অলীক কথোপকথন

ঘুমটা হঠাতই ভেঙে গেলো। ডান হাতটার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকবে, অনুভুত হচ্ছে না। একটু চেষ্টা করতেই শরীরের নীচে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলো। ঝাঁঝাঁ করে জ্বলুনি হতে শুরু করেছে, প্রাণ ছুটতে শুরু করলো জীবন্ত কোন আত্মায় যেন! বড্ড তেষ্টা পেয়েছে আবীরের। অদিতিকে কি পানির গ্লাসটা দিতে বলবে? উঁহু, মেয়েটা ঘুমুচ্ছে সম্ভবত। ওকে কি কখনও বলা হয়েছে ঘুমানোর সময় চাঁদের আলো পড়ে তার মুখটা কতো সুন্দর দেখায়? কতো রাত জেগে জেগে তার চোখমুখে এসে পড়া অবাধ্য এলোচুল গুনেছি তা সে কোনদিন ঘুণাক্ষরেও জানতে পারবে না! বেশ সংকোচ হয় এসব বলতে, এতো আপন কাউকে লুকিয়ে দেখার মাঝে আনন্দ যেমন রয়েছে, রয়েছে অস্বস্তিও। যার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় বিনা অনুমতিতে, তার দিকে লুকিয়ে তাকানোর ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন বলেই হয়ত এ রকম অনুভূতি হয়। তেষ্টা বাড়ছে, পাশ না ফিরেই বলে উঠলো আবীর, ‘অদিতি! জেগে রয়েছ?’ অদিতি নিরুত্তর দেখে মুচকি হাসল আবীর, বিড়বিড় করে বলল, ‘যা কখনও বলতে পারিনা, সে সব বলি তাহলে? তুমি ঘুমাচ্ছ, কিছুই শুনতে পারবে না, কিন্তু সে তো আমার দোষ নয়! আমি তো বলছি! তুমি কি জানো তোমার এতো আপত্তি সত্ত্বেও কেন পর্দা মেলে দিয়ে ঘুমাই?’ আপনমনে উত্তর দিলো আবীর, ‘তোমার ধারনাও নেই পূর্ণিমার আলো চুইয়ে চুইয়ে যখন তোমার গালে এসে পড়ে, সে প্রতিফলনে তাকিয়েই একটা জীবন পার করে দেয়া যায়! আর তোমার চুলে এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস রয়েছে জানো? কতোবার অযথা কাছাকাছি হয়েছি শুধুমাত্র চুলের গন্ধ নিতে, তার হিসেব আমি সত্যিই দিতে পারবো না প্রিয়তমা।’ চোখে জল এসে গেলো আবীরের কথা বলতে বলতেই। কিন্তু মুছতে ইচ্ছে করছে না একদমই।

অদিতি জেগে থাকলে অবশ্য কাঁধের উপরে মাথা রেখে হাঁসতে শুরু করতো! এসব ন্যাকামি ও একদমই পছন্দ করেনা। খুব লজ্জা পায়, ফ্লারট করতে গেলে কান চেপে চোখ বন্ধ করে মুখটা বিকৃত করে নেয়! অদ্ভুত মেয়ে!! কি যে অপূর্ব লাগে ওকে, ওর গালে নিখুঁত একটা টোল পড়ে তখন… তখন ইচ্ছে করে স্পর্শ করতে, কিন্তু সে সময়ে অদিতি হয়ে যায় লজ্জাবতী গাছের মতো। লজ্জাবতীর পাতাগুলো দেখলেই ছুঁয়ে দেয় আবীর, কিন্তু অদিতিকে তখন অবাক হয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা তার। প্রচণ্ড সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে হয় না। অপূর্ব চাঁদ, বিস্তৃত আকাশ, তারকারাজি কিংবা অস্তগামী সূর্যকে ছুঁয়ে দেবার আনন্দ কতোটুকু আবীরের জানা নেই, তবে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকার অসামান্য অনুভূতির সাথে কোন কিছুরই তুলনা করতে ইচ্ছে হয়না তার। অদিতি যেন ঠিক তেমনই! ‘না, কোথাও একটু ভুল হচ্ছে, অদিতি তার থেকেও বেশী কিছু… সে অতুলনীয়, কারণ সে একান্তই আমার!! সে একমাত্র সৃষ্ট দেবী যা শুধু আমাতেই বিসর্জিত, আর আমি সে সৃষ্টির মুগ্ধতায় কৃতজ্ঞ একমাত্র পূজারী। আমার প্রার্থনা তুমি, প্রার্থনা তোমার কাছে।’ অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো আবীর, এতো কথা বলতে জানে সে! অথচ অদিতির সামনে কেন বলতে পারেনা? কেন নীরব অভিনয়ে, শব্দহীনতায় বুঝে নেবার আকুলতা? হয়ত এটাই সৌন্দর্য এই আত্মা’দুটির, কিছু নীরব অথচ আকুল অনুভূতি!

‘অদিতি তোমার মনে আছে একবার তোমার পছন্দের শার্টটা না কিনে নিজের পছন্দে কেনায় কি অভিমানটাই না করেছিলে! সে ঠোঁট ফুলিয়ে-বাঁকিয়ে একদম যাতা অবস্থা! কিছুতেই বুঝাতে পারছিলামনা তোমাকে। চন্দ্রগ্রহণ হলে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয় কেন জানো? গ্রহণ কুৎসিত বলে নয়, তার আড়ালে মুগ্ধতা নিয়ে চন্দ্রদেবী লুকিয়ে থাকে বলেই এতো আগ্রহ। তোমার এরকম অভিমানগুলো ঠিক সেরকম। তবে তা ছিল কচুপাতার পানির মতোই ক্ষণস্থায়ী, পাশে গিয়ে বসে তাকিয়ে রইলাম তোমার দিকে। বাঁকানো ঠোঁট কতো সুন্দর লাগছে বলেই ফেলেছিলাম সেদিন! রাগ মেশানো অবাক দৃষ্টিতে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম তখন। পরক্ষনেই গলা ছেড়ে হেঁসে যেন চাঁদের গ্রহণটুক এক ঝটকায় সরিয়ে দিলে!’ সেদিন কি পূর্ণিমা ছিল? নাকি অমাবস্যা? ঠিক মনে করতে পারলোনা আবীর।

রাত বিরেতে হাঁটতে বের হবার বায়নাটা অদিতি নিয়মিতই ধরে, আর বের হলেই জোনাকি ধরে দেবার “আদেশ!” সানন্দে রাজি হয়ে নেমে পড়ে আবীর জোনাকি ধরার কাজে। এ কাজে রীতিমতো এক্সপার্ট হয়ে গেছে সে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে জোনাকিগুলোকে হাতে নিয়েই উড়িয়ে দেয় অদিতি। এর মানে কখনও জিজ্ঞেস করে নি আবীর। অদিতি নিজেই আনমনে প্রতিবার বলে উঠেছে, ‘প্রতিটি প্রাণ এক একটি বন্দীশালা, মৃত্যুতে তার মুক্তি। তবে আমার বন্দিত্ব আবীর, মুক্তি আবীরে, তাই আমি মৃত্যুকে প্রতিনিয়ত অভিশাপ দেই, জোনাকিগুলোকে উড়িয়ে দেবার আগে কানে কানে বলে দেই মৃত্যুদেবতাকে গিয়ে বলতে, কতোটা বেশী তোমার সাথে থাকতে ইচ্ছে করে আমার।’ গুনমুগ্ধ শ্রোতা আবীর, তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে অদিতির দিকে। ‘আমি তাহলে তোমার এ খেলায় কে?’ মিষ্টি হেঁসে অদিতি বলে, ‘ভুল বললে পাগল! খেলাটা আমাদের আর আমরাই সব কিছু!’ ‘আচ্ছা সেদিনও কি আকাশ চাঁদ ছিল? নাকি আঁধার কালো ছিল সমস্তটা? কই খেয়াল করা হয়নি তো! তুমি কি দেখেছিলে অদিতি? মনে করতে পারো? আমি পারছিনা! পারবো কি করে বলো, আমার চাঁদটা যে হাতের ভাঁজেই ছিল, হৃদয়ে হচ্ছিল স্পন্দিত উপচে পড়া জ্যোৎস্নার!’

তেষ্টাটুক চলে গেছে, তবু গলার ভেতরটা খসখসে হয়ে রয়েছে। উঠতে গিয়ে মনে পড়লো পানি রাখা হয়নি আজ। আবার শুয়ে গেলো আবীর। ‘অদিতি শুনছো? আজ খুব হাঁটতে যেতে ইচ্ছে করছে… বাকিটা কোনদিনই বলতে পারিনি, আজও পারবো না, তুমি তো ঘুমুচ্ছো প্রিয়তমা! তবু বলতে ইচ্ছে করছে, তোমার হাত ধরে হাঁটতে ইচ্ছে করছে অদিতি! বলা হয়নি, ওই হাতটা না ধরে এক পা হাঁটার ইচ্ছে নেই আমার, সাহসও নেই। আঁধারে তোমার কালো চোখে না তাকিয়ে সামনে তাকানো আমার জন্যে শুধু অপ্রয়োজনীয় নয় অযৌক্তিকও বটে! তোমার জন্যে জগতের সব জোনাকি একত্র করে দিতে ইচ্ছে হয়, আলোটুকু তোমার গালে মাখিয়ে জোনাকিকে গর্বিত করার বড্ড ইচ্ছে হয় আমার। তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে নিঃসঙ্গ-নিঃশব্দ কোন দ্বীপে, আমাদের নীরবতা যেখানে শত পাখীর কাকলীর কারণ হবে। তোমার রক্তিম পায়ের প্রতিটি পদক্ষেপে কৃষ্ণচুড়া ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে… জানি কিছুই পারবো না। আমি সামান্য বড়, তাই বলা হয়নি তোমায় কোনদিনও। আজও স্বার্থপরের মতো আত্মপ্রসাদ নিতে বকবক করে মরছি আমি।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে শ্বাস ফেললো আবীর। আজ ওর আলাদা লাগছে, ঘরে বিন্দুমাত্র আলো নেই। কিন্তু জানালা গলে কিছুটা আলো তো আসার কথা ছিল। তাকিয়ে অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো, জানালার পর্দা নামানো! এরকম তো কখনও হয় না, উঠে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিলো আবীর। আবছা আলো আসছে বটে, তবে তা অস্পস্টতা কাটায়নি ঘরের। ‘আচ্ছা, আজ কি আকাছে চাঁদ রয়েছে? উঁহু, দেখা যাচ্ছে না তো!’ একটু খেয়াল করতে মেঘেদের আলোকিত একটি দল দেখতে পেলো আবীর। চাঁদটা তাদের সাথে লুকোচুরি খেলায় মেতে রয়েছে! মেঘগুলোকে অসহ্য লাগছে এখন ওর, কিন্তু এটা যে ওদের খেলা! তাতে বাধা দেবার অধিকার কি কারও রয়েছে?

একটু মন খারাপের মতো হলো আবীরের। অদিতির মুখখানা দেখবার বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে। বাতি জ্বালালেই পারে! কিন্তু পারছে না আবীর, যদি ইচ্ছেটা মরে যায় তখন? যদি ঘুম থেকে জেগে ওঠে অদিতি? অপরাধীর মতো চেহারা করে কি বলবে তখন আবীর? অদিতির চোখদুটোই সর্বনাশী! ও চোখে তাকিয়ে কিছুই বলা যায়না, মোহাবিষ্ট করে রাখে, শুধু তাকিয়ে থাকা যায় বিস্মিত! সাধ্য কি ও চোখের সামনে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাবে কেউ? পা টিপে টিপে আবার আগের যায়গায় শুয়ে গেলো আবীর। অদিতি এখনও ঘুমিয়ে, সে যেন আর শেষ হবার নয় মুহূর্তগুলো। আবীরের খুব ইচ্ছে করছে অদিতির হাতটা ছুঁয়ে দিতে, আঁধারে খুঁজে পাবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছে না। হাসল আবীর আপনমনেই, এ ইচ্ছে তার প্রতি রাতেই করে, কিন্তু ছুঁয়ে দেখা হয় না কখনই! তবে আজকের ইচ্ছেটা যেন সব কিছুকেই হার মানাচ্ছে। হাত বাড়ালো আবীর। আঁধারে ঠাহর করতে পারছে না ঠিক, আন্দাজে যেখানে হাত থাকার কথা সেখানে হাতটা রাখতে গেলো আবীর… শূন্য বিছানার স্পর্শ পেলো শুধু, অদিতি ওখানে নেই! প্রচণ্ড হাহাকার করে উঠলো আবীরের সমস্ত সত্তা! ‘কিন্তু তুমি তো এখানেই ছিলে প্রিয়তমা, চাঁদটা এমনই ছিল, ছিল জোনাকির আলোক ইন্দ্রজাল আর তোমার মায়াময়তা!’

চাঁদের আলো শুষে নেয়া মেঘমালা সরে গেলো, বিচ্ছুরিত কোমল আলোয় ঘরটা পূর্ণ হয়ে গেলো। আলোটা ঠিক সেখানে পড়েছে যেখানটায় অদিতি শুয়ে থাকে। টপটপ করে অশ্রু ঝরছে আবীরের দু’গাল বেয়ে, বিড়বিড় করতে লাগলো সে, ‘সেভাবেই জ্যোৎস্না তোমায় খুঁজছে, ভেজাবে বলে আলোক আশীষে। আর আমার চোখদুটো, ঠিক একইভাবে পিপাসায় কাতর, তোমায় দেখবো বলে।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আবীর, এ কি করছে ও! অদিতি, ওর অদিতি… ও তো ঘুমুচ্ছে। তার চোখ দেখা হবেনা, এলোচুল গুঁজে দেয়া হবেনা কানের পাশে – এ হতে পারে না। চাঁদের আলোয় স্নানরত অদিতি অদৃশ্য হতে পারে না, হলে চাঁদের অস্তিত্বও যে অসত্য হয়ে যায়! শুধু খেয়ালী মেয়েটার ঘুমটুকু ভাঙছে না। যখন অনেক শব্দ ছিল, উপলক্ষ ছিল না! আজ উপলক্ষহীন শত উচ্চারণে ম্লান হয়ে এসেছে সকল অনুভূতির প্রকাশ, আবীর লুব্ধকের ন্যায় অবিচল ভেবে চলে। আজও বলা হলোনা, কতোটা ভালোবাসে আবীর অদিতিকে এবং শুধুই অদিতিকে, কতোটা পাগল সে ওই চোখের এক একটি পলকের তরে, তার খানিক আনন্দ কতোটা মুল্যবান আবীরের কাছে! বলা হয়ত আর কোনদিনও হবে না, হৃদয়ের বাসিন্দা যে হৃদয় মাঝে ঘুমিয়ে গেছে! আজ পূর্ণিমা, আবীর আজও দেখছে অদিতিকে অপলক… তবে তার দৃষ্টি অস্পষ্ট… আর্দ্র।

১৭ thoughts on “অলীক কথোপকথন

  1. এক বাক্যে অসাধারণ…………
    এক বাক্যে অসাধারণ………… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. সাহিত্য গুণ সমৃদ্ধ লেখা ।
    সাহিত্য গুণ সমৃদ্ধ লেখা । ভালোবাসা ভর করেছিলো কিছুক্ষন । কিছুক্ষন ছিলাম ভালোবাসায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *