সরকারের কাছে প্রত্যাশা,মঞ্চের কাছে প্রত্যাশা

আওয়ামী লীগ আরেকটা নির্বাচনে হারল।হারার কারণগুলা স্পষ্টই বলা যায়।হলমার্ক,ডেস্টিনি,শেয়ার বাজার,লিমন,রামপাল ইত্যাদি ইত্যাদি।আরও অনেক আছে,এক নিঃশ্বাসে এই কয়টাই মনে পড়ল।রাজাকারের বিচারের মুলা ঝুলায় বেশিদিন পার পাওয়া যাবে না।জনগণ রাজাকারের বিচার চায় এবং নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে চায়,সে ব্যাপারে সন্দেহ নাই।কিন্তু একটা দলের নির্বাচন জেতার জন্য সেটা যথেষ্ট না,৫ সিটি নির্বাচন তার প্রমাণ।আস্তিক-নাস্তিক,হেফাজত ইস্যুও খুব ভালোমতো ব্যবহার করা হয়েছে।এই অবস্থা বজায় থাকলে সরকারের জন্য নির্বাচন জেতা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।কারণ,যতই ৪ দলীয় জোট সরকারের সময় দুর্নীতি হোক,যতই সেসময় জঙ্গিবাদের উত্থান হোক(তখন আমার বয়স দশেরও কম,আমি সবসময় একটা ভয়ে থাকতাম,এই বুঝি বাংলা ভাই বোমা ফুটায় মেরে ফেলল!),সেসব কিছুই এখন যাবে-আসবে না।কারণ,বাঙালীর গোল্ড ফিস মেমোরি।তারা আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দিতে বিএনপি-কে আনবে।কিন্তু বিএনপির আমলে যে দুর্নীতি-সন্ত্রাস কমবে তা না,বরং আরও অনেক বাড়বে।জঙ্গিবাদের রিটার্ন ঘটবে।শফি,সাইদি,গোলাম আযমেরা ছড়ি ঘোরাবে।তারা টিকতে পারবে বলে মনে হয় না।কারণ,বাংলাদেশে বদ লোকেরা কখনো টিকতে পারে নাই।রাজাকারদের টিকার প্রশ্নই আসে না।
সে যাই হোক।আওয়ামী লীগ হারলে এসব ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার যা অবশ্যই ঘটবে,সব রাজাকাররা বের হয়ে যাবে।এই বার বাইর হইলে তাদের বিচার আর হবে বলে মনে হয় না।বাঙালীর প্রাণের দাবী,ন্যায়বিচার তারা আর পাবে না!
এখন সরকারের করনীয় আসলে কি?
সময় খুবই কম।পাঁচ মাস,তবে এই পাঁচ মাসেও জনগণকে বোঝানো সম্ভব যে আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পারছি,আমাদের আবার সুযোগ দেন।সেজন্যঃ
-শেয়ার কেলেঙ্কারি,হলমার্ক,ডেস্টিনি ইত্যাদি বিষয়গুলার কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করেন।যত মানুষের কান্না এই সব কোম্পানিগুলোর নামের সাথে জড়ায় আছে,তাদের ভোট পাওয়ার আশা নাহলে ছাড়তে হবে।যে লোকটা আপনার সরকারের আমলে ফতুর হইছে এবং অপরাধীর কোন বিচার দেখে নাই,সে আপনাকে কেন ভোট দিবে?কয়েকটা রাজাকারের বিচার করতেছেন,তাই?
সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নেন এইসব ক্ষেত্রে,ভোট বাড়তে পারে।
আর হ্যাঁ,পারলে অর্থমন্ত্রী পরিবর্তন করেন।উনার জন্য আর নিজেদের মান ডুবাবেন না!
-পদ্মা সেতু করতে পারেন নাই গুণধর মন্ত্রীদের জন্য।ছয় মাসে সেটা শেষ হবে না,শুরু করেন।যাদের দুর্নীতির জন্য এতদিন লাগল সেতুর কাজ শুরু করতে,তাদের শাস্তি দেন।তাদের দয়া করে আর দেশপ্রেমিক বলবেন না।
রেলের কালো বিড়ালেরও একটা ব্যবস্থা করেন।
-আস্তিক-নাস্তিক ইস্যু অনেক বড় একটা সমস্যায় ফেলছে আপনাদের।এই সমস্যা থেকে বের হওয়া খুব কঠিন।একটা দাড়িওয়ালা,পাঞ্জাবি পড়া লোক যখন কাউকে নাস্তিক বলে,সহজ-সরল বাঙালী সহজেই তা মানে।এজন্য মহাজোটের ব্যাপক ক্যাম্পেইন করা দরকার।মানুষকে বোঝানো দরকার,ব্লগ মানেই নাস্তিক না,লীগ মানেই নাস্তিক না।দেশে ইসলাম বিপন্ন না,ইসলাম ইসলামের জায়গায়ই আছে।ইসলামকে রক্ষা করার মত পরিবেশ সৃষ্টি হয় নাই।
নাহলে কপালে অশেষ দুঃখ আছে!হেফাজত দিয়েই এবার বিএনপি ক্ষমতায় চলে যাবে!
-অবশ্য ক্যাম্পেইন করবেন কিভাবে?দলে ঐক্য নাই!কে কত বেশি খাবে,সেটা নিয়েই মারামারি!ঐক্য গড়েন,ওটা সবচেয়ে বেশি দরকার!অনেক নেতা নাকি এলাকায় যানও না,এগুলা বদলান।
-রাজকারদের বিচার আপনারা শুরু করছেন,আমরা চিরঋণী।কিন্তু শুরু থেকেই শাহরিয়ার কবির স্যার,মুনতাসির মামুন স্যার প্রমুখ বলে আসছেন যে বিচার আরও গতিশীল হওয়া দরকার।ট্রাইব্যুনাল সংখ্যা বাড়ানো দরকার ছিল।কিন্তু তা হয় নাই।এখনও কোন রাজাকারের ফাঁসি হয় নাই।আপীল বিভাগে এসে আটকে আছে।হয়তো আপনাদের টার্ম শেষ হবার আগে একটা-দুটো ফাঁসি হলেও হতে পারে,ভালো কথা।
কিন্তু বিচার পারলে আরও গতিশীল করেন,আপীলের রায় ৬০ দিনের মধ্যে দেওয়ার বিধান করা ছিল।পরবর্তীতে বললেন,”৬০ দিনের বিধান নির্দেশনামূলক!”নির্দেশনামূলক হলেও,বেশি সময় লাগলে সে ব্যাপারে কোন জবাবদিহিতা কি লাগবে না?আসামীপক্ষের আইনজীবীরা অনেক সময় কোর্টেই আসেন না,ফলে কোর্ট বারবার তারিখ দেন।বিচার বাঁধাগ্রস্ত হয়!তাই,ঠিক কতদিন এভাবে সময় ক্ষেপণ করতে দেওয়া হবে আসামী পক্ষকে?
সেসময় প্রজন্মকে ওভাবে ধোঁকা দেয়ার কি মানে ছিল?তখন বলা হয় নি যে ৬০ দিনের বিধান “নির্দেশনামূলক”।
এখন,বাস্তবতা এই যে,আগামী কয়েক মাসে বড়জোড় ২-৩ টা রাজাকারের ফাঁসি হতে পারে।আবার,অবস্থা খুব খারাপ হলে,হয়তো একটাও হবে না!তখন সরকার বলবে,আমাদের আবার নির্বাচিত কর,আমরা বিচার শেষ করব।কিন্তু সেই প্ল্যান কাজে আসছে না।কারণ,৫ সিটি নির্বাচনের একটায়ও সেই কারণে আওয়ামী লীগের জয় হয় নাই।এই প্রজন্ম খুব সম্ভব বারবার সুযোগ দিতে রাজি না,তারা একবার সুযোগ দিয়ে সদিচ্ছার অভাব দেখেছে।সম্ভবত তারা হতাশ।তাই,তাদের ভোট জামাত শিবিরের বাক্সে পড়তে পারে যেটা সবচেয়ে বেশি দুঃখজনক হবে।সেই দুঃখজনক সম্ভাবনা যদি নাকচ করেও দেই,তাহলেও সম্ভবত অনেকে হয়তো হতাশায় ভোটই দেবেন না।ফলে,আওয়ামী লীগ এক বিরাট ভোট ব্যাঙ্ক হারাবে।
তাই,এই বিচারের ব্যাপারে তৎপরতা বাড়ানো সম্ভব হলে খারাপ না।ট্রাইব্যুনাল সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।প্রজন্মকে বুঝান যে,আপনারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ!
-জামাত শিবির নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এখনও কোন পদক্ষেপ নেন নাই।যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আপনাদের কোন হাত না থাকলেও জামাতকে কেবল আপনারাই নিষিদ্ধ করে ফেলতে পারেন।সংসদে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেন নির্বাহী আদেশ দিয়ে।ফলে,তারা আর হরতাল করতে পারবে না,নির্বাচনও করতে পারবে না।
এই কথা সত্য যে,পরবর্তীতে তাদের বৈধতা দেওয়া হতে পারে এই ক্ষেত্রে আবার নির্বাহী আদেশ জারি করে।তাহলে,ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবেও তাদের বিচার হোক।কিন্তু সেটা সময়সাপেক্ষ।এই দেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের দল কেন হরতাল করবে?কেন রাজনীতি করবে?তাই,যেভাবেই হোক,যত দ্রুত সম্ভব এদের নিষিদ্ধ করেন।তাহলে,আপনাদের সবচেয়ে বড় ভরসা,নতুন প্রজন্ম,তারা মনে সাহস পাবে,আশা পাবে,আপনাদের পাশে দাঁড়াবে।
আপনাদের মনে রাখা দরকার,এই প্রজন্মই আপনাদের সবচেয়ে বড় শক্তি,তাদের ন্যায্য দাবী নিয়ে অন্তত খেলবেন না!
-জামাতকে নিষিদ্ধ করলেই হবে না,তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চিরতরে থামানোর জন্য।সেক্ষেত্রেও কোন পদক্ষেপ নাই!বরং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামী ব্যাংকের গুণগান গেয়ে বেড়াচ্ছেন!এসব বন্ধ করেন,জামাতকে থামান।নাহলে একসময় আপনাদেরকেই জামাত বিলীন করে দিবে!
এই গেল বর্তমানে সরকারের কাছে প্রত্যাশা।

এবার আসি কোটি বাঙালীর প্রাণের প্রিয় গণজাগরণ মঞ্চের কাছে প্রত্যাশার ব্যাপারে।
মঞ্চের এবার করণীয় কি?
এই মঞ্চের উৎপত্তির কারণ ছিল রাজাকারদের সুষ্ঠু বিচার।পরবর্তীতে ৬ দফা দেওয়া হয়।সেই ৬ দফার মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আপীল করার সুবিধা ছাড়া তেমন কোন অগ্রগতি নাই।এমনকি সেই আপীলও কাদের মোল্লার মামলায় প্রযোজ্য হবে কি না,সে বিষয়ে জানতে অ্যামিকাস কিউরির মতের অপেক্ষায়।৬০ দিনে রায় আসেই নাই,কবে আসবে তারও কোন ঠিক নাই।এই সরকারের এই আমলে তাই কাদের মোল্লার ফাঁসি হবে বলে মনে হয় না।জামাত নিষিদ্ধের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ দেখি না,এর ,মাঝে আবার শুনলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামাতের দল হিসাবে বিচারের জন্য মামলা করার প্রক্রিয়াও এখন বন্ধ।সরকারের মন্ত্রীরা ইসলামী ব্যাংকের গুণগান করে চলেছেন।তাহলে,বেশ ভালমতোই বোঝা যায়,সরকারের এখন ছয় দফা দাবী পূরণের পরিকল্পনা নাই।মঞ্চের কাছ থেকে তাহলে এখন কেমন পদক্ষেপ আসা উচিত?নিঃসন্দেহে অনেক কঠোর পদক্ষেপের সময় আসছে।সরকারকে বোঝাতে হবে,বাঙালী এবার জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কতটা ঐক্যবদ্ধ।বোঝাতে হবে,মানুষ প্রাণের দাবী ভুলে নাই!
সেক্ষেত্রে মঞ্চের পদক্ষেপ অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।সরকারকে আমাদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য করার মত কোন পদক্ষেপই মঞ্চ নিতে পারে নাই।মঞ্চের এই ব্যাপারটা সরকারকে বুঝায় দিতে হবে,প্রজন্মের দাবির প্রতি আন্তরিক না হলে পরেরবার ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন হবে।মঞ্চের কাছে এক সাধারণ সমর্থক হিসেবে আমি কি প্রত্যাশা করি?:
-মঞ্চ সারাদেশে প্রতিনিধি সভা করতেছে।ভালো কথা।কিন্তু সময় বয়ে যাচ্ছে।তাই,যেখানে যেখানে সভা করা হচ্ছে,সেখানেও কিন্তু মানববন্ধনের মত কর্মসূচি দেওয়া যায়।
-এখন আর কোন প্রশ্নোত্তর পর্বের সময় না।এখন সময় কঠোর আন্দোলনের।রুমি স্কোয়াডের অনশন ভাঙ্গানোর পর অনেক দিন হল।কিন্তু এখনও প্রতীকী অনশনের মত কর্মসূচিও দেখি নাই!এরকম কর্মসূচিই দরকার।প্রথমে প্রতীকী অনশন দিয়ে শুরু করা যাক।তারপর আস্তে আস্তে ধাপে ধাপে কঠোর হতে হবে।পরিস্থিতি যদি এমন দাঁড়ায়,কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।তাহলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা উচিত।

-আরেকটা ব্যাপার মঞ্চের করা উচিত।মঞ্চের সারাদেশে ক্যাম্পেইন করে মানুষকে বোঝানো দরকার যে দেশে ইসলাম বিপন্ন না,আওয়ামী সরকার নাস্তিক না,গণজাগরণ মঞ্চ নাস্তিক না,ব্লগ মানেই নাস্তিক না।এই কাজটা করতে না পারলে সব কিছুই বৃথা হয়ে যাবে।গ্রামের মানুষের ফেসবুক নাই,ব্লগ নাই।তাদের বিভ্রান্ত করা খুব বেশিই সোজা জামাত-হেফাজতের জন্য।
জামাত শিবির এদেশে আর আস্ফালন করার অধিকার রাখে না!তাদের এবারই থামাতে হবে।নাহলে,আর সুযোগ আসতে নাও পারে!তাই,কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষায় থাকলাম,এই অপেক্ষার শেষ দেখতে চাই।

৫ thoughts on “সরকারের কাছে প্রত্যাশা,মঞ্চের কাছে প্রত্যাশা

  1. আপনার চিন্তাশীল লেখা পড়ে ভালো
    আপনার চিন্তাশীল লেখা পড়ে ভালো লাগলো । সবচেয়ে জরুরী বিষয়টা হল – আওয়ামীলীগ কে তার রাজনৈতিক চরিত্র দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে । একি সাথে বামদের সাথে সখ্যতা আবার মৌলবাদীদের সাথে কলাকুলি এসব ধান্দাবাজি লীগ কে ছাড়তে হবে । অন্যদিকে বি এন পি শুরু থেকেই তার ডানপন্থী ভাবধারা ধরে রেখেছে । এবং তারা স্পষ্ট ।
    আসলে জনগণ কে বিভ্রান্তিতে রেখে ক্ষমতায় বারবার যাওয়া যায় না ।

    1. ধন্যবাদ।এবং সেটাই,আওয়ামী লীগ
      ধন্যবাদ।এবং সেটাই,আওয়ামী লীগ মৌলবাদদের সাথে অনেকবারই আপোষ করতে চেয়েছে।তবে,কখনোই তারা লাভবান হয় নি।আওয়ামী লীগের তাদের মূল চেতনায় বিশ্বাস রেখে দেশ থেকে উগ্র মৌলবাদ নির্মূলেই কাজ করা উচিত।তাহলেই সম্ভবত,ভোটের ক্ষেত্রেও তারা লাভবান হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *