্রতিরোধ্য ভাবেই।

একটি স্বাধীন দেশে নির্বাচিত সরকার থাকা সত্বেও কিভাবে উগ্র ইসলামপন্থিরা সম্পূর্ন বিনাকারনে রাজধানী দখল করে সরকার পতন ঘটানের জন্য হুমকী দিতে পারে? আহমেদ শফির হেফাজতে ইসলাম তো কোন রাজনৈতিক দল নয়। অথচ অদ্যাবধি দেখা তাদের প্রতিটা কার্যক্রমই রাজনৈতিক এবং অগণতান্ত্রিক। সরকার কেন ভাবছে না যে, একটা অরাজনৈতিক সংগঠনের এই রাজনৈতিক কার্যক্রমের পেছনের কারন এবং উৎসগুলো কি? আপাত দৃষ্টিতে শুধু এতটুকুই বোঝা যায় যে, হেফাজতিদের মাথার টুপি গুনতেই সরকার যেন বেশী আগ্রহী এবং ব্যস্ত। প্রতিটি টুপিই এক একটি ভোট এবং এই ভোটগুলোই সরকারকে লোভী থেকে লোভাতুর করে তুলেছে। এজন্যে তারুন্যের জাগরনকেও অগ্রাহ্য করতে পিছপা হচ্ছে না সরকার। মহাজোট সরকারের অংশিদার হু.মো. এরশাদ যখন পানির বোতল নিয়ে শাপলা চত্বরে হেফাজতিদের সেবায় আত্ননিয়োগ করেছিলেন, তখনই হেফাজতিদের ব্যাপারে সরকারের প্রেমাস্পদ মনোভাবের চিত্রটি স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল। পর্দার আড়াল থেকে তখন কি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া মুচকী হেসেছিলেন? কিছুটা যে হেসেছিলেন, তার প্রমান তো সারা জাতিই দেখলো গত পাঁচটি সিটি নির্বাচনে। এধরনের ভুল তাঁরা আগেও করেছে এবং খেসারত দিয়েছে চড়ামূল্যে। অথচ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কেন তা বোঝে না?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস এবং গঠনতন্ত্র যদি কেউ বুঝে পড়ে থাকেন, তাহলে তো তার এই সামান্য ব্যাপারটি না বোঝার কোন কারন নেই। আওয়ামী লীগ যখন মুসলিম লীগ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল তখনো আওয়ামী লীগের গায়ে ধর্মবিরোধী অপবাদ’ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু ৭০-এর নির্বাচনে এই অপবাদ কোন কাজে লাগে নাই। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে সৎ-স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী নেতাকর্মীরা সততার সাথে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রানের কথাটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৯৬-এর নির্বাচনেও বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনী শোনা যাবে। তারপরেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে মানুষ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছি। ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতিহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলেছিল, বলেছিল ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গড়ার কথা। ৭০ পরবর্তি কোন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এতো বেশী ভোট কখনোই দেয়নি মানুষ।পক্ষান্তরে ১৯৯১, ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল কিছুটা বিপরিতমূখী এবং স্ববিরোধী। সেজন্য তাকে পরাজয়ও বরন করতে হয়েছিল।

বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগ যতবারই তার আদি অবস্থান পরিবর্তন করেছে, ততবারই জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। এবারও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। হেফাজতি আর মৌলবাদিদের ’এক ঢাকা’ (রাজধানী) হেফা দেখে আওয়ামী লীগ আবারো সেই ইলুশন বা বিভ্রান্তিতে ভুগছে। কত বোকা হলে এই বিভ্রান্তিতে মানুষ পড়তে পারে! ছোট একটি ‘ঢাকা’ পূর্ন করতে কত লাখ মানুষের প্রয়োজন হয়? পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত? ভোটের হিসাবটা তো সেভাবেই হওয়া উচিত। দেড় কোটি তরুন ভোটার কি এতোই নগন্য? এই সামান্য হিসাবটাও কি কেউ করতে পারে না? যাদুকর যেমন বিভিন্নভাবে দর্শকদের সম্মোহন করে যাদুর তেলেসমাতি দেখায়, হেফাজতিরা (মূলত জামায়াতিরা) ঠিক একই কায়দায় সেই যাদু-প্রদর্শন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সম্মোহন করেছে, বিভ্রান্ত করেছে। পর্দার আড়ালে থাকা কূটকৌশলী জামায়াতে ইসলামীর ‘হেফাজতি-যাদু’ দেখে বিভ্রান্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ। জয় হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের কূটকৌশল। বিএনপি-জামায়াতের ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে যতবারই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপক্ষতার মূল মন্ত্র থেকে দূরে সরে গিয়েছে, ততবারই আওয়ামী ভোটাররা বিভ্রান্ত হয়েছে, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, জামায়াতিদের ভোটার শুধু ‘এক ঢাকা হেফা’ হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভোটার ‘এক দেশ’ বাঙ্গালী। এই কথাটি যতবার ভুলেছে, ততবারই আওয়ামী লীগকে খেসারত দিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, আওয়ামী লীগের দুর্বল দিকগুলো জামায়াতিরা ভালভাবেই জানে বিধায় সেই দুর্বল ফাঁক-ফোকড় দিয়ে তাদের অনাবিল আনাগোনা অব্যাহত রেখেছে তারা। এই ফাঁক-ফোকড়গুলো বন্ধ করতে হবে এবং ‘এক দেশ বাঙ্গালী’-কে নিয়ে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসতে হবে। নারীদের নেমে আসতে হবে রাস্তায় যৌনবিকারগ্রস্ত হেফাজতি-জামায়াতিদের মোকাবেলা করতে। গণজাগরনের তারুন্যকে পাহারা দিতে হবে মৌলবাদীদের চোরাগুপ্ত-গলিগুলোকে। রাষ্ট্র থেকে ধর্মের গিলাফ সরিয়ে ফেলে, মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে পারলে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মৌলবাদীদের কবর রচনা হবে এইদেশেই। ‘এক-দেশ বাঙ্গালী’র দেশে পরিনত হবে বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হলে, জামায়াত নেতৃত্বশুন্য হবে অবধারিতভাবে এবং দলটি এমনিতেই বিলিন হয়ে যাবে। সেই সাথে বিলিন হবে তাদের দোসররাও।

তাই জিজ্ঞাসা, “এক ঢাকা হেফা” না-কি “এক দেশ বাঙ্গালী”? সিদ্ধান্তে নিতে সরকার তথা বাংলাদেশের তাবৎ প্রগতিশীলদের এক টেবিলে বসে। ঠিক করতে হবে কর্মপন্থা। কর্মীদের দিতে হবে দিক-নির্দেশনা। সময় খুব কম। পারবেন কি?

৮ thoughts on ““এক ঢাকা হেফা” না-কি “এক দেশ বাঙ্গালী”?

  1. ৪২ বছরে মৌলবাদ ক্যান্সারের
    ৪২ বছরে মৌলবাদ ক্যান্সারের ন্যায় ছড়িয়ে গেছে ।এখন ট্রীটমেন্ট করা বড়ই কঠিন ।স্বাধীনতার পর পর ট্রীটমেন্ট টা দরকার ছিলো ।

  2. অসাম লিখেছেন ।তেতুল তত্ব নিয়ে
    অসাম লিখেছেন ।তেতুল তত্ব নিয়ে লিখা অনেক গুলো পোস্টের মধ্যে আপনার লিখাটি বিশেষ গুরুত্ববাহী বলা যায় ।

    আসলে যত আলোচনা-সমালোচনা, প্রশংসা-তিরস্কার করা হোক না কেন, পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হোক না কেন ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে না পারল ধর্ম এবং রাষ্ট্র দুটোই কলংকিত হবে এটাই বাস্তবতা।

  3. আপনার এই কেন গুলোর উত্তরই
    আপনার এই কেন গুলোর উত্তরই খুঁজছি। কিন্তু উত্তর মেলা ভার!
    আমরা নতুন প্রজন্ম জামাতের মতো রাজাকারের সাথে যুক্ত কোন দলকেই ভোট দিবো না। কিন্তু বাঙালি বড়ই ভুলমন জাতি এবং এখন তো মুসলিম বাঙ্গালিই বেশি। এরা রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা দেখবে না। রাগের মাথায় ভোট দিয়ে বসবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দলকে। যেটা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত।
    আওয়ামীলীগের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমরা চাই এমন কিছু করুক যাতে জনগনের সমর্থন পায়।
    আমরা তাদের বিপদ দেখতে পাচ্ছি, তারা কি দেখছে না????

  4. ভোটের প্রতিক নৌকা, কিন্তু দুই
    ভোটের প্রতিক নৌকা, কিন্তু দুই নৌকায় পা দেওয়ার পরিণতি কি হয় সেটা বারবার ঠেকেও শেখেনা আওয়ামী লীগ। নিজেও ডোবে, দেশকেও ডোবায়। উল্টো এখন তারা সব চাপাচ্ছে বাম দল এবং নাস্তিক শাহবাগীদের(?) ঘাড়ে। এই বিশ্রী শব্দটা এখন অনলাইন আওয়ামী যোদ্ধারাও ইউজ করে। :মাথাঠুকি:

  5. হেলিকপ্টার সাহেব কি
    হেলিকপ্টার সাহেব কি ছোটবেলা থেকেই মেয়ে বিদ্ধেষী নাকি।

    উনি যদি মেয়ে বিদ্ধেষী হয়ে থাকেন তাহলে তো তেতুল দেখে উনার লালা ঝরার কথা না।

    আর উনার যদি লালা নাই ঝরে , তাহলে উনি কিভাবে এই তেতুল তত্ত্ব দিলেন ?

    ওহ তাহলে এই ৯৩ বছর বয়সেও উনার লালা ঝরে । তাই তো উনি এখন ও তেতুল নিয়া গবেষণা করেন।

    # himel khaled #

Leave a Reply to সৈয়দ গোলাম শহিদ শাহিন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *