সাম্প্রতিক কোটা বিতর্ক এবং একটি বিশ্লেষণ : ফিরোজ আহমেদের লেখা থেকে

কোটা পদ্ধতি নিযে আন্দোলন-সংগ্রাম-জ্বালাও পোড়াও-ধরপাকড় চলছে, সেই সাথে চলছে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনাও। এটা একদিক দিয়ে জরুরি যে এই আলোচনা নিয়োগ ক্ষেত্রে বৈষম্য, আমলাতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীলতা, রাষ্ট্রের অন্তর্গত বৈষম্য, কায়েমি স্বার্থ, দলবাজ নিয়োগ প্রক্রিয়া, আন্দোলনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ইন্ধনসহ অজস্র প্রসঙ্গ উঠে আসছে। অনেকগুলো আলোচনাতে তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ আছে, অনেকগুলো মতামত হুজুগে ভেসে যাওয়া। মোটা দাগে কিছু মতামত এখানে রাখতে চাই


কোটা পদ্ধতি নিযে আন্দোলন-সংগ্রাম-জ্বালাও পোড়াও-ধরপাকড় চলছে, সেই সাথে চলছে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনাও। এটা একদিক দিয়ে জরুরি যে এই আলোচনা নিয়োগ ক্ষেত্রে বৈষম্য, আমলাতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীলতা, রাষ্ট্রের অন্তর্গত বৈষম্য, কায়েমি স্বার্থ, দলবাজ নিয়োগ প্রক্রিয়া, আন্দোলনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ইন্ধনসহ অজস্র প্রসঙ্গ উঠে আসছে। অনেকগুলো আলোচনাতে তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ আছে, অনেকগুলো মতামত হুজুগে ভেসে যাওয়া। মোটা দাগে কিছু মতামত এখানে রাখতে চাই

১. প্রথমত আমি জানিয়ে দেওয়া ভালো, সব সংরক্ষণ পদ্ধতির মাঝে অগণতান্ত্রিকতা নেই। বরং ইনসাফ বা ন্যাযবিচারের ধারণাই এমন হবার কথা যে কোন বিচারে সামাজিক বর্গ আকরে কেউ পিছিয়ে থাকলে তাকে এগিয়ে আনার সুযোগ দেয়াটা রাষ্ট্র/সমাজ/প্রতিষ্ঠান কর্তব্য হিসেবে নেবে। সম্প্রদায় হিসেবে, জাতি হিসেবে, লৈঙ্গিক পরিচয়ে যদি দেখা যায় রাষ্ট্রে বিভিন্ন সামাজিক বর্গের মাঝে অসাম্য প্রতিষ্ঠিত আছে, সেক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিকতারই পরিচয় হবে পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীগুলোর জন্য সংরক্ষিত সুযোগের ব্যবস্থা করে এই বৈষম্য দূর করা। নারীকোটা, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোটা তাই অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। এই কোটার বিরুদ্ধে কোন আপত্তিকে গূরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।

২. মোটা দাগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নামে যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অধিকাংশের মূল আপত্তি সেখানেই। এই কোটার পরিমানটা অস্বাভাবিক বেশি, এবং এটা বৈষম্য ও দুর্নীতির হাতিয়ার হয়, এই বক্তব্যটি অজস্রবার শোনা গেছে, এর মাঝে সন্দেহাতীতভাবেই সত্যতাও আছে। ‘দেশকে ভালোবেসে যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই চাকরির জন্য যুদ্ধ করতে নামেননি’ কোটা বিরোধীরা যেমন এই যুক্তি তুলছেন, তেমনি কোটার পক্ষেও যুক্তি আছে: এই সুবিধার ব্যবস্থা করে ভবিষ্যতেও দেশের সঙ্কটে ঝাঁপিয়ে পড়তেই ভবিষ্যতের নাগরিকদের উৎসাহ দেয়া হয়।
আমি দ্বিতীয় যুক্তির পক্ষে, দেশের জন্য যারা প্রাণ দিতে পিছ পা হননি, তাদের সর্বোচ্চ উপায়ে সন্মান জানানো দেশের কর্তব্য। কিন্তু এই বিপুল পরিমান সংরক্ষিত আসন বর্তমানের আর সব শিক্ষার্থীদের মাঝে যে বঞ্চনা আর বৈষম্যের বোধ তৈরি করছে, সেটার রাজনৈতিক গূরুত্বও কম না। এই কোটা যদি ৫ বা ১০ ভাগ হতো, মনে হয় না খুব বেশি আপত্তি কেউ করতো। কিন্তু তিরিশ ভাগ চাকরি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মান দেখানো হয় না, বরং বাকিদের বঞ্চনার বোধ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধই করে।

এই কোটা শুধু যে কমিয়ে আনা উচিত, তাই নয়। যে কোন মুক্তিযোদ্ধা কেন সন্তানের জন্য এই কোটার সুবিধা পাবেন? মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে যেমন দুস্থরা আছেন, আছেন উচ্চবিত্ত মুক্তিযোদ্ধা। আছেন কৃষক কিংবা মাঝারি ব্যবসায়ি মুক্তিযোদ্ধা। এই সংরক্ষণের সুযোগটা সীমিত রাখা উচিত কেবলমাত্র পঙ্গু, দুস্থ, নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই, বাকি মুক্তিযোদ্ধারা আর্থিক নয়, এমন সকল রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক সুবিধা ও সন্মান পাবেন। এই মানদণ্ডটি নিখুঁত করা সম্ভব না, কিন্তু অনিখুঁত বাস্তবতায় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা মাপকাঠি তৈরি করাটা খুব অসম্ভবও না। এই বিবেচনায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা এই সুবিধা পাবেন না।

৩. ‘মেধাবী’ শব্দটার ব্যবহার নিয়ে সম্ভবত একটা ব্যাপক হুজ্জত তৈরি হয়েছে। কোটা পদ্ধতি বাতিলকারীরা নিজেদের ‘মেধাবী’ পরিচয় দিচ্ছেন বলে সরকারী চাকরি-আকাঙ্ক্ষী নন, এমন ব্যক্তিদের ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপের বন্যা লক্ষ্যণীয়। কিন্তু এইখানে মেধাবী শব্দটা দিয়ে বুদ্ধিজীবী সুলভ বিষয় দক্ষতা বা ইত্যাদি আর কিছুকে বোঝান হয়নি, কেবলমাত্র বোঝানো হয়েছে একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে কেউ উত্তীর্ন হয়েছেন। সেই মানদণ্ড আরেকজনের কিংবা স্বয়ং উত্তীর্ণ ব্যক্তিরও সন্তোষজনক না মনে হতে পারে, সেটা নিয়ে সমালোচনা বা সেটা বদলাবার আন্দোলন হতে পারে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যখন মেধাক্রম আর কোটা এই দুটি ফারাক তৈরি করছে, মেধাক্রম অনুযায়ী তারা ব্যকরণসম্মতভাবেই মেধাবী। এটাকে উত্তীর্ণদের তালিকা হিসেবে অভিহিত করলে বরং শব্দ বা পরিভাষাগত এই ঝামেলা এড়ানো যেতো। কিন্তু যে অভিধার জন্য তারা দায়ি নন, সেই পরিভাষার ব্যবহার নিয়ে তামাশা করে বুদ্ধিবৃত্তিক জীবিকার সাথে যুক্ত অনেকেই তাদের মেধার যথাযথ পরিচয় দেননি।

৪. অনেক দিন ধরেই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা শুধু না, অনেক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানও সরকারী চাকরিতে ততটা আগ্রহী নন। বেসরকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং বিদেশী সংস্থাগুলোই তাদের কাছে আকর্ষণীয়। এর বাইরে বিপুল চাকরির যোগান দিচ্ছে গণমাধ্যমগুলো। এবং এটাও দৃশ্যমান যে, সরকারী চাকরির বেতনের তুলনায় এই খাতগুলোতে বেতন অনেক অনেক বেশি। কোন সন্দেহ নেই সরকারী চাকরিতে বহু স্থলে অন্য উপরি আয়, পেশাগত নিরাপত্তা এবং অবসরকালীন সুবিধা এখনও মধ্যবিত্তের কোন কোন অংশের কাছে আকর্ষণীয়। তারপরও বিসিএস পরীক্ষার্থীদের বড় অংশই ধনী এবং উচ্চমধ্যবিত্ত নন, এমনকি স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশও বেসরকারী চাকরিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। এমনকি নিন্মবিত্ত ও মফস্বলের মধ্যবিত্ত কোন কোন পরিবারের সন্তানদেরও দেখা যাবে নিরাপদ কিন্তু কম বেতনের সরকারী চাকরির তুলনায় আর সব সম্ভাবনাকে বেশি গূরুত্ব দিতে।
আরেক ধরনের পেশা বা জীবনদৃষ্টিভঙ্গী অর্জনজনিত সুবিধাজনক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে এই নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উপহাস করাটা পুরোপুরি রুচিকর ঠেকেনি। যারা পাঠাগারে গিয়ে বিসিএসের প্রশ্নোত্তর মুখস্ত করে, তাদের নিয়ে উপহাস করছেন সাংস্কৃতিক তৎপরতার সাথে যুক্ত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা মধ্যবিত্ত! কিন্তু বিসিএসের পরীক্ষা পদ্ধতি এমন হাস্যকর কেন হবে, সেই দোষ এই তোতাপাখীর মত মুখস্ত করা শিক্ষার্থীদের না। মাত্র এক প্রজন্ম আগেও সরকারী চাকরি এত আকর্ষণী ছিল যে তুলনামূকভাবে সপ্রতিভ এবং বিখ্যাত শিক্ষার্থীরা সেই চেষ্টাই করতেন। এই্ উপহাস এবং তাচ্ছিল্যের মাঝে একটা প্রবল সুবিধাজনক অস্থানের অহমের প্রকাশ আছে, হোক সেটা পারিবারিক কিংবা অর্জিত দক্ষতার। সরকারি চাকরি নিয়ে উপহাস তারা করতে পারেন, সেটা ব্যক্তিগত অভিরুচি, কিন্তু যাদেরকে ওই জীবনটা যাপন করতে হবে কিংবা তারা সেটা যাপন করতে ইচ্ছুক, তারা নিজেদের পেশাগত ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নিয়োগ পদ্ধতির জন্য দাবি করলে সেই আন্দোলন নিয়ে উপহাস করাটা অসঙ্গত হবে।

৫. কোটা ব্যবস্থা যদি গ্রহণযোগ্য হয় (আমার কাছে তা গ্রহণযোগ্য), সেটা সরকারী এবং বেসরকারী সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কেন একটা গণমাধ্যম মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মান করবে না? আদিবাসীদের? কিংবা নারীদের পশ্চাৎপদ পরিস্থিতিতে কেন মূল্যায়ন করা হবে না? একটা নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে বড় এবং পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয় এমন সকল প্রতিষ্ঠানেই একটা নিয়ম বেঁধে দেয়া উচিত যে এই সীমিত সংখ্যক পদ এই এই এই সুবিধাবঞ্চিত অংশের জন্য রাখতে ওই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ বাধ্য থাকবে। সেক্ষেত্রে সরকারী সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর অনগ্রসররা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকবেন না, কিন্তু কাঙ্খিত বৈষম্য দূর হওয়ার গতি বৃদ্ধি পাবে।

৬. ভারতে অনেক বেশি সংরক্ষণ আছে, তারা পারলে আমাদের এখানে কি সমস্যা? ভারতে কোটার পরিমান অনেক বেশি, কিন্তু খেয়াল রাখবেন সেটা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরপুরুষদের জন্য নয়, বরং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী ও দলিত শ্রেণীর জন্য বরাদ্দ থাকে। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতে উচ্চবর্ণের গুটিকয় সম্প্রদায়ের হাতে সরকারি চাকরির বিরাট অংশ, বাণিজ্য এবং উৎপাদনেরও বড় অংশ তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এই অবস্থার অবসানের জন্যই সেখানে সংরক্ষন পদ্ধতির বেশি প্রয়োজন পড়েছে। আমলাতন্ত্রের প্রাত্যিহিক কাজ কর্ম সম্পাদন করার জন্য বিরাট কোন সৃজনশীল প্রতিভার তো আসলে প্রয়োজন নেই, কিন্তু এই সংরক্ষন কিছুটা হলেও সামাজিক বৈষম্য ঘুচিয়ে অচলায়তন ভেঙেছে। যদিও প্রবল ব্রাহ্মণ্য আক্রমণ ও প্রতিরোধের মুখে এই সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য অনেকখানিই বাধাগ্রস্ত কিংবা বিপর্যস্ত হয়েছে।

৭. আমলাদের চাকরির মেধাক্রম-সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়া আমাদের ভাবার দরকারটা কি? মরুক আমলাতন্ত্র! আমলাতন্ত্র দেশের কি কাজে লাগে? এমন ‘বিপ্লবী’ ভাবনাও বিরল নয়। তবে এই ভাবনটা প্রায় শিশুর মত সরল। যতক্ষণ না বিপরীত কোন ব্যব্স্থা কায়েম করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অসঙ্গতিগুলো আছে, সেগুলো দূর করার সংগ্রাম করতেই হবে। কিভাবে একটা বিপ্লব করবেন যদি না সচিবালয়েরও সারিগুলো ভেঙে শ্রমিকের কাতারে অংশ নেয়? জনগণের যে কোন অংশের মাঝে যখন যেভাবে কোন প্রশ্ন কিংবা কোন দ্বন্দ্ব উপস্থিত হচ্ছে, আপনার কর্তব্য হলো সেখানে ন্যায্যতরের পক্ষে যাওয়া, এবং এভাবে আপনি শুধু তাদেরই সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জন করবেন না, জনগণের আর সব অংশও আপনাকে ভালবাসতে এবং বিশ্বাস করতে শিখবে।

৮. বরং আরও প্রগতিশীর সংরক্ষণের জন্য লড়াই করা উচিত। চেষ্টা করা উচিত যেন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরের বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ-দশ ভাগ বাড়তি আসন রাখা হয়, তাদের জন্য সরকারি চাকরিতেও তেমনি একটি বরাদ্দ যেন থাকে। কারণটা খুব সহজ, প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম ভগ্নাংশ পরিমানে জনজীবন থেকে উঠে না আসে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পুরো প্রকৌশল শিক্ষাই আসলে বরবাদ হয়ে ব্যক্তিগত অর্জনের ঘটনা হযে দাঁড়াবে। আমলাতন্ত্রের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত সংরক্ষণের সামান্য অংশ বাস্তবে ব্যবহৃত হয়, অবিলম্বে এর প্রতিকারের উদ্যোগ নেয়া দরকার।

৯. শিবির ঢুকে পড়েছে আন্দোলনে! খুবই সত্যি, কিন্তু প্রগতিশীলদেরই তো উচিৎ ছিলো শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভকে ধারণ করতে পারার। শিবির ঢুকেছে, মুক্তিযুদ্ধকে অপমানসূচক শ্লোগান দিয়েছে, নাশকতা করেছে– এই্ সব কিছুই অসম্ভব হতো যদি তারা আগে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাদের নেতৃত্ব শিক্ষার্থী-নিয়োগকর্তা সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান আনতে পারতো। শিক্ষার্থীদের এই্ ক্ষোভ বহুবছর ধরেই নানান ভাবে উদ্‌গীরিত হয়েছে, প্রতি বছরই বিশেষ করে শিবির এই ইস্যুটাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। বরং উল্টো দিক দিয়ে, প্রগতিশীলরা এই আন্দোলন প্রশ্নে দ্বিধা দেখানোতে এবং শিবিরের ইন্ধনই আন্দোলনে একমাত্র সংগঠিত শক্তি থাকাতে এই আন্দোলন সফল হয়নি, উপরন্তু ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ভাবনা নারী, আদিবাসী প্রভৃতি জরুরি সংরক্ষণের বিরুদ্ধেও বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। প্রগতিশীল তাদের উচিত হবে দ্রুতই একটা গ্রহণযোগ্য লিখিত প্রস্তাব নিয়ে আন্দোলন শুরু করা, সেটা শুধু চাকরির সংরক্ষণ না, নিয়োগ পদ্ধতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া, ভাইভার স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি নিয়েও রূপরেখা প্রদান করবে। আর সব কোটা যেমন আরও বৃদ্ধি করা উচিত, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ করা উচিত, তেমনি মুক্তিযোদ্ধা আসনএর পরিমান বিষয়ে তারা একটা গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব তৈরি করলে সেটাকে বাস্তবায়ন করে বাকিদের ক্ষোভ নিরসন সম্ভব হবে।

১০. ভারতবর্ষে ঐতিহাসিকভাবেই সংরক্ষন সুবিধার প্রশ্ন কিন্তু জাতীয় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছে বহুবার। উৎপাদনশীর খাত দুর্বল থাকায় সরকারি চাকরি বিপুল সংখ্যক তরুণের জীবীকার স্বপ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে, আবুল কাশেম ফজলুক হকদের উত্থানের একটা বড় কারণ ছিল অনগ্রসর মুসলমানদের জন্য সুনিশ্চিত চাকরির ব্যবস্থা করা। ফজলুক হক তুলনামূলকভাবে অসাম্প্রদায়িকই ছিলেন, মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য একেবারে সংরক্ষিত রাষ্ট্র বানাবার পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে পুরোপুরি তাল মেলাতে না পেরে তার সিংহাসন হরিয়েছিলেন। কিন্তু ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত আসন আজকে উল্টোভাবে আওয়ামী রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলে সেটা মুক্তিযুদ্ধের নগদ স্বার্থজীবি রাজনৈতিক এলিট (আওয়ামী লীগ) ও তার মাধ্যমে চাকরির কোটারি স্বার্থজীবীদের একটা আঁতাত বাকি জনগোষ্ঠীকে, যারা চাকরি পাচ্ছে সেই ৭০ ভাগ এবং যারা চাকরি পায়নি, তাদেরকে বিক্ষুদ্ধ করবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনার প্রতি। বস্তুত বাকি সব ক্ষেত্রেই কোন না কোন ভাবে আওয়ামী লীগ এভাবেই ৭২ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়াশীলদের উত্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রগতিশীলরাও এই ধরনের মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে।

১১. কিন্তু রাষ্ট্র তো সুবিধাভোগীদেরই সুবিধা করে দেবে, এটাই স্বাভাবিক! স্বাভাবিক, কিন্তু এই স্বাভাবিকত্বকে যতবেশি প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পারবেন, নতুন স্বাভাবিকতার শর্ত তৈরি করতে পারবেন, তত বেশি করে এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই নতুন স্বাভাবিক নীতি এবং স্বপ্ন তৈরি হবে। মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে একজন যথাযথ ভ্যানগার্ড তৈরি করতে হলে বহু শত সমর্থক্‌ই সেই প্রক্রিয়ায় আগে নির্মাণ করতে হবে।

ফিরোজ আহমেদ : কেন্দ্রীয় নেতা, গণসংহতি আন্দোলন
সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *