একটি প্রশ্ন

এক.
ঘটনা: গতকাল বিকেল বেলা এক সরকারী কলেজের সামনে একটি সি,এন,জি অটোরিক্সা দাঁড়িয়ে ছিলো। সারাদিন ভ্যাপসা গরমের পর প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কলেজ ছুটি হওয়া সত্যেও ছাত্র-ছাত্রি ও স্যারেরা রাজপথ সংলগ্ন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি কমবার অপেক্ষা করছিলো। তাদের মধ্যে একজন স্যার হাত উচিয়ে ঐ সি,এন,জির ড্রাইভারকে ডাকলেন। কিন্তু তিন চারবার ডাকা সত্যেও ড্রাইভার কোন সারা শব্দ না দিলে বাধ্য হয়ে তিনি বৃষ্টির মধ্যেই ড্রাইভারের কাছে গিয়ে ধমকের সুরে কিছু বললেন। এরপর বেশ কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। এক পর্যায়ে ভদ্রলোক বেশ রেগে গেলেন এবং উত্তেজিত ভাবে ইশারায় কলেজের ছাত্রদের ডাকতে লাগলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চার পাঁচজন গিয়ে হাজির হলো সেখানে।



এক.
ঘটনা: গতকাল বিকেল বেলা এক সরকারী কলেজের সামনে একটি সি,এন,জি অটোরিক্সা দাঁড়িয়ে ছিলো। সারাদিন ভ্যাপসা গরমের পর প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কলেজ ছুটি হওয়া সত্যেও ছাত্র-ছাত্রি ও স্যারেরা রাজপথ সংলগ্ন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি কমবার অপেক্ষা করছিলো। তাদের মধ্যে একজন স্যার হাত উচিয়ে ঐ সি,এন,জির ড্রাইভারকে ডাকলেন। কিন্তু তিন চারবার ডাকা সত্যেও ড্রাইভার কোন সারা শব্দ না দিলে বাধ্য হয়ে তিনি বৃষ্টির মধ্যেই ড্রাইভারের কাছে গিয়ে ধমকের সুরে কিছু বললেন। এরপর বেশ কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলো। এক পর্যায়ে ভদ্রলোক বেশ রেগে গেলেন এবং উত্তেজিত ভাবে ইশারায় কলেজের ছাত্রদের ডাকতে লাগলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চার পাঁচজন গিয়ে হাজির হলো সেখানে। ছাত্ররা স্যারের অভিযোগ শুনে ড্রাইভারকে প্রথমে ধমকা ধমকি ও পরে গাড়ির ওপর আক্রমন করে বসে। বাধ্য হয়ে ড্রাইভার গাড়ি থেকে বের হয়ে আসলে ছাত্ররা তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। গণধোলাই ভয়াবহ আকার ধারণ করলে সেই স্যারই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন। পরে ছাত্রদের হুমকির মুখে ড্রইভার ঐ স্যারের পা ধরে মাপ চেয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে।

দুই.
একজন ছাত্রের বক্তব্য: আমি পলাশ; কম্পিউটার ডিপার্টমেন্ট, সেকেন্ড সেমিষ্টার। কলেজের বারান্দায় রাসেদের জন্য অপেক্ষা করছি। শালার বাথরুম করতে এতোক্ষণ লাগে!
‘ভাদ্রা গরমে তাল পাকে’ সারা জীবন শুনে এসেছি। কিন্তু ভাদ্রা গরম কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী তা আজকে টের পেলাম। সকাল বেলা গোসল করে এসেছিলাম। ঘামে আরেক গোসল হয়ে গেছে।
পশ্চিমাকাশে মেঘ জমেছে। ভাবছি- বৃষ্টি নামলে ভালই হতো। আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই যেন হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগলো। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ আকাশ কালো করে ঝুম বৃষ্টি। ভালই হলো, গরমটা একটু কমবে এখন।
বারান্দা এতোক্ষণ খালি ছিলো; বৃষ্টি নামায় রাস্তার সব পাবলিক এসে জুটেছে। না, সব না; কেউ কেউ আবার ভিজতে ভিজতেই যাচ্ছে। খুব আরাম পাচ্ছে মনে হয়। কাধে বইয়ের ব্যাগটা না থাকলে আমিও নেমে যেতাম। শালার-রাশেদ এখনও আসছে না কেন! জিপারে ‘ইয়ে’ আটকে গেল নাকি?
বৃষ্টি হচ্ছে দেখার মত। দুই মিনিটে রাস্তায় তিন ইঞ্চি পানি জমে গেছে। বারান্দায় এখন আর দাঁড়ানোর জায়গা নেই। একে তো কলেজ ছুটি, তার ওপর আবার বাইরের পাবলিক। সরকারী কলেজের সবই সরকারী!
বারান্দার ওপাশে কেমি কৌশল বিভাগের সি,আই (চিপ ইন্সট্রাক্টর) আব্দুল রসিদ স্যার হাত উচু করে সি,এন,জি ডাকছেন। ড্রইভার কানে শোনে না নাকি? তিন-চারবার ডাকলো তবুও আসছে না! শালাদের এই এক দোষ। মাঝে মধ্যে সব জমিদার হয়ে যায়। মানুষকে বিপদে ফেলতে পারলে এদের যেন আনন্দের শেষ নেই!
বাধ্য হয়ে সি,আই স্যার বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গেলেন। মাথায় দেখি আবার রুমাল ধরেছেন। বারান্দায় দাঁড়ানো সবাই হেসে উঠলো। এই বৃষ্টিতে ছাতা নিয়েই কাক ভেজা হতে হবে; আর উনি কিনা রুমাল ধরেছেন! সত্যি, এরকম হাস্যকর বুদ্ধি বোধহয় কেবল সি,আই স্যারদের টাক মাথাতেই থাকে।
স্যার সি,এন,জিটার সাথে কি নিয়ে যেন তর্ক বিতর্ক করছেন। বলেছিলাম না- শালাদের এই এক দোষ। বিপদে ফেলে ভাড়া বেশি নেবে।
অবস্থা মনেহয় ভয়াবহ। স্যার আমাদের ইশারায় ডাকছেন। ফোর্থ সেমিষ্টারের চার পাঁচজন বড় ভাই এগিয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে ছাত্র প্রতিনিধি জুয়েল ভাইও আছেন।
আরিব্বাস! এ দেখি বাংলা সিনেমা! জুয়েল ভাই দেখি একশনে নেমে গেছেন। আজকে ব্যাটার খবর আছে। জুয়েল ভাইকে তো চেনে না; এখন বুঝবে কত ধানে কত চাল। আর দেরি করা যায় না। টিভি দেখে মার্শাল আর্টের বেশ কিছু কৌশল শিখেছি। আজ যখন সুযোগ পেয়েছি তখন কয়েকটা কিল-ঘুসির প্র্যাকটিক্যাল হয়ে যাক।
আমি ব্যাগ রেখে সি,এন,জিটার কাছে পৌছাতে পৌছাতে রিতিমত ভিড় জমে গেল। লোহার দরজা লাগানো থাকায় ড্রাইভারকে ধরা যাচ্ছে না। তবে সবাই মিলে রাগ ঢালছে গাড়িটার ওপর। দেখাদেখি আমিও একটা লাথি মারলাম দরজায়। সাথে সাথেই গোড়ালির কাছে রগে টান লাগলো। শালার লোহার বডিতে লাথি মেরে পোষাবে না।
জুয়েল ভাই বললেন: এভাবে হবে না, আগে গ্লাস ভাঙ।
সূর্যের চেয়ে বালি গরম। পেছন থেকে কোন এক পাবলিক বলল: পেট্রোল আন, শালারে আইজক্যা পুড়াইয়ে মারুম। এক হারামজাদারে পুড়াইলেই সবগুলা ঠিক হইয়্যা যাইবো। শালারা ভাড়া যাইবা না, ফাইজলামি পাইছো!
এতোক্ষণে ড্রাইভারের টনক নড়লো। এর জন্যই বলে- সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাকা করতে হয়। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। প্রায় সাথে সাথেই আমি বাদে বাকি সবাই ঝাপিয়ে পড়লাম তার ওপর। আমিও যেতাম, কিন্তু পায়ের ব্যাথায় নড়তে পারছি না। টিভিতে তো বলেছিলো পাঁচ ইঞ্চি ইটের দেয়ালও নাকি ভেঙ্গে যাবে। তাহলে রগে টান লাগলো কেন!
ওদিকে এক দফা গনধোলাই শেষ। সি,আই স্যারই সব ম্যানেজ করেছেন। এখন জুয়েল ভাই ড্রইভারের কলার ধরে রেখেছে। আর ড্রাইভার স্যারের পা ধরে মাফ চাইছে। একেই বলে- শক্তের ভক্ত নরমের যম!
জুয়েল ভাই বললেন: এবার স্যারকে পৌছে দিয়ে আয়। স্যার, আপনি এক পয়সা ভাড়াও বেশি দিবেন না।
ড্রাইভার মিনমিন করে বলল: আমি যামু না।
শুনে তো আমরা সবাই থ। বলে কি ব্যাটা! এতো মার খেয়েও লজ্জা হয়নি। এরা মানুষ না পাজামা!
জুয়েল ভাই হাতের মুঠি পাকিয়ে বললেন: কী বললি!
স্যার তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে বললেন: থাক থাক; ছেড়ে দাও। এমনিতেও আমি ওর গাড়িতে যাব না। যারা মানুষকে বিপদে ফেলে মজা পায় তাদেরকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।
জুয়েল ভাই ড্রাইভারকে ছেড়ে দিয়ে বললেন: যা, এবারের মত ছেড়ে দিলাম। এই রাস্তায় যেন তোকে আর না দেখি।
ড্রাইভার তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে চলে গেল। সত্যি মানুষ কতো নির্লজ্জ হতে পারে; এজন্যই এদের কোন উন্নতি হয় না। এরা সারা জীবন ভাড়া গাড়িই চালাবে, নিজে কোন দিন গাড়ির মালিক হতে পারবে না।

তিন.
ড্রাইভারের বক্তব্য: আমি জয়নাল মিয়া। সি,এন,জি চালাই। রাস্তার পাশে গাড়ি নিয়ে বসে আছি। আজ সারা দিনে তেমন পেসেঞ্জার পাই নাই। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। কাল রাতে খুব জ্বর ছিলো। সকালে একটু কমেছে। এখন আবার বাড়ছে। সাথে পেট ব্যাথা। তল পেটটা কেমন যেন চিন চিন করছে। বৌটা বারবার নিষেধ করেছিলো আজকে গাড়ি নিয়ে বের হতে। তখন শুনিনি। বৌ এর এতো দরদ আমার সহ্য হয় না। গরীব মানুষের এতো দরদ থাকতে নেই। আল্লাহ জন্মের সময় গরিব মানুষকে একটা করে পেট দিয়ে দেয়। সেই পেটে রাজ্যের ক্ষুধা। আর দেয় পেটের সাথে একটা পোড়াকপাল; ফ্রি! তাই জ্বর হোক ম্যালেরিয়া হোক কাজ তাদের করতেই হয়। নইলে রাক্ষুসে পেট শান্তিতে থাকতে দেয় না।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না আসলেই ভাল করতাম। ভাড়া যেতে ভাল লাগছে না। মধ্যে থেকে মালিককে একগাদা টাকা দিতে হবে; এটা আগে ভাবিনি। বেরিয়ে যখন পরেছি তখন যে করেই হোক গাড়ি চালাতে হবেই। ভাড়া পাইনি বা শরীর অসুস্থ এসব তো আর মালিক দেখতে যাবে না। তার ওপর ট্রাফিক-সার্জেন্টের পকেটে কিছু দিতে হবে।
কিচ্ছু ভাল লাগছে না। তার মধ্যে নেমেছে বৃষ্টি! মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। গরম থেকে যে এরকম জ্বর হয় আগে জানা ছিলো না। ইচ্ছে করছে শুয়ে পড়তে। ট্যাক্সি ক্যাব হলে শুয়ে পড়া যেত। সি,এন,জির সিটে শোয়া যায় না। আজকে আর বাড়ি ফিরতে পারবো কিনা কে জানে!
কলেজের বারান্দা থেকে এক ভদ্রলোক ডাকছে। ডাকুক; এখন কোথাও যেতে পারবো না। অধৈর্য হয়ে লোকটি কাছে চলে এলো। এসেই ধমক: কানে শোন না?
মনে মনে বললাম: আমি কি তোর বাপের চাকর যে তুই ডাকলেই যেতে হবে? মুখে বললাম: এখন ভাড়া যামু না।
: রাস্তা-ঘাট ভাল তো যাবে না কেন?
: অন্য অসুবিধা আছে ভাই; শরীর খারাপ।
ব্যাটা তবুও প্যান প্যান করে: তাহলে এই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি? ভাড়া না হয় একটু বেশিই নিও, চলো।
শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, কথা বলতেই ভাল লাগছে না। তার মধ্যে ব্যাটার প্যান প্যানানিতে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আবার টেকার গরম দেখায়! গরিব বলে কি আমরা মানুষ না? আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতে পারে না?
বেশ ঝাজের সাথেই বললাম: টেকার গরম দেখান? তিন ডাবল ভাড়া দিলেও যামুনা। আপনে অন্য সি,এন,জি দেখেন।
লোকটা রেগে গেছে মনে হয়। কলেজের দিকে তাকিয়ে ছাত্রদের ডাকছে। ডাকুক; ছাত্র ডাকুক, পাবলিক ডাকুক আর পুলিশই ডাকুক আমি ভাড়া যাব না। স্বাধীন দেশে বাস করি। কারও হুকুমের চাকর না যে বললেই যেতে হবে।
মুহূর্তের মধ্যে চার পাঁচজন ছাত্র এসে জুটলো। লম্বা মত একটা ছেলে বলল: কিরে কি সমস্যা? যাবি না কেন?
আমি ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম ছেলেটাকে। আমার চেয়ে বয়সে দশ বার বছরের ছোট হবে। এমন অনেকেই আছে যারা বাবার বয়েসি রিক্সা ওয়ালাকেও তুই তুকারি করে। যেন রিক্সা ওয়ালারা, আমরা কারও বাবা কিংবা বড় ভাই নই। আমাদের আপনি করে বললে তাদের সম্মান কমে যাবে। ভদ্রলোক একেকজন!
ছেলেটা কোন জবাব না পেয়ে গালিগালাজ শুরু করলো। মেজাজ ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। তবুও কিছু বললাম না। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। হটাৎ করেই শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। এতোক্ষণ এটা ছিলো না। নতুন উপসর্গ।
আমার জবাব না পেয়ে ছেলেগুলো এক কান্ড করে বসলো। হঠাৎ করেই সবাই মিলে গাড়ির দরজায় দড়াম দড়াম লাথি মারতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে তাদের দেখতে লাগলাম। এতো রাগের কারণ কী? একজন সি,এন,জি ড্রাইভার ভাড়া যেতে না চাইলে সেটা কি খুব বড় অপরাধ? মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতে পারে না!
পাবলিকের মধ্যে গাড়ি ভাঙ্গার একটা প্রবণতা আছে। চান্স পেলে এরা ছাড়ে না। লম্বা মত সেই ছেলেটা বলল: এভাবে হবে না, আগে গ্লাস ভাঙ।
পেছন থেকে আরেকজন বলল: পেট্রোল আন, শালারে আইজক্যা পুড়াইয়ে মারুম। এক হারামজাদারে পুড়াইলেই সবগুলা ঠিক হইয়্যা যাইবো। শালারা ভাড়া যাইবা না, ফাইজলামি পাইছো!
আশ্চর্য! এমন কী অপরাধ করেছি যে আমাকে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারার প্রশ্ন আসছে! মগের মুল্লুক নাকি? দেশে কোন আইন আদালত নেই! নাকি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য বলছে?
তবে পেট্রোল না ঢাললেও গাড়ির গ্লাস ভাঙ্গতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। হরতাল না ধর্মঘট না, এর মধ্যে মালিকের গাড়ি ভাঙ্গলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
প্রায় সাথে সাথেই সবগুলো মানুষ একজোটে আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। পিঠের ওপর কে প্রচন্ড জোরে একটা লাথি দিলো। কতক্ষণ এরকম চলেছিলো বলতে পারবোনা। সেই লোকটিই সবাইকে থামালেন। লম্বা করে ছেলেটা আমার কলার ধরে তার কাছে মাফ চাইতে বলল। আমি কী অপরাধ করেছি তা-ই বুঝতে পারলাম না, মাফ চাওয়া তো অনেক পরের ব্যাপার। তবুও লোকটির পা ধরে বললাম: স্যার মাফ কইর‌্যা দ্যান।
লম্বা ছেলেটি বলল: এবার স্যারকে পৌছে দিয়ে আয়। স্যার, আপনি এক পয়সা ভাড়াও বেশি দিবেন না।
মার খাওয়ার পরই আমি প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি- মরে গেলেও আমি ওনাকে নিয়ে যাব না। অনেক কষ্টে বললাম: আমি যামু না।
লম্বা ছেলেটা হাতের মুঠি পাকিয়ে বলল: কী বললি!
সেই লোকটি তাকে থামিয়ে বলল: থাক থাক; ছেড়ে দাও। এমনিতেও আমি ওর গাড়িতে যাব না। যারা মানুষকে বিপদে ফেলে মজা পায় তাদেরকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।
এতো দুঃখেও আমি মনে মনে হাসলাম। আমরা মানুষকে বিপদে ফেলে মজা পাই! হাহ্! রাতবিরাতে অচেনা রাস্তায় নিয়ে যখন যা খুশি ভাড়া দিয়ে বলে- নিলে নে, না নিলে ভাগ! তখন আমারা বিপদে পড়ি না?
ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যখন গ্যাস পাই না বলে ভাড়া যেতে পারি না, অথচ দিন শেষে মালিক কোন কথা না শুনে ঠিক ঠিক তার জমা বুঝে নেয় তখন আমরা বিপদে পড়ি না?
হরতালে যখন আমাদের গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়; ট্রাফিক পুলিশ, সার্জেন্টরা যখন জোকের মত আমাদের রক্ত পানি করা টাকা ছিনিয়ে নেয় নানা অজুহাতে, তখন আমরা বিপদে পরি না? আজকাল আবার গাড়ির সাথে ড্রাইভারকেও পুড়িয়ে মারার রেওয়াজ চালু হয়েছে!
দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য সারাদিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও যখন না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় আমরা মারা যাই তখন কোথায় থাকে এই ভদ্রলোকেরা? কোথায় থাকে তাদের মানবতা বোধ?
দেশে কত নারী অধিকার আন্দোলন হয়, শিশুদের জন্য কতো জ্ঞানি-গুনি ব্যক্তিরা কত কিছু করেন। আমাদের জন্য, এই শ্রমজীবি-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য কি কেউ কিছু করেছেন? আমাদেরকে যে সমাজে একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না, তুই তুকারী করা হয়, ছোটলোকের বাচ্চা বলে গালি দেয়া হয় এসব তো কেউ দেখে না! সমাজে আর কিছু না হোক একজন মানুষ হিসেবে যে সম্মানটুকু আমাদের প্রাপ্য তাও যে আমরা পাইনা; তবুও তো আমাদের নিয়ে রিক্সা ওয়ালা বা সি,এন,জি চালক অধিকার আন্দোলন কখনও হয় না!
সত্যি, একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে!

চার.
আমার বক্তব্য: সুধী পাঠক, একটি ঘটনাকে আমি দুই ভাবে প্রকাশ করলাম। আমি জানি না কোন দৃষ্টিভঙ্গিটা আপনারা গ্রহণ করবেন। কোনটা গ্রহণ করা উচিৎ। জ্ঞানী শিক্ষক আর ছাত্র পলাশের কথাই ঠিক নাকি মূর্খ সি,এন,জি চালক জয়নালের? কোনটা? আমি জানি না।
তাতে কী? আপনারা নিশ্চয়ই জানেন! আমাকে একটু বলবেন কি?
———-০———-

– সফিক এহসান
(২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬)

৭ thoughts on “একটি প্রশ্ন

  1. যত দোষ গরিবের !
    ভাই আমি যদি ঐ

    যত দোষ গরিবের !
    ভাই আমি যদি ঐ শিক্ষকের জাগায় থাকতাম আমি ঠিক আবার আমি সিএনজি ড্রাই ভার এর জায়গায় থাকলেও আমি ঠিক
    একজন আরেক জনের অবস্থা বুঝি না!
    আপনার লিখা পুরা বস্তবত
    আমি কাউকে দোষ দিতে পারছিনা কারণ সিএনজি চালকেরাও এমন সুযোগের ব্যবহার করে আবার প্যসেঞ্জার রা ও অনেক সময় তাদের ঠকায়। দোষ কখন ও একজনের হতে পারে না , তবে এটা এক জনের প্রতি পুঞ্জিভুত খোভ আরেক জনের উপর উঠানো

    আপনি দুই সাইট ই ব্যক্ত করেছেন ভাল ভাবে আসলে আমরা শিক্ষিত লোক কে অর্থাৎ বড় পদে থাকা পড়া লিখা করতে পারা ব্যক্তির দোষ দিতে পারলে নিজেকে মহৎ ভাবি এখানেও সেটা ফুটে উঠেছে

    1. আমি আসলে কাউকে দোষারপ করতে
      আমি আসলে কাউকে দোষারপ করতে চাইনি। আমি জাস্ট একটা ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি…
      দর্শনের মত আমিও বিশ্বাস করি যে, জগতের প্রতিটা মানুষই আসলে ভালো…।

      কিন্তু রাস্তা-ঘাটে যখন একজন মানুষের সাথে কথা কাটা-কাটি হয় (হয়তো রিক্সা বা সি,এন,জি ওয়ালার সাথে ভাড়া বা তদ্রুপ বিষয় নিয়ে) তখন আমারও মেজাজ খারাপ হয়। ইচ্ছা করে ধরে ধোলাই দেই। এবং এটা বোধহয় প্রায় সবারই হয়। ইমার্জেন্সি সময়ে এরকম হলে মেজাজ ঠিক রাখা আসলেই কঠিন।

      কিন্তু আমি জাস্ট চিন্তা করতে চেয়েছি- কেন ওরা এমন করে? ওরা কি আসলে “খারাপ” তাই এরকম করে? নাকি ওরাও কোন পরিস্থিতির শিকার?
      জাস্ট এটাই…

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
      :ফুল:

      1. আমি তাই বলেছি সফিক ভাই
        আমি তাই বলেছি সফিক ভাই প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থানে ঠিক কারন আমি কিংবা আপনি ঐ রিক্সা ওলার অবাস্থা বুঝি না তাই আমরা ঠিক তারাও বুঝে না তাই তারা ঠিক বুঝলে কি আর এগুলো হত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *