কায়রো থেকে ফিরেঃ গৃহযুদ্ধের পথে অগ্নিগর্ভ মিশর

এক বছর বয়সী মৌলবাদী মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় টেকনোক্র্যাটদের দ্বারা গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সকল প্রগতিশীল বিরোধী দলের মোর্চা ‘৩০ জুন ফ্রন্ট’। গত ২৬ জুন তরুণ ‘তামারদ’রা (বিদ্রোহী) আন্দোলনরত সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভেতর সমন্বয়ের জন্য ‘৩০ জুন ফ্রন্ট’ গঠন করে আগামী ছয় মাসের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। আন্দোলনকারী দলগুলো গত কয়েক মাস ধরে দেড় কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে ৩০ জুন তাহরির স্কোয়ারে প্রেসিডেন্ট মুরসির পদত্যাগের দাবিতে অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশ ঘোষণার জন্য।


এক বছর বয়সী মৌলবাদী মুসলিম ব্রাদারহুড সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় টেকনোক্র্যাটদের দ্বারা গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সকল প্রগতিশীল বিরোধী দলের মোর্চা ‘৩০ জুন ফ্রন্ট’। গত ২৬ জুন তরুণ ‘তামারদ’রা (বিদ্রোহী) আন্দোলনরত সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভেতর সমন্বয়ের জন্য ‘৩০ জুন ফ্রন্ট’ গঠন করে আগামী ছয় মাসের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। আন্দোলনকারী দলগুলো গত কয়েক মাস ধরে দেড় কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে ৩০ জুন তাহরির স্কোয়ারে প্রেসিডেন্ট মুরসির পদত্যাগের দাবিতে অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশ ঘোষণার জন্য।

গত এক মাস ধরে রাজধানী কায়রোসহ সমগ্র মিসরে রাজনৈতিক ব্যারোমিটারে পারদের মাত্রা বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর জ্ঞাতিভাই মুসলিম ব্রাদারহুড (এমবি) সরকারের বয়স এক বছর না হতেই এদের বিভিন্ন নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ড ও অপশাসনে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। ২০১১-এর ২৫ জানুয়ারি তাহরির স্কোয়ারে যে তরুণরা মিসরের দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনা করেছিল অত্যন্ত ধূর্ততার সঙ্গে তা আত্মসাৎ করেছে এমবি। বিপ্লবের পর প্রধানত ধর্মনিরপেক্ষ, উদার, গণতান্ত্রিক দলগুলোর অনৈক্যের কারণে এমবি ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ২৫ জানুয়ারি বিপ্লবের আগেই সমমনা ৩০টি মৌলবাদী ধর্মভিত্তিক সালাফি দলকে একত্রিত করে এমবির রাজনৈতিক দল ফ্রিডম এ্যান্ড জাস্টিস পার্টি এক শক্তিশালী মোর্চা গঠন করেছিল। তাহরির স্কোয়ারের তরুণ ফেসবুক প্রজন্ম রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামধারার সমর্থক হলেও স্বৈরাচারী হোসনি মোবারকের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এমবি ও কট্টরপন্থীদের অংশগ্রহণে আপত্তি করেনি। বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিন জোট যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শিকেয় তুলে জামায়াতের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচি দিয়েছিল; একই ভুল করেছে মিসরের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তি। এই ভুলের মাসুল গত এক বছর ধরে তারা কড়ায়-গণ্ডায় শোধ করছে।

মিসরের এই রাজনৈতিক টালমাটালের ভেতর আট দিনের এক ঝটিকা সফরে আমি কায়রো গিয়েছিলাম, ফিরেছি গত ২৩ জুন। কায়রোয় আমার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তাহরির স্কোয়ারের বিপ্লবের তরুণ নায়কদের সঙ্গে, প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ মিডিয়া ব্যক্তিত্বÑ এমনকি চলচ্চিত্র ও টিভি তারকাদের সঙ্গেও। এদের ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের ভ্রাতুষ্পুত্র, রিফর্ম এ্যান্ড জাস্টিস পার্টির চেয়ারম্যান ইসমেত আনোয়ার এল সাদাত, ইউনিয়নিস্ট প্রোগ্রেসিভ পার্টির শীর্ষ নেতা ড. রিফাত এল সাঈদ, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরব লীগের প্রাক্তন মহাসচিব আম্র এম মুসা, ফ্রিডম ইজিপ্ট পার্টির প্রধান আম্র্ হামযাওয়ে, ইজিপ্সিয়ান অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের সভাপতি হাফেজ আবু সায়েদা, রাইটার্স ইউনিয়ন অব ইজিপ্টের সভাপতি মোহামেদ সালমাওয়ে ও প্রেসিডেন্ট মুরসির শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ওসামা ফরিদ। এছাড়া মিসরের সবচেয়ে প্রাচীন দৈনিক ‘ইজিপ্সিয়ান গেজেট’-এর প্রধান সম্পাদক ম্যাগদি কুত্ব্সহ এর সম্পাদকমণ্ডলীর সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে, যা মিসরের সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করেছে।

ভারত, চীন ও মেসোপটেমিয়ার প্রায় সমবয়সী মিসরীয় সভ্যতার বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির কথা আমরা সবাই জানি। ফেরাউনদের নিজস্ব ধর্মের ওপর প্রথম আঘাত এসেছে রোমানদের পক্ষ থেকে। প্রাচীনতম খ্রিস্টান রাজ্য রোমের বাইরে প্রথম যে দেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারিত হয়েছে সেটি হচ্ছে মিসর। কায়রোর সবচেয়ে প্রাচীন সেইন্ট মেরির গির্জা যেখানে প্রতিষ্ঠিত সেখানে স্বয়ং যিশুখ্রিস্ট এসেছিলেন। মুসলমানদের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের (রা.) সময়ে মিসরে মুসলিম সৈন্যবাহিনী প্রবেশ করে। কায়রোর খানে খলিলিতে হোসেন মসজিদে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেনের (রা.) ছিন্নমস্তক সমাহিত হয়েছে। মুসলিম শাসকরা তরবারির জোরে মিসরে ইসলাম প্রচার করতে পারেননি। মিসর জয়ের পর ধর্মপ্রচারের জন্য তাদের একশ’ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আরব সুফীদের দ্বারা মিসর ও উত্তর আফ্রিকায় ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটেছে। প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী হওয়ার কারণে মিসরের সনাতন ধর্মের সঙ্গে কপটিক খ্রিস্টান বা মুসলমানদের ভেতর উল্লেখযোগ্য কোন বিরোধ অতীতে কখনও ছিল না। মিসরে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ঘটেছে ১৯২৮ সালে হাসান আল বান্না কর্তৃক ‘ইখওয়ান আল মুসলেমুন’ বা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে মিসরের বুদ্ধিজীবীদের ভেতর বস্তুবাদী দর্শন, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইহজাগতিকতার পক্ষে নবজাগরণ আমরা প্রত্যক্ষ করি বৃটিশ ঔপনিবেশিক কালে। মিসরেই প্রথম মুসলিম বিশ্বের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ‘হিজ্ব্ আলমানি’ (ধর্মনিরপেক্ষ দল) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে। পরে এই দলের নাম পরিবর্তন করে ওয়াফ্দ্ পার্টি রাখা হয়, যেহেতু সেক্যুলারিজমের একটি আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ধর্মহীনতা, অপরটি ‘ইহজাগতিকতা’। ১৯৫২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে গামেল আবদেল নাসের মুসলিম ব্রাদারহুডের পাশাপাশি ওয়াফ্দ্ পার্টিকেও নিষিদ্ধ করেন, যদিও নাসের ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ আরব জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। মুসলিম ব্রাদারহুড (১৯২৮) ও জামায়াতে ইসলামী (১৯৪১) প্রতিষ্ঠার পর মুসলিমপ্রধান দেশসমূহের রাজনৈতিক অঙ্গনে, এমনকি ধর্মীয় ডিসকোর্সেও ধর্মের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার দ্বৈরথ তীব্রতর হয়।

নাসেরের একদলীয় শাসনের সময় ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হলেও প্রশাসনে মুসলিম ব্রাদারহুডের শক্তিশালী অবস্থান নাসের দুর্বল করতে পারেননি। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হওয়ার কারণে নাসেরের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুড সব সময় মার্কিন সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছে। তৎকালীন ইজিপ্সিয়ান সোশ্যালিস্ট পার্টির তরুণ নেতা ছিলেন ড. রিফাত সাঈদ। আলোচনা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছেন, নাসের ক্ষমতায় এসে দল নিষিদ্ধ করে ডান-বাম সবাইকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। সেই সময় ব্রাদারহুডের বিখ্যাত নেতা সাঈদ কুত্বের সঙ্গে তিনি একই জেলে ছিলেন। জেলে কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী হিসেবে রাখা হতো; অথচ সাঈদ কুত্ব্সহ ব্রাদারহুডের নেতারা থাকতেন রাজার হালে। জেলে আসার আগেই সিআইএ-র সঙ্গে ব্রাদারহুডের নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত প্রসারমান কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে মদদ দিয়েছে। সাঈদ কুত্ব্ তার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা সেই সময় জেলে বসে লেখেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ব্রাদারহুডের প্রতি আমেরিকার আশীর্বাদ অব্যাহত রয়েছে।

১৫ জুন যেদিন আমি কায়রো যাই সেদিনের প্রধান খবর ছিল মিসর সিরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের সাহায্য করার কথা ঘোষণা করেছে। মিসরী বন্ধুরা বললেন, বিরোধী দলের ৩০ জুনের অভ্যুত্থানের ঘোষণায় ভীত হয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসি আমেরিকাকে খুশি করবার জন্য আরবস্বার্থবিরোধী এমন ঘোষণা দিয়েছেন। গোটা আরব বিশ্বে একমাত্র সিরিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ বাথ পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমেরিকা যেভাবে আফগানিস্তান ও ইরাকের সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নজিবুল্লাহ সরকার ও সাদ্দাম সরকারকে হটিয়ে পুতুল সরকার ক্ষমতায় বসিয়েছে, একইভাবে তারা এখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে হটাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ইজিপ্সিয়ান গেজেটের সম্পাদক হাতেম খেদ্র্ বলেছেন, সাদ্দাম বা আসাদ যত স্বৈরাচারী হোক না কেন, সে সব দেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কারা তাদের দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। আমেরিকার কোন এখতিয়ার নেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুসলিম বিশ্বে একের পর এক ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের পতন ঘটাবে।

সিরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবার প্রতিদান পেতে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিলম্ব হয়নি। ২৬ তারিখ কায়রোয় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে বলেছেন, তারা চায় ক্ষমতাসীন ব্রাদারহুড সরকার যেন পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারে। আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু কায়রো থেকে ই-মেইলে জানিয়েছেন, আমেরিকান রাষ্ট্রদূত খ্রিস্টান নেতাদের একান্তে বলেছেন, ৩০ জুন তারা যেন রাস্তায় না বেরোয়।

২০০১ সালে বাংলাদেশে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে জামায়াতে ইসলামী যখন ক্ষমতায় এসে হিন্দুনিধন আরম্ভ করেছিল এবং দলে দলে হিন্দুরা ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসার পর গত এক বছরে দৃশ্যমান কোনও হামলা না হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে খ্রিস্টানরা দেশ ছেড়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় চলে যাচ্ছে।

কায়রো অবস্থানের সময় আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন ইজিপ্সিয়ান গেজেটের কলাম লেখক মোহসেন আরিশি। প্রথম দিনই মোহসেনের সঙ্গে কায়রোর প্রাণকেন্দ্র তাহরির স্কোয়ারে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল তাহরির স্কোয়ারের বিপ্লবের এক তরুণ যোদ্ধা মুস্তফা বদ্র্। মুস্তফা জানাল তাদের সঙ্গে তিউনিসিয়া, তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ব্লগ ও ফেসবুকের মাধ্যমে যারা সবাই ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদে বিশ্বাসী। আমি মুস্তফাকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কথা বলেছি। শাহবাগের খবর ওরা ইন্টারনেটে পেয়েছে কিন্তু কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। মুস্তফার বয়স মাত্র একুশ, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বলল, গত বছর ওরা কয়েকজন ‘সেক্যুলার ফ্রন্ট অব ইজিপ্ট’ গঠন করেছে।

তাহরির স্কোয়ারের বড় সড়ক দ্বীপের পাশের রাস্তার উল্টো দিকে এক চা-ওয়ালা চা বিক্রি করছিল। মোহসেনকে বললাম, ওখানে কি কায়রোর বিখ্যাত পুদিনা চা পাওয়া যাবে? মোহসেন বলল, পাওয়া যাবে।

ছোট শামিয়ানার নিচে পুদিনা চা খেতে খেতে চা-ওয়ালার সঙ্গে কথা বললাম। মোহসেন দোভাষীর দায়িত্ব পালন করছিল। চা-ওয়ালার নাম হামদে, বয়স ৪৪, তাহরির স্কোয়ারের অভ্যুত্থানের প্রথম দিন থেকে এখানে চা বিক্রি করছে। হামদের কোন কাজ ছিল না, একেবারেই বেকার। তাহরির স্কোয়ারে লোকজন একত্রিত হচ্ছে দেখে ও ঠিক করল চা বিক্রি করে কিছু আয় করবে। অভ্যুত্থানের সময় বিক্রি ভালই হয়েছে। ১৮ দিনের ঘটনা এখনও ওর চোখের সামনে ভাসে। যেদিন পুলিশ প্রথম গুলি চালাল সেদিন ওর চোখের সামনে মুস্তফার মতো এক তরুণ মাথায় গুলি লেগে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। ওর মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। চা বিক্রি ফেলে রেখে নিজে কোলে করে তরুণের লাশ হাসপাতালে রেখে এসেছে। ফিরে এসে দেখে তখনও রাস্তায় সেই তরুণের মাথার মগজ পড়ে আছে। সেই মগজ এই সড়ক দ্বীপে কবর দিয়েছে হামদে।

কথা বলতে বলতে হামদে উত্তেজিত হয়ে পড়লÑআমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মোবারক হটলে আমাদের অবস্থা ভাল হবে। আড়াই বছর হয়ে গেছে, অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বাড়িতে চার ছেলে বেকার। দু’বেলা ঠিকমতো খাবার জোটে না। মুরসির বিরুদ্ধে দেড় কোটি গণস্বাক্ষরকারীদের ভেতর হামদেও আছে। বলল, এবারের বিপ্লব সফল হবেই। হামদে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ৩০ জুনের জন্য।

হামদের সঙ্গে কথা বলার সময় কয়েকজন পথচারী দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। ওদের ভেতর একজন ছিলেন বয়স্ক মহিলা, কালো প্যান্ট ও কুর্তা পরনে, চেহারায় দারিদ্র্যের ছাপ। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। প্রথমে ভাঙা ইংরেজি পরে একনাগাড়ে মিসরী আরবিতে বলে গেলেন ৭০ বছরের উম্মে সাঈদা। তিনিও ছিলেন তাহরির স্কোয়ারের অভ্যুত্থানে। এখনও রোজ আসেন। সামরিক বাহিনীতে লে. কর্নেল ছিলেন। অবসরের পর রাজনৈতিক প্রচারকের কাজ করছেন। তার এক ছেলে ডাক্তার, আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার, লুক্সরে থাকে, দু’জনই বেকার। উম্মে সালমা বললেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য না হলে চাকরি পাওয়া যাবে না, ব্যবসা করা যাবে না। বিদেশে পড়বার জন্য বৃত্তি পাওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে মহিলা কেঁদে ফেললেন।

মোহসেন মহিলাকে জানিয়েছে, আমি বাংলাদেশের সাংবাদিক। বিদায় নেয়ার সময় বললেন, আশা করি আপনি আমাদের কথা লিখবেন। ৩০ জুন মুরসিকে গদি ছাড়তেই হবে। ও যা ভোট পেয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি স্বাক্ষর আমরা সংগ্রহ করেছি। ক্ষমতায় থাকার কোন অধিকার নেই ওর। আমি মহিলার সঙ্গে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালাম, তিনি আমাকে আলিঙ্গন করলেন।

কায়রোর রাস্তায় কোন বয়স্ক মহিলাকে বোরখা বা হিজাব ছাড়া দেখিনি। ফেরার পথে মোহসেনকে জিজ্ঞেস করলাম, মহিলা কি খ্রিস্টান? মোহসেন সায় জানাল, কোন মুসলমান মহিলা অচেনা কাউকে এভাবে আলিঙ্গন করবেন না।

এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম টিভি তারকা শিরীনের সঙ্গে, অধ্যাপক এজ্জাত সফ্র্রে গ্রামের বাড়িতে। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলা উচিত। সেখানে এক টিভি সিরিয়ালের শূটিং চলছিল। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রাক্তন অধ্যাপক এজ্জাতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমাদের রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমানের নৈশভোজে। তার সঙ্গে ছিলেন মিসরের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও উপমন্ত্রী তালাত সেলমি। চলচ্চিত্রে আমার আগ্রহ জেনে এজ্জাত আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে। বললেন, সেখানে অনেক বড় তারকারা শূটিংয়ে থাকেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও টিভি তারকা শিরীন বললেন, আমরা এখন অন্ধকার যুগে বাস করছি। আপনি নিশ্চয় শুনেছেন টেলিভিশনে বেলি ড্যান্স বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কায়রো অপেরা ও ব্যালেও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কোনদিন শুনব বোরখা ছাড়া ছবিতে অভিনয় করা যাবে না।
শিরীনকে জিজ্ঞেস করলাম, কায়রোর রাস্তায় খুব কম মেয়েকেই দেখেছি যাদের মাথায় হিজাব নেই। এমনকি স্কার্ট, প্যান্ট ও টি শার্ট পরা তন্বী, অথচ মাথায় হিজাব। শিরীন বললেন, এটা শুরু হয়েছে আশির দশক থেকে। আপনি আগের চলচ্চিত্র যদি দেখেন কখনও রাস্তাঘাটে এমন হিজাবী নারী দেখবেন না। আমরা এটাকে বলি আমাদের সমাজের ‘এখওয়ানিকরণ’। তাকে বললাম, বাংলাদেশে আমরা বলি ‘পাকিস্তানীকরণ’ বা ‘জামায়াতীকরণ’।

কায়রোয় রাস্তায় রাস্তায় ভাস্কর্য। মোল্লারা দাবি জানিয়েছেন, কোন ভাস্কর্য থাকতে পারবে না। একজন সালাফি মোল্লা বলেছেন, আফগানিস্তানের বায়মিয়ানে যদি বৌদ্ধমূর্তি ভেঙে ফেলা যেতে পারে, আমরা কেন মিসরে পারব না। মোল্লারা ঘোষণা করেছেনÑ মিসরে পিরামিড, স্ফিংস কিছুই থাকবে না। পিরামিড ও স্ফিংস ভাঙা যে উচিত হবে না এ বিষয়ে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড শেখ ইতোমধ্যে ফতোয়া দিয়েছেন। সালাফিরা বলছেন, এগুলো পৌত্তলিকতা; মুসলিম রাষ্ট্রে এসব পৌত্তলিকতা চলবে না।

মানবাধিকার কমিশনের সভাপতিসহ রাজনৈতিক নেতারাও মিসরীয় সমাজের মৌলবাদীকরণ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মাত্র এক বছরের এমবি শাসনে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই শুধু বাড়েনি, মিসরের কয়েক হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হুমকির মুখে। গত বছর নতুন যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে সেখানে ইব্রাহিমীয় তিনটি ধর্মÑ ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ছাড়া বাকি সব ধর্মচর্চা মিসরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি এবং অধ্যাপক আম্র্ হামযাওয়ে বলেন, তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সকল ধর্মের অনুসারীদের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ।

২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারির বিপ্লবে মিসরে শহীদের সংখ্যা ১৮০০-এর ওপরে। তাহরির স্কোয়ারের উল্টো দিকে প্রাচীরে আঁকা শহীদদের ছবি এখনও জ্বলজ্বল করছে। মুস্তফা বলেছে, ৩০ জুন শহীদের সংখ্যা ১৮ হাজার হতে পারে। মৌলবাদীদের ছাড় দিয়ে আমরা বার বার ভুল করেছি। এবার আর কোনও ভুল হবে না।

মোহসেনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তোমরাই বলেছ ব্রাদারহুড অত্যন্ত সংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল। পক্ষান্তরে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তি বহুধাবিভক্ত, কোনও অবিসংবাদী নেতা নেই বিরোধী দলে। তোমরা কীভাবে দাঁড়াবে মুরসির বিরুদ্ধে?’

মোহসেন বলল, তুমি তো সব রকমের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছ। দেখেছ তো মানুষের ক্ষোভ কোথায় গিয়েছে পৌঁছেছে। নেতৃত্ব আন্দোলনের ভেতর থেকেই উঠে আসবে। ওরা যত আঘাত করবে আমাদের ঐক্য তত দৃঢ় হবে। রাষ্ট্রদূতের নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট মুরসির উপদেষ্টা শিল্পপতি ওবামা ফরিদ বললেন, বিরোধী দল যত হম্বিতম্বি করুক কিছুই করতে পারবে না। আপনি বোধহয় শোনেননি, শুধু মুরসিকে রক্ষার জন্য এক লক্ষ সদস্যের আত্মহত্যা ব্রিগেড তৈরি হয়েছে। ব্রাদারহুডকে হটানো এত সহজ নয়। মোহসেন বলেছে, দরকার হলে আমরা সশস্ত্র বাহিনীকে বলব ক্ষমতা গ্রহণের জন্য। মৌলবাদীদের চেয়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অনেক দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে পারবে। মিসরের সশস্ত্র বাহিনী তুরস্ক ও আলজেরিয়ার মতো ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে।

তাহরির স্কোয়ারে বৃদ্ধা উম্মে সাঈদা অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলেছিলেন, আপনি যদি মিসরের সাধারণ মানুষের বাড়িতে যান সর্বত্র মায়েদের চাপা কান্না দেখতে পাবেন। এভাবে মানুষ বাঁচতে পারে না। তৃতীয় বিপ্লব আমরা ব্যর্থ হতে দেব না।

মিসরের মানুষ ৩০ জুন যে বিপ্লবী আন্দোলন আরম্ভ করতে যাচ্ছে তার বিজয় দেখার জন্য কত দিন অপেক্ষা করতে হবে জানি না। মৌলবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তি স্ব স্ব অবস্থানে অনড়। তাহরির স্কোয়ারে ২৮ জুন থেকে মানুষ সমবেত হচ্ছে। ১০ কিলোমিটার দূরে নাসের স্কোয়ারে অবস্থান নিয়েছে মৌলবাদীরা। আমার উদ্বেগের বিষয় হচ্ছেÑ মৌলবাদী দানবের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার জয়ের জন্য মিসরের বন্ধুদের আর কত মূল্য দিতে হবে!

১৩ thoughts on “কায়রো থেকে ফিরেঃ গৃহযুদ্ধের পথে অগ্নিগর্ভ মিশর

  1. চমৎকার এই লেখাটি পড়ে অনেক
    চমৎকার এই লেখাটি পড়ে অনেক কিছুই শেখার আছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই মৌলবাদ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হাত ধরাধরি করে চলে। মিশরেও দেখছি তাই। বাংলাদেশেও একই অবস্থা হবে যদি না আমরা এখনই ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের বিভক্তিই ওদের শক্তি।
    শাহরিয়ার কবির স্যারকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা আপন অভিজ্ঞতার আলোকে এতো চমৎকার একটি পোস্ট ইস্টিশনে শেয়ার করার জন্য।

  2. অসাধারন একটি লেখা
    অসাধারন একটি লেখা

    মৌলবাদীদের ছাড় দিয়ে আমরাও বার বার ভুল করেছি। এবার আর ছাড় দেওয়া যাবে না ।

  3. মিশরে আবার আন্দোলন শুরু হয়ে
    মিশরে আবার আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। মিশরীয় আর্মি প্রধান মুরসিকে অলরেডি আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছেন জনগণের দাবী মেনে নেওয়ার জন্য।

    এতো চমৎকার একটি পোস্টে মন্তব্য খরা দেখে ব্যথিত হলাম। :ভাঙামন:

  4. মিশরীয় রা বুজল কিন্তু আমাদের
    মিশরীয় রা বুজল কিন্তু আমাদের বাংলার মানুষ এখনো মৌলবাদীদের চিনতে পারল না!
    একজন সালাফি মোল্লা বলেছেন,
    আফগানিস্তানের
    বায়মিয়ানে যদি বৌদ্ধমূর্তি ভেঙে ফেলা যেতে পারে,
    আমরা কেন মিসরে পারব না। ??? কত ভয়ঙ্কর মৌলবাদী চর্চা!

  5. চমৎকার একটি লেখা।
    আলতু ফালতু

    চমৎকার একটি লেখা।
    আলতু ফালতু বিষয় নিয়ে ব্লগে ক্যাচালের কোন শেষ নাই। অথচ ইস্টিশন কর্তৃপক্ষের সুবাদে শাহরিয়ার কবিরের মত একজন গুনীজনের লেখা আমরা পড়তে পারছি। এই পোস্টে মন্তব্যের খরা দেখে বুঝা গেল ইস্টিশনের বাচ্চা ছেলেরা আড্ডা দিতেই ব্লগে আসে। আপসুস।

    শেয়ার দিলাম পোস্টটি। শাহরিয়ার কবির সাহেবকে স্যালুট এমন একটি লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রাক্কালে এই লেখাটা আমাদেরকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ দেয়। ম্যাসেজটা ধরতে পারাটাই বড় কথা।

  6. অসাধারন একটা লেখা
    আজ প্রায়

    অসাধারন একটা লেখা
    আজ প্রায় সারাদিন খবর দেখলাম।
    মিসরের খবর।
    মন ভাল নাই…
    বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…

  7. মুসলিম ব্রাদারহুড আর
    মুসলিম ব্রাদারহুড আর জামাত-শিবির যে একই রসুনের কোয়া সেটা প্রমাণ হয় বাঁশেরকেল্লায় ছাগুদের হাহাকার দেখে-

  8. ব্রাদারহুডকে বাই বাই বলা
    ব্রাদারহুডকে বাই বাই বলা হয়েছে । কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে মিশর কি সামরিক পথে হাটবে নাকি আবার গণতন্ত্র নামক বিষবৃক্ষের নিচে অবস্থান করবে ?

    1. ইসলামিক কান্ট্রিগুলো এখন তিলে
      ইসলামিক কান্ট্রিগুলো এখন তিলে তিলে ধর্ষিত হবে। তারপর মানুষ বিভিন্ন তন্ত্রেমন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে সমবন্টনতন্ত্রের দিকে ধাবিত হবে। পুঁজিবাদ সমগ্র বিশ্বে এখন হাহাকারের নাম। গনতন্ত্র জিনিসটা পুঁজির বিকাশে একটা সহায়ক তন্ত্র মাত্র!

  9. চমৎকার লেখা।
    মোল্লাতন্ত্র

    চমৎকার লেখা। :-bd
    মোল্লাতন্ত্র কখনই গনতন্ত্রকে পরাজিত করতে পারে না।

    জংলী আইন জঙ্গলে মানায় ,
    আর সৌদী আইন সৌদীতে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *