সোনার বাংলা

– ঘুমায় নাকি?
– দুপুরের পর থেকে অমনেই হুইয়া আসে। ঘুমায় পরসে নাকি জানি না।
– ডাক ওরে।
পুলিশ কনস্টেবল আর সেন্ট্রির কথোপকথন আমি শুনতে পারছিলাম। শুনে উঠে পরতে পারতাম কিন্তু ঘুমটা তখনও চোখের পাপড়িতে আসি আসি করছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। বরং কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। সেন্ট্রি এসে লাঠির খোঁচা দিয়ে ঘুমটাকে তাড়াক তারপর ওঠা যাবে।
সেন্ট্রির নাম কলিম। বয়স্ক সেন্ট্রি। আজ সকালে কথা হয়েছে। সোজা সরল মানুষ। আমি ওনাকে কলিম মামা বলেই ডেকেছি। খুশি হয়ে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছিল।

– ঘুমায় নাকি?
– দুপুরের পর থেকে অমনেই হুইয়া আসে। ঘুমায় পরসে নাকি জানি না।
– ডাক ওরে।
পুলিশ কনস্টেবল আর সেন্ট্রির কথোপকথন আমি শুনতে পারছিলাম। শুনে উঠে পরতে পারতাম কিন্তু ঘুমটা তখনও চোখের পাপড়িতে আসি আসি করছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। বরং কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। সেন্ট্রি এসে লাঠির খোঁচা দিয়ে ঘুমটাকে তাড়াক তারপর ওঠা যাবে।
সেন্ট্রির নাম কলিম। বয়স্ক সেন্ট্রি। আজ সকালে কথা হয়েছে। সোজা সরল মানুষ। আমি ওনাকে কলিম মামা বলেই ডেকেছি। খুশি হয়ে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কলিম মামা তালা খুললেন। প্লাস্টার ওঠা সিমেন্টের মেঝেতে স্যান্ডেলের খ্যাশ খ্যাশ শব্দ করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। একটা সময় স্যান্ডেলের এই শব্দ শুনে খুব রেগে যেতাম। মিঘিকে ধমক দিয়ে বলতাম, ‘গোঁড়ালী ফেলে হাঁটতে পারিস না?’ ও কথা শুনত না। দেখে ওর পিঠে জোরে ঘুষি বসিয়ে দিতাম। ও উলটো রেগে আরো বেশি জোরে স্যান্ডেলের শব্দ করে চলে যেত।
– অয় উঠেন। বড় স্যার ডাকতেসে।
আমি কলিম মামার ডাক শুনেও উঠি না। শুয়ে থাকি। আমি কলিম মামার এত মধুর ডাকে উঠে গেলেও ঘুম আমাকে ছেড়ে উঠবে না। কলিম মামা আরো দু’বার ডাক দেয়। এরপর গায়ে লেপ্টে থাকা খাদি চাদরটা টান দিয়ে ফেলে দেয়। আমি তবু নড়ি না। ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকি। কলিম মামা লাঠি টা মেঝেতে ঠুকিয়ে গা ঝাঁকি দিয়ে ডাক দেয়। চোখ মেলে কলিম মামার দিকে তাকাই।
– বড় সাহেব ডাকতেসে।
আমি উঠে বসি। মেঝে থেকে চশমাটা তুলে চোখে পরি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের দিকে তাকাই। গোলাম রব্বানী। উনি কি স্যার? খাদি পোশাকধারী কে যে বড় আর কে যে ছোট ধরা যায় না। আমি কলিম মামার পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে আসলাম। গোলাম রব্বানী আমাকে দেখে কিছু না বলে পেছনে ঘুরে এগিয়ে গেলেন, আমিও তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। একটা ছোট কাঠের দরজা ঠেলে বড় ঘরে ঢুকলাম। খাদি পোশাক পড়ুয়া আরেকজন ফোমের চেয়ারে হেলান দিয়ে পা দুলাতে দুলাতে বেশ আরাম করে সিগারেট খাচ্ছেন। নাম শাহীন মাহমুদ। বা হাতের আঙ্গুলে পরে থাকা সবুজ পাথরে আংটিটা দিয়ে তিনি পায়ের তালে তালে কাচের গ্লাসে টুং টুং শব্দ তৈরি করছেন।
– স্যার নিয়ে এসেছি।
চোখ ঘুরিয়ে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন তিনি, এরপর বসতে বললেন। কাচের টেবিলের পাশে থাকা কাঠের চেয়ারে বসলাম আমি। সামনে ফোমের কতগুলো চেয়ার ছিল। কিন্তু জেলের আসামী হিসেবে আমি কাঠের চেয়ারটাকেই বেছে নিলাম। গোলাম রব্বানী সামনের সোফার চেয়ারে বসলেন।
– আতিক হোসেন?
– জি।
– কিসে পড়েন?
– জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে।
– কোন ইয়ার?
– থার্ড ইয়ার।
– ছাত্রলীগ করেন?
– না।
– আগে করতেন?
– না।
– কোন দল করতেন?
– কোন দল না।
– পলিটিক্স শিখলেন কিভাবে?
– আমি পলিটিক্স করি না।
– এই খুনের বিদ্যা কোথা থেকে পেলেন?
– কোথাও থেকে পাইনি। নিজের মাথা থেকেই এসেছে।
– কি নিয়ে পড়ালেখা করেন?
– রসায়ন।
– খুনের রসায়ন তো ভালই আয়ত্ত্ব করসেন।
 নীরবতা।
– পিস্তল কই পাইছেন?
– চুরি করেছি।
– কোথা থেকে?
– বড় চাচা আপনাদের এখানে কাজ করে। ওনার পিস্তলটা সকালে নিয়ে বের হয়ে গেসলাম।
– বাহ! মাশাল্লাহ।
তোমার সাথে সাথে চাচাকেও ফাঁসিয়ে দিলে। বাহ! জানো তো এরপর কি হবে?
– জানি।
– কি হবে?
– খুব বেশি হলে ফাঁসি, কম হলে কারাদন্ড।
– ফ্যামিলির?
– কিছু হবে না।
– চাচার?
– কিছু হবে না।
– চাচার কিছু হবে।
– কি হবে?
– চাকরিটা খুয়াইতে পারে।
– ও!
– আচ্ছা এখন কাজের কথায় আসি। কিভাবে খুনের চিন্তা আসল মাথায়?
– রায় শোনার পরপরই আসচে।
– রায় তো কবেই দিসে!
– সুযোগ পাই নাই এতোদিন। সুযোগ পাইলে কবেই করতাম।
– বুড়া তো দুইদিন পর এমনিতেই মরত। তারে দুইদিন আগে মাইরা নিজের ভবিষ্যত শেষ করে লাভ কি হইল?
– বুড়ার একদিন বেশি বাঁচাই আমার ভবিষ্যত মারার জন্য যথেষ্ট।
– এর আগে যখন খোলা মাঠে ঘুরত তখন মারো নাই ক্যান?
– তখনও বুঝতে পারিনাই।
– কি বুঝ নাই?
– বিষের তীব্রতা।
– এখন বুঝতে পারস?
– হ্যা পারসি।
– শান্তি?
– হুম…
– তোমার সাথে আর কে কে ছিল?
– কেউ ছিল না।
– একাই প্ল্যান করসো?
– হ্যা। কাউকে জানালে আর করা হইত না।
– কেউ দেখে নাই।
– অত ভিড়ে খেয়াল করে নাই।
– আগে থেকে কেউ খেয়াল করে নাই?
– খেয়াল করার মত কিছু ছিল না। আমি এমন কাজ করিনি এর আগে। করব এমনটাও ভাবে নাই।
– কোর্টের ভেতর ঢুকলে কিভাবে?
– সাংবাদিক বলে ঢুকে গেছি সাংবাদিকদের সাথে।
– শূট?
– কয়েকদিন অলিম্পিয়াডে শিখেছিলাম। আর আমি সামনে গিয়ে মারসি।
– পালাওনি কেন?
– পারতাম না। আমি ট্রেইনড না।
– পাশে কে ছিল?
– খেয়াল নাই।
– অলিম্পিয়াডে ট্রেইনার কে ছিল?
– আব্দুল মোকসেদ স্যার। কেন? উনি তো কিছু করে নাই।
– কিছু করেছে বলেছি?
– তাহলে?
– খুন করার আগেরদিন কই ছিলে?
– বাসায়।
– আর কোথাও যাও নাই?
– ভার্সিটি গেছি।
– বাসায় কে কে থাকে?
– আব্বু, আম্মু আর ছোটবোন।
– বাবা কি করে?
– চাকরী।
– কিসের চাকরি?
– বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের একাউন্ট্যান্ট।
– মা কি করে?
– গৃহিনী।
– বোন?
– ক্লাস ৯-এ পড়ে।
– তার আগের দিন কোথায় ছিলে?
– বাসায় ছিলাম, ভার্সিটি গেছি আর একজনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।
– কার সাথে?
– প্রেমিকা।
– নাম কি?
– মল্লিকা।
– কোথায় থাকে?
– তেজকুনিপাড়া।
– সাভার থেকে তেজকুনিপাড়া আসচ?
– না উত্তরায় দেখা করেছি।
– কি করে মল্লিকা?
– জগ্ননাথে পড়ে।
– রাজনীতি করে?
– না।
– ও জানত খুন করার কথা?
– না।
– আর কে জানত?
– কেউ জানত না।
– ওকে নিয়ে যান। কালকে এডভোকেট এসে যা কথা বলার বলবে।
গোলাম রব্বানী আমাকে নিয়ে আবার লকাপে ফিরে এলেন। ফিরতে ফিরতে গোলাম রব্বানীর কাছ থেকে শুনলাম শাহীন সাহেব এই থানার ওসি। পুলিশের খুব অত্যাচারের কথা শুনেছিলাম। নিজেকে খানিকটা সেভাবেই প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু তেমন কিছু করল না দেখে অবাক হলাম। হয়ত প্রথম দিন বলেই এত ভাল আচরণ। দিনে দিনে টর্চার বাড়বে। ফিরে এসে আগের মত খাদি চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

আজ প্রথম কোর্টে যাব। টিভিতে অনেকবার বিচার করার প্রোসেস দেখেছিলাম। এর আগে অবশ্য বাবার সাথে একবার গাজীপুরের এডিএমের এজলাশে গিয়ে বিচার দেখেছিলাম। এবার নিজেই আসামী। নিজের বিচার নিজেই দেখব। আমার সামনে পিছনে মোট ৬জন পুলিশ। আমার এডভোকেট রিতু মাসুদ, মৃদূল নারায়ণ। মৃদূল নারায়ন অত্যন্ত ধূর্ত এডভোকেট। এই পর্যন্ত কত মিথ্যা বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছে তার হিসাব নাই। পুলিশের বুটের শব্দগুলো খুবই বিরক্তিকর। মাথার মধ্যে চিন্তার তালে তালে সারাদিন এই খট খট শব্দ বাজতে থাকে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রথমেই এডভোকেট বেঞ্চের দিকে চোখ পড়ল। পেছনের দর্শক সারির দিকে তাকালাম না। ওখানে চেনা কোন মুখ থাকলে নিজেকে আর সামলাতে পারব না। চেনা মানুষের বিষন্ন চোখ নিকোটিনের বিষের মত পুড়িয়ে দেয়। আমার নিরর্থক এই জীবনকে ঐ এক দৃষ্টিই অনেক মুল্যবান করে দিতে পারে। মৃত্যুকে মেনে নেওয়া তখন খুব কঠিন হয়ে যাবে। এরচেয়ে বরং কপট উকিলবাবুদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আইনের ফাঁক ধরে মক্কেলকে বাঁচানোর বা ফাঁসানোর আপ্রাণ চেষ্টাটা দেখার মত। প্রবীণ বিচারকের আসার অপেক্ষা করছি অনেকক্ষণ ধরে। অবশেষে আসলেন ‘মহামান্য’ বিচারপতি। মোটেও প্রবীণ না। ক্লিন শেভ করা, আধুনিক মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে, গায়ে কাল জাজেস গাউন ফেলে গম্ভীর মুখে ঢুকলেন। ঊনি আসার সাথে সাথেই সবাই দাঁড়াল। আমি আগে থেকেই দাঁড়ানো। উনি বসতে বলার পর বসলেন। এরপর শুনানী শুরু হল। আমাকে অনেক প্রশ্ন করা হল। আমি আমার মত উত্তর দিলাম। যখন যা মাথায় আসল। নারায়ন বাবুর একটি কথাও মাথায় রাখতে পারিনি। ওনারা অবশ্য নিজেদের মত জোড়াতালি দিয়ে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। উকিলি মারপ্যাঁচের কথা অনেক শুনেছি। সামনাসামনি দেখে বুঝলাম রাসভারী জিলেপির চেয়েও বেশি প্যাঁচ। কথার একটু ডান বামেই বিচারের মোড় ঘুরে যায়। আর একেকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য তো বোমের চেয়েও ভয়ানক। আমার মৃত্যুদন্ড ঠেকানো যাবে বলে মনে হয় না। অবশ্য গোলাম আযমের এত খুনেও যখন ফাঁসি হয়নি আমাকে ফাঁসি না দেওয়াটাও অবাক করা কিছু হবে না।

গত সাত মাস ধরে কারো সাথে দেখা হয় না। প্রথম দিকে কয়েকবার মা,মিঘি, মল্লিকা, মিজান ভাই আরো কয়েকজন এসেছিল দেখা করতে। আমি দেখা করিনি। কলিম মামাই বাইরের খবর একটু আধটু যা দেবার দেয়। সেসব খবর শুনে, সকাল দুপুর রুটি ডাল খেয়ে, একটু একটু লেখালিখি করে বেশ কাটিয়ে দিয়েছি। এই কয়েক মাসে লকাপটা আমার ঘর হয়ে গেছে। এই ঘরে অন্য কোন আসামী জায়গা পায়নি। কেন পায়নি?-কলিম মামাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু কোন উত্তর পাইনি। হয়ত আমার মত অন্যায় কেউ করেনি তাই। অবশ্য ভালই হয়েছে। আপন ঘরে আপন চিন্তার জগতে ভালই ঘোরাফেরা করা গেছে। ফাঁসির রায় শোনার পর শেষবারের মত কাছের মানুষগুলোকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কেন জানি এই একঘরে জীবন ছেড়ে শেষবারের মত শাহাবাগের উত্তপ্ত রোদের বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। শহীদ জননীর ছায়ায় দাঁড়িয়ে বাঁচার শেষ নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করছে। আপন চিন্তার জগত ছেড়ে সাধারণের চিন্তায় মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই আবেগ তো আবার বাঁচার ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে তুলবে। ক্ষুদিরামের মত নিজের হাতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়ার ইচ্ছাকে মেরে ফেলবে। হঠাত কলিম মামা তালা খুললেন,
– আপনার সাথে দেখা করতে আসচে।
– কে?
– জানি না। স্যার বলসে আপনেরে ডাইকা দিতে।
আজকে কেন জানি না বলতে পারলাম না। শেষবারের মত দেখে নেই পরিচিত মুখগুলো। এরপর নাহয় সুযোগ আসলেও আর দেখব না। আজকে তবু দেখে নেই। আমি খাদি চাদরটা গায়ে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলাম।

কাল ফাঁসি কার্যকর হবে। বিচারকরা অনেকটা বিধাতার মত। তাদের বিচার কাজ কখনো আমরা মুল্যায়ন করতে পারিনা। তাদের চিন্তার ধার যে আকাশের কোন মন্ডলে থাকে তাই ধরতে পারিনা। কি বিবেচনায় যে শত খুন, ধর্ষন, নিপীরণের পরও পিশাচরা ছাড় পায় আর আমার মত ‘ক্ষুদে রাম’ একটা পিশাচকে মারার অপরাধে দড়িতে ঝুলে যায় বুঝতেই পারি না। বিধাতারও কি বিচার! বিধাতা তো বলে সে সর্বজ্ঞ। তার জ্ঞানের কাছে আমার জ্ঞান তুচ্ছ।আসলেই। আজকে বুজতে পারছি। আমার জ্ঞান দিয়ে আমি কোনমতেই হিসাব মিলাতে পারছি না। কিন্তু সে কি সহজে মিলিয়ে ফেলেছে।
আচ্ছা মা এখন কি করছে? কাঁদছে? না। এতদিনে চোখের পানি শুকিয়ে যাবার কথা। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি সামান্য কিছুতেই মা কেঁদে অস্থির করে দেয়। এত বড় ধাক্কায় মায়ের চোখের পানি অবশিষ্ঠ থাকার কথা না। অবশ্য কোথায় জানি পড়েছিলাম যারা সামান্য বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয় তারা নাকি বড় বিপদে নিথর হয়ে যায়। হয়ত মাও নিথর দেহ নিয়ে আল্লাহর সামনে বসে আছে। কি জানি! বাবা কি করছে? বাবা কাঁদার কথা না। বাবা নিশ্চই তার পাশে গুলি খেয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে শহীদ হওয়া মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে করে নিজেকে শক্ত রাখবে। বাবার তো গর্ব হওয়া উচিত। মুক্তিযোদ্ধার ছেলে রাজাকার মুক্ত করতে গিয়ে মারা যাবে- এতে তো কাঁদার কিছু নেই। বাবা কি কারাগারের সামনে একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে? থাকতেই পারে। ইশ! বাবাকে জানানো হয়নি বাবার পাশে তিন হাত জায়গা খুড়ে শোবার ইচ্ছাটা। মল্লিকা এখন কি করছে? ও শক্ত মেয়ে। নিশ্চই নরম হাতে কিবোর্ডে খট খট শব্দ তুলে ফেসবুক-ব্লগে ঝড় তোলার চেষ্টা করছে। আশেপাশের সবাইকে আমার প্রসঙ্গেই বলছে। নাকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড়ালে চোখের পানি ফেলছে? শক্ত মানুষেরা ভেতরে ভেতরে অনেক ভঙ্গুর হয়। না, ওর কাঁদার কথা না। ঐ তো আমাকে ফালি করে কাটা ভগাংকুরের সেই বীরাংনার সাথে পরিচিত করেছিল। পাঁজরের হাড় বেকে যাওয়া সেই মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেছিল। চায়ের দোকানি সন্তানহারা মায়ের সাথে দেখা করিয়েছিল। ও কখনো কাঁদবেনা। বরং নতুন গল্প সাজাবে। নতুন কাউকে আমার সাথে পরিচিত করাবে। আচ্ছা, এই মুহুর্তে শাহাবাগটার কি অবস্থা? ওরা কি আগের মত এক হতে পেরেছে? বেরিয়ে আসতে নোংরা রাজনীতির থাবা থেকে? শাহাবাগে কি জেগেছিল আরেকটা ৮ই ফেব্রুয়ারী?
জানি না। কিচ্ছু জানি না। এই অন্ধকার কূপে থেকে কিছু জানাও যায় না। একটা ফাইভ ফাইভের জন্য গলাটা খুব খুশ খুশ করছে। একটু লাল পানি পেলেও ভাল হত। ঘুমে চোখ জোড়া জড়িয়ে আসছে।

শাহাবাগটা একদিন্ আমাদের জায়গা ছিল। শাহাবাগের প্রতিটা কংক্রিটকণা রাজাকারের ফাঁসির কথা বলত। আজকে সেই কংক্রিটের কণাগুলো মারিয়ে রাজাকারেরা গাড়ি চেপে চলে যাচ্ছে। ওদের ফাঁসির দাবিতে কাঁপা আকাশ আজকে ওদের হাসির শব্দে কাঁপছে। পতাকাটা মাথা নত করে ওদের হাতে বন্দি হয়ে আছে। জাতীয় সঙ্গীতটা ওদের কন্ঠে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। বীরাঙ্গনা নেকাবের উপরে ঘোমটা টেনেছে। সন্তানহারা মা নিজের জন্য তিন হাত মাটি খুঁড়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা আবার ঘরে কপাট দিয়েছে। নাস্তিকদের মায়েরা নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে পথে পথে ঘুরছে। বিধাতা হাসছে। শাহাবাগ কাঁদছে। ওরা শান্তির ঠান্ডা আগুন ছড়াচ্ছে।

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল কলিম মামার ডাকে। জেলারের পক্ষে একজন জানতে এসেছে আমার শেষ ইচ্ছা।
– আমার শেষ ইচ্ছা?
– হ্যা, শেষ ইচ্ছা।
– আমার শেষ ইচ্ছা- সোনার বাংলা।

১৮ thoughts on “সোনার বাংলা

  1. কাল্পনিক হলেও গল্পটা একেবারে
    কাল্পনিক হলেও গল্পটা একেবারে ভিতরকেই নাড়া দিয়ে দিল ।আফসুস! কয়েদি হতে পারবো না নয়তো আপনার কল্পনাকে বাস্তবেই রূপ দিতাম।শুনেছি কোন মামলায় গ্রেফতার হলেও প্রথমে হাজতি হিসেবে জেলে রাখা হয় ।হাজতিরা সাধারনত কয়েদির সান্নিধ্য পান না ।মামলার বিচার শেষ হলে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা প্রদান করলে তবেই কয়েদি হওয়া যায় ।তাছাড়া জেলের ভিতর খুন করলেও সর্বচ্চো শাস্তি নাকি ৭বছর! হায়! যদি প্রথমেই কয়েদি হবার সুযোগ থাকত তবে একটা চান্স নিয়ে নিতাম।

    1. আমি আসলে অত গভীরয়াবে জানিনা।
      আমি আসলে অত গভীরয়াবে জানিনা। তবে গল্পের চরিত্র জেলের ভেতরে খুন করেনি। আদালত নেবার সময় খুন করেছে। এই ধরনের ব্যাপার ফুটাতে চেয়েছিলাম। অবশ্য আমি শুনেছি কোন আসামীকে খুন করলেও ফাঁসি দেয় যদি গুরুত্বপূর্ণ কোন কারণ না থাকে।

  2. ‘দশ মাস দশদিন পরে
    জন্ম নেব

    ‘দশ মাস দশদিন পরে
    জন্ম নেব মাসির ঘরে মাগো
    তখন যদি না চিনতে পারিস দেখবি গলায় ফাঁসি’

    গল্পটা ক্লাসিক হইছে, মাশিয়াত।

  3. অসাধারণ শব্দটা কম মনে
    :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:
    অসাধারণ শব্দটা কম মনে হচ্ছে…
    কিছু লেখা আছে যা পড়লে ভেতরে কী যেন হয়। আপনাকে :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

  4. “বুড়ার একদিন বেশি বাঁচাই
    “বুড়ার একদিন বেশি বাঁচাই আমার ভবিষ্যত মারার জন্য যথেষ্ট।”
    —এই লাইনটা চমৎকার ইনসাইটফুল! অনবদ্য…
    আজ সারাদিন গল্পটা পড়া হয়নি বলে আফসোস লাগছে!!
    অসামান্য হয়েছে… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow: :bow:

  5. আসলেই তো তাই। গোলাম একদিন
    আসলেই তো তাই। গোলাম একদিন বেশি বেচে কত তরুণের ভব্যিষত ধ্বংস করবে তার হিসাব নাই। ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *