অন্তর্দাহ-০২

সেকালে আমরা সবেমাত্র মাতুয়াইল বহুমূখী বিদ্যাগারে লেখাপড়ার সপ্তম বর্ষ চুকাইয়া অষ্টম বর্ষে পদার্পন করিয়াছি। তৎক্ষণেও প্রিন্সের সহিত আমার সখ্যতা গড়িয়া ওঠে নাই। কারন, আমি ছিলাম যেমন ডানপিটে, তেমনি ফাঁকিবাজ। লেখাপড়া না করিয়া সর্বদা কাহার পাদপের কোন ফলটিতে রঙ ধরিয়াছে, কাহার হংস-কুক্কুট কতখানি মোটাতাজা হইয়াছে, সেই খবর লইতেই ব্যতিব্যাস্ত ছিলাম। সেইহেতু বিদ্যাশিক্ষার দিক হইতে সর্বদা নিন্মবিক্তই থাকিয়া গিয়াছিলাম।


সেকালে আমরা সবেমাত্র মাতুয়াইল বহুমূখী বিদ্যাগারে লেখাপড়ার সপ্তম বর্ষ চুকাইয়া অষ্টম বর্ষে পদার্পন করিয়াছি। তৎক্ষণেও প্রিন্সের সহিত আমার সখ্যতা গড়িয়া ওঠে নাই। কারন, আমি ছিলাম যেমন ডানপিটে, তেমনি ফাঁকিবাজ। লেখাপড়া না করিয়া সর্বদা কাহার পাদপের কোন ফলটিতে রঙ ধরিয়াছে, কাহার হংস-কুক্কুট কতখানি মোটাতাজা হইয়াছে, সেই খবর লইতেই ব্যতিব্যাস্ত ছিলাম। সেইহেতু বিদ্যাশিক্ষার দিক হইতে সর্বদা নিন্মবিক্তই থাকিয়া গিয়াছিলাম।

আমার ন্যায় নিন্মবিক্ত ছাত্রের পক্ষে বিদ্যাগারের বাৎসরিক পরীক্ষার সওয়াল-জবাব দিতে হিমশীম খাইতে হইত। সমগ্র বৎসরব্যাপী নাচানাচি লাফালাফি করিয়া পরীক্ষাকক্ষে যাইয়া যখন তাহার মাসুল দিতাম, তখন যেন আর কলম চলিত না। সেমতাবস্থায় আপণ চিত্তেই আপনাকে ধিক্কার দিতাম আর আশেপাশে চাহিয়া দেখিতাম আমার সন্মুখ-পশ্চাৎ, ডানে-বামে কাহার আসন পড়িয়াছে। এই করিয়া কোন প্রকারে সপ্তশ্রেণীর পাঠ চুকাইয়াছি।

এক্ষণে অষ্টম শ্রেনীর ত্রৈমাসিক পরীক্ষার রুটিন পাইয়া আমার নিদ্রা হারাম হইবার উপযোগ ঘটিল। দিবা-রাত্রি জাগরিত থাকিয়া পুস্তিকা পত্রগুচ্ছ গো-গ্রাসে গিলিবার নিমিত্তে দেহ ও মন উভয়ই চালাইতেছি। কিন্তু! কে যেন আমার গলনালী চাঁপিয়া রাখিয়াছে। শত উপায় করিয়াও পাঠ্য বিষয়গুলি অন্তরস্থ করিতে পারিতেছি না। গনিত, বঙ্গ, ভ্রাহ্ম, ম্লেচ্ছ সকল বিষয়ে তালগোল পাকাইয়া এমনি খিঁচুরী প্রস্তুত করিয়া ফেলিয়াছি, যাহা অন্তরস্থ করিলে বদহজম হইবার সম্ভাব্যতা ষোল আনা। এখন কি করিব?

চকিতে স্মরণ হইল আমার শেষ ভরসার কথা। আমার পাশ্বে কাহার আসনখানি পড়িতে পারে? অনেক অঙ্ক কষিয়া, হিসাবের ডেবিট-ক্রেডিট মিলাইয়া যাহার রোলনম্বরখানি আমার খাতায় উঠিল, পরক্ষনেই তাহার গাম্ভীর্যপূর্ণ আকৃতিখানিও বোধ করি আমার অন্তরের পর্দায় ফুটিয়া উঠিল। সে আর কেহ নয়, আমাদিগের স্বনামধন্য প্রিন্স। মনন করিলাম সে মোটামুটি প্রকৃতির ছাত্র। তাহার নিকট হইতে সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে। প্রিন্সের সহিত একটু আগাম ভাব জমাইবার মনোরথ হইল। কিন্তু কেমত করিয়া সেই দুঃসাধ্য কর্মখানি সম্পাদন করিব তাহা চিন্তা করিতেই আমার সমস্ত কলেবর ঘর্মাক্ত হইয়া গেল। কারণ, প্রিন্স তো আর আমাতুল্য ফাঁকিবাজ নহে যে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই হইব। কস্মিনকালেও তাহাকে দেখি নাই কাহারো সহিত একটু আধটু দুষ্টতা করিতে অথবা পড়া-লেখায় ফাঁকিবাজি করিতে। বিদ্যানিকেতনে আসিয়া আমরা যেকালে নাচানাটি-লাফালাফি ইত্যাদি প্রকার দুষ্টতা করিয়া আপন আপন অন্তর পরিতৃপ্ত করিতাম, সেকালে প্রিন্সকে দেখিতাম একাকী বিদ্যাগারের ছাঁদে যাইয়া গুণগুণ করিয়া আপণ চিত্তে গীতিবাদ্য চর্চা করিতে।
আমাদিগের পরীক্ষা সন্নিকটে আসিয়াছিল ঠিকই কিন্তু তাহার আরোও মাস দু-এক বাকি ছিল। আমি আপণ হৃদয়ে অভিসন্ধি করিতেছিলাম, এই দুই মাসে কেমন করিয়া প্রিন্সের সহিত সুহৃদ সম্পর্ক স্থাপন করিব। প্রত্যহ বিদ্যাগারে আসিয়া প্রিন্সকে খোল করিতাম যে, সে বিদ্যাগারে আসিয়া কি প্রকারে অবসর সময় অতিবাহিত করে এবং তাহার পছন্দ ও অপছন্দের কর্মগুলি কি কি? সেই স্বল্প সময়ে প্রিন্সের সম্বন্ধে আমি যেই তথ্যগুলি জানিয়াছিলাম তাহা নিন্মরুপ :-

“প্রিন্সের বিস্তারিত নাম ফজল মাহমুদ। পিতামাতার দুই সন্তানের মধ্যে প্রিন্স প্রথম এবং এই প্রথম হওয়াটাই যেন তাহার পূর্বজন্মের কোন পাপের ফসল। প্রথম হইবার হেতু সর্বক্ষণ তাহাকে পিতামাতা কর্তৃক মহাশাসনে থাকিতে হয়। তাহার কনিষ্ঠ কোন অপরাধ করিলে সে যদি উহাকে কোন প্রকার শাসন করে তাহা হইলে কনিষ্ঠ হইতে প্রিন্সকে পিতামাতার নিকটে অধিক নিগ্রীহিত হইতে হয়। এককালে প্রিন্স পিতামাতার অনেক গর্বের বস্তু ছিল। কিন্তু সেই বস্তুখানি তাহার কর্মফলে মহাস্থানগড়, পূন্ড্রবর্ধন প্রভৃতি প্রাগৈতিহাসিক স্থানগুলির ন্যায় ঐতিহাসিক বস্তুতে রুপায়িত হইয়াছে।

লেখাপড়া বাদ দিয়া প্রিন্স শুধুমাত্র কাব্যচর্চা, গীতবাদ্য চর্চা আর পুস্পাঙ্কণ লইয়াই ব্যাতিব্যাস্ত থাকিত। এই নন্দন কি করিয়া যে পরীক্ষার ফলাফল ভাল করিত তাহা আমি ভাবিয়া পাইতাম না। এই বিষয়খানি আমাদিগের বিদ্যাসদনের সকল শিক্ষকেরও গবেষণার বস্তু ছিল। কেহ কহিতেন, এ ছেলে নিশ্চয়ই নকল করে পরীক্ষা দেয়, তা না হলে ক্লাশে একদিনও পড়া পারে না অথচ পরীক্ষার খাতায় কি সুন্দর করে সব উত্তর লিখে দেয়।

আবার কেহ কহিতেন, আমার মনে হয় ও ঠিকই পড়াশুনা করে, কিন্তু সেটা কাউকে বুঝতে দেয় না। কখনও কখনও কোন কোন শিক্ষক আবার গোপনে প্রিন্সের উপর নজর রাখিতেন। কিছুকাল এইরুপে নজর রাখিয়া, তাহার চরিত্রে আচারে কোন প্রকার সন্দেহজনক কর্ম না পাইয়া এক সময় তাহাদিগের কৌতুহল আর গবেষণার অন্ত ঘটিল।”

প্রিন্স সম্পর্কে এইরুপ অদ্ভুদ তথ্য পাইয়া আমার ভয় হইতেছিল যদিপ্য সে আমার সখ্যতা স্বীকার না করে? এককালে আমাদিগের বিদ্যানিকেতনের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বিদায়কাল উপস্থিত হইলে সেইস্থলে প্রিন্সের সহিত আমার অন্তরঙ্গতা ঘটে। প্রিন্সের নিকটবর্তী হইয়া তাহার হৃদয়ের যে অভিজ্ঞাতি আমি পাইয়াছিলাম, তাহা পূর্বেই বর্ণনা করিয়াছি। তাহার অন্তরঙ্গ সুহৃদ হইতে পারিয়া আপনাকে আমার ধন্য মনে হইতেছিল। অল্প কয়েক দিনের প্রচেষ্টায়ই আমি তাহার চীরন্তন সখায় পরিণত হইয়াছিলাম আর সেই যাত্রায় তাহার প্রসাদ লাভ করিয়া আমার পরীক্ষার ফল অপরাপরের তুলনায় ভাল হইয়াছিল। এরপর হইতে আমরা উভয়ে সর্বদা একে অপরের সন্নিকটে অবস্থান করিতাম। আমার বাটীতে প্রিন্স আসিত। তাহার বাটীতে আমার আতিথ্য হইত। প্রাতে সূর্যোদয়ের কয়েকঘন্টা গত হইলে দুই সখায় একত্রে বিদ্যাগারে আসিতাম। বিদ্যাগারে মধ্যাহ্ন বিরতীর সময়ে একত্রে টিফিন করিতাম। বিদ্যালয় হইতে অব্যহতির পর দুইজনে মাঠে যাইয়া এলাকার অপরাপর নন্দনদিগের সহিত খেলা করিতাম। সাঁঝের বেলায় কোনদিন প্রিন্স আবার কোন দিন আমি একে অপরকে আপ আপণ নীড়ে পৌঁছাইয়া দিতাম। এই প্রকারে একদা আমাদিগের সুহৃদবন্ধন এমনি পর্যায়ে আসিয়া দাঁড়াইল যাহাতে প্রিন্সকে ছাড়িয়া আমি, আমাকে ছাড়িয়া প্রিন্স দিনখানেকও কাটাইতে পারিতাম না ॥

৮ thoughts on “অন্তর্দাহ-০২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *