বিপ্লবের পথে হাঁটাঃ কিছু নিজস্ব ভাবনা

[ভাবনাগুলো একান্তই নিজের। কাউকে আঘাত করতে লেখা নয়]

আমরা কি করি? কেন করি? দেশের ভালমন্দের দায়িত্ব যে রাজনীতিবীদদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকি, তারাই দেশটাকে বেচে দেয় বারবার।

মূল্যবোধের বা নৈতিকতার জায়গা থেকে আমাদের দায়িত্ব গালিগালাজ করেই খালাস। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে যখন আবোল-তাবোল ধরণের আকাম-কুকাম করে, তখন তাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য আমরা ভোট দেই বিএনপিতে। আবার বিএনপি যখন সেই একই ঘটনা ঘটায়, ক্ষেপে গিয়ে আমরা সিল দেই নৌকায়। সেই দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মত এও এক রাজনৈতিক দুষ্টচক্র। ভোট মানে পাঁচ বছর পর পর নির্দিষ্ট করে দেয়া, পরের পাঁচ বছর দেশের আর দেশের মানুষের বারটা কারা বাজাবে।


[ভাবনাগুলো একান্তই নিজের। কাউকে আঘাত করতে লেখা নয়]

আমরা কি করি? কেন করি? দেশের ভালমন্দের দায়িত্ব যে রাজনীতিবীদদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকি, তারাই দেশটাকে বেচে দেয় বারবার।

মূল্যবোধের বা নৈতিকতার জায়গা থেকে আমাদের দায়িত্ব গালিগালাজ করেই খালাস। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে যখন আবোল-তাবোল ধরণের আকাম-কুকাম করে, তখন তাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য আমরা ভোট দেই বিএনপিতে। আবার বিএনপি যখন সেই একই ঘটনা ঘটায়, ক্ষেপে গিয়ে আমরা সিল দেই নৌকায়। সেই দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মত এও এক রাজনৈতিক দুষ্টচক্র। ভোট মানে পাঁচ বছর পর পর নির্দিষ্ট করে দেয়া, পরের পাঁচ বছর দেশের আর দেশের মানুষের বারটা কারা বাজাবে।

বামদলগুলোর মধ্যে একটা বড় অংশ সমাজতন্ত্রী তথা সাম্যবাদীরা। সমাজতন্ত্রের এই ধ্বজাধারীরা আন্দোলনমুখি রাজনৈতিক চর্চা করলেও খুব একটা কাজের না। যদিও গণবিরোধী যে কোন রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এরাই সবার আগে মাঠে ময়দানে সোচ্চার থাকে। এরা যখন হয় ফুলবাড়ি ঠেকাতে গিয়ে নয় জাতীয় খনিজ সম্পদ পাচার ঠেকাতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খায়, ডান ও মধ্যপন্থীরা তখন চাঁদাবাজির তোলা গোণে। তারপরও, দুঃখ লাগে যখন শুনি এরাই জোট বেঁধে আওয়ামী লীগ- বিএনপির সাথে যায় ইলেকশন করতে। তারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সাম্যবাদের লক্ষ্যে পৌঁছুনোর কথা বলে, আবার আওয়ামী-বিএনপি গণের কোলে বসে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট খাবার স্বপ্নেও বিভোর।

ভোট রাজনীতি করে করে কম্যুনিস্ট পার্টিগুলা এখন আর একটাও কম্যুনিস্ট পার্টি নাই। সব সো কলড সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি হয়ে গেছে। পুরাই পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের মত অবস্থা। ভোটে জিতে এরা যদি দুই যুগ শাসনও করে, তবু সমাজতন্ত্রের নামগন্ধ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বরং নন্দীগ্রামের মত ঘটনা ঘটতে থাকবে বারবার।

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শুরু মধ্যবিত্তের হাতে হবে এটাই স্বাভাবিক। এবং সেই আন্দোলনে সর্বহারা শ্রেণীর মধ্যেও নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে সেটাও অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু, মজার বিষয় এইটাই, সর্বহারা আন্দোলনের নেতৃত্ব আর সর্বহারার মধ্যে তৈরি করতে দেয়া হয়না। সমাজতন্ত্র এখন মধ্যবিত্তের একচেটিয়া। আর এদের বেয়াল্লিশ বছরের উচ্ছিষ্টভোগী রাজনীতির কারণে ময়দানে চোর-ডাকাতের জয় জয়কার। কারণ, যত সুশীলতার কথাই বলা হোকনা কেন; মানুষ পাওয়ার পলিটিক্সেই বিশ্বাস রাখে। সবাই নিরাপত্তাই চায়। কবিতা ধোয়া বুলিতে কারো আস্থা নেই।

ভোটে জিতে সমাজতন্ত্র কায়েম করা অসম্ভব। পাব্লিকে সিল-ছাপ্পর মাইরা দিলেই সমাজতন্ত্র ঘাড়ের উপর লাফায়া পড়বে বলে যাদের বিশ্বাস, তাদের যত একবুক দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই দেয়ার নাই। কারণ, সমাজতন্ত্র একটি জনগণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়। পুজির মালিকেরা যেমন ছেড়ে কথা কইবেনা, সেনাবাহিনীও পিঠের চামড়া আস্ত রাখবেনা। আর এতো আমাদের সবারই দেখা, দুই দিন আগে যেমন শাহবাগে মানুষের ঢল নেমেছিল, শাহবাগের গায়ে নাস্তিক ট্যাগ সহ ধর্মের ট্যাবলেট জলে গুলে দিতেই সেই মানুষই পর লাফিয়ে পড়ল শফি হুজুরের তেঁতুল গাছ রক্ষা করতে।

সেদিন ছবির হাটে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথায় কথায় একজন সুশীল ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘সশস্ত্র বিপ্লবের কথা এখন যারা চিন্তা করে, তাদের চিকিৎসা দরকার।’ লোকটার দোষ নাই। জীবন যুদ্ধে সদা বিপর্যস্ত এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিন্তা এরকমই দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণীটাই এরকম। কঠিন ও কঠোর সবকিছুতেই ভয়। পাছে নিজের ক্ষতি হয়। সুতরাং, অভাব নেই পলায়নপর যুক্তির। যদিও সেখানে আমার কথাটা ছিল এই রকম, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বহারা শ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে হলে তা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। এবং, সেই অভ্যুত্থানের বিরোধী ও প্রতিবিপ্লবী শক্তির পালটা ক্যু ঠেকানোর জন্য তার একটা সশস্ত্র চরিত্র থাকাও জরুরী। লোকটা বোধহয় এরকম কিছু ঘটতে গেলে কি জানি কি হয়ে যায়, সেই ভয়েই পাগলের ডাক্তারকে স্মরণ করেছিলেন। যদিও আমি এক পাগলের ডাক্তারের কথা জানি; যিনি রাজনীতি বোঝেন, এবং ঘোর সমাজতন্ত্রী; এবং বিপ্লবের সশস্ত্র চরিত্রেও আস্থা রাখেন।

এক বড়োভাই একটা কথা গত কয়েকদিন বারবার বলছিলেন, রাষ্ট্রের চরিত্র জনগণের মধ্যে ফুটে উঠবেই। রাষ্ট্র নিজেই যখন লিপ্ত হবে গণবিরোধী কাজে, জনগনও তখন উপযুক্ত রাজনৈতিক শিক্ষার অভাবে সেই একই কাজ করে যাবে। রাষ্ট্র যেখানে রামপাল আর টিকফা চুক্তির মত গণবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত হয় শুধু মাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু ধারক বাহক নেতা আর আমলা গোষ্ঠির সুবিধা দিতে গিয়ে, সেখানে সাধারণ মানুষ শুধুমাত্র নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করে দুর্নীতিতে লিপ্ত হবে ও তাকে লালন করবে এটাই স্বাভাবিক। বিরুদ্ধ মতকে থামাতে গিয়ে রাষ্ট্র যখন লিপ্ত হয় বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডে ও নির্মম দমন নীতিতে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রমও অস্বাভাবিক কিছুনা।

তাহলে উপায় কি? পুঁজির বিকাশ আর ক্যারিয়াস্টিক পতিতাবৃত্তি ছাড়া কি আমাদের কিছুই করার নেই?

আছেতো বটেই। ঐযে, বললাম না; সমাজতন্ত্র একটি জনগণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়। অর্থাৎ, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আনতে গেলে সবার আগে তার একটা সাংস্কৃতিক চরিত্র দেয়া জরুরী। মাঠে কিষাণ- কলে মজুর- আর পথে ঘাটের রিক্সাচালক এদের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার বিকাশ জরুরী। কথা আসতে পারে, যার পেটে ভাত নাই; তারে আর রাজনীতি শিখায়ে কি হবে? রাজনীতি লম্বা লম্বা ভাষণ, আর কঠিন ভাষায় মার্ক্সবাদী ত্বত্ত বুঝিয়ে শেখানো যায় না। আমরা মুকুন্দ দাশেরই স্বদেশী। যাত্রা- পালা- কবিগান- গাজীর গীতের দেশ আমাদের। রাস্তার পারের পথনাটকগুলো এরশাদ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। মাঠে কিষাণ- কলে মজুর- আর পথে ঘাটের রিক্সাচালক এদের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার বিকাশ প্রাথমিকভাবে এদিয়েই সম্ভব। এবং, এদের মধ্য থেকেই যদি কবিয়াল- চারণ- আর কুশীলব বের করে আনা যায় এবং নিজেদের ক্ষোভ ও বঞ্ছণার কথা তাদের নিজেদের বলতে শেখানো যায়, এই চেতনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো ও সর্বহারা শ্রেণির মধ্যে থেকে নেতৃত্ব বের করে আনা সম্ভব। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যেই অংশটা সমাজকাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী, তাদের কাজ হবে শুধুমাত্র সমন্বয় সাধন। শুধু তাই নয়, আমরা যে প্রতিনিয়ত মার্কিন-ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি; আমার বিশ্বাস এভাবে তাকেও রোধ করা সম্ভব।

আর প্রকৃত বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রতিষ্ঠা, সেটা গোলটেবিলে সম্ভব না। মাঠে- ময়দানে কাজ করতে করতে জনগণ ও জনগণের চাহিদাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক ও প্রায়োগিক এবং পুনঃবিশ্লেষণাত্মক ও পুনঃপ্রায়োগিক কর্মকান্ডের মাধ্যমেই তৈরি হওয়া সম্ভব। তিন তলায় পাখার নিচে আরাম কেদারায় বসে সর্বহারা শ্রেণির জন্য আহা-উহু করলেই বিপ্লবী পার্টি তৈরি হয়না। আর এও নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে, বিপ্লবী পার্টির জন্য চাই সুশিক্ষিত পার্টি ক্যাডার ও সঠিক রণকৌশল ও ত্বত্ত। পুস্তক ও ময়দান, দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের পরিপূরকতো বটেই।

সব কথার শেষ কথা। সঠিক পরিবর্তন আনতে গেলে এক সম্পূর্ণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ প্রয়োজন। অন্য অনেকের মত এই কথাটা আমিও বিশ্বাস করি।

৭ thoughts on “বিপ্লবের পথে হাঁটাঃ কিছু নিজস্ব ভাবনা

  1. বামরা এখন এই অবস্থায় নেই যে
    বামরা এখন এই অবস্থায় নেই যে সতন্ত্র হয়ে কিছু করতে পারবে।
    আর অধিকাংশ মানুষ মনে করে বাম মানেই নাস্তিক।
    বর্তমানে বাঙালি খুব কমই আছে। অধিকাংশই মুসলিম বাঙালি!!!

  2. চমৎকার বিশ্লেষণাত্মক লেখা ।
    চমৎকার বিশ্লেষণাত্মক লেখা । দ্বিমতের কোন কারণ নেই । তত্ত্ব – প্রয়োগ এর সুষম সমন্বয় না হলে পরিবর্তন বা বিপ্লব রাত ১২ টার পর টক – শো তে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে । আশা রাখি, মানুষ জাগবে ফের চেতনার গভীরে দৃপ্ত শপথে …

  3. ঠিক মনের কথাগুলো বলে দিয়েছেন।
    ঠিক মনের কথাগুলো বলে দিয়েছেন। একটা কথা আমি বারবার বলি। সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক কথাবার্তা আমি কম বুঝি। শুধু এটাই বুঝি সর্বহারা শ্রেণীর জন্যই যেই আন্দোলন, সেই আন্দোলনে সর্বহারা শ্রেণীকে যুক্ত করতে না পারলে সেটা কেমন আন্দোলন? লেখার শেষে এসে এই কথাগুলোই বলে দিয়েছেন।

    আর প্রকৃত বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রতিষ্ঠা, সেটা গোলটেবিলে সম্ভব না। মাঠে- ময়দানে কাজ করতে করতে জনগণ ও জনগণের চাহিদাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক ও প্রায়োগিক এবং পুনঃবিশ্লেষণাত্মক ও পুনঃপ্রায়োগিক কর্মকান্ডের মাধ্যমেই তৈরি হওয়া সম্ভব। তিন তলায় পাখার নিচে আরাম কেদারায় বসে সর্বহারা শ্রেণির জন্য আহা-উহু করলেই বিপ্লবী পার্টি তৈরি হয়না। আর এও নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে, বিপ্লবী পার্টির জন্য চাই সুশিক্ষিত পার্টি ক্যাডার ও সঠিক রণকৌশল ও ত্বত্ত। পুস্তক ও ময়দান, দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের পরিপূরকতো বটেই।

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *