অন্তর্দাহ-০৩

বহুকাল হইতেই আমার শ্রেনীকক্ষের অপরাপর সখাদিগের নিকট হইতে শুনিয়া আসিতেছি, পঞ্চম শ্রেনীতে নাকি একটা নতুন জিনিস আসিয়াছে, যাহা আমাদিগের বিদ্যাসদনের পঞ্চম বর্ষ হইতে দশম বর্ষীয় নন্দনদিগের মস্তিস্ক বিকৃত করিয়া তাহাদিগের ইক্ষণদ্বয় হইতে নিদ্রাহনন করিয়া লইয়াছে। কিন্তু জিনিসটা দর্শন করিবার মত সৌভাগ্য আমার ন্যায় দুর্ভাগার ভাগ্যে ঘটে নাই।

জিনিসটা সম্পর্কে শ্রেনীর এক বান্ধবের নিকটে জিজ্ঞাসা করিলে সে কহিল, তুই কি ভেবেছিস এটা কোন বস্তু?

আমি কহিলাম, জিনিস তো বস্তুই হয়।


বহুকাল হইতেই আমার শ্রেনীকক্ষের অপরাপর সখাদিগের নিকট হইতে শুনিয়া আসিতেছি, পঞ্চম শ্রেনীতে নাকি একটা নতুন জিনিস আসিয়াছে, যাহা আমাদিগের বিদ্যাসদনের পঞ্চম বর্ষ হইতে দশম বর্ষীয় নন্দনদিগের মস্তিস্ক বিকৃত করিয়া তাহাদিগের ইক্ষণদ্বয় হইতে নিদ্রাহনন করিয়া লইয়াছে। কিন্তু জিনিসটা দর্শন করিবার মত সৌভাগ্য আমার ন্যায় দুর্ভাগার ভাগ্যে ঘটে নাই।

জিনিসটা সম্পর্কে শ্রেনীর এক বান্ধবের নিকটে জিজ্ঞাসা করিলে সে কহিল, তুই কি ভেবেছিস এটা কোন বস্তু?

আমি কহিলাম, জিনিস তো বস্তুই হয়।

বন্ধুটি হাসিয়া কহিল, আরে বোকা এই জিনিস ঐ জিনিস না। একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছে ক্লাশ ফাইভে, খুব সুন্দরী। দেখছিস না স্কুলের প্রায় সব ছেলেই ওর জন্য একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছে।

আমি আমার এহেন বোকামীতে লজ্জিত হইয়া বন্ধুটির নিকট হইতে সূদুরে যাইয়া ঐ জিনিসটাকে লইয়া চিন্তণ করিতে লাগিলাম।

আমার শ্রেনীকক্ষের অধিকাংশ নন্দনই কোন না কোন প্রকার তনয়াদিগকে ভালবাসিয়া তাহাদিগের প্রেমে পড়িয়াছে। আর যাহারা পড়ে নাই, তাহারা পথিমধ্যে দাড়াইয়া বালিকা বিদ্যানিকেতনের বিভিন্ন বর্ষীয়া তনয়াদিগকে নানা প্রকার কটু বাক্যবাণে জর্জরিত করিয়া তাহাদিগের হৃদয় জয় করিয়া লইবার ব্যার্থ প্রয়াশ চালাইত প্রত্যহ। কিন্তু, অপরাপর সখাদিগের ন্যায় আমি এবং আমার প্রাণপ্রিয় সুহৃৎ প্রিন্স অদ্যাবধি কোন নন্দিনীকে ভালবাসিয়া আপন আপন হৃদয়মন্দিরের দখল তাহাদিগের হস্তে সমর্পণ করি নাই।

কিন্তু আমার শ্রেনীকক্ষের সেই সখার মুখনিসৃত বাক্যগুলি আমাকে এতটাই প্রভাবান্বিত করিয়াছিল যে, সেই নন্দিনীর মুখখানি দর্শন করিবার নিমিত্তে আমার হৃদয়ে এক বিশাল ঢেউ খেলিয়া গেল। বন্ধুটিকে জিজ্ঞাসিয়া জানিতে পারিলাম ঐ বালিকার নাম নীলা।

প্রিন্স বিদ্যাগারে আসিবামাত্রই তাহাকে নীলার কথা জ্ঞাত করিলাম। কহিলাম, চল দোস্ত দেখে আসি কি এমন সুন্দরী যে পুরো স্কুল পাগল করে দিয়েছে।

প্রিন্স আমার উপরে বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কহিল, আমি বাবা এ সবের মধ্যে নেই। তোর ইচ্ছে হয় তুই গিয়ে দেখে আয়। তারপর কেমন দেখলি আমাকে বলিস।

অবশেষে আমার উপর্যুপরি অনুরোধে প্রিন্স পঞ্চম শ্রেনীতে পদধুলি দিবার মত প্রকাশ করিল। সেইস্থলে গিয়া দেখি মেয়েটা নাই। তাহার সতীর্থ একজনকে জিজ্ঞাসিয়া জ্ঞাত হইলাম শারীরিক অসুস্থতা হেতু নীলা অদ্য বিদ্যাগারে আসে নাই। তাহার কথা জ্ঞাত হইয়া আমি আপণ চিত্তে এক প্রকার ব্যাথা অনুভব করিতেছিলাম। অবশেষে এক প্রকার ব্যাথিত চিত্ত লইয়া প্রিন্সের সহিত আপণ শ্রেনীকক্ষে প্রত্যাবর্তন করিলাম।

শ্রেনীকক্ষে আসিয়া প্রিন্স আমাকে কহিল, দেখলিতো তোর সুন্দরীকে প্রাণ ভরে। আর যেন দেখার সাধ না জাগে।

আমি মুখে বলিলাম, ঠিক আছে, আর যাব না। কিন্তু অন্তরের অন্তস্থল হইতে কহিলাম, ওকে আমি দেখেই ছাড়ব।

এই ঘটনার বেশ কতকদিন গত হইয়া গেল। হৃদয় অভ্যন্তর হইতে সেই বিউটিফুল দুহিতাকে কিছুতেই দুর করিতে পারিলাম না।

তাহাকে বিন্দুমাত্র দর্শন না করিয়া শুধু বন্ধুর মুখ হইতে শুনিয়াই আমার এমতাবস্থা, আর যাহারা নীলাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছে তাহাদিগের না জানি কেমন অবস্থা হইয়াছে।

একদা বিদ্যাগারের বিজ্ঞান মাষ্টারমশাই এর পড়া অন্তরস্থ করিয়া যাই নাই। এই দিকে মাষ্টামশাইও আমার উপরে ক্রোধান্বিত হইয়া ছিলেন। কারণ, শ্রেনী পরীক্ষায় নিউটন মহাশয়ের দ্বীতিয় সূত্রখানি আপনার মনমত করিয়া লিখিয়া আসিয়াছি। উহার ব্যাখ্যাও করিয়া আসিয়াছি নিজের মনমত করিয়া। তাই মাষ্টারমশাই এর বেত্রাঘাত ও শ্রেনীকক্ষের অন্যান্য পাঠার্থীদিগের নিকটে লজ্জা প্রদান হইতে আপনার পৃষ্ঠ ও চিত্তকে বাঁচাইবার নিমিত্তে তিনি আসিবার পূর্বেই শ্রেনীর নেতার নিকট হইতে পানি খাইবার অনুমতি লইয়া বিদ্যানিকেতনের সন্নিকটস্থ কলের ধারে আসিলাম। প্রিন্সকেও আমার সমভিব্যাহারে লইয়া আসিয়াছি। সেইখানে গিয়া দেখিলাম আমাদিগের বিদ্যাসদনের পঞ্চম বর্ষীয়া গুটিকতক নন্দিনী কলের ধারে গাগরি ভরিয়া জল লইতেছে আর দশম বর্ষীয় এক জোড়া নন্দন তাহাদিগের মধ্যমনিটাকে নানারুপ মন্তব্য করিয়া তাহার চিত্তে বিরক্তির সঞ্চার করিতেছে।

আমি প্রিন্সের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলাম তাহার কাজল কাল নেত্রদ্বয় মদ্যপ চোখের ন্যায় ঘোলাটে ও রক্তাভ হইয়া উঠিতেছে আর মুখমন্ডল ঘোর অমাবস্যার ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ ধারন করিতেছে।

আমি কিছু বলিয়া উঠিবার পূর্বেই সে তাহার চলায় পূর্ণগতি সঞ্চার করিল। আমি আর কোনরুপ বাক্যব্যয় না করিয়া তাহার অনুগমন করিলাম। প্রিন্স আমার প্রতি কোনরুপ দৃষ্টিপাত না করিয়া সোজা গিয়া ঐ দুস্কৃতিকারী নন্দনদ্বয়ের দলপতিটার জামার কলার চাঁপিয়া সজোরে ধাক্কা মারিয়া কহিল, এভাবে কারো ভালবাসা পাওয়া যায় না। ভালবাসতে হলে মনটাকে ভাল করে হবে আসবেন। আর কোনদিন যদি আপনাদের দেখি কোন মেয়ের সাথে ফাজলামো করতে কিংবা কোন মেয়েকে বিরক্ত করতে, তাহরে কপালে খারাবি আছে।

ঘটনার আকস্মিকতায় ঐ নন্দনযুগল মুহুর্তখানেক বোকার ন্যায় আমাদিগের পানে চাহিয়া রইল। আমিও মূহুর্তখানেক চাহিয়া রইলাম হতবাক হইয়া আর মনে মনে প্রিন্সকে উপলক্ষ্য করিয়া নানা প্রকারের কটুবাক্য নিক্ষেপ করিলাম। কারণ, একে তো তাহারা দুরাচার অপর দিকে আমাদিগের বয়োঃজ্যেষ্ঠ।

প্রিন্সের ব্যাবহারের নিমিত্তে নন্দনদ্বয়ের নিকটে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করিতে গেলে উহাদিগের একজন আমাকে কহিল, দেখিস রাজন! প্রিন্স আমার কলার ধরে ওদের সামনে আমাকে অপমান করেছে। এর মাসুল ওকে দিতে হবে।

আমি এতোটা চঞ্চল হইলে কি হইবে, প্রিন্সের ন্যায় এতোটা হিম্মত আমার নাই। নন্দনদ্বয় প্রস্থানগত হইলে আমি প্রিন্সকে কহিলাম, তুই জানিস ওরা কত খারাপ, তবু তুই ওদের সাথে এভাবে লাগতে গেলি কেন?

আমার উক্তিতে কোনরুপ কর্ণপাত না করিয়া প্রিন্স সেই ভীতা, লজ্জিতা, আশ্চার্যান্বিতা, দন্ডায়মানা নন্দিনীগনের নিকটে যাইয়া উহাদিগের দলনেত্রীকে জিজ্ঞাসিল, এই মেয়ে তোমার নাম কি?

পার্শ্ব দন্ডায়মানা এক সহচরী উত্তরে কহিল, পুরো নাম শারমিন আক্তার। আমরা ডাকি নীলা বলে।

প্রিন্স ক্রুদ্ধস্বরে কহিল, শারমিন আক্তারই হোক আর নাসরিন আক্তারই হোক, তুমি আর কখনোও পানি নিতে এখানে আসবে না।

নীলা! নামটা শুনিয়া আমার হৃদয়ের সেই সুবিশাল ঢেউটা আরোও সুবৃহৎ আকার ধারণ করিয়া হৃদয়তীরে ধরাস্‌ করিয়া ধাক্কা খাইল। কিছুক্ষণ পূর্বে যেই ঘটনা ঘটিয়া গেল, তাহার উত্তেজনায় আমি দলনেত্রীর প্রতি একদন্ডও তাকাইবার ফুসরত পাই নাই। এক্ষণে তাহার পরিচিতি পাইয়া আমি মনঃসংযোগ সহকারে তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলাম।

আমি দেখিলাম, দলনেত্রী কিংকর্তব্যবিমুঢ় হইয়া ভূমির প্রতি দৃষ্টিনত করিয়া আছে। হয়তো লজ্জা পাইয়াছে তাহাকে লইয়া আমরা এই প্রকার একটা ঘটনার অবতারনা করিলাম বলিয়া। লজ্জার এক গোলাপী আভা যেন তাহার সুশ্রী মুখদর্পনে লালিমা মাখাইয়া দিয়াছে।

নীলার লাজুক মুখমন্ডলের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া আমার শুধুমাত্র একটা কথাই স্মরণ হইতেছিল যে, বাংলা ব্যাকরণের কোন এক অধ্যায়ে পড়িয়াছিলাম “মুখ চন্দ্রের ন্যায়”। কিন্তু আমার সন্মুখদন্ডয়মানা তনয়ার মুখমন্ডলের সহিত তো দুরের কথা, তাহার নখদর্পনের সহিতও দ্বিজরাজের উপমা করিতে আমি লজ্জা পাইলাম। গোলাকার মুখমন্ডলে আয়তাকার নয়নযুগল, গোলাপী পুরুষ্ট অধর, যুগল ভ্রু যেন পেন্সিলে অঙ্কিত। শীরে কৃষ্ণকাল কেশধাম বর্ষাকালের নীরদের ন্যায় পৃষ্ঠাবধি দখল লইয়া আছে। সমস্ত মিলাইয়া আমি দেখিলাম, তাহার গাত্র হইতে যেন পূর্ণিমার শশধর প্রভা ঠিকড়াইয়া বাহিরে পরিতেছে। মনে হইল আমি স্বয়ং কোন দেবীর সন্ধান পাইয়াছি। আমার পুঁজা দিতে ইচ্ছা করিল। জিজ্ঞাসিতে ইচ্ছা করিল তাহার বাটীর সন্ধান। কিন্তু প্রিন্সের কথা স্মরণ করিয়া হাঁ করিয়া দাঁড়াইয়া মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাহাকে দর্শন করা ব্যাতিত আর কিছুই করিতে পারিলাম না।

আমার সেই পুজ্যদেবী তাহার সখীগনের সহিত নিরব ও লজ্জাকর প্রস্থান করিবার পর আমি রাগতস্বরে প্রিন্সকে কহিলাম, বেশ তো হিরো সাজলি। আর সেদিন ওকে দেখতে যাবার কথা বলায় আমাকে কেমন কথা শোনালি। আজ ওর জন্যই তুই ঐ সব খারাপ ছেলেদের সাথে লাগতে গেলি। যখন ঐ ছেলেরা দল বেধে তোকে আবার মারতে আসবে তখন কি ঐ সুন্দরীর দল তোকে বাঁচাতে আসবে? তুই কেন এ রকম বোকামী করতে গেলি? ওদের সাথে দুষ্টোমি করেছিল ওরাই উত্তর দিত। জানিস না এখন নারী-পুরুষের সমান অধিকার?

ঐ সুন্দরীদিগের প্রতি আমার এইরুপ রোষানল দেখিয়া প্রিন্স ইষৎ হাসিয়া কহিল, অধিকার অনধিকার বুঝি না। আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি মাত্র। তোর সামনে কেউ যদি এমন অন্যায় করতো তুই কি বাধা দিতিস না?

সে পুনরায় কহিল, নীলা তো এখনো পূর্ণাঙ্গ নারী হয় নি। আমিও পুরুষ হইনি। তাহলে এখানে সমান অধিকারের প্রশ্ন আসে কেন? এই বলিয়া সে শ্রেনীকক্ষের দিকে পদসঞ্চার করিল। আমিও কোন কথা না কহিয়া তাহার অনুগমন করিলাম।

কিন্তু সেকালে কে বুঝিতে পারিয়াছিল, এই কর্তব্যপরায়নতা প্রিন্সের হৃদয়কে সর্বভূকের ন্যায় জ্বালাইয়া তাহাকে বিনাশের প্রতি ঠেলিয়া লইয়া যাইবে ॥

৭ thoughts on “অন্তর্দাহ-০৩

  1. লিখায় নিয়মহীনভাবে সাধু ও চলিত
    লিখায় নিয়মহীনভাবে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রন আসলেই দুষনীয়।

    ভাল লিখেছেন ।আরো ভাল কিছু পড়তে চাই ।

  2. ভাইয়া, কিছু কিছু জায়গায়
    ভাইয়া, কিছু কিছু জায়গায় বঙ্কিম ভাব ক্ষুণ্ণ হয়েছে। প্লিজ এটা করবেন না, মুড নষ্ট হচ্ছে । খুব এনজয় করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *