হিমুরা বেঁচে থাকবে

অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর থেকেই গল্পের বই পড়া শুরু হয় হিমেলের।সব ধরনের বই-ই সে পড়ে কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ এর বই তার বেশী ভালো লাগে।বিশেষ করে হিমুর বইগুলো।হিমেলের ধারনা হিমু চরিত্রটি তার ই।তার মনের গভীরে তখন থেকেই হিমু হওয়ার ইচ্ছা জেগে ওঠে।হিমেলের মা আমেনা বেগম খুব সহজ সরল মানুষ।একটা মাত্র ছেলে তার,তাই ছেলের সব আবদার তার রাখতে হয়।ছেলেকে ভালোবাসেন যে অনেক,তাই হিমেল কিছু চাইলে তিনি মানা করতে পারেন না।

হিমেলঃআম্মু…

আমেনা বেগমঃকীরে কিছু বলবি???

হিমেলঃআম্মু তুমি আমাকে কখনো আদর করে হিমু ডাকোনা কেন???
আজ থেকে হিমু ডাকবে।

আমেনা বেগমঃকেনো রে???(হাসতে হাসতে)


অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর থেকেই গল্পের বই পড়া শুরু হয় হিমেলের।সব ধরনের বই-ই সে পড়ে কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ এর বই তার বেশী ভালো লাগে।বিশেষ করে হিমুর বইগুলো।হিমেলের ধারনা হিমু চরিত্রটি তার ই।তার মনের গভীরে তখন থেকেই হিমু হওয়ার ইচ্ছা জেগে ওঠে।হিমেলের মা আমেনা বেগম খুব সহজ সরল মানুষ।একটা মাত্র ছেলে তার,তাই ছেলের সব আবদার তার রাখতে হয়।ছেলেকে ভালোবাসেন যে অনেক,তাই হিমেল কিছু চাইলে তিনি মানা করতে পারেন না।

হিমেলঃআম্মু…

আমেনা বেগমঃকীরে কিছু বলবি???

হিমেলঃআম্মু তুমি আমাকে কখনো আদর করে হিমু ডাকোনা কেন???
আজ থেকে হিমু ডাকবে।

আমেনা বেগমঃকেনো রে???(হাসতে হাসতে)

হিমেলঃআমি হিমু তাই হিমু ডাকবে।

আমেনা বেগমঃবুঝলামনা।।কি বলিস এগুলো???

হিমেলঃএত বুঝতে হবেনা।আজ থেকে আমায় হিমু ডাকবে।নো হিমেল অনলি হিমু…

হিমেলের বাবা কবির সাহেব আবার তার স্ত্রীর সম্পূর্ণ বিপরীত।সবসময় তার মেজাজ গরম থাকে।বিরাট গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিক তিনি,সারাক্ষণ নানা কাজের চাপ আর দুশ্চিন্তায় থাকেন।।স্ত্রী আর পুত্রকে সময় খুব একটা দেয়া হয়না তার।

দেখতে দেখতে দিন কেটে যেতে লাগল সময়ের ধারায়।এই তো হিমু কয়দিন আগেই এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলো,যেখানে আমেনা বেগম এর মুখে গর্বের হাসি লেগেই আছে সেখানে কবির সাহেব এর মুখ স্বভাবমতোই গম্ভীর।তাকে দেখে মনে হয় যেন তার ছেলে এফ গ্রেড পেয়েছে।

দিন যতো গড়াতে লাগলো হিমুর বুকশেলফ হুমায়ুন আহমেদের বই দিয়ে ভরে যেতে লাগলো।প্রথম প্রথম কবির সাহেব ব্যস্ততার কারণে খেয়াল না করলেও পরে তিনি লক্ষ্য করেন যে হিমু সারাদিন ওইসব বই নিয়েই পড়ে আছে।

কবির সাহেবঃতোমার ছেলে কি দিন দিন বলদ হচ্ছে??

আমেনা বেগমঃহিমু কি শুধু আমার ছেলে??
আর ও বলদ হবে কেন??
ও খুবই বুদ্ধিমান ছেলে।

কবির সাহেবঃসারাদিন তো দেখি গল্পের বইয়ের পাতা ওলটায়।
এত হাবিজাবি আজগুবি গল্পের বই পড়লে বলদ ই হবে।ওকে বলে দিও এসব ছাইপাশ ছেড়ে পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে।ওকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে।আসল পড়ার নামে ঠনঠন
তার ওপর বলদটা আমায় বলে যে তাকে হিমু বলে ডাকতে।হিমু আবার কোন ছাগলের নাম??তুমিও দেখি ডাকা শুরু করে দিয়েছ!!

আমেনা বেগমঃ আহা…একটাই তো ছেলে আমাদের।আদর করে নাহয় ডাকলে।

কবির সাহেবঃ ও সব ফালতু হিমু টিমু ডাক আমি ডাকতে পারবোনা।
এখন যাও চা নিয়ে আসো,আর মাথা গরম করোনা।

আমেনা বেগম আর কিছু না বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন।হিমু দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে দিয়ে সবই শুনছিল।
কিন্তু হঠাৎ সে বের হয়ে এলো…

হিমুঃ আব্বু তুমি এত রাগ করো কেন??
এত রাগ তো ভালো না।

কবির সাহেবঃ জ্ঞান দিতে এলি বুঝি??

হিমুঃ না।।
রাগ কমানোর উপায় বলতে এসেছি।

কবির সাহেবঃকি উপায়??

হিমুঃ তুমি রোজ সকালে আমাদের বাড়ির সামনের বাগানটায় খালি পায়ে এক ঘণ্টা হাঁটলে দেখবে তোমার রাগ কমে যাবে।
ন্যাচারাল এয়ার মাইন্ড ফ্রেশ রাখে।রাতের বেলা হাঁটতে পারলে আরও ভাল।
হেহে…

কবির সাহেবঃতোর সব কয়টা দাঁত ফেলে দেবো,মুখ বন্ধ কর।
আমার সাথে ফাজলামো হচ্ছে??

হিমুঃ ফাজলামো না।ইয়ু ক্যান ট্রাই দিস…হেহে…

কবির সাহেব দাঁত মুখ খিঁচিয়ে সেখান থেকে উঠে গেলেন।আমেনা বেগম কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে আসলে দেখেন যে কবির সাহেবের জায়গায় হিমু তার চেয়ার এ বসে পা দোলাচ্ছে।

আমেনা বেগমঃ কীরে,তোর আব্বু কোথায়???

হিমুঃকি জানি!!
আম্মু আমাকে একটা পুরনো হলুদ পাঞ্জাবি এনে দেবে??

আমেনা বেগমঃ পুরনো কেন??
নতুন ই এনে দেবো।

হিমুঃ না,আমার পুরনোই লাগবে।
যেখান থেকে পারো এনে দাওনা।

আমেনা বেগমঃ তোর কিছুই এখন আর বুঝিনা।
আচ্ছা,এনে দেবো।

হিমু বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখল একটা রঙ চটে যাওয়া পুরানো হলদে পাঞ্জাবি তার বিছানার ওপরে পড়ে আছে।হিমু সাথে সাথে ওই পাঞ্জাবিটা পড়ে ফেলল আর রাতে যখন তার আম্মু আব্বুর সাথে খেতে বসল তখন হিমুর সেই অবস্থা দেখে কবির সাহেব তো তব্দা খেয়ে গেলেন…

কবির সাহেবঃবলদের এই শ্রী কেন???
এটা কি পড়েছিস তুই??

হিমুঃএটাই আমার উপযুক্ত পোশাক।

আমেনা বেগমঃ তাই বলে তুই এটা পড়ে খেতে বসবি??

কবির সাহেবঃদাও,আরও লাই দাও।এসব তোমার আদরের ফল।তুমি ই নিশ্চয়ই ওকে এটা এনে দিয়েছো।তোমরা যা খুশি করো মা ছেলে মিলে।

কবির সাহেব খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলেন।আমেনা বেগম ফ্যালফ্যাল করে হিমুর দিকে তাকিয়ে রইলেন,আর হিমুর সমস্ত মনোযোগ তার পাঞ্জাবিতে লেগে যাওয়া ঝোল পরিষ্কারে….

১৯ জুলাই,২০১২,রাত ৯ টা…

কবির সাহেবঃতোমার বলদ ছেলে আজ কি করেছে জানো??

আমেনা বেগমঃকি করেছে??

কবির সাহেবঃআমার বন্ধু খান আজ ওকে রমনায় দেখেছে।ও নাকি সেই হলুদ ময়লা পাঞ্জাবিটা পড়ে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিল।ওর কি পড়াশুনা নেই নাকি???সন্ন্যাসী হয়েছে??

আমেনা বেগমঃআরে,খান সাহেব কি দেখতে কি দেখেছে কে জানে।

কবির সাহেবঃআজগুবি কথা বাদ দাও,আর তোমার ছেলেকে সামলাও।আমার বাড়িতে কোন সন্ন্যাসীগিরি চলবেনা।

আমেনা বেগম হিমুর রুমে গেলেন,দেখলেন হিমু চোখ বন্ধ করে বসে আছে কিছু বলছেনা।হিমুর আচার আচরণ খুবই বিভ্রান্তিকর।
বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার
প্রতিক্রিয়া অপরকে বিভ্রান্ত
করে।এই বিভ্রান্ত করা হিমুর
অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ।

আমেনা বেগমঃবাবা হিমু,তুই ঠিক আছিস তো??এরকম করছিস কেন??হিমু…হিমু রে…
হিমুঃউহ।।মা চেঁচিয়ো না তো।চিন্তা করার সময় ডাকতে নেই।

আমেনা বেগমঃতোর কি হয়েছে রে আমাকে বলবি???
তোর বাবার বন্ধু নাকি আজ তকে খালি পায়ে রাস্তায় হাট তে দেখেছে।

হিমুঃমা,খালি পায়ে হাটতে বেশ মজা লাগে।তুমি ট্রাই করতে পারো।শুধু সমস্যা হচ্ছে ঢাকা শহরের রাস্তা ঘাঁট ভালোনা।এই যেমন আজ হাটতে গিয়ে পায়ে কাঁচা গু লেগে গেছে।এসব সমস্যা ছাড়া আর তেমন সমস্যা নেই।

আমেনা বেগমঃকি বলিস এগুলো??আমাকে বুঝিয়ে বল তোর কি হয়েছে??

হিমুঃউহ মা জ্বালিয়োনা তো।এত কিছু বোঝা লাগবেনা।এখন যাও ।

আমেনা বেগম মুখ গোমড়া করে বের হয়ে এলেন হিমুর রুম থেকে।
তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না যে তার ছেলেটার কি হয়েছে।।বাইরে এসে দেখলেন কবির সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন।তিনি সবই শুনেছেন…

কবির সাহেবঃতোমার ছেলেকে আর ২-৩ দিন আদর করে নাও।ওকে আমি চট্টগ্রাম আমার ভাইয়ের বাসায় দিয়ে আসবো।

আমেনা বেগমঃকেন??ওকে ওখানে নিয়ে যাবে কেন???

কবির সাহেবঃ কেন?ওর অস্বাভাবিক
আচরন কি তোমার চোখে পড়ছে না?
এখানে আর কিছুদিন থাকলে ও বদ্ধ
পাগল হবে।হি নিডস ট্রিটমেন্ট।
আমার ভাই মনরোগ বিশেষজ্ঞ।হিমেল
ওখান থেকে সুস্থ হয়েই ফিরবে।

আমেনা বেগমঃ প্লীজ,আর কটা দিন
দেখো।তারপর না হয় . . . . .

কবির সাহেবঃ ওর মাথা থেকে যত
জলদি সম্ভব হিমুর ভূত ছাড়াতে হবে।
হুমায়ুন আহমেদের একটা বই
পড়েছি কাল রাতে।ঐ বইতে হিমু
নামে একটা চরিত্র আছে।তোমার
ছেলে ঐ গল্পের ঠিক আবাল
মার্কা বিরক্তিকর হিমু হওয়ার
চেষ্টা করছে।তাই আমি ডিসিশান
নিয়ে ফেলেছি।তুমি আর একটা কথাও
বাড়াবেনা আশা করছি।

প্রচন্ড রকমের অভিমান আর
হতাশা নিয়ে আর কথা না বলে সেখান
থেকে আমেনা বেগম চলে গেলেন।

রাত ১১.৪৫|

খাওয়া দাওয়া শেষে হিমেল তার
ঘরে চুপচাপ বসে আছে।দুইদিন ধরেই
তার মনটা খারাপ।একটু আগেই
টিভিতে ব্রেকিং নিউজের
মাধ্যমে সে জানতে পেরেছে তার
প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ আর বেঁচে নেই।
এরকম কিছু একটা ঘটবে তা সে আগেই
জানত।কারণ হিমুরা আগে থেকেই
অনেক কিছুর পূর্বাভাস পায়।ভবিষৎবাণী করতে পারে।
তার মন
খারাপ
করে কাঁদতে হবে কিনা তা চিন্তা করে
মনকে শান্ত
করল,সে কাঁদতে পারবেনা।কারণ হিমুর
কাঁদতে নেই,তার স্বাভাবিক
থাকতে হয় সবসময়।
হিমু মন
খারাপকে ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক
হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল।এক সময়
সে ঘুমিয়েও গেল।

২০ জুলাই,২০১২।সকাল ৯টা|

নাস্তার টেবিলে বসে কবির
সাহেব জানালেন আগামী ২৩
জুলাই,সোমবার
তিনি হিমেলকে নিয়ে চট্টগ্রাম
যাচ্ছেন।
হিমুকে তৈরী থাকতে বললেন।হিমু
হ্যাঁ অথবা না কোনো জবাব
না দিয়ে নাস্তা করতে লাগল।
রাতে হিমু আমেনা বেগমকে জানায়
সে চট্টগ্রাম যাবে কিন্তু তার ৩
টি শর্ত পূরণ করতে হবে।তবেই
সে যেতে রাজি হবে।আমেনা বেগম
শর্ত ৩টি জানতে চাইলে হিমু
একে একে বলে যায় . . . . .

১)হিমুকে চট্টগ্রাম
একা যেতে দিতে হবে।সে কারও
সাথে যেতে ইচ্ছুক না।

২)সে প্লেন অথবা নিজ
গাড়িতে করে যাবেনা।
তাকে বাসে করে যেতে দিতে হবে।

৩)যাওয়ার সময় সে হলুদ
পাঞ্জাবি পরে যাবে,এই
ব্যাপারে তাকে বাধা দেওয়া যাবেনা

আমেনা বেগম খুব মনযোগ
সহকারে শর্তগুলো শুনলেন।হিমুর
প্রতি খুব রাগ লাগার পর ও
তিনি তাকে কিছু বললেন না।কারণ এই
ছেলেটি আর কিছু মুহূর্ত তার চোখের
সামনে থাকবে।
তিনি জানেন তার
ছেলে একরোখা স্বভাবের।
বুঝিয়ে বললেও লাভ নেই।
অপরদিকে হিমুর বাবা ও জেদী।এই
কথা শুনলে তার মাথা আরও গরম হবে।
তিনি চুপচাপ হিমুর ঘর
থেকে বেরিয়ে এলেন।তিনি জানেন
শর্তগুলো নিতান্তই অনর্থক।তবুও সাহস
করে শর্তগুলো কবির
সাহেবকে জানালেন।
কবির সাহেব ভয়ংকর রকমের রাগ
করলেন।ইনি হিমুর গায়ে কখনো হাত
তুলেন নি।কিন্তু তখন কষে দুইটা চড়
দিতে খুব ইচ্ছে করছিল তার।রাত
অনেক হওয়াতে এবং আমেনা বেগমের
বাধা পেয়ে তিনি নিজেকে সামলে নে
রাত পেরুতেই খুব সকাল সকাল কবির
সাহেব হিমুর ঘরে যান।তিনি হিমুর
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তার
ছেলেটাকে অনেক্ষণ ধরে দেখেন।হিমু
নিষ্পাপ শিশুর মত ঘুমুচ্ছিল।
তিনি চুপিসারে হিমুর মাথায় হাত
বুলাতেই হিমু নড়ে চড়ে উঠে।
সাথে সাথে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে
ভাব এনে ফেলেন মুখে।হিমুর ঘুম
ভেঙে গেলে বিছানায়
উঠে বসে দুহাতে চোখ ডলতে লাগল।
তার অবাক লাগছে সকাল বেলা তার
বাবাকে তার ঘরে দেখে।

হিমুঃ কি হলো আব্বু?কিছু বলবে?

কবির সাহেবঃ হুম।তোর
সাথে জরুরি কথা ছিল।

হিমুঃ আচ্ছা বলো,শুনি।
একটা কথা,তোমার মেজাজ এখন কত
ডিগ্রী গরম?

কবির সাহেবঃ খবরদার
হিমেল,ফাজলামো করবি না বলছি।

হিমুঃ হেহে।তবে এটা ফাজলামো না।
আমি জানি তুমি খুব রেগে আছো।যদিও
তোমার চেহারা আমার সাথে অভিনয়
করছে।কিন্তু আমার
চোখকে ফাঁকি দেওয়া এতো সোজা না।
হেহে . . . .

কবির সাহেবঃ তোর
সমস্যা কি জানিস?তুই আস্ত
একটা বলদ।তোর মত বলদ আমি দ্বিতীয়
দেখিনি।

হিমুঃ উফ।একমাত্র বলদের শ্রেষ্ঠ
পিতা হিসেবে তাহলে তোমার
গর্ববোধ করা উচিত।হেহে . . . . .।

কবির সাহেবঃ দুইটা থাপ্পর
দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দেবো,বেয়াদব ছেলে
একটা।

হিমুঃ তুমি যেন
কি বলতে এসেছো বলো।(বাধ্য ছেলের
মত মাথা নিচু করে)

কবির সাহেবঃ তুই এগুলা কি শর্ত
দিয়েছিস?পাগল হয়ে গেছিস পুরোপুরি?

হিমুঃআমি খুব ভেবে-চিন্তে বলেছি।
এতে কারো কোনো ক্ষতি নেই।

কবির
সাহেবঃ তোকে আমি একা ছাড়তে পারি না
আর এই পঁচা হলুদ পাঞ্জাবি পরে তুই
চট্টগ্রাম যাবি?তোর কি অভাব
লেগেছে কাপড়ের?

হিমুঃ আব্বু প্লীজ আমাকে বাধা দিও
না।

কবির সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ
করে একটু
ঠান্ডা মেজাজে বোঝাতে চেষ্টা করেও
ব্যর্থ হলেন।এক
পর্যায়ে তিনি অসম্ভব রকমের রাগ
করে হিমুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
তিনি অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলেন
হিমুকে ঠিকানা দিয়ে দিলে সে পৌঁছে
আর তার ৩টি শর্ত পূরণ হলে যেহেতু
তাকে উপযুক্ত জায়গায়
পাঠানো যাবে তাই
তিনি অনিচ্ছ্বা থাকার পরেও
রাজি হলেন।খুব কষ্টে তার রাগ
নিয়ন্ত্রণ করলেন।
হিমু এই খবর জানতে পেরে খুশি হয়।
আমেনা বেগম দিনরাত কাঁদতে শুরু
করলেন।
তিনি হিমুকে ছেড়ে কখনো থাকেন নি।
সেই হিমু চলে যাবে অনির্দিষ্টকালের
জন্য।ভাবতেই তার নরম
বুকটা চিড়ে কান্না বেরিয়ে আসে।

২৩জুলাই,২০১২|

আমেনা বেগম হিমুর পাশে শুয়ে আছেন।
তার চোখে পানি।একাকি জীবনে এই
ছেলেটাই তার সঙ্গী,আজ তার আদরের
ছেলেটা চোখের আড়াল হবে।
তিনি হিমুকে সবসময় তার
কাছে রেখেছিলেন।
সারা রাত আমেনা বেগম
জেগে ছিলেন।তিনি হিমুর
ঘরে শুয়েছেন কাল রাতে।
ছেলেটাকে ২দিন তিনি অনেক আদর
করেছেন।তার যেন মন ভরেনা।মায়ের
আদরের অন্ত নেই।বারবার শুধু আদর
করতেই ইচ্ছে করে।
হিমু তার মাকে খুব ভালবাসে।কিন্তু
কদিন ধরে হিমু বদলে গেছে।
জড়োসড়ো হয়ে চুপচাপ বসে থাকে।
সারাদিন বইয়ের মাঝে ডুবে থাকে।
এমন্কি মা-বাবার কাছ
থেকে দূরে যাবে ভেবেও তার মন
খারাপ হয়না।সে স্বাভাবিক ব্যবহার
করছে।তার কোনো কষ্ট নেই,অভিমান
নেই,কিছু বলার নেই।
কবির সাহেব হিমুর ঘরের দরজায়
কড়া নাড়লে হিমুর ঘুম ভাঙে।সে উঠেই
ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমের
দিকে চলে গেলো।হিমু আজ কারও
সাথে কোনো কথা বলছেনা।বারবার
জানতে চাইছে তারা কখন রওনা হবে।
নাস্তা শেষে হিমু তার ব্যাগ
নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
আমেনা বেগম ছেলের
পাশে বসে অঝরে কাঁদছেন।কবির
সাহেব গাড়ি বের
করে হিমুকে নিতে এলেন হিমুর ঘরে।
হিমু মাথা নিচু করে মৃদু গলায় তার
মায়ের কাছ থেকে বিদায়
নিয়ে জলদি বেরিয়ে পড়ল।
তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার
সুযোগটাও সে দিলনা দিলনা তার
মাকে।
হয়ত এ এক লুকোনো অভিমান!

সকাল ১১.৩০|

হিমু আর কবির সাহেব
গাড়িতে বসে আছে।হিমুকে কবির
সাহেব
বাসে তুলে দিয়ে ফিরে আসবেন।হিমু
বেশ চুপচাপ হয়ে বসে আছে।কবির
সাহেব গম্ভীর হয়ে আছেন।
হঠাৎ তাদের গাড়ি থামলো মাঝপথে।
তারা দেখতে পেলো একদল তরুণ হলুদ
পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাতে ফুল
নিয়ে শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছে।
হিমু খুব মনযোগ দিয়ে সেই দৃশ্য
দেখছে।
কবির সাহেব বিরক্তির ছাপ
নিয়ে বলতে লাগলেন,
‘দুনিয়ার যত আজব কাহিনী।হুমায়ুন
আহমেদ মারা গেছে বলে কি এরকম
করে রাস্তায় হাঁটতে হবে নাকি?একজন
মানুষ মরে গেছে আর গাধাগুলার
এগুলা কি ধরনের ফাজলামি।
রাস্তাঘাটে নেমে ফাজলামি করছে এর
বিশ্রী রঙের একটা পোশাক পরে।সব
কয়টাকে দুইটা করে থাপ্পর দিলে ঠিক
হত।’

হিমুর কথাগুলো শুনে খুব হাসি পেল।হিমু
স্বতন্ত্র ব্যাক্তিত্বের অধিকারী।
সে প্রায়ই যুক্তি-
বিরোধী মতানুসারে আচরণ করে,
এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে।কিন্তু
হিমু এসব শুনেও
না শোনার ভান করে চুপ করে রইল।কিছু বলল না।

বাস স্ট্যান্ড
থেকে হিমুকে চট্টগ্রামের
বাসে তুলে দিলেন কবির সাহেব।
হিমুকে সাবধানে যেতে আর তার
নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে বললেন
তিনি।আর কোনো সমস্যা হলে ফোন
করতে বলে তিনি চলে গেলেন।বাস ও
ছেড়ে চলে গেলো।
কবির সাহেব বেশ হাসি খুশি ভাব
নিয়েই ঘরে ঢুকলেন।এত আনন্দিত
তাকে আগে কোনোদিন
লেগেছে কিনা বলা মুশকিল।
তিনি হয়ত তার ভেতরের
চাপা কষ্টকে হাসির মাধ্যমে প্রকাশ
করছেন।

আমেনা বেগমের অসম্ভব রকমের মন
খারাপ।তিনি তার ঘরে চুপ
করে বসে আছেন।তিনি জানেন তার
ছেলে মানসিকভাবে অসুস্থ নয়।আর
কবির সাহেব তার মনের তুষ্টির জন্য
চাইলেই ঢাকায়
চিকিৎসা করাতে পারতেন।
তা না করে এত দূর
ছেলেটাকে পাঠিয়ে দেওয়া তার উচিত
হয়নি।কিন্তু কবির সাহেবের
কাছে তিনি বরাবর ই হার
মেনে এসেছেন।

কোনো বিশেষ কারণেই হোক আর
অকারণেই হোক,আজ কবির সাহেব
বাসা থেকে একটুও নড়ছেন না।
সারাদিন বাড়িতে কাটালেন।
তিনি টিভিতে বিকেল ৫ টার সংবাদ
দেখতে লাগলেন।
তিনি খবরে দেখতে পেলেন
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের
উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি বাস
খাদে পড়েছে।তিনি টিভি স্ক্রীণের
দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালেন।তার
বুঝতে কষ্ট হলোনা এই সেই বাস
যেটায়
হিমেলকে তিনি তুলে দিয়েছেন।কিন্তু
মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।সেখানে নিহত হয়েছে অনেকেই।এ কি থেকে কি হয়ে গেল!!তিনি আমেনা বেগমকে কি জবাব দিবেন!!তিনি অপরাধী হয়ে গেলেন।

হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল।মুখে বিষাদের চিহ্ন নিয়ে কবির সাহেব দরজা খুল্লেন।দরজায় দাঁড়িয়ে তার ছেলে হিমেল।তিনি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন।সব অভিমান ঝেরে ফেলে দিলেন।তিনি হিমু বলে ডাকলেন হিমেলকে।জানতে চাইলেন কিভাবে সে বাড়ি ফিরল।হিমু বলল কবির সাহেব চলে আসার পর সে বাস থামিয়ে তখনই নেমে পড়ে।গন্তব্য শহীদ মিনার।শহীদ মিনারে যাবার আগে সে কিছু ফুল কিনে নেয়।সেখানে যেয়ে লাখ লোকের ভিড় সামলে শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আহমেদের সাথে প্রথম এবং শেষ দেখা করে।তার পদচরণে ফুল সাজিয়ে দেয়।সেখানে দোয়া করে এবং বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

কবির সাহেব কথাগুলো শুনে আজ আর রাগ করলেন না।আমেনা বেগম দৌঁড়ে ছুটে এলেন হিমুর কাছে।তিনি এখনও ওসব কিছুই জানেন না।তিনি জানেন তার ছেলে মায়ের কোলে ফিরে এসেছে।

হিমুর বেঁচে থাকার প্রয়োজন।তাই হিমু বেঁচে আছে।আর হিমুরা বেঁচে থাকবে।

(উৎসর্গ: শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে।
হুমায়ুন স্যারকে নিয়ে লেখার যোগ্যতা হয়তো আমার হয়নি।তবুও বৃথা চেষ্টা।গত বছর এমন দিনে তাঁকে হারাবো ভাবিনি।এ কি শূণ্যতা দিয়ে গেলেন তিনি!গল্পটি তাঁর স্মরণে রচিত।)

১১ thoughts on “হিমুরা বেঁচে থাকবে

  1. সাধারণ গল্প হলেও পড়তে ভালো
    সাধারণ গল্প হলেও পড়তে ভালো লেগেছে। লেখাটা এক পর্যায়ে এসে এরকম কবিতার কাঠামো পেলো কেন? এডিট করে দিয়েন পারলে। পড়তে কষ্ট হয়।

  2. খারাপ না ভালই লেগেছে! তবে
    খারাপ না ভালই লেগেছে! তবে আপনি বোধহয় মোবাইল দিয়ে লিখেছেন (পরপর দুইবার পোস্টিত হয়েছিল…); তাই এমন হয়েছে, পারলে এডিট করে দিয়েন। কথোপকথনের অংশ ছাড়া বাকি অংশ গদ্যের মত না হয়ে পদ্যের মত হলে পড়তে পাঠক বিরক্তবোধ করবে…
    আর এক চরিত্র নিয়ে সবাই লিখতে গেলে মূল চরিত্র স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে! কারণ হুমায়ুন আহমেদ হিমুকে দিয়ে মানুষের ছেলেমানুষিপূর্ণ ইচ্ছাগুলোর একটা লিখিতরুপ দিয়েছেন তার অসাধারণ লিখনি দিয়ে।। চাইলেই সবাই হিমুকে নিজের মত করে বর্ণনা করতে পারবে…
    তবে আমি অনুরোধ আমরা এইটা না করলেই বরং ভাল!
    আপনার লিখনি ভাল নিজের মত করে লিখুন অনেক ভাল কিছুও হতে পারে।
    স্যারকে সালাম :salute: আপনাকে ধন্যবাদ :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. আমি শুধু একটি গল্পেই এই
      আমি শুধু একটি গল্পেই এই চরিত্র নিয়ে লিখেছি।
      এভাবে আর লেখা হচ্ছেনা।

      হুম।মোবাইলে লিখেছি।
      ধন্যবাদ আপনাকে।

  3. পড়ে ভালো লাগলো| তবে তোমার
    পড়ে ভালো লাগলো| তবে তোমার অন্য লেখাগুলো বেশী ভালো| এক চরিত্র সবাই লিখাতে হয়তো এমন মনে হয়েছে|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *