বাংলাদেশ-ভারত ‘বন্ধুত্ব’ এখন কোন পথে?

গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্ব›দ্বী শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা এখন আর শোনা যায় না। ভারতের প্রভাববলয়ের সবচেয়ে গভীরে যুক্ত থাকা ভুটান ও নেপালকে দেখা গেছে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, মিয়ানমারেও ভারতকে তার প্রভাব হ্রাস পাওয়া ঠেকাতে জুঝতে হচ্ছে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশকেই ভাবা হতো ভারতের একমাত্র পরীক্ষিত বন্ধু। কিন্তু ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যেন সেই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’কে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কলকাতার বুদ্ধিজীবী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মত হলো, শেখ হাসিনা সরকার সত্যিকারার্থে ভারতবন্ধু বলেই পানিসীমান্ত এবং স্থলসীমান্ত নিয়ে যে বিবাদগুলো ছিল তার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। এমনকি ছিটমহল বিনিময় পর্যন্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে করিডোর ব্যবহার করে ভারতীয় লোকবল এবং মালামাল পরিবহনের ব্যবস্থাও ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। এর মধ্যে নাগরিকত্ব আইন এবং এনআরসি ইস্যু ঢুকে পড়ে সেই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বে কিছুটা হলেও ফাটল ধরার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ইঙ্গিতও মিলছে প্রচুর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফর বাতিল হয়েছে হঠাৎই। কুটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পক্ষই সভাগুলো বাতিল করেছে। এমনকি একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠকটিও। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয় নিয়ে বার্ষিক এই বৈঠকে এবার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের লক্ষ্যে ছয়টি অভিন্ন নদীর হালনাগাদ করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এটা সবারই জানা যে, ভারতে সম্প্রতি পাস হওয়া নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণেই বাংলাদেশ এসব সভা বাতিল করেছে।

বাংলাদেশ অবশ্য রয়েসয়ে ধাপে ধাপেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। শুরুতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের সমালোচনা করে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভারতের ঐতিহাসিক ভুমিকা ছিল। কিন্তু নতুন বিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করবে। বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে মধুর সম্পর্ক। আমাদের দেশের মানুষ চান না নয়াদিল্লি এমন কিছু করুক যাতে দু’দেশের সম্পর্ক প্রভাবিত হয়।

বিজেপির থিঙ্ক ট্যাংক দীর্ঘ গবেষণা এবং পর্যালোচনা করেই নাগরিকত্ব বিল এবং নাগরিকপঞ্জি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যারা এর বিরোধিতা করছে কংগ্রেস এবং তৃণমূলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলরা তারাও স্বীকার করছে বিজেপি তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য এই বলপ্রয়োগ করেছে। এর ফলে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটবে এবং মুসলমানসহ ভারতের সংখ্যালঘুরা আস্তে আস্তে দেশ ত্যাগ করবে। আর অন্যান্য দেশ থেকে মুসলমানরা আসবে যারা বিজেপির ভোট ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এই হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ।

কুটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন শুধু অভ্যন্তরীণ হিসেব নিকেশ করেই বিজেপি এই বিল পাস করেনি বরং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে চাপে রাখার জন্যও এই নাগরিকত্ব বিল এবং নাগরিকপঞ্জি করা হয়েছে। এই নাগরিকত্ব বিল এবং নাগরিকপঞ্জির সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা যাতে নির্যাতিত কিংবা নিপীড়িত না হয় সে জন্যই তারা এ রকম উদ্যেগ নিয়েছে বলে বিজেপির মুখপাত্ররা বলছেন। কিন্তু এটা উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। বেশি চাপ হাসিনা সরকারের না সইলে সেটা ফিরে ভারতের কাঁধেই চাপবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অর্কপ্রভ সরকার বলেন, নেপাল অনেকটাই চীনের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে ভাইয়েরা ক্ষমতায় আসায় এবং তাদের অতীত বলে তারা অনেকটাই চীনঘনিষ্ঠ। শেখ হাসিনা সরকার সত্যিকারেই ভারতবন্ধু হিসেবে স্বীকৃত। হঠাৎ করে তাদের বিদেশমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর স্থগিত করার একটা রাজনৈতিক এবং কুটনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই আছে। বিজেপি যদিও বলে তাদের নীতি হলো ‘প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার’ দেওয়া। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে, সেই নীতির প্রয়োগ ঘটছে না।

বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে ভাষা ও চেতনা সমিতির সম্পাদক ইমানুল হক বলেন, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে ভারত চলতে পারবে? সার্বভৌম একটা দেশের নাম করে অন্য দেশের সংসদে বসে এভাবে বলা যায়? তাদের বিদেশমন্ত্রী যেভাবে সফর বাতিল করেছেন তাতে আমি মনে করি তিনি বাংলাদেশের জনগণের যথাযথ সম্মান রক্ষা করেছেন।

তবে এখনই হতাশ হতে রাজি নন অনেকে। তাদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অচিরেই চলমান সংকট কেটে যাবে বলেও আশা তাদের। কলকাতার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর চন্দ বলেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটা খুব শক্তিশালী জায়গায় এই মুহূর্তে রয়েছে। এনআরসি ইস্যুতে সেটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে, আমি সেটা মনে করছি না। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের অস্থিরতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গজুড়েও চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এর মধ্যে বাংলাদেশেও ভারতবিরোধিতা শুরু হলে বিজেপি সরকারকে মাশুল বড় দিতে হতে পারে।

বিশ্লেষকরা এ প্রশ্নে একমত যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কলাকৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বিজেপি। দলটির নেতৃত্ব এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, তার ফল কী হতে পারে, সেসব কিছুই আমলে নেয়নি। কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে বাংলার ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব বাংলার জনগণ এ নিয়ে গর্ব করে যে, উগ্র ধর্মীয় রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের রাজনীতির সূচনা ও সমাপ্তি, দুটোই তারাই টেনেছে। ফলে ভারতের নতুন উগ্রপন্থিরা যদি মুসলিমদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশকে টার্গেট করে, তাহলে বাংলা বসে থাকবে না। ভারতের উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির বিনাশ ঘটতে পারে বাংলার সঙ্গে দ্ব›দ্বকে কেন্দ্র করেই। তবে তার আগে বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান কথিত বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে। বিজেপি সরকার জেনেবুঝেই এই খেলায় হাত দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *