স্মৃতিকথনঃ যেখানে আলাদা ছিলাম আমরা দু’জন।।

সবকিছুই নাকি পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু তারপরও প্রত্যেকটা নতুন জিনিসই চমক নিয়ে আসে। যেমনটা ছিল আমার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া। মাত্র ২ নম্বরের জন্য চান্স পাইনি। কিন্তু এতটা দুঃক্ষ পাইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবো এটা আমি অনেক আগে থেকেই জানতাম। যেদিন পরীক্ষা দিলাম সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম আমার ঢাবি কনফার্ম।।

ঢাবিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। চাইলে আরো ভালো সাবজেক্টে মাইগ্রেশন করতে পারতাম কিন্তু ২য় বার মেডিক্যালে পরীক্ষা দেয়ার ইচ্ছা এবং ভালো ভালো অনেকগুলো ফ্রেন্ড হয়ে যাওয়ায় সাবজেক্টটা চেইঞ্জ করিনি।।


সবকিছুই নাকি পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু তারপরও প্রত্যেকটা নতুন জিনিসই চমক নিয়ে আসে। যেমনটা ছিল আমার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া। মাত্র ২ নম্বরের জন্য চান্স পাইনি। কিন্তু এতটা দুঃক্ষ পাইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবো এটা আমি অনেক আগে থেকেই জানতাম। যেদিন পরীক্ষা দিলাম সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম আমার ঢাবি কনফার্ম।।

ঢাবিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। চাইলে আরো ভালো সাবজেক্টে মাইগ্রেশন করতে পারতাম কিন্তু ২য় বার মেডিক্যালে পরীক্ষা দেয়ার ইচ্ছা এবং ভালো ভালো অনেকগুলো ফ্রেন্ড হয়ে যাওয়ায় সাবজেক্টটা চেইঞ্জ করিনি।।

ঢাবিতে ভর্তি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তার কারণ ছিল একটি মানুষ। যাকে আমি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে দেখতাম। জীবনের একটা অংশ ছিল ও আমার। ওর সাথে প্রথম দিন পরিচয়টা অনেক মজার ছিল। ওর নামের প্রোনান্সিয়েশন নিয়ে ঝামেলা। ও যতই বলে “স” হবে না “শ” হবে ততই আমরা “স” দিয়ে ডাকতাম। ও একটু রাগ করত। তারপর প্রথম কথা হয় টিএসসিতে। প্রথম কথার দিনই ওর সাথে ফেইসবুকে চ্যাটিং শুরু হয়। প্রতিদিনই চ্যাট হত। বেশিরভাগ সময়ই সন্ধ্যার দিকে। ওয়েবসাইট ডেভেলাপিং এর কাজ করার জন্য আমার সবসময়ই ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসে থাকতে হত। আর এই সুযোগে কাজের ফাকে ফাকে ওর সাথে চ্যাট করতাম।।

আস্তে আস্তে আমরা আরো ক্লোজ হতে থাকি। নিজেদের লাইফের অনেক সমস্যার কথা একে অপরকে বলতে শুরু করি। নিজের সবকিছু ওর সাথে শেয়ার করা শুরু করি। ও ওর সবকিছু শেয়ার করত আমার সাথে।।

তারপর শুরু হয় ওকে কন্সালটিং করার বিষয়টা। আমি যেন ওর পার্সোনাল কাউন্সিলর ছিলাম। ও ওর সব কাজে আমার বুদ্ধি এবং সহায়তা আশা করত। আমিও কখনো না করিনি। ওর নানা সমস্যার সমাধান করে দিতাম। ওকে সাহস দিতাম। ওকে অনেক কিছু বুঝাতাম। ওকে নতুন নতুন অনেক কিছু শেখাতে গিয়ে আমার নিজেরই অনেক কিছু জানা হয়ে যেত।।

ওর সাথে আমার সবচেয়ে বেশি কথা হত কার্জনের বাইরে বাসস্ট্যান্ডে। ওটা ছিল আমাদের পছন্দনীয় জায়গা। বিকালে ক্লাস শেষ করে বাস দিয়ে রওয়ানা হওয়ার অপেক্ষায় ওর সাথে কথা বলতাম। অনেক্ষণ কথা হত। ওর বাস থাকতো সাড়ে ৪টায় আর আমার ৫টা ১০এ। ওর সাথে কথা বলার জন্য মাঝে মাঝেই আমি ৩টা ৪০এর বাস মিস করতাম। মনে আছে এমন অনেকদিনই হয়েছে যেদিন ওর সাথে কথা বলার জন্য পর পর দুইটা বাসও মিস করেছি।।

ক্লাসে সবসময়ই পাশাপাশি বসার চেষ্টা করতাম। একদিনের কথা এখনো মনে হলে প্রচুর হাঁসি পায়। আমি আর ও ক্লাসে পাশাপাশি বসে গল্প করছি আর ঐদিকে স্যার পড়িয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে ও চুপ হয়ে গেল। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। ওকে জিজ্ঞেস করতে যাব এমন সময় ও খাতায় একটা লেখা আমাকে দেখাল। দেখে আমি কাঁদবো না হাঁসবো বুঝতে পারছিলাম না। লেখাটা ছিল, “স্যার আমাদের দেখছেন। দরজার গ্লাসে তাকিয়ে।” অর্থাৎ স্যার আড়চোখে দরজার গ্লাসে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছেন কারা কারা কথা বলছে। আমি তো পুরো অবাক হয়ে গেলাম। তারপর আর বেশি কথা বলিনি। কি দরকার শুধু শুধু স্যারের কাছে অপমানিত হওয়ার।।

কার্জনের গেটের বাইরে কতবার কথা বলার সময় যে ডিপার্টমেন্টের এক বড় ভাই দেখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ঐ ভাই আর আমি একই বাসে চলাচল করতাম। উনি আমাকে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলে হন হন করে সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যেতেন।।

বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়ই আসে ঝাড়ির কথা। ও ওর আজব আজব সমস্যা গুলো দেখাত আর আমি তার সমাধান বের করতাম। ওর সমস্যাগুলোকে নিজের সমস্যা ভাবা শুরু করেছিলাম। ওকে শক্ত হওয়ার জন্য, ওকে সাহস দেয়ার জন্য বলতাম “তোমাকে ঝাড়ি দেয়া প্রয়োজন।” ও বলত “দাও।” আমি তখন ওকে কিছু বলতাম না। শুধু হাঁসতাম। তারপর এই সেই কথা শুরু করতাম। ও বলত, “কি ব্যাপার? ঝাড়ি দিচ্ছ না কেন?” আমি বলতাম, “সময় হোক।” মাঝে মাঝেই মজা করার জন্য বলতাম, “আজকে ঝাড়ি দেব। মানসিকতা নিয়ে এসো।” ও এসে চুপচাপ কাঁচুমাঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। তখন ওকে অনেক ভালো লাগতো। আমি তখন ওর সাথে মজা করা শুরু করতাম। মজার মাঝেই কঠিন কঠিন কথা ঢুকিয়ে দিতাম। কিন্তু ও বুঝতে পারতো না। আমি তখন ওকে বুঝিয়ে বলতাম। একদম প্রাইভেট টিউটরের মত উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতাম। এরকম মজার মাঝেই একদিন বলেছিলাম, “তুমি ডিপার্টমেন্টে একটা ফানি ক্যারেক্টার হয়ে গিয়েছ।” কথাটা মনে হয় ওর খারাপ লেগেছিল কিন্তু আমাকে বুঝতে দেয়নি। যদি আমি বুঝতে পারতাম কথাটা ওর খারাপ লেগেছে তাহলে হয়তো মজার কথাটা বলতাম। আমি যে সিরিয়াসলি বলিনি সেটা বলতাম।।

ফেইসবুকে চ্যাটে ওর সাথে সবসময়ই মজা করতাম। বেশিরভাগ সময়ই ও মজাটা না বুঝে রাগ করত। তখন আবার আমাকে মজার কথা বলে ওর রাগ ভাঙ্গাতে হত। ওর সাথে সববিষয় নিয়ে কথা হত। সমসাময়িক নানান বিষয় হতে শুরু করে রাজনীতি, বিনোদন, সঙ্গীত সব নিয়ে কথা হত। ও একবার আমাকে একদম আমার মনের মত কথা বলেছিল। কথাটা ছিল,

“অনেকের সাথেই মিশি, অনেকের সাথেই কথা বলি। কিন্তু সবার সাথেই কিছুক্ষণ কথা বলার পর আর কথা খুজে পাওয়া যায় না। কিন্তু তুমিই এমন একজন মানুষ যার সাথে কথা কখনো শেষ হয় না। তোমার সাথে কথা বলতে কখনোই আমার বোরিং লাগে না। আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে কখনো কথার কমতি হয় না। আমরা কথা বলার বিষয় পেয়েই যাই।”

কথাটা একদম আমার মনের কথা ছিল। আসলেই আমারও ওর সাথে কথা বলতে কখনো বোরিং লাগত না। দু’জনের মধ্যকার মিল অনেক বেশি থাকার কারণে এরকম হয়েছে। আমাদের সবকিছুতেই অনেক মিল। এমনকি ওর আর আমার রক্তের গ্রুপও এক।।

তারপর যখন আমি বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে বাড়ি চলে এলাম তখন থেকে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ শুরু হয়। প্রতিদিন নিয়ম করে দুই বেলা ওকে ফোন দেয়া যেন রুটিন শিডিউল ছিল। ফোন দিয়ে কেমন আছ জানার চেয়ে নতুন কোন সমস্যা হয়েছে কিনা তা জানা বেশি হত। একদিন তো রাগ করে আমি বলেই ফেলেছিলাম, “তোমাকে ফোন দিলেই শুধু তুমি নানান সমস্যার কথা বল।” পরে অবশ্য স্যরি বলে ক্ষমাও চেয়েছিলাম।।

আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে কিউট। এত্ত কিউট কোন বন্ধুত্ব হতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। কিউট হওয়ার কারণ অবশ্যই ও। ও অনেক কিউট ছিল। তাই বন্ধুত্বটাকেও কিউট বানাতে পেরেছে। কোন বন্ধুত্বে মনে হয় এত কিছু হয় নি যেটা আমাদের বন্ধুত্বে হয়েছে।।

থাক আর বেশি কিছু বলবো না। অনেক বললাম। শেষে বলি আমাদের বন্ধুত্বটা কমপ্লিক্যাশনের চাপায় পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ও অনেকবার চেষ্টা করেছে আমাকে আগের মত ফিরিয়ে নিতে কিন্তু কিছুদিন আগের মত থেকেই আমি আবার তা নষ্ট করেছি। এট লাস্ট আই এম এ কাওয়ার্ড ইন্ডিড।।

৮ thoughts on “স্মৃতিকথনঃ যেখানে আলাদা ছিলাম আমরা দু’জন।।

  1. ওর বাস থাকতো সাড়ে ৪টায় আর
    ওর বাস থাকতো সাড়ে ৪টায় আর আমার ৫টা ১০এ। ওর সাথে কথা বলার জন্য মাঝে মাঝেই আমি ৩টা ৪০এর বাস মিস করতাম। মনে আছে এমন অনেকদিনই হয়েছে যেদিন ওর সাথে কথা বলার জন্য পর পর দুইটা বাসও মিস করেছি।।
    —- এরকম টুকরো টুকরো ঘটনা থাকে বলেই জীবন অনেক শোকে তাপে ও মাঝে মাঝে ভোরের সূর্যের মতো হেসে ওঠে ।
    এট লাস্ট আই এম এ কাওয়ার্ড ইন্ডিড।।
    —- কেন যেন বন্ধুত্ব না থাকার পেছনে বন্ধুত্ব ‘র স্তর পার হয়ে সম্পর্কটি নতুন মাত্রা অনুসন্ধানী হয়েছিলো । সে যাই হোক । স্মৃতি আমার কাছে মহা মূল্যবান একটা সম্পদ । আপনার কাছেও হয়তো । একে আগলে রাখুন – অজানা সুখে মন ভরে উঠবে নিশ্চয়ই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *