রাগান্বিত হওয়া বা যথেষ্ট হতাশ হবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সমগ্র পৃথিবীতে বিশ্বের সেরা শিক্ষাব্যবস্থা প্রসার লাভ করে বা বিবেচিত হয়েছিল। যে কোনও শিক্ষা ব্যবস্থা যদি মানুষকে বর্বরতা থেকে জীবাণুমুক্ত করতে পারতো তবে জার্মানি সেই পথেই এগিয়ে যাবার কথা ছিল, জার্মানিতে তো কোন স্বৈরশাসক জন্ম নেবার কথা ছিলনা। জার্মানরা সে সময় থেকেই আধুনিক গবেষণামূলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিল, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের কৃতিত্বের জন্য বিশেষ বিশিষ্ট ছিল – কেবল কার্ল বেঞ্জের কথা চিন্তা করুন যিনি পেট্রোল চালিত অটোমোবাইল আবিষ্কার করেছিলেন, রুডলফ ডিজেল যিনি সংক্ষেপণ-ইগনিশন ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন, হেইনিরিচ হার্টজ যিনি বৈদ্যুতিক চৌম্বক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন, উইলহেম কনরাড রেন্টগেন যিনি এক্সরে আবিষ্কার করেছিলেন, ফ্রেডরিখ অগস্ত্য কেকুলি যিনি রশ্মি ও রাসায়নিক কাঠামোর তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন, পল এহরলিচ যিনি সিফিলিসের প্রথম ঔষধি চিকিৎসা শুরু করেছিলেন, এখানে অবশ্যই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথা বাদ দেয়া যায় না। উনিশ শতকের সময় অনেক আমেরিকান পণ্ডিতরা তাদের ডিগ্রির জন্য জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে গিয়ে পড়াশোনা করতেন। জার্মানরা সে সময় থেকেই শৈশব-কালীন শিক্ষা ব্যবস্থা কিন্ডারগার্টেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রশিক্ষণের উপর জোর দেয়। জার্মান সরকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত বৃত্তিই প্রদান করেছিল, যেমন একজন ক্রনিকলারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও ফি দেবার প্রয়োজন হতোনা। কিন্তু এত কিছুর পরেও যেটা সম্ভব হয়নি সেটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব, কারণ রোগ জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত শরীরের ভেতর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজে নির্ণয় করা গেলেও মস্তিষ্ক ও মনন যখন ধর্মের ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তখন যে কোন প্রগতিশীল সমাজ হঠাত করেই ধ্বংসের মুখে ধাবিত হতে থাকে।
অনেকেই তখনকার সময় ধারণা করেছিলেন সমৃদ্ধশালী, শিক্ষিত এবং সংস্কৃত লোকদের মধ্যে যথা ইউরোপ, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকা সব সময় স্বৈরশাসন থেকে নিরাপদ, কিন্তু শতাব্দীর মাঝামাঝি না আসতেই সভ্যতা উল্টো পথেই ধাবিত হতে থাকল।
আমাদের দেশেও এখন সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করছি যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে, মানুষের মাঝে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন যদি ঘটেই থাকে তবে মানুষ নিশ্চয়ই কুসংস্কার থেকে দুরে থাকবে, একটি সুন্দর সমাজ গঠন করতে এর চাইতে বড় চাওয়া আর কিইবা হতে পারে। কিন্তু দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে যে আসলে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি এগিয়ে যাচ্ছে না, এখানে কিছু ধর্মীয় উন্মাদকে হাটে মাঠে ঘাটে গরু ছাগলের মত ছেড়ে রাখা হয়েছে আর তারা বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের নানা ধরনের কুৎসিত মন্তব্য করেই থেমে থাকছেন না, তারা নিজেদের শিক্ষা দীক্ষার কৃতিত্ব অক্সফোর্ড থেকে তিনবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পদক নিয়ে গ্রামে গঞ্জে মানুষের মস্তিষ্কে ধর্মের ভাইরাস ঢুকিয়ে দিচ্ছে, অথচ যারা কবি গান, জারি গান বা আধ্যাত্মিক গান বাজনা করেন বরং তাদেরকেই জেলখানাতে পুরে রাখা হচ্ছে। ঠিক এধরনের কর্মকাণ্ডই শুরু হয়েছিল জার্মানিতে হিটলারের শাসন আমলের শুরুতেই। আজ আমাদের দেশে মাতৃদুগ্ধ সংরক্ষণ ব্যাঙ্কটিও সরকার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলো কারণ সমাজের শিক্ষিতরা ধর্মের ভাইরাসে আক্রান্ত।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই জার্মানিতে স্বৈরশাসক বিরোধী আন্দোলন হবে সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারে নাই। তবে রাশিয়ার রাজনৈতিক আবহাওয়া দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগেই থেকেই সমগ্র ইউরোপের উপর প্রভাব বিস্তার শুরু করে, কার্ল মার্ক্সের ঘৃণা ও স্লোগান “বুর্জোয়া শ্রেণী” নিপাত যাক, এই বুর্জুয়া শ্রেণীকেই তিনি সমাজের অসুস্থতার জন্য দায়ী করেছিলেন। লেনিন এবং তাঁর উত্তরসূরি স্ট্যালিন সেই দর্শনের আরও অনেক দূরে ঠেলে নিয়ে গিয়ে তথাকথিত “ধনী” কে কৃষকের গরুর সাথে বেধে তাদের সাধারণ মানুষের কাতারে নিয়ে আসলেন।
কথা হচ্ছে সমগ্র ইউরোপে যখন সমাজতন্ত্র এতটাই প্রভাব বিস্তার করছে তাহলে কেন উচ্চ শিক্ষিত জার্মানরা অ্যাডলফ হিটলারের মতো পাগলকে জড়িয়ে ধরল? সংক্ষিপ্ত উত্তরটি হ’ল স্বৈরশাসকের খারাপ নীতিগুলি অর্থনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছিল তখন হিটলার জার্মানদের মস্তিষ্কে এক ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়ে যেন যে কোন পরিস্থিতি যথেষ্ট রাগান্বিত হওয়া বা যথেষ্ট হতাশ হয়ে পড়ে থেকে মানুষ হিটলারকেই অন্ধের মত বিশ্বাস করা শুরু করে সে ধরনের রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার উপর জোর দেয়া হয়, গোয়েন্দা বাহিনী, সামরিক বাহিনী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে হিটলার আয়েত্তে আনতে সমর্থ হয়। বলতে গেলে মানুষের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে শেতাঙ্গ ও নীল চোখের অধিকারীরাই উন্নত জাতের মানুষ বাকিরা অন্য জাতের। ঠিক যেমন করে আমাদের দেশের মোল্লারা উন্মাদের মত আমাদের দেশের গ্রামে গঞ্জে সামিয়ানা টাঙিয়ে মানুষের মস্তিষ্কে ধর্মের ভাইরাস ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সরকার, দল, রাজনীতি সমাজ আজ এই ভাইরাসেই আক্রান্ত তাই আমরা সব দেখেও বুঝেও যথেষ্ট রাগান্বিত হওয়া বা যথেষ্ট হতাশ হবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি। বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে যাচ্ছে, ধর্ষণের পর পুকুরের ছেলেমেয়েদের লাশ পচে ভেসে উঠছে, ভোরের সকালে ধান খেতে, পাট খেতে বা মাদ্রাসার ছাদে তরুণীর মৃত লাশ, মাদ্রাসাগুলোতে এখন ধর্ষণের মহাউত্সব দেখেও আমরা এখন আর যথেষ্ট রাগান্বিত হওয়া বা যথেষ্ট হতাশ হবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *