শাইখ সিরাজ-সাগর দ্বন্দ্ব : কার দখলে থাকবে ইমপ্রেস-চ্যানেল আই

চ্যানেল আই ও ইনসেপটা ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ইমপ্রেসের মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব ঘনীভূত হয়েছে। এই দ্বন্দ্বে গ্রুপটির মালিক তথা বিনিয়োগকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজ।

ইমপ্রেসে মালিকপক্ষের এই দুই প্রধান প্রতিভূর মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো হলেও বরাবরই ফরিদুর রেজা সাগরের কর্তৃত্ব অটুট ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পর অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ইমপ্রেস গ্রুপের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। এই সুযোগে শাইখ সিরাজ তার হাত লম্বা করেছেন এবং মালিকপক্ষের একটি অংশকেও নিজের পক্ষে টানতে সমর্থ হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে ইমপ্রেস গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সাগরপন্থীদের বের করে দেয়া বা তাদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়।

ফরিদুর রেজা সাগর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর থেকে আবার ইমপ্রেসে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। গ্রুপের মালিকদের একটি অংশের সমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি আবার মাঠে নামেন। ইমপ্রেস গ্রুপে যে কোনো বড় ধরনের ওলটপালটে সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী মহলে শাইখ সিরাজবিরোধী প্রচারণা চালান। ধারণা করা হচ্ছে ভয়াবহ প্রভাবশালী এই ‘মিডিয়া মুঘল’ এক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। সরকারের ‘গ্রিন সিগনাল’ পাওয়ার পর তিনি শাইখ সিরাজসহ অন্যদের ওপর প্রকাশ্যে হামলা চালানোর পথ বেছে নিয়েছেন।

সাগর শুরুতে ব্যক্তি শাইখ সিরাজকে আলাদা করেছেন এবং চ্যানেল আইয়ে তার কিছু খারাপ সিদ্ধান্ত ও তৎপরতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এটা করতে তিনি সরকারপন্থী সবচেয়ে বড় পত্রিকা দৈনিক সমকালকে ব্যবহার করেছেন। তাকে অপদস্থ করার জন্য শাইখ সিরাজ কীভাবে চক্রান্ত করেছেন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে প্রকাশিত লেখাটিতে সেই বয়ানই উঠে এসেছে। ঘটনা হলো, ‘স্বর্ণ-কিশোরী’ নামক চ্যানেল আইয়ের একটি প্রোগ্রামের ইভেন্টে অংশ নিতে সাগরসহ আরও কয়েকজন ওইদিন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে গিয়েছিলেন। আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে ওই অনুষ্ঠান শেষ করে ফেরার পথে তাদের হেলিকপ্টারটি দুর্ঘটনার মুখে পড়ে।

সাগর বলেন, “আমার জ্ঞান থাকাকালীন আমীরুলকে বলেছিলাম, গোদাগাড়ী অনুষ্ঠান নিয়ে দ্রুত একটা প্রমোশনাল অনএয়ার করো। কারণ, কেন গোদাগাড়ী গেলাম এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। অপু মাহফুজ তৈরি করে। কিন্তু কোনো রহস্যময় কারণে সেই প্রোমো প্রচারিত হলো না। এখন মনে হয়, এও যেন ষড়যন্ত্র! সেদিন যদি প্রমোশনাল এবং গোদাগাড়ীর অনুষ্ঠান নিয়ে সংবাদ ও স্বর্ণ-কিশোরী প্রচারিত হতো, তবে হয়তো এত ধোঁয়াশা তৈরি হতো না। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, গোদাগাড়ী যাওয়ার কারণ কী? আমাকে বারবার বলতে হয়েছে, এটা নিছক হেলিকপ্টার ভ্রমণ নয়। একটি কমিটেড কাজের জন্য আমাদের যেতে হয়েছিল।”

সাগর আরও বলেন, “শাইখ সিরাজ তখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন।… আমার অবর্তমানে শাইখ সিরাজ হয়তো তার কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে অনুষ্ঠান প্রচার স্থগিত করলেন। যুক্তি দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য লাইভ যাবে। তাই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেদিন স্বর্ণ-কিশোরী প্রচারের সময়ে বিএনপি-বিকল্পধারার সংবাদ সম্মেলন প্রচার করা হয়।… পরে জেনেছি সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যাচ্ছে- ১২ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে পরিচালকবৃন্দের কেউ চ্যানেল আইতে আসেননি। তাই অনুমান করি, কারও একক সিদ্ধান্তে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছে।… আমি টেলিফোনেও চেক করে দেখেছি, জনাব শাইখ সিরাজ কার কার সঙ্গে সেদিন কথা বলেছিলেন।”

সাগরের লেখায় যদিও উঠে এসেছে শাইখ সিরাজের একক সিদ্ধান্তের কথা, তবে এর সঙ্গে মালিকদের মধ্যেকার আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা ছিল, যা তিনি এড়িয়ে গেছেন। পাশাপাশি শাইখ সিরাজকে ঘায়েল করার জন্য তিনি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন বিনপির সংবাদ সম্মেলনের তথ্য। ইমপ্রেস ও চ্যানেল আই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা কারণে শাইখ সিরাজের ক্ষমতা বেড়েছে বটে, তবে এর বাইরে ব্যবসার জগতে ও সরকারের বনেদী অংশে, এমনকি সেনাবাহিনীতেও ফরিদুর রেজা সাগরের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ফলে এ যাত্রায় ইমপ্রেস-চ্যানেল আইয়ে ফরিদুর রেজা সাগর তার কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হতে পারেন।

তবে সরকারপক্ষের মধ্যে তুলনামূলক দুর্নীতিবাজ অংশের সঙ্গে শাইখ সিরাজের সখ্যতা বেশি। সাগররাই নানা ধরনের সুবিধা আদায়ের জন্য শাইখ সিরাজকে এসব কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। এতদিন মিলেমিশেই পদক বাগানো থেকে শুরু করে নানা ধরনের অবৈধ কাজ তারা করেছেন। এসবের সূত্রে ধুরন্ধর সিরাজ তার ব্যক্তিগত অবস্থান কতখানি পাকাপোক্ত করতে পেরেছেন, তা সাগরেরও অজানা। এ অবস্থায় সিরাজও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন সাগরকে ঘায়েল করতে। যুদ্ধ যেহেতু প্রকাশ্যে চলে এসেছে, সেক্ষেত্রে ধারণা করা যায় যে, অচিরেই ফলাফল জানা যাবে।

দুটো ব্যাপার ঘটতে পারে। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আই থেকে কিক-আউট হতে পারেন। এটা একেবারে খারাপ নয়। তিনি দ্রুতই নতুন কোনো চ্যানেলের মালিক হবেন সেক্ষেত্রে। আরেকটা হতে পারে যে, ইমপ্রেস ভেঙে গেল এবং দুটি বা ততধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হল। এটা তাদের উভয়পক্ষের শক্তি হ্রাস করবে। অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানাচ্ছে যে, শাইখ সিরাজের জয়ের সম্ভাবনা কম। স্থির মস্তিস্কের হওয়ায় এবং বনেদী সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকায় সাগরের সম্ভাবনাই এখনো বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *