এক বীর পুরুষের গল্প ও আমাদের সামাজিক সংস্কার

আমার নিচতলার ভাড়াটিয়া দম্পত্তির স্বামী কাজ করে একটা সরকারি দপ্তরে, স্ত্রী একটা স্কুলের শিক্ষিকা আর তাদের বছর সাতের একমাত্র মেয়েটি ঐ স্কুলেই পড়ে। আমাদের সাথে সম্পর্ক খুবই ভাল শুধু এই ছোট মেয়ে আর তার মায়ের কারণে, আমার মা’কে ‘নানী’ বলে ডাকে মেয়েটা, মা’ও নিজের নাতনীই মনে করেন, আমিও নিজের আপন মনে করি ফুটফুটে এই শিশুকে। ঘটনা হলো, মেয়েটার বাবা ‘পরকিয়া’ প্রেমে পরেছে, আমাদের এলাকার এক মেয়ের সাথে, সম্পর্ক বেশ অনেকদিনের। স্বামী স্ত্রী’র মধ্যে দাম্পত্য কলহ প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা এই পরকিয়ার জেরে। অনেকদিন আগে একবার মধ্যরাতে তাদের পাশের ফ্ল্যাটের অন্য মহিলা আমাদের ডেকে নিচে নিয়ে যান, কারণ স্বামীর মারের চোটে মহিলা বাথরুমে ঢুকে সংঞ্জাহীন হয়ে পরেন। উপায়ান্তর না দেখে আমাদের ডাকেন। গিয়ে দেখি ঘটনা সত্য, বাথরুমে কোন সাড়া শব্দ নেই, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ। স্বামী মশায় ঘরে নিরুদ্বিগ্ন হয়ে টিভি দেখছেন, তারপাশে ছোট্ট মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। আমার আর মা’র চাপে পরে উনি বাথরুমের দরজা ভাঙ্গলেন, কিন্তু স্ত্রীকে উঠাতে পারছেন না একা, বাধ্য হয়ে আমার মা আর পাশের ফ্ল্যাটের মহিলার সহযোগীতায় তাকে বিছানায় নিয়ে মোটামুটি ধাতস্থ করা হলো। ডাক্তার ডাকতে স্বামী মশায় রাজী না হওয়ায় আমরাও ঘরে ফিরে এলাম। এটা পরের ঘটনার তুলনায় খুব ছোট একটা উদাহরণ।

সর্বশেষ গত সপ্তাহে এক সন্ধ্যায় এই ব্যাপারটা নিয়ে স্বামী স্ত্রী’তে তুমুল ঝগড়ার একপর্যায়ে যথারীতি বীরপুরুষ স্বামী শারীরিক ভাবে আঘাত করেন খুব হিংস্রভাবে। ফলশ্রুতিতে মহিলা পুনরায় জ্ঞান হারান, আর স্বামী মশায় ভীত হয়ে ঘরছাড়া! আমরা কেউ বাসায় নেই, কিন্তু খবর পেয়ে আমার মা প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত মহিলাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত উত্তরার একটা ক্লিনিকে তাকে ভর্তি করাতে সক্ষম হলেন। উনার বাবার বাড়ি থেকে আত্মিয় আসার পরে মা বাসায় ফিরলেন মাঝরাতের পরে। এই কদিন তাদের মেয়েটা আমাদের বাড়িতেই ছিল, আর ওর বাবা কয়েকবার হাসপাতালে উঁকি দিয়ে আর চিকিৎসার খরচা মিটিয়ে তার দায়ীত্ব সারলেন। চারদিনের মত হাসপাতালে কাটিয়ে মহিলা বাসায় ফিরলেন দুদিন আগে।

এখন সমস্যা হলো, স্বামীর বাবা মা তাদের বীর পুরুষ ছেলের কর্মকান্ড জানতেন না। আর মহিলাও তার শ্বশুর শাশুড়িকেও জানাবেন না ব্যাপারটা। বাধ্য হয়ে আমার মা ফোনে জানালেন তাদের এই ঘটনা! তাতে ফল হলো হিতে বিপরীত, স্বামী মশায় খুব ক্ষেপলেন তার স্ত্রী আর আমার মায়ের উপর। মজার কথা হলো, আজ শ্বশুর মশায় এলেন। ছেলে বউকে দেখতে না, যা শুনলাম ছেলের পক্ষে উকালতি করতে! তারমতে, ‘পুরুষেরা একাধিক বিয়ে করতেই পারে। এটা দোষের কিছু না’! আর মহিলাও এই অসুস্থ শরীরে ব্যাস্ত হয়ে গেছেন শ্বশুরের ইফতারের ব্যাবস্থা করতে।

আমি প্রথম থেকেই চাচ্ছিলাম ব্যাটাকে একটা শক্ত মার দিতে, কিন্তু মা’র নিষেধে এবং অন্য অনেক কিছু চিন্তা করে তা করতে পারিনি! আজও চাচ্ছিলাম শ্বশুর মশায়ের সাথে কথা বলতে, কিন্তু মা মানা করলেন। যাইহোক, মহিলাকে পরামর্শ দিলাম মামলা করতে, কিন্তু উনি রাজি না। আমার মাথায় ঢুকছেনা, উনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েও কেন কঠোর হচ্ছেন না? শারীরিক ভাবে হয়ত তিনি তার স্বামীর কাছে দূর্বল, কিন্তু আইন উনাকে ভাল সহায়তা দিবে এক্ষেত্রে। মনে হচ্ছে উনার সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সামাজিকতার চাপে কোন কঠোর ব্যাবস্থা উনি নিতে পারছেন না, মার খেয়েই যাচ্ছেন।

আমরা যে নারীদের শিক্ষিত ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার উপর জোর দিচ্ছি, প্রচলিত সমাজ ব্যাবস্থা ও পুরুষতান্ত্রীক সামাজিকতা অটুট রেখে সেটা কতটা ফলপ্রসু হবে? নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের সাথে সাথে আমাদের কি সমাজের সংস্কার ও তার দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর উপর জোর দেওয়া উচিৎ না?

২৫ thoughts on “এক বীর পুরুষের গল্প ও আমাদের সামাজিক সংস্কার

  1. শিক্ষা, অর্থনৈতিক
    শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক সংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিলোপ, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইত্যাদি কাজ করতে হবে । আর মেয়েদের কে সচেতন হতে হবে তার অধিকার সম্পর্কে এবং অধিকার হরণ এর ব্যাপারে । তাকে সাহস দিতে হবে তার পাশে দাঁড়াতে হবে । জীবনের ইতিবাচক দিক তাকে বলতে হবে ।

    1. তার পাশে আছি, সহযোগীতার
      তার পাশে আছি, সহযোগীতার আশ্বাসও দিয়েছি, কিন্তু তিনি নিজেই আগ্রহী নন কোন আইনি ঝামেলায় যেতে!

  2. আমার মাথায় ঢুকছেনা, উনি

    আমার মাথায় ঢুকছেনা, উনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েও কেন কঠোর হচ্ছেন না?

    এটা বাঙ্গালি মেয়েদের ঐতিহ্য বলা চলে .।

    আসলেই বীর পুরুষ লোক টা ., বীরতার সাথে স্ত্রী নির্যাতন .,পরক্রীয়া ., এবং গোটা পুরুষ জাতিকে বদনাম করছেন .।

    ভাই মাইর টা না দিয়ে ভুল কাজ করলেন

    1. ভাই, সমাজে ‘বাড়িওয়ালার সাথে
      ভাই, সমাজে ‘বাড়িওয়ালার সাথে ভাড়াটিয়া’র প্রেম কাহিনীর গুজব খুব দ্রুত ডালপপালা ছড়াবে! দ্বিতীয়ত, ঐ মহিলাই পক্ষপাতি নন তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন ধরণের ব্যাবস্থা নিতে! সব চিন্তা করেই হাত গুটিয়ে আছি!

    2. এটা বাঙালি মেয়েদের ঐতিহ্য বলা
      এটা বাঙালি মেয়েদের ঐতিহ্য বলা ঠিক হচ্ছে কি ? আমার কাছে মনে হয় এটা পুরুষতন্ত্রের অবৈধ উপনিবেশ নারীর মনোজগতে । হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষ , নারীকে নিয়ন্ত্রণ, দমন, শোষণ করতে এই ধরণের কাঠামো তৈরি করেছে । আর কাঠামোর বাইরে যাওয়া রাতা রাতি সম্ভব নয় । তাই ওই নারী শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ওই কাঠামোর বাইরে বের হতে পারছে না ।

      1. ভাল বলেছেন, তবে ‘সংসার সুখের
        ভাল বলেছেন, তবে ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’ লাইনটা কিন্তু নারীরাই বেশী ব্যাবহার করে থাকে!

      2. হ্যা কিন্তু পৃথিবির অন্যান্য
        হ্যা কিন্তু পৃথিবির অন্যান্য দেশে দেখুন এমন নয় তারা অত্যাচার সহ্য করতে নারাজ
        এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ

  3. খুবই দুঃখজনক ঘটনা। কাছাকাছি এ
    খুবই দুঃখজনক ঘটনা। কাছাকাছি এ রকম ঘটনার সাথে আমারা কম বেশী সবাই পরিচিত। মেয়েরা যতদিন স্বনির্ভর না হবে ততদিন এসব চলতেই থাকবে।
    আপনার মা কে সালাম জানাবেন।

    1. ধন্যবাদ, তবে এই ভিকটিম কিন্তু
      ধন্যবাদ, তবে এই ভিকটিম কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, তারপরও মুখ বুজে আছেন! সমস্যাটা সামাজিক ব্যাবস্থায়, উনার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উনি চিন্তিত!

  4. আমাদের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে
    আমাদের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে দেখলেই ভাববার অবকাশ নেই যে তাদের মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছে তাদের জেনিটিক কোডই সম্ভবত আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও তার পাশবিক নির্যাতনে…
    আপনার মাকে ধন্যবাদ অসহায় মেয়েটির পাশে দাঁড়ানোর জন্যে…
    আর আপনাকে তিরস্কার ঐ জালিমটাকে পুলিশের হাতে না তুলে দেয়ার জন্যে!! :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি:

    1. ” জেনিটিক কোডই সম্ভবত আমাদের
      ” জেনিটিক কোডই সম্ভবত আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও তার পাশবিক নির্যাতনে…”
      জানিনা কি বোঝাতে চেয়েছেন । আমার মতামত উপরে বলেছি ।

      1. “আমাদের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে
        “আমাদের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে দেখলেই ভাববার অবকাশ নেই যে তাদের মেরুদণ্ড গড়ে উঠেছে আসলে তাদের জেনিটিক কোডই সম্ভবত আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও তার পাশবিক নির্যাতনে পরিবর্তন হয়ে গেছে!”—
        দুঃখিত এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্যে!!

    2. ভাই, পুলিশে ফোন দিলেই ওটাকে
      ভাই, পুলিশে ফোন দিলেই ওটাকে ধরে নিয়ে যাবে বলে আমি নিশ্চিত! কিন্তু তারপরে কি হবে? যার জন্য করব সে নিজেই চাচ্ছে না আইনি ঝামেলায় জড়াতে বা ব্যাপারটা বাইরের কারো কাছে শোনাতে! ভিকটিমের সহযোগীতা না পেলে এসব ক্ষেত্রে কোন কাজই হবে না!

  5. পুরনো একটা মন্তব্য মনে পড়ে
    পুরনো একটা মন্তব্য মনে পড়ে গেল, এদেশে ছেলেরা যতটা না পুরুষতান্ত্রিক মেয়েরা তার চেয়ে বেশি পুরুষতান্ত্রিক।

    1. মায়েরা ছেলেদের মনে করে ‘সোনার
      মায়েরা ছেলেদের মনে করে ‘সোনার আংটি’, সেটা বাকা হলেও কোন সমস্যা নেই, দামও কমে না! আমার অভিজ্ঞতাও অনেকাংশে তাই বলে ‘এদেশে ছেলেরা যতটা না পুরুষতান্ত্রিক মেয়েরা তার চেয়ে বেশি পুরুষতান্ত্রিক।’

  6. আমি বুঝলাম না কোন হিসেবে এই
    আমি বুঝলাম না কোন হিসেবে এই বাপগুলাই ছেলেদের লাই দেয়? এইরকম কিসু হলে তো বাপেরই ছেলেকে থাপ্প​ড় দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলার কথা!!

    1. আমার মাথাতেও ঢুকেনা এসব!
      আমার মাথাতেও ঢুকেনা এসব! একেবারে অশিক্ষিত পরিবারের হলেও না হয় মানা যেত, কিন্তু লোকটার পরিবার শিক্ষিত এবং সামাজিক ভাবেও মোটামুটি অবস্থান ভাল!

      1. শিক্ষিত অশিক্ষিতও কথা না, বাপ
        শিক্ষিত অশিক্ষিতও কথা না, বাপ ছেলেরে লাই দেবে কেন​? অশিক্ষিত কত রিকশাওয়ালার পোলাপানরে দেখি, রাস্তায় পোলা খালি গায়ে দাড়ায় আসে, সাথে হ​য়ত বাপ আসে, ছেলে বলে-আব্বা আমারে ওই লেবেনচুষটা কিন্যা দাও আর ঠাস করে থাপ্প​ড় মারে বাপ। তা নারী কি তাদের কাছে ললিপপের চাইতেও কমদামী?

  7. অবশ্যই সমাজের সংস্কার ও তার
    অবশ্যই সমাজের সংস্কার ও তার দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর উপর জোর দেওয়া উচিৎ।এটা সময়ের দাবী ।

    1. আমরাই সমাজ, আমাদের সমন্বয়েই
      আমরাই সমাজ, আমাদের সমন্বয়েই সমাজ গড়ে উঠে, সমাজ সংস্কারের আগে নিজেকেই সংস্কার করে শুরু করতে হবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *