টিআইবি’র করাপশন রিপোর্ট। সত্য না মিথ্যা??

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল (টিআই) একটি জার্মানির বার্লিনভিত্তিক দুর্নিতী বিরুধী একটি বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এটি ১৯৯৩ সালে কাজ শুরু করে। বাংলাদেশের শাখার নাম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি),বাংলাদেশে কাজ শুরু করে ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশে এই সংস্থার চেয়ারম্যন এ্যডভোকেট সুলতানা কামাল,নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান,গবেষণা পরিচালক রফিক হাসান। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সংস্থাটি বিভিন্ন বিষয়ে জরিপ প্রতিবেদন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করে। প্রত্যেক বারই এই প্রতিবেন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যাদের কে নিয়ে জরিপ করা হয় তারা কোণ সময় প্রতিবেদনের তথ্য স্বীকার করে না,আর না করারি কথা। কারন নিজের দোষ কয়জনই স্বীকার করে? কয়েক মাস আগে সাংসদদের নিয়ে একটি জরিপ চালিয়ে ছিল সেখানে বলে ছিল প্রায় ৯৭% সাংসদ কোন না কোন অনৈতিক কাজে জরিত। এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয়ে ছিল, বলা হয়ে ছিল সাংসদদের মান ক্ষুণ্ণ করার জন্য টিআইবি এসব ষড়যন্ত্র করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, এটি হল ‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার-২০১৩’

২.
টিআইয়ের গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার-২০১৩ শীর্ষক প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায়, ৫১টি দেশের মানুষ তাদের দেশের চরম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু সেই ৫১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। সে তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, মালদ্বীপ ও নেপালের নাম রয়েছে। এই রিপোর্টে যে ৩৬টি দেশের মানুষ মনে করে যে পুলিশ হচ্ছে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত, সেসব দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। টিআইয়ের প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, ১২টি জনসম্পৃক্ত খাত বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পুলিশকে চিহ্নিত করেছে। পুলিশের পয়েন্ট মার্ক ৩.৯। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিচার বিভাগ (৩.৫)। তৃতীয় স্থানে এসেছে রাজনৈতিক দল (৩.৪)। এরপর ক্রমানুসারে রয়েছে সংসদ/আইনসভা (৩.২), চিকিৎসা/স্বাস্থ্য (২.৯), পরিষেবা (২.৯), ব্যবসা/বেসরকারি খাত (২.৬), শিক্ষাব্যবস্থা (২.০), গণমাধ্যম (২.০), এনজিও (১.৭), সেনাবাহিনী (১.৫) এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (১.৫)। জরিপ পরিচালনাকালে একজন উত্তরদাতার কাছে ১২টি খাত বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হয়েছিল- নিচের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করেন? প্রতিটি খাত বা প্রতিষ্ঠানের পাশে পাঁচটি উত্তর ছিল। ১. একেবারেই দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, ২. কম দুর্নীতিগ্রস্ত, ৩. দুর্নীতিগ্রস্ত, ৪. বেশ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ৫. খুবই দুর্নীতিগ্রস্ত। বার্লিনভিত্তিক টিআই ১০৭টি দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ২৭০ জনের ধারণা ও অভিজ্ঞতার ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। বাংলাদেশে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা-বয়সের এক হাজার ৮২২ জন তথ্যদাতার কাছ থেকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে তথ্য সংগৃহীত হয়। এর ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের (বৈশ্বিক) ধারণা এবং বাংলাদেশের মানুষের ধারণার চিত্র তুলে ধরা হয়।
টিআইবির প্রতিবেদনে দুর্নীতির শীর্ষ খাত বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশ মানুষের মতানুযায়ী রাজনৈতিক দল আর পুলিশ প্রশাসন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। একই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক দলের দুর্নীতিকে উদ্বেগজনক মনে করে বৈশ্বিকভাবে ৬৫ শতাংশ মানুষ আর বাংলাদেশে উদ্বেগজনক মনে করেছে ৪৫ শতাংশ মানুষ।

৩.
এই বিসয়টা নিয়ে যতটা বিতর্ক হওয়ার কথা ছিল, এই সময়ে ততটা হয় নি। গোলামের ও মুজাহিদের রায়ের কারনে এক ইস্যু তে আরেক ইস্যু চাপা পরে গেছে। কিন্তু আমাদের যদি বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো যে, এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশের মহা পরিচালক এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সকল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সমলোচনা করেছেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন এই রিপোর্ট ‘রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলছেন যে মুহূর্তে পুলিশ নিজের জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে, তখন পুলিশের বিরুদ্ধে এ রিপোর্ট দিয়ে তারা তাদের মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে।
টিআই এর প্রতিবেদন এবং টিআইবি এর প্রতিবেদনের অমিলও খুজে পাওয়া গিয়েছিল,এই বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন এটা টেকনিক্যাল সমস্যার কারনে হতে পারে,আমরা উদ্দেশ্যমুলুক ভাবে কিছু করিনি।

৪.
বলা হয়েছিল ১৮২২ জনের মতামত নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরী করেছে,আসলেই কি এই কথা শুধু এই কয়জন মানুষের? যাদের নিয়ে এই প্রতিবেদন তারা বলছেন টিআইবির রিপোর্ট সম্পুর্ন ভুল, উদ্দেশ্যমুলুক, ষড়যন্ত্রমুলুক, তৃতীয় শক্তির দালাল হিসাবে কাজ করছে, জামাত শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত আছে। কিন্তু আমরা একটু নিজেরা বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখি কতটা সত্য, রাজনৈতিক দল আর পুলিশ প্রশাসন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছে, রাজনৈতিক দল বলতে যারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থেকেছে এবং আছে তাদেরকেই বলা হয়েছে। বিএনপি বলছে যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই দুর্নিতি করার সুযোগ রয়েছে তার মানে এক দল স্বীকার করল যে, তারাও ক্ষমতায় থাকা কালে দুর্নিতি করেছে। কিন্তু লীগ বলছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে টিআইবি,(এই দুই দলের নেতাদের কি চরিত্র আবার হননের চেষ্টা)অতএব তারা এটাকে প্রত্যাখ্যান করল। যদি দুর্নিতি না করে থাকে তাহলে তাহলে একজনের ঢাকা শহরে দুই তিন বা তার চেয়ে আরও বেশি ফ্লট ফ্ল্যাট,গাড়ি বাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মাঝে খবর আসে টিআর কাবিখা এগুলুও ঐ এলাকার সাংসদ মেরে খান এতে চরিত্র নষ্ট হয় না। লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ খেয়ে চাকরি দেন মানুষকে এতে চরিত্র নষ্ট হয় না। আর পুলিশ, এমন কোন মানুষ নাই যে পুলিশের দুর্নিতি সরাসরি দেখেন না, রাস্তায় বাস দিয়ে চলতে গেলে দেখা যায় গাড়ি আটকিয়ে দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ এটা দাও ওটা দাও ড্রাইভার কিছু না দিয়ে ২০০-৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে দেয় তো সব শেষ। কত ধরনের যে ভুল ধরে টাকা লওয়া যায় যা শুধু তারাই জানে। থানায় একটা জিডি করতে গেলেও ৫০-১০০ টাকা দেওয়া লাগে কেন? এটা কী দুর্নিতি না? বিভিন্ন কারনে মানুষের বাড়িতে পুলিশ ভেরিফিকেশনে গেলে ৫০০-১০০০ টাকা দেওয়া লাগে, এসব মনে হয় নিয়মই হয়ে গেছে। এসব যদি দুর্নিতির সংজ্ঞায় না পরে তাহলে টিআইবির রিপোর্ট ভুল,মিথ্যা। যদি এগুলো দুর্নিতির সংজ্ঞায় পরে তাহলে টিআইবির রিপোর্ট সত্য এবং সাধারন মানুষের কথা।

বিঃদ্রঃ তথ্যে যদি কোন ভুল থাকে তাহলে সঠিক তথ্য পেলে সংশোধন করা হবে ।

৫ thoughts on “টিআইবি’র করাপশন রিপোর্ট। সত্য না মিথ্যা??

  1. দুর্নীতি চোখে দেখতে চান
    দুর্নীতি চোখে দেখতে চান ?
    ট্রাফিক পুলিশ এর পাশে দাড়ান ।
    দুর্নীতির কথা শুনতে চান ?
    সংবাদ শুনুন ।
    দুর্নীতি নিজে করতে চান ?
    সরকারি চাকরীতে যোগ দিন ?

    আর এসব থেকে দুরে থাকতে চান,
    বনবাসে যান ….. :মাথাঠুকি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *