আমি সেই রাতের কথা বলছি. . . .

পঁচিশ মার্চ ।
মানবসভ্যতার ইতিহাসের ভয়ংকরতম যে কয়টা দিন আছে তার মধ্যে এই পঁচিশ মার্চ একটা ।
আর্মেনীয় গণহত্যা বা হিটলারে ইহুদি নিধনযজ্ঞের চেয়েও ভয়াবহ এক যুদ্ধের সূচনা এই পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে ।
ভয়ংকর কারণ আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো যুদ্ধেই কোনো দেশের সামরিক বাহিনী মধ্যরাতে সাধারণ জনগন নির্বিচারে হত্যা করেনি ।
যুদ্ধের কিছু অলিখিত নিয়ম থাকে । যার মধ্যে একটি হল হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা চালানো যাবে না । নারী ও শিশুদের যুদ্ধের আওতার বাইরে রাখতে হবে । প্রবল পরাক্রান্ত পাকিস্তানী বীর সেনাবাহিনী এসব নিয়ম ভঙ্গ করেছে প্রকাশ্যে , নির্বিচারে ।

পঁচিশ মার্চ ।
মানবসভ্যতার ইতিহাসের ভয়ংকরতম যে কয়টা দিন আছে তার মধ্যে এই পঁচিশ মার্চ একটা ।
আর্মেনীয় গণহত্যা বা হিটলারে ইহুদি নিধনযজ্ঞের চেয়েও ভয়াবহ এক যুদ্ধের সূচনা এই পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে ।
ভয়ংকর কারণ আজ পর্যন্ত কোথাও কোনো যুদ্ধেই কোনো দেশের সামরিক বাহিনী মধ্যরাতে সাধারণ জনগন নির্বিচারে হত্যা করেনি ।
যুদ্ধের কিছু অলিখিত নিয়ম থাকে । যার মধ্যে একটি হল হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা চালানো যাবে না । নারী ও শিশুদের যুদ্ধের আওতার বাইরে রাখতে হবে । প্রবল পরাক্রান্ত পাকিস্তানী বীর সেনাবাহিনী এসব নিয়ম ভঙ্গ করেছে প্রকাশ্যে , নির্বিচারে ।
যুক্তরাষ্ট্র নামের জঘন্য দেশটার পা চাটা কুকুর জাতিসংঘ সব দেখেও চুপ ছিলো আদর্শ প্রভুভক্তি প্রদর্শন করে । পেছনে যে কারনেই থাকুক , রাশিয়া না বাধা দিলে আমাদের এই বাংলাদেশ যে বালুচিস্তান হতো তা না বললেও চলে ।

মুক্তিবাহিনীর নাম শুনলে ভয়ে প্যান্ট হলুদ করে ফেলতো সাচ্চা মুসলমান নামধারী পাকিস্তান বাহিনী । এরা পানিকে ভয় পেতো যমের মতো , এদেশের মানুষকে তার চেয়েও বেশি । পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে একটাও সফল অপারেশন সম্পন্ন করতে না পারা এই পাকিস্তান মিলিটারিদের বিশেষ লোভ ছিলো এ দেশীয় নারীদের প্রতি । তা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু না । বাঙ্গালী নারী পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মোহনীয় নারী । ইসলাম ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে খাওয়া এই জারজ মিলিটারিরা তাই ধর্ম বিসর্জন করতে দ্বিধা করেনি । তাদের সহযোগিতায় ছিলো তাদেরই বিমাতা গোত্রীয় ভাই বেরাদার গুয়াজম এন্ড গং ।

তিরিশ লক্ষ লাশের এক জীবন্ত নরক সৃষ্টির সূচনা পঁচিশ মার্চ ।

আতঙ্কে দিশাহারা কত পরিবার সেই রাতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।হারিয়ে যায় কত মা , কত সন্তান । একটু আগেই জড়জড়ি করে ঘুমিয়ে থাকা বড় বোন টার কাছ থেকে হারিয়ে যায় তার আদরের ছুটকি টাকে । এক শংকু মজুমদারের লাশ যেনো পরে থাকে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ।

পঁচিশ মার্চ রাতে ঠিক কি পরিমান একটা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তা কখনো বোঝানো সম্ভব না । সাধারণ মানুষের কোনো দিকে পালানোর রাস্তা ছিলো না । সাত মার্চে অসহোযোগের ডাক দিয়ে আলোচনায় বসেছিলো শেখ মুজিব । পঁচিশ মার্চ রাতে গুজব ছড়িয়ে পরে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে । অন্যান্য নেতারাও নেই । বিনা মেঘে বজ্রপাত নয় , বিষয়টা ছিলো বিনা কিয়ামতে পৃথিবী ধ্বংসের মতো ভয়াবহ ।

একাত্তরে ঢাকার ফকিরাপুল এলাকায় থাকতো হাসু আপা । পুরো নাম হাসনা হেনা । সবাই হাসু আপা করেই ডাকতো । তার সাথে থাকতো তার ছোট ভাই রাসেদ , রাসেদুল ইসলাম । একটা ফটোগ্রাফী ট্রেনিং এর সময় পরিচয় হয় ষাটোর্ধ এই মুক্তিযোদ্ধার সাথে , বছরখানেক আগে । তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পঁচিশে মার্চ রাতের কথা ।

” আমি তখন কেবল ঢাকা এসেছি । একটা কিছু চাকরীর ব্যবস্থার জন্যে । হাসু আপা আর তুলতুল ঢাকায়ই থাকতো । দুলাভাই মার্চের শুরু থেকে নিখোজ । তুলতুল কেবল কথা শিখেছে , মা আর মামা দুটোই বলতে পারে । একটা লাল ফ্রক পরে বেশ হাটাহাটিও করে । হাসু আপা কি একটা দোকানে সেলাই এর কাজ করতো । সপ্তাহ খানেক ধরে আমিও আছি , কোনোরকমে দিন কাটে ।
ঢাকার অবস্থা বছর খানেক থেকেই খারাপ ছিলো । মার্চে গন্ডগোলটা আরো বেশি । তবে সাধারণ মানুষ খুব একটা গা করতো না । আমিও খেয়ে পরে থাকার ব্যবস্থা খুজছিলাম , ইয়াহিয়া মুজিব নিয়ে আগ্রহ ছিলো না ।
পচিশ তারিখ সন্ধ্যা থেকেই কেমন যেনো সব অন্যরকম হয়ে গেলো । তখন মধ্যরাত কেবল পেরিয়েছে । গোলাগোলির আওয়াজ পেলাম । গলির মোড়ে একটা ছোটো ঘুন্টি দোকান ছিলো , হাশেম নামে এক ছেলে বসতো । ওকে দেখলাম দৌড়ে আসতে । থামানোর সময় পেলাম না । আরও কয়েকজনকে দেখলাম যে যেদিকে পারছে দৌড়াচ্ছে । ঘুরে দেখি হাসু আপা তুলতুলকে কোলে নিয়ে ভীত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আশে পাশের বাড়িগুলো থেকে মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে । আমি আর হাসু আপাও দৌড়ালাম । আমার হাতে একটা ব্যাগ , আপার কোলে তুলতুল ।
হঠাত্‍ পেছনের দিক থেকে কান ফাটানো শব্দে গুলি । আমার পাশে একবৃদ্ধ মতোন চাচা কেবল ‘মা’ বলে পরে গেলেন । পেছনে ঘুরে তাকানোরও সময় নাই । দৌড়াচ্ছি আর দৌড়াচ্ছি । পা দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাচ্ছিলো । তবুও কেবল দৌড়াচ্ছি । একটা গলি মতোন রাস্তা দিয়ে আমি , হাসু আপা আর কয়েকজন দৌড়াতে থাকলাম । কিছুক্ষণ পর গুলির আওয়াজ আর শুনলাম না । হঠাত্‍ দেখি আপার শাড়িতে রক্ত । বুকটা ছলাত্‍ করে উঠল । আপা নিজেও চমকে উঠলো । কিন্তু না , আপার গুলি লাগেনি ।ঐ কঠিন বুলেটের আঘাতে আমাদের আদরের তুলতুলের রক্তে আপার রং উঠে যাওয়া পুরোনো সবুজ শাড়িটা ভিজে কালো হয়ে গেছে । সবুজ জমিনে সেই যে এক ফোঁটা লাল রক্ত আমি দেখেছিলাম , আজও পতাকার লালে কেবল তুলতুলের রক্তের দাগ খুজে পাই । ”

এমনি আরও শত তুলতুলের নিষ্পাপ রক্তে আমাদের বাংলাদেশ । হেরে গিয়েও আবার জেগে উঠা এক ফিনিক্স পাখির দেশ ।

২ thoughts on “আমি সেই রাতের কথা বলছি. . . .

  1. কোন বাঙ্গালী যদি ইনিয়ে বিনিয়ে
    কোন বাঙ্গালী যদি ইনিয়ে বিনিয়ে অস্বীকার করতে চাই ২৫ মার্চের কাল রাতের কথা
    তবে আমি তাকে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া এক নিমকহারাম বলব…

    এমনি আরও শত তুলতুলের নিষ্পাপ রক্তে আমাদের বাংলাদেশ । হেরে গিয়েও আবার জেগে উঠা এক ফিনিক্স পাখির দেশ ।

    অনেক ভাল লাগল…

  2. কিছুদিন পর কালোরাত বলতে
    কিছুদিন পর কালোরাত বলতে বুজাবে ৫মে এর রাতকে। গনহত্যা বলতে বুজাবে সাঈদীর চন্দ্রাভিযানে নিহত সন্ত্রাসীদের পুলিশী মরনকে। সবকিছুর পর এদেশের মানুষ ২৫ কে ভুলে ৫এ ইতিহাস হাতড়াবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *