ভারত নিয়ে উদ্বেগে থাকবে বাংলাদেশ বছরজুড়ে!

নতুন বছর ও নতুন দশকের সূচনা হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ২০২০ সালে পরিবর্তনশীল এক বিশ্ব সবার সামনে অপক্ষো করছে। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। আঞ্চলিক শক্তি ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তণ মোকাবিলা করছে। এর জের ধরে সেখানে বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং গুপ্ত তৎপরতা চলছে। অভিযোগ যে, ভারতের বর্তমান সরকার দেশটি থেকে মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করতে চায়। প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগুরুর দেশ বাংলাদেশ রয়েছে দুশ্চিন্তার মধ্যে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাঁকবদলটা এরকম যে, আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্ধী শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা এখন আর শোনা যায় না। ভারতের প্রভাববলয়ের সবচেয়ে গভীরে যুক্ত থাকা ভুটান ও নেপালকে দেখা গেছে আরেক প্রতিদ্বন্ধী শক্তি চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, মিয়ানমারেও ভারতকে তার প্রভাব হ্রাস পাওয়া ঠেকাতে জুঝতে হচ্ছে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশকেই ভাবা হতো ভারতের একমাত্র পরীক্ষিত বন্ধু। কিন্তু ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যেন সেই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’কে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মত হলো, বাংলাদেশ সরকার সত্যিকারার্থে ভারতবন্ধু বলেই পানিসীমান্ত এবং স্থলসীমান্ত নিয়ে যে বিবাদগুলো ছিল তার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। এমনকি ছিটমহল বিনিময় পর্যন্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে করিডোর ব্যবহার করে ভারতীয় লোকবল এবং মালামাল পরিবহনের ব্যবস্থাও ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। এর মধ্যে নাগরিকত্ব আইন এবং এনআরসি ইস্যু ঢুকে পড়ে সেই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বে কিছুটা হলেও ফাটল ধরার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ইঙ্গিতও মিলছে প্রচুর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফর বাতিল হয়েছে হঠাৎই। সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পক্ষই সভাগুলো বাতিল করেছে। এমনকি একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠকটিও। এটা সবারই জানা যে, ভারতে সম্প্রতি পাস হওয়া নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই বাংলাদেশ এসব সভা বাতিল করেছে।

কুটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন শুধু অভ্যন্তরীণ হিসেব নিকেশ করেই বিজেপি এই বিল পাস করেনি বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে চাপে রাখার জন্যও এই নাগরিকত্ব বিল এবং নাগরিকপঞ্জি করা হয়েছে। এই নাগরিকত্ব বিল এবং নাগরিকপঞ্জির সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা যাতে নির্যাতিত কিংবা নিপীড়িত না হয় সে জন্যই তারা এ রকম উদ্যেগ নিয়েছে বলে বিজেপির মুখপাত্ররা বলছেন। কিন্তু এটা উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। বেশি চাপ হাসিনা সরকারের না সইলে সেটা ফিরে ভারতের কাঁধেই চাপবে।

বিশ্লেষকরা এ প্রশ্নে একমত যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কলাকৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বিজেপি। দলটির নেতৃত্ব এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, তার ফল কী হতে পারে, সেসব কিছুই আমলে নেয়নি। কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে বাংলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব বাংলার জনগণ এ নিয়ে গর্ব করে যে, উগ্র ধর্মীয় রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের রাজনীতির সূচনা ও সমাপ্তি, দুটোই তারাই টেনেছে। ফলে ভারতের নতুন উগ্রপন্থিরা যদি মুসলিমদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশকে টার্গেট করে, তাহলে বাংলা বসে থাকবে না। ভারতের উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির বিনাশ ঘটতে পারে বাংলার সঙ্গে দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই। তবে তার আগে বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান কথিত বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে। বিজেপি যদিও বলে তাদের নীতি হলো ‘প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার’ দেওয়া। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে, সেই নীতির প্রয়োগ ঘটছে না।

বিজেপি সরকারের বাংলাদেশ নীতি কি এই প্রশ্ন এখন কুটনৈতিক পাড়ায় জোরেশোরেই উঠছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভারত সরকার বাংলাদেশকে সব ইস্যুতে চাপে রাখতে চাইছে। ভারত চাইছে কোনো কিছু না দিয়ে কেবল নিজেদের দিকটা আদায় করে নিতে। পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও একই পাল্লায় রেখে ভারতের স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশকেও একটি ইস্যু করে তোলা। এই নীতির কারণেই বাঙালি মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করার ওপর বিজেপি এত জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশে সব মহলই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এদিকে ভারতে প্রবল ঝড় তুলেছে মৌলবাদী শিবির। এখন ভারত এগিয়ে চলেছে একটি ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে। ফলে দ্রুতই বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী এই দেশটি। অনেকের বিশ্বাস, বিরোধী দলগুলোও বর্তমান অবস্থাটাই ধরে রাখতে চায়, পরিবর্তনে তারা আগ্রহী নয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মোদিকে বিরোধিতার স্বার্থে সক্রিয় হলেও তারাও আসলে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার বিরুদ্ধে নয়। ফলে বিজেপির বিভাজনের নীতির বিরুদ্ধে ভারতের সমাজে তরুণদের বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ের শক্ত কোনো ফ্রণ্ট গড়ে ওঠেনি। এর অর্থ হলো, আন্দোলনের গতি তীব্র হলেও সাম্প্রদায়িকতার সংকট মুছে ফেলার মতো পরিস্থিতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

ভারতের রাজনীতির বর্তমান এই অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতা হঠাৎই পাল্টে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের পর বড় আকারের উদ্বাস্তু ঢল মোকাবিলার আতঙ্ক লেগেই থাকবে। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি বাংলাদেশে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ভারতের বর্তমান যে অংশীদারিত্ব, তাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সব মিলিয়ে ২০২০ সালে ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ থাকবে গভীর উদ্বেগের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *