বল্টুর মহাকাশ যাত্রা [পর্ব : ৩]

শনির উপগ্রহ টাইটানে যেতে চাইলো ফ্রিয়া। আমারো সেটা দেখার সখ ছিলো খুব। কারণ পৃথিবীতে যে দুষ্প্রাপ্য হীরক, তাতে নাকি পূর্ণ শনির এ চাঁদটি। সুতরাং চোখের পলক না ফিরতেই খপখপ পৌঁছে গেল টাইটানে। কিন্তু নামবো কিভাবে এ গ্রহে আমরা? সব ধারালো আর সুঁচালো চকচকে হীরকে পূর্ণ এর ভূমি। রোদের আলো পড়ে চকচকে আভা তৈরি হয়েছে টাইটানের মাটিতে। যেন চোখ ঝলসে যায়। ফ্রিয়াকে বললাম – নেমে কাম নাই এর মাটিতে। বিষাক্ত হীরাতে হাত পা সব কেটে যাবে। কিন্তু ফ্রিয়া তার পাখায় ভর করে টাইটান আকাশে ভেসে ভেসে আলতো করে একটা বড় হীরকখন্ডের উপর নামলো। স্বয়ংক্রিয় আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে এমন একটা বড় হীরক টুকরো তুলতে চাইলো সে আমাদের হাওদায়। কিন্তু ভরাট গম্ভীর গলায় কে যেন বলে উঠলো – খবরদার কোন জিনিস নেবেনা এখান থেকে। এখানের সব জিনিস এ মাটির সম্পদ! আমি বড় করে বললাম – কে তুমি ভাই? আমাদের সামনে এসো। কিন্তু ঐ অদৃশ্য আওয়াজ আর কোন শব্দ করলো না। ফ্রিয়া এবার ছোট একটা ডায়মন্ড টুকরো হাতে নিয়ে উঠে এলো হাওদায়। এবার কাছে এলো সেই ভরাট কণ্ঠ! ছোঁ মেরে হীরক টুকরোটা ছিনিয়ে নিয়ে বললো – এটা কখনো নিতে পারবে না তোমরা। আমরা কাউকে দেখলাম না। কিন্তু শুনতে পেলাম কারো ভয়ার্ত গুরুগুম্ভীর কথা!
:
অন্ধকার হয়ে আসছে টাইটানে। এখানের পরিবেশ খুব সুখপ্রদ মনে হলোনা আমাদের। এক টুকরো সাধের হীরে আনতে পারলো না ফ্রিয়া। বড়ই কৃপণ এ ভূমির অদৃশ্য বাসিন্দারা। ধিক জানিয়ে আবার উড়াল দিতে বললাম খপখপকে। একটা কুইপার বেল্ট পার হচ্ছি আমরা। আবার নানাবর্ণের বরফ জগৎ। ইচ্ছে হচ্ছে মহাকাশের এ ভাসমান বরফ টুকরোর মাঝে হেঁটে বেড়াই কিছুক্ষণ। কিন্তু পৃথিবী দেখা যাচ্ছেনা এখান থেকে। অন্তত ১৯- লাখ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি আমরা। এখানে যদি হারিয়ে যাই দুজনের কেউ, তাহলে কি হবে আমাদের! সম্ভবত সৌরজগত পার হয়ে এসেছি আমরা মিল্কিওয়ের অন্য নভমন্ডলে। ভয়েজার-১ কে দেখতে পেলাম দূরাকাশে। পথে নানাবিধ অড ক্লাউডের ছড়াছড়ি। কোনটা ধুলিময় কোনটা নানাবর্ণে রঞ্জিত। পৃথিবীর ফুলের বাগানের মত মহাকাশে এ কমেটগুলো সৃষ্টি করেছে চোখ জুড়ানো এক সৌন্দর্যময়তা!
:
এন্ডোমিডা নক্ষত্র মন্ডলীর বুকে ভাসছি আমরা। এগুলো গড়ে ১০-আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবী থেকে। কিন্তু আমরা আলোর গতির চেয়ে ১০০-গুণ গতিতে চলে এসেছি বলে অনেক কম সময় লেগেছে আমাদের। প্রথমেই গেলাম মিল্কি ওয়ের লাইটেনস তারার কাছে। এটা একটা বামন নক্ষত্র। ছটি গ্রহ আছে এ নক্ষত্রের। এ সূর্যটির একটা সুপার আর্থও আছে। অনেকটা পৃথিবীর মত আবহাওয়া গ্রহটির। নাম YT41TR। প্লান করলাম YT41TR গ্রহটিতে নামবো আমরা। দেখবো সেখানে প্রাণ বা প্রাণের উপযোগি কোন পরিবেশ গড়ে উঠেছে কিনা। খুব সমর্পণে কাছে গেলাম গ্রহটির। কিন্তু ওমা। প্রবল টানে খপখপ এবং চলে যাচ্ছি আমরা গ্রহটির অভ্যন্তরে। মনে হচ্ছে গ্রহটির চাপে পিষে মরবো আমরা এখনই। খপখপকে বললাম – জীবন বাঁচাতে তাড়াতাড়ি ভাগো এখান থেকে। এবার নিকটবর্তী প্রসিউন তারকার কক্ষপথে ঢুকলাম আমরা। এ নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে ৪টা গ্রহ। মাঝামাঝি সুপার সেভার গ্রহটিতে নামতে প্রস্তুতি নিলাম আমরা। এটি একটা লকস গ্রহ। মানে এর একদিক সব সময় সূর্যের দিকে, অপর দিক চির অন্ধকারময়। সুতরাং গ্রহটির একদিক ফুটন্ত আগুন অপর পিঠে চির বরফের অন্ধকার। ইনফ্রারেডের সাহায্যে অন্ধকার সাইডে দেখতে চেষ্টা করলাম আমরা। কিন্তু পৃথিবীর সি লায়নের মত জোঁক জাতীয় বিশালাকার সরীসৃপের মত প্রাণিদের ঘুরে বেড়াতে দেখলাম অন্ধকারে। ওদের দেখেই গা ঘিন ঘিন করে উঠলো। ফ্রিয়াকে বললাম একটা প্রাণিকে পৃথিবীতে নিতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু দেখতে যা অবস্থা! নামা নিরাপদ মনে না করে ফিরে চললাম আমরা পরের দৃশ্যমান নক্ষত্রমন্ডলীর দিকে।
:
প্রক্সিমা সেন্টরী নক্ষত্রপুঞ্জে খুঁজে পেলাম ZR42A গ্রহের দেখা। বিশাল এ গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে ১৭০০০-গুণ বড়ো। কিন্তু এর পাহাড়গুলো সোনালী রঙের মেটালিক ঔজ্বলতায় ভরপুর। হতে পারে টাইটানের মত এ গ্রহটি স্বর্ণ বা এ জাতীয় কোন ধাতু দ্বারা তৈরি। বা লাখ লাখ বছরের বিক্রিয়ায় এর মাটি পরিণত হয়েছে স্বর্ণমাটিতে। কিন্তু পৃথিবী থেকে ১২ আলোকবর্ষ দূরের এ গ্রহে স্বর্ণের খোঁজ নিতে কে আসবে। এখানে স্বর্ণ বড়ই মূল্যহীন। ফ্রিয়াকে বললাম – স্বর্ণ নিবে কয়েক ভরি? ঠোঁট উল্টে ফ্রিয়া বললো – সোনা দিয়া কি করবো এখানে? মাঝে মাঝে আগ্নেয়গিরির উদগীরণ দেখলাম এ গ্রহে। এবার সাইরাস নক্ষত্রমালার কাছ দিয়ে উড়ে গেলাম আমরা। কিন্তু এ তারকার কোন সুপার আর্থ গ্রহ খুঁজে পেলাম না আমরা। যে কারণে এ তারকা ছেড়ে এগিয়ে গেলাম ইরিডামি নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে। ইরিডামির আলোর ঝলকানিতে চোখ ঝলসে গেল আমাদের। উজ্জ্বল লাল হলদে প্রভা ঢেকে দিলো আমাদের মহাকাশযান ও আমাদেরকে। গা পুড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হলে দ্রুত সামনে পালিয়ে গেলাম আমরা।
:
এবার একটা বিচ্ছিন্ন এতিম গ্রহকে সামনে পেলাম আমরা। যার নাম ইপিএক্স2RG। এ গ্রহটির কোন সূর্য নেই। গ্রহটি অন্ধকারে নিজের অক্ষে একাকি ঘুরছে সে চির অন্ধকারের মাঝে। তার আশে পাশে কোন প্রতিবেশীও নেই। একক ও ভিন্নধর্মী গ্রহটির মাটিতে নামলাম আমরা। এর তাপমান মাইনাস ৪০০ ডিগ্রির মত। সব কিছু শুকনো ও ঠান্ডায় জমে যাওয়া। পাথরময় এ গ্রহ ঢেকে আছে চির অন্ধকারে। সম্ভবত মানুষ আর পরী হিসেবে আমরাই প্রথম লাইট জ্বালালাম গ্রহটিতে। সামান্য একটা টর্চের আলোতে মনে হলো পুরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো গ্রহটি। সঙ্গে ঝনঝন শব্দ হলো কি যেন ভাঙার। লাইট বন্ধ করে একইভাবে ২য় বার জ্বালালে আবার একইরূপ শব্দ হলো গ্রহজুড়ে। আমরা বুঝতে পারলাম না কিসব ভাঙার শব্দ। চির অন্ধকার এ গ্রহে কি আলোতে ভেঙে যায় সবকিছু? অন্ধকারে আর কতক্ষণ থাকা যায় ভয়াবহ ঠান্ডার মাঝে? শব্দ করলাম আমরা কাউকে ডাকতে! ফ্রিয়া পরীর ভাষাতে ডাকলো কবার। কিন্তু শীতার্ত হিঁস হিঁস শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না আমরা। আমরা আবার উড়লাম নতুন কোন গ্রহ নক্ষত্রের সন্ধানে!
:
লালান্ডি নক্ষত্রমন্ডলীতে পৌঁছতে মাত্র কমিনিট লাগলো আমাদের। এখানের গ্রহগুলো লালান্ডির দুটো তারকাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। মানে এখানের গ্রহগুলোর আকাশে দুটো সূর্য ওঠে দিনে। তাই প্রত্যেকটি গ্রহের উজ্জ্বলতা অত্যন্ত বেশি। এ তারকামন্ডলীর সুপার আর্থ RQ26X গ্রহতে পৌঁছলাম আমরা অলপতেই। কিন্তু ওরে বাবা! এর গ্রাভিটি ফিল্ডতো ভয়াবহ। মাটিতে পা ফেলে তোলা যায়না ওজনের কারণে। মনে হচ্ছে পা শরীর কেউ যেন টেনে রাখছে মাটিতে। শরীরের ওজন অন্তত দশগুণ বেশী ওখানে। ফ্রিয়া হালকা থাকার কারণে একটু হাঁটতে পারলেও, আমি বেশ কবার হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে। অনেক কষ্টে আমাকে টেনে তুললো ফ্রিয়া। এ গ্রহটির মাটিতে ছোট ছোট বৃক্ষলতা দেখলাম। কোন গাছও দুতিন ইঞ্চের বেশী বড় নয়। সম্ভবত ভয়াবহ মহাকর্ষ বলের কারণে বড় হতে পারেনি গাছপালা। মাটিতে বৃষ্টির চিহ্ন আর অল্প জল দেখলাম আমরা। সম্ভবত তরল জল আছে এ গ্রহে। মনে হলে এটা পৃথিবীর মত জীবনের কিছুটা অনুকুল!
[পরের পর্ব কাল]
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *