হিমুর ময়ূরাক্ষীতে একদিন…!!

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত আমার প্রিয় একটি বই ” একা এবং কয়েকজন” এর কিছু কথা দিয়েই লেখাটা শুরু করছি।”ভালো করে ভেবে দেখতে গেলে,প্রত্যেক মানুষেরই জন্মের পেছনে একটা করে রোমহর্ষক গল্প আছে। যে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা প্রতিটি জন্মকে ঘিরে থাকে-তার সঙ্গে তুলনা চলে আর কিসের।”

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত আমার প্রিয় একটি বই ” একা এবং কয়েকজন” এর কিছু কথা দিয়েই লেখাটা শুরু করছি।”ভালো করে ভেবে দেখতে গেলে,প্রত্যেক মানুষেরই জন্মের পেছনে একটা করে রোমহর্ষক গল্প আছে। যে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা প্রতিটি জন্মকে ঘিরে থাকে-তার সঙ্গে তুলনা চলে আর কিসের।”

আমি নিজেকে এখনও লেখক ভাবিনা। আমার সাথে কোন লেখকের পরিচয়ও নেই। সেরকম কারো সাথে পরিচয় থাকলে তাকে জিজ্ঞাসা করতাম তাদের সৃষ্ট উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে জন্ম দিতেও কি তাদের এই উদ্বেগ, উৎকন্ঠা পার হয়ে আসতে হয় কিনা। সুনীলের সৃষ্ট সূর্য, শীর্ষেন্দুর সৃষ্ট শ্রীনাথ, ধ্রুব কিংবা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের হরিশঙ্কর , পিন্টু, মুকু কিংবা হুমায়ূন আহমেদ এর হিমু, মিসির আলী এদের জম্ম রহস্যটা কি? হ্যাঁ এরা হয়তো কেবল উপন্যাসের কিছু চরিত্র। আমরাও যেমন এক একজন মানুষ এক একটা চরিত্র। জীবন নামের নাট্যশালায় আমরাওতো অভিনয় করেই যাচ্ছি। আমাদের সৃষ্টিকর্তাতো আমাদেরকে নির্দিষ্ট একটা পাণ্ডুলিপি দিয়েই পাঠিয়েছেন। সেই অর্থে প্রত্যেক লেখকই এক একজন সৃষ্টিকর্তা। আমার মূল লেথা শুরু করার আগে আমি কিছু ভূমিকা নিচ্ছি। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন রচনা কিংবা ভাবসম্প্রসারন লেখার শুরতে অনেকবার ভূমিকা কিংবা সূচনা লিখেছি। আমার সবসময় চেষ্টা থাকত শুরুটা যাতে আকর্ষণীয় হয়। যেমন ”জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর ”-এর ভাবসম্প্রসারন শুরু করতাম, একথা জগত জীবনের শ্বাশত প্রত্যয় কথার কথা কিংবা শূণ্যগর্ভ বাণী নয় । জীবের জীবন দাতার অধীষ্ঠান। রূপময় জীবনকে বাদ দিয়ে অভক্তি আর অশ্রদ্ধাকে সঙ্গি করে ঈশ্বরকে পাওয়া যায়না। তিনি রূপের মাঝে রূপাতীত, জীবের অন্তরে সজীব আত্মা। অনেকেই হয়তো ভাবছেন ভূমিকা লেখা হয়নি তো শুরুর লেখাটা কি? দয়া করে কেউ এ প্রশ্ন করবেন না। কারণ এর উত্তর আমার জানা নেই। পাঠকদের আমি আগেই জানিয়েছি আমি কোন লেখক নই। তাই ক্ষমা পাব আশা করেই আবার লিখতে শুরু করছি।

Man is a rope, tied between beast and over man. পশু আর অতিমানব যে দড়িতে বাঁধা সেই দড়িটি হল মানুষ। সেই দড়ি চলে গেছে অতি গভীর এক খাদের উপর দিয়ে। A dangerous across. অতি বিপদজ্জনক পারাপার। সাংঘাতিক এক চলার পথ। ফিরে তাকালেই বিপদ। দোদুল্যমান এক রজ্জু । দাঁড়াবার উপায় নেই। Man is something that shall be overcome. মানুষ এমন এক জীব যাকে পেরিয়ে যেতে হবে। মানুষকে অতিক্রম করতে না পারলে মানুষ হওয়া যবেনা।- যারা সজ্ঞীব চট্টোপাধ্যায়ের ”লোটাকম্বল” পড়েননি তাদেরকে বলছি অংশটুকু সেখান থেকে নেয়া।

আমরাতো মানুষই। মানুষ হয়ে মানুষকে কিভাবে অতিক্রম করব? না আমি আপনাদের মানুষ হয়ে কিভাবে মানুষকে অতিক্রম করতে হবে তা বলার জন্য লিখছি না। আমি এও বলবোনা মানুষ ও পশুর মধ্যে অতি পাতলা কাগজের দেয়াল। একটু এদিকওদিক হলেই যে দেয়াল, চার দেয়ালের ঘরে পরিণত হয়। আর বিবেক তখন সেই চার দেয়ালে আটকা পড়ে। না সংযত হতে হবে। ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। জীবনে দেখাতো কম হলনা। কত রকমের মানুষ, কত রকমের অসুখ! বিচিত্রসব পরিস্থিতি! জীবনে আনন্দের ভাগের চেয়ে দুঃখের ভাগই বেশী। আমাদের সুখ যে কোথায় তা আমরা নিজেরাই জানিনা। তবুও সেই সুখের আশায় একে অন্যের উপর চড়ে বেরাচ্ছি। একবারতো জন্মেছি!! আর কি চাই? মানুষ হয়েইতো জন্মেছি। কিন্তু সেই মানুষ হয়ে জন্মেও নিজেদেরকে মানুষ বলে ভাবতেই ভুলে যাই।

আমি এবার আমার মূল বিষয়ে ফিরে যাই, উপন্যাসের চরিত্র। একজন লেখক যখন কোন উপন্যাস লেখেন তখন একটি থিমকে সামনে রেখে তিনি লেখাকে এগিয়ে নিয়ে যান। নির্দিষ্ট একটি বক্তব্যকে প্রকাশ করার জন্যই রচিত হয় একটি উপন্যাস। লেখক তার এই বক্তব্য প্রকাশ করেন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে। এ ঘটনাগুলো ঘটানোর জন্য পাত্রপাত্রীর প্রয়োজন হয়। এই পাত্রপাত্রীর কেউ নায়ক, কেউ নায়িকা। এই যে আমি লিখছি তা হয়তো আপনাদের কাছে পেীঁছবেনা। আর পেীঁছোলেও সবাই হয়তো পড়বেননা। আবার যে কয়েকজন পড়তে শুরু করবেন তাদের অনেকেই হয়তো পড়া শেষ না করেই আমাকে গালি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেবেন। শেষ পর্যন্ত যে কয়েকজন পড়েও ফেলবেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হয়তো গালি না দিয়ে বলবেন, সেই পুরোনো কচকচানি। তবে শেষপর্যন্ত যদি লেখকের লেখা কোন পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে তবে লেখক সেই একজনকে সঙ্গী করেই ছুটে চলেন নতুন সঙ্গীর খোঁজে। সমুদ্রের বুকে যে ঢেউয়ের উৎপত্তি সে ঢেউ সমুদ্রপাড়ের সকল বালুকে সমুদ্রবুকে নিয়ে যেতে চায়। এক ঢেউতো সকল বালু সমুদ্রের বুকে নিয়ে যেতে পারেনা। প্রতিটি ঢেউ বালুর কিছু অংশ সমুদ্র বুকে নিয়ে যায়, কিছু অংশের ভিত নাড়িয়ে যায়, আবার কিছু অংশ কেবলই ভিজিয়ে রেখে চলে যায়। তাইতো ঢেউয়ের ফিরে ফিরে আসা।

আমরা গল্প উপন্যাস অনেকেই পড়ি। এই পাঠকের অনেকেই শুধু পড়ার জন্যই পড়েন, অনেকেই আবার বোঝার জন্য পড়েন, অনেকে বোঝেন । অনেকে বুঝতে চেষ্টা করেন। মানুষের চরিত্র যেমন বহুরকমের তেমনি পাঠকও অনেক ধরনের। হুমায়ুন আহমেদ রচিত উপন্যাসের চরিত্র হমিুর ভক্তের অভাব নেই। আমি অনেককে প্রশ্ন করেছি, ”আপনার হিমু চরিত্রটি কেন ভাল লাগে?” কেউ বলেছেন হিমুর পাগলাটে ধরনের কাজগুলোর জন্য, কেউ বলেছেন আধ্যাতিক ক্ষমতা আছে বলে, কেউ কেউ বলেছেন পড়ার সময় একটা থ্রিল অনুভব করেন , তাই ভাল লাগে। আরও অনেক ধরনের উত্তর। হিমুর যেসব বইতে রূপার চরিত্র রয়েছে তা আবার অনেকের বেশী প্রিয়। হিমুর প্রতি ভাললাগা এমন পর্যায়ে পৌছেঁছে যে অনেকেই হিমু হওয়ার চেষ্টাও করেছেন। হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে চেপে খালি পাঁয়ে হাঁটতে শুরু করেছেন।এই খবর হিমুর সৃষ্টিকর্তা হুমায়ুন আহমেদ এর কাছে পেীছেছে। তিনি হয়তো খুশিই হয়েছেন। তার লেখা উপন্যাসের চরিত্র মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তারতো খুশি হওয়ারই কথা। কিন্তু তিনি কি আসলেই খুশি? আমার তা মনে হয়না। তার মত সৃষ্টিশীল লেখক এ ব্যাপারে খুশি হবেননা। বরং তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য না বুঝে আমরা যে পাগলামী করছি তাতে তার হাসিই পাবার কথা। যারা হিমুর বই পড়েন তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ লোক হিমু চরিত্রটি বুঝতে পারেননা বলেই আমার ধারনা। তারা শুধু ঘটনাপ্রবাহ পড়েন। কিন্ত হিমু চরিত্রের মধ্যদিয়ে লেখকের বক্তব্য বুঝতে চেষ্টা করেননা। আমি জানি সৃষ্টির উদ্দেশ্য সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। হিমু চরিত্র সম্পর্কে আমি যে ধারনা দেব তা একান্তই আমার নিজস্ব।। আমার এ ব্যাখ্যা হয়তো অনেকেরই পছন্দ হবেনা। তবুও কেন জানি চরিত্রটি এরকমভাবে আবিষ্কার করার পর সবাইকে জানানোর ইচ্ছাটাকে মাটিচাপা দিতে পারছিনা।

এই পৃথিবীতে প্রতীকী ভাষার অবস্থান খুব শক্ত। সৃষ্টির শুরু থেকে এই ভাষা চলে আসছে। হিমু চরিত্রটি সম্পূর্ণ প্রতীকী একটি চরিত্র।শুরুতেই বলব হলুদ পাঞ্জাবীর কথা। তার আগে একটা ঘটনা বলি, আমি তখন ক্লাশ এইট কিংবা নাইনের ছাত্র। আমাদের স্কুল, ড্রেসের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি হলেও যেকোন কারণেই হোক আমি একদিন স্কুল ড্রেস পড়ে যাইনি। ক্লাশ টিচার ক্লাশ করাতে এসে আমাকে অন্য পোষাকে দেখে এর কারণ জানতে চাইলেন। আমি কি কারণ বলেছিলাম মনে নেই। তবে কারণটা যে টিচারের পছন্দ হয়নি তা তখনই বুঝতে পেরেছিলাম। ক্লাশের প্রথম সারির ছাত্র হওয়ায় স্যার হয়তো আমাকে শাস্তি দিলেন না। এরপর স্যার আমাদের সবাইকে প্রশ্ন করলেন, “তোমরা যে স্কুল ড্রেস পড় তা কেন পড়?” আমরা কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। স্যার তখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, ”ওর মধ্যে আর তোমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তোমাদের দেখে যেকেউ বুঝতে পারবে তোমরা ছাত্র। আরও নির্দিষ্টভাবে তোমরা এ স্কুলের ছাত্র। কিন্তু ওকে দেখে কি কেউ বুঝতে পারবে যে ও ছাত্র? আর একটা স্কুলে অনেক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। এদের কারও বাবা-মা ধনী, কেউ কেউ গরীব। তোমাদের যদি কোন স্কুলড্রেস না থকতো তাহলে দেখা যেত কেউ পড়েছ খুব দামী পোষাক আর কেউ পড়েছ ছেরা পোষাক। এতে তোমাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়ে যেত। এখন বুঝতে পারছো কেন তোমাদের স্কুল ড্রেস পড়তে হয়?”

হিমুর হলুদ পাঞ্জাবীর ব্যাপারটা আসলে হিমুকে অন্য সবার থেকে আলাদা করার চেষ্টা। মানে আলাদা একটা আইডেনটিটি। মানে আমি একজন হিমু। পুরোপুরি বোঝাতে পারলাম না। উদাহরণ দিলে হয়তো বুঝবেন। ধরুন একজন মাওলানা তার পরিচয় হল তিনি পাঞ্জাবী পড়া থাকবেন মাথায় টুপি থাকবে আর সঙ্গে দাড়ি থাকতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে এরকম কাউকে দেখলেই আমরা আন্দাজ করতে পারি উনি একজন ধার্মিক লোক। আমার মতে হিমুর হলুদ পাঞ্জাবীর ব্যাপারটাও ঠিক তাই। হিমুর হলুদ পাঞ্জাবী হিমুর পরিচয় বহন করে। কিন্তু এটাতো হলুদ না হয়ে অন্য কোন রং হতে পারত? হ্যাঁ তা হয়তো পারত। তবে এর পেছনেও নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। যার কারণ শ্রদ্ধেয় লেখক বলতে পারবেন। তবে আপনাদরে সুবিধার্থে আমি হিমু এবং কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা বইয়রে শুরুটা একটু উল্লখে করতে পারি। সেখানে এক মহলিার রিক্সা দরকার তখন সে তার পাশে হিমুকে দখেতে পেয়ে হিমুকে তার জন্য রক্সিা ঠিক করতে বল। পরে হিমুর মনে প্রশ্ন জাগে আশপোশে এত মানুষ থাকতে ঐ মহিলা কেন তাকেই রিক্সা ডেকে দিতে বলল? তখন হিমু নিজেকে প্রশ্ন করে তার চেহারার মধ্যে এমন কিছু কি আছে যা দেখে সবাই বুঝবে,“I’m at your service.”আমার ধারণা হলুদ পাঞ্জাবীর বৈশিষ্ট্য সেখানেই।

”মানুষের মনে পরম-করূণাময় কিছু কাঁটা বিধাইয়া দেন। এই কাঁটার নাম মন্দ কাঁটা। তুমি যখনই কোন মন্দ কাজ করিবে তখনই এই কাঁটা তোমাকে স্মরণ করাইয়া দিবে। তুমি অস্বস্তিবোধ করিতে থাকিবে। ব্যাথাবোধ না- অস্বস্তিবোধ। সাধারণ মানুষের জন্যে এইসব কাঁটার প্রয়োজন আছে। সিদ্ধ পুরুষদের জন্যে প্রয়োজন নাই। কাজেই কণ্টকমুক্তির একটা চেষ্টা অকশ্যই তোমার মধ্যে থাকা উচিত। যেদিন তুমি নিজেকে সম্পূর্ণ কণ্টকমুক্ত করিতে পারিবে সেদিন তোমার মুক্তি।”

এই উপদেশ হিমুর বাবা তার পুত্রকে মহাপুরুষ বানানোর উপদেশ হিসেবে লিখেছিলেন। যারা হলুদ পাজ্ঞাবী পড়ে, খালি পাঁয়ে রাস্তায় হাঁটার কথা ভাবছেন তাদেরকে বলছি, হলুদ পাজ্ঞাবী গায়ে পড়ার আগে হিমুর বাবার উপদেশগুলো ভাল করে পড়ে নেবেন। মহাপুরুষ হওয়ার আগে আমাদের মানুষ হতে হবে। মানুষ হয়ে জন্মেও মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। আমাদের মন্দ কাঁটার অস্বস্তিবোধ দূর করতে হবে। এই অস্বস্তিবোধ নির্ধারক বিবেক। যা আমাদের অন্যান্য সৃষ্টি থেকে আলাদা করে।যে কারণে আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে পারছি, সেই বিবেককে নিজেদের স্বার্থের চারদেয়ালে আটকে না রেখে ছেড়ে দিতে হবে মুক্ত আকাশে।

” মানুষ মায়াবদ্ধ জীব । মায়ায় আবদ্ধ হওয়াই তাহার নিয়তি। মায়া কূপ বিশেষ। সে কূপের মায়ায় যে আাবদ্ধ হবে তাহার মনের গভীরতার উপর নির্ভরশীল। যখনই এরূপ কোন মায়া কূপে আবদ্ধ হওয়ার সম্ভবনা দেখিবে তখনই মুক্তির জন্য চেষ্টা করিতে হবে।মায়া নামক রঙিণ কূপে পড়িয়া জীবন কটানোর জন্য তোমার জন্ম হয়নি।”

এটাও হিমুর উদ্দেশ্যে লেখা তার বাবার উপদেশের আরেকটি। এর ব্যাখ্যার জন্য আমাকে বিতর্কিত একটি বিষয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন বিতর্কিত তা জানা সত্তেও তা নিয়ে আলোচনা কেন? আসলে এ নিয়ে আমার নিজের মধ্যে কোন বিতর্ক নেই। যারা বিয়ে করেছেন তারা ব্যাপারটা ভাল বুঝবেন। আমরা আমাদের চারপাশে এমন লোককে দেখি যারা বিয়ের পর আমূল বদলে যান। যে লোক পারলে চব্বিশ ঘন্টাই বন্ধুদের সাথে কাটিয়ে দিতে চাইত। বিয়ে করার পর দেখা যায় সেই লোক চব্বিশ ঘন্টাই স্ত্রীর কাছে থাকতে চায়। এটাকে আপনারা কি বলবেন? স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা? হ্যাঁ পাঠক আমিও আপনার সাথে একমত। তবে এ ভালবাসার পরিমাণ এতই বেশী যে তার অতিশয্যতায় আলাদা এক জগতের সৃষ্টি হয়। তার সৃষ্ট এ জগতই সেই কূয়া। যে কূয়ার গভীরতা এতই বেশী যে কূয়ার উপরের সূর্য কিংবা চাঁদের আলো তার কাছে পেীঁছেনা। যে জগতের সাথে বাইরের জগতের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাই বলে কি বিয়ে করা যাবেনা?? এ প্রশ্নটা যাদের মনে উদয় হয়েছে তাদেরকে বলছি আপনি আপনার ভালবাসাকে যখন নির্দিষ্ট কোন জায়গায় আবদ্ধ করে না রাখবেন তখন তার যে অংশ আপনার অর্ধাঙ্গীনী পাবেন তিনিও তাকেই তার প্রাপ্য ভাববেন। আবারও সেই কথা চলে আসে আমাকে মানুষ হতে হবে। আমাকে আমার অতিক্রম করতেই হবে। নিজেকে বন্দি করে রাখলেতো চলবেনা।

সৃষ্টিকর্তা তাঁর বিশাল এই সৃষ্টিতে অসংখ্য রহস্য রেখেছেন। যে রহস্যভেদ করার সমর্থ্য তিনি আমাদের দেননি। কিংবা যদি শেকস্পিয়ারের ভাষায় বলি- There are many things happen between heaven and earth হিমুর সৃষ্টিকর্তাও তার সৃষ্টির মধ্যে কিছু রহস্য দিয়েছেন। হিমুর আধ্যাতিকতাই সেই রহস্য। তবে বিজ্ঞানে Extrasensory perception (ESP) নামে একটা কথা আছে। দেখা যাক বিজ্ঞান এই বিষয়ে কি বলেছে, ““Extrasensory perception (ESP) is the purported ability to acquire information by paranormal means independent of any known physical senses or deduction from previous experience.. তবে এমন হতে পারে হিমুর সৃষ্টিকর্তা হিমুর মধ্যে এই গুণটা ইচ্ছে করইে দিয়েছেন। যেমনটা আমরাও আমাদের পৃথিবীতে অনেক দেখি!

আবার এটাও সত্য যে প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অন্যের জন্য কিছু কামনা করলে সেটা প্রকৃতি অগ্রাহ্য করে না। যদিও একথার কোন ভিত্তি নেই। তবুও এটাই চিরন্তন সত্য। এটা চাইলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন!!!আপনার চাওয়াটা যদি অন্যের জন্য হয় এবং তা যদি অন্যের কোন ক্ষতি না করে তবে আপনার সেই চাওয়াটা পূরণ হবে বলেই আশা রাখি। আবার ব্যাপারটা আপনি এরকমভাবে নিতে পারেন সে হয়তো কোননা কোনাভাবে সেই পাওয়াটা Deserve করে। হিমুর চাওয়া পাওয়াগুলোও অন্যকে নিয়ে এবং সেগুলো পজেটিভ চাওয়া । তাই হয়তো প্রকৃতি তা অগ্রাহ্য করে না।

আমার লেখাটি শেষপর্যায়ে। যারা ধৈর্য্য ধরে এ পর্যন্ত পড়েছেন তাদেরকে আমার জীবনের একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছে। আমার হুমায়ূন আহমেদ-এর উপন্যাস পড়া শুরু হয় ”তেতুল বনে জোছনা” উপন্যাসটি দিয়ে। আমি তখন অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র। বইটি আমার এতই ভাললাগে যে পরবর্তী সময়ে আমি আমার সব পূঁজি দিয়ে শুধু হুমায়ূন আহমেদ এর বই কিনতে শুরু করি। সেই সূত্রে আমার পরিচিতি হয় মিসির আলি, হিমু এবং শুভ্রর সাথে। এবং মিসির আলি চরিত্র আমাকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে আমি বড় হয়ে মিসির আলি হবো বলে সিদ্ধান্ত নেই। আমার মা-বোন যখন বলত ভালভাবে পড়াশোনা করতে। পড়াশোনা করা ছাড়াতো গাড়ি বাড়ি করা যাবেনা। আমি তখন তাদেরকে বলেছিলাম আমিতো মিসির আলি হবো। আমার গাড়ি বাড়ির দরকার নেই। আমি এখন প্রাপ্ত বয়স্ক কিন্তু আমি এখনও বলছি আমার গাড়ি বাড়ির দরকার নেই। কিন্তু এখন আমি হিমু হতে চাই। নিজেকে সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে চাই। কি হবে আমার আমার করে! মানুষকে কিছু দিতে পারার মধ্যে যে সুখ, প্রাইভেট কারের নরম সিটে বসে সে সুখ পাওয়া যাবেনা। বাড়ির মার্বেল পাথরের বাথরুমের বাথটাবে গোসল করে যে সুখ পাওয়া যায় তার চেয়ে হিমুর ময়ুরাক্ষী নদীতে গোসল করা যে অনেক সুখের। যে একবার অন্যের জন্য কিছু করার সুখ অনুভব করেছে সে পৃথিবীর অন্যসব সুখ তুচ্ছ করার ক্ষমতা রাখে বলেই আমার বিশ্বাস।

আপনারা আপনাদের এই নগরীতেই অসংখ্য মানুষের ভিড়েই হয়তো আমাকে একদিন দেখবেন। কিন্তু আমাকে চিনবেননা। কারণ আমিতো হলুদ পাজ্ঞাবী পড়বোনা কিংবা খালি পাঁয়েও হাঁটবোনা। আমি যে এখনও মানুষ হতে পারিনি। আমি যে এখনও আমাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে চলেছি। আমাকে যে মানুষ হতে হবে। আমাকে আমার অতিক্রম করতেই হবে। আমাকে হিমু হতেই হবে!!

১০ thoughts on “হিমুর ময়ূরাক্ষীতে একদিন…!!

  1. হিমু চরিত্র নিয়ে নিয়ে
    হিমু চরিত্র নিয়ে নিয়ে বিশ্লেষনটি ভাল হ​য়েছে। আমার কাছে হিমু চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হল​- হিমু ড্রেসকোড বা অস্বাভাবিকতার আড়ালে স্বাধারন মানুষের চাওয়া পাওয়া আর অস্বাধারন ভাবনাগুলোর প্রতিচ্ছবি। লেখক হিমুকে দিয়ে সেই কাজগুলো করাতেন যা আমরা পারিনা, অথচ করতে চাই। নিজের অপুর্ণতাকে বইয়ের চরিত্রের মাঝ দিয়ে প্রস্ফুটিত হতে দেখে মানুষ হিমুর ভক্ত হ​য়।

  2. সুন্দর বিশ্লেষন করেছেন।বিশেষ
    সুন্দর বিশ্লেষন করেছেন।বিশেষ করে কোটেশনগুলির মাঝে এই কথাটি… Man is a rope, tied between beast and over man. পশু আর অতিমানব যে দড়িতে বাঁধা সেই দড়িটি হল মানুষ”।

    অসম্ভব ভাল লেগেছে।

  3. চমৎকার বিশ্লেষণ। ফেসবুকে
    চমৎকার বিশ্লেষণ। ফেসবুকে ব্লগে আজ হুমায়ূন আহমেদ বিষয়ক প্রচুর লেখা দেখলাম। আপনার লেখাটাই সেরা মনে হলো। হিমু সম্পর্কে রাইন যা বলেছেন তার সাথে একমত।

  4. বাহ চমৎকার একটা কারণ পেলাম
    বাহ চমৎকার একটা কারণ পেলাম স্কুল ইউনিফর্ম পরিধান বিষয়ক!

    আপনার বিশ্লেষণ ভালো লাগল,আপনি হিমুর বাহ্যিক চরিত্রই শুধু বিশ্লেষণ করেননি বরং তাঁর ভেতরে স্বত্তার খুঁটিনাটিও বিশ্লেষণ করেছেন.| হিমুর ভেতরটা স্ক্যান করেছেন :ফেরেশতা:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *