‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার নেই’ কথাটা কি দেশবাসী গিলেছে?

‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ বললে হয়তো বেশী কমিয়ে বলা হয়ে যায়। চার সিটিতে ধরাশায়ী আওয়ামী লীগের জন্য আরও একটা সিটি হাতছাড়া হওয়া কি নতুন কোন কষ্ট বয়ে আনবে? কিছুটা না অনেকটা? শাকের আঁটি না আরেকটি বোঝা? বিশেষ করে, ‘গাজিপুর’কে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলবার পরে। যদিও বক্তব্যটা হয়তো দেয়া হয়েছিল কর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনবার জন্য। ফিরিয়ে আনতে পারে নি। অনেকে অবশ্য কথাটার আরও একটা অর্থ বের করেছেন। ‘এখানেই যদি হারে, তবে বাকী সব জায়গায় তো হারা নিশ্চিত। হয়তো গোপালগঞ্জেও।‘

‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ বললে হয়তো বেশী কমিয়ে বলা হয়ে যায়। চার সিটিতে ধরাশায়ী আওয়ামী লীগের জন্য আরও একটা সিটি হাতছাড়া হওয়া কি নতুন কোন কষ্ট বয়ে আনবে? কিছুটা না অনেকটা? শাকের আঁটি না আরেকটি বোঝা? বিশেষ করে, ‘গাজিপুর’কে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলবার পরে। যদিও বক্তব্যটা হয়তো দেয়া হয়েছিল কর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনবার জন্য। ফিরিয়ে আনতে পারে নি। অনেকে অবশ্য কথাটার আরও একটা অর্থ বের করেছেন। ‘এখানেই যদি হারে, তবে বাকী সব জায়গায় তো হারা নিশ্চিত। হয়তো গোপালগঞ্জেও।‘
ফলাফলের পরে কি বলবে, দুই দলই, তাঁর জন্য দুটো করে রেকর্ড রেডি রেখেছিল। বিএনপি এর জয় আর পরাজয়ের জন্য রেকর্ড দুটি চার সিটি কর্পোরেশান নির্বাচনের সময়েই শোনানো হয়, ‘কারচুপি’ আর ‘জনগণের প্রত্যাখ্যান’। এখানেও একটা সময় তাঁরা ভেবেছিল বোধহয় হারছে, তাই পরাজয়ের রেকর্ড চালু করে দিয়েছিল। কোথায় কোথায় কারচুপি হয়েছে এমন সব কথাবার্তা শুরু করেছিল। ফলাফলের প্রাথমিক নমুনা দেখে সুর পাল্টেছে। এখন ‘জামানত বাজেয়াপ্ত’ সুরে কথা বলবে হয়তো। আওয়ামী শিবির এখন গনতন্ত্রের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একটা দল হিসেবে নিজেকে প্রমানে ব্যস্ত। কত সুন্দর নির্বাচন তাঁরা উপহার দিতে পারে, সেই প্রশংসা করতে তাঁরা মুখে ফেনা ওঠাচ্ছে। ‘দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব’ প্রায় বছর তিনেক ধরে এই তত্ত্ব প্রমাণ করেই যাচ্ছে।
ব্লগপাড়া আর ফেসবুকে এখন মতামতের ছড়াছড়ি। কিছু কট্টর আওয়ামী পন্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাস আর ব্লগ পড়লাম। দেশবাসীর মূর্খতা নিয়ে অনেকেই বেশ হতাশ। ‘তাঁরা একজন ডাক্তার আর একজন নাপিতের পার্থক্য বুঝতে শেখেনি’। ‘ডাক্তার চিকিৎসা করছে না বলে কি নাপিতের কাছে চিকিৎসা নিতে হবে?’ ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৈরি হওয়া একটা দলকে তাঁরা একটি রাজনৈতিক দল বলে মানতে রাজী না। একজন বোঝাতে চাইছে, বিএনপি আসা মানে জামায়াত আসা, তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধুলোয় মিলাবে, একথা দেশবাসী বুঝছে না। কেউই যে কথাটার উত্তর দিচ্ছেন না, তো হচ্ছে ‘আওয়ামী কর্মকাণ্ডে অখুশি হলে জনগণের জন্য করণীয় কি?’
জাহাঙ্গীর ফ্যাক্টর, হেফাজত ফ্যাক্টর কিংবা এরশাদ ফ্যাক্টর এসব নিয়েও অনেকে আলাপ করছেন। ‘অ্যান্টি ইঙ্কাম্বেন্সি’ ফ্যাক্টর কে সবাই মেনে নিচ্ছেন। তবে আওয়ামী শাসন আমলকে খুব খারাপ বলতে অনেকেই রাজী হচ্ছেন না, বিশেষ করে কট্টর লীগ পন্থীরা। ‘ছাত্রলীগ’ কিংবা ‘দুর্নীতি’ ইস্যু কে অনেকেই আমলে নিতে চান না। ‘বিএনপি আমলেও তো কত হত্যা সন্ত্রাস হয়েছে’। ‘হাওয়া ভবনের দুর্নীতি কি মানুষ জানে না?’ অর্থাৎ ভালো হতে রাজী না। বড়জোর বিএনপির চেয়ে একটু কম খারাপ কাজ করতে রাজী আছি। আর জনগণকে বেছে নিতে হবে কে কম খারাপ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামী শিবির এখনও মানসিক ভাবে ২০০৮-০৯ এ অবস্থান করছে। তখন হাওয়া ভবন, তারেক কিংবা বিদ্যুৎ নিয়ে কথা বলে যেভাবে বাজার মাত করেছিল, এবারও তাঁরা তাই করবে। সেই গল্প গুলো মনে করে দিলে আবার একই ঘটনা ঘটবে। উল্টোটা একবারও ভাবছে না। তখন যে সুবিধা আওয়ামী শিবির পেয়েছিল, এবার সে সুবিধা পাচ্ছে জাতীয়তাবাদী শিবির। হাওয়া ভবনের জায়গা দখল করেছে পদ্মা সেতু, ছাত্রলীগ আর শেয়ার বাজার। বিদ্যুতের স্থান নিয়েছে কুইক রেন্টাল। আর সবার ওপরে যোগ হয়েছে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ইস্যু।
গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী শিবির ছিল দারুণ রকমের আত্মবিশ্বাসী। ‘বত্রিশ’ থেকে যদি বাড়েই কতই আর বাড়বে? বড়জোর একশ? ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তাঁর ওপর বিএনপির যা অবস্থা, বড় কোন মিছিল বের করতেই পারে না। তাঁর ওপর নেতা কর্মীদের ওপর যেসব কেস ১/১১ এর সরকার করেছিল, সেসবের ভয়ে তাঁরাও প্রকাশ্যে কাজ করছে না। এমন একটা নড়বড়ে দলকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তাঁরা বরং বেশী মনোযোগী হল, জামাতের সঙ্গে ভাঙ্গন তৈরির দিকে। এমন অবস্থা তৈরি করল, যেন বিএনপি প্রকাশ্যে জামাত কে সমর্থন দিতে না পারে। এমনটা হোলও। যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে বিএনপি বেশ ঝামেলায় ছিলও। বিরুদ্ধে কোথাও বলতে পারছে না, আবার সমর্থনও দিতে পারছে না।
স্ট্র্যাটেজি হিসেবে তাই তাঁরা ঠিক করল, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীর বিচার এসব ব্যাপারকে সামনে নিয়ে আসবে। ব্যাস তাহলেই দুর্নীতি, ছাত্রলীগ আর পদ্মাসেতু সবাই ভুলে যাবে। বিচারগুলো ঝুলাতে ঝুলাতে পঞ্চম বর্ষে নিয়ে আসলো। কিছু রায় হল আর কিছু ঝুলিয়ে রাখা হল। এবং কোনটাই কার্যকর হওয়ার কোন সম্ভাবনা এই শাসনামলে রাখল না। আবার যেন দেশবাসী সুযোগ দেয়, এভাবে ব্যাপারটাকে নিরবাচিনী ইস্যু বানাবার পাঁয়তারা শুরু করল। গণজাগরণ মঞ্চের বিশাল জোয়ার দেখে ব্যাপারটায় উৎসাহও বাড়ল। দলে দলে সব মন্ত্রীরা এলেন সমর্থন দিতে। পুরো আন্দোলন নিজের পকেটে পুরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
এমন সময় উদয় হল ‘হেফাজত’। নাস্তিক বিতর্ক তুলে পুরো ঘটনার একটা ভিন্ন মোড় দিল। দ্বিধাগ্রস্থ আওয়ামী শিবির প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারলো না কি করবে? প্রথমটায় হেফাজতকে তোষামোদের চেষ্টা করল। হেফাজতের দাবী দাওয়া মানবার চেষ্টা করা যায় কি না? এরপরে প্রায় একই সময় অনেকগুলো ঘটনা ঘটলো। হেফাজতের ওপর ক্র্যাক ডাউন, গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙ্গে ফেলা, মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার, সম্পাদকের বিবৃতি, কিছু ব্লগার গ্রেফতার। সব মিলিয়ে তৈরি হল একটা বিভ্রান্তি। প্রশ্ন দেখা দিল, আওয়ামী শিবির আসলে কি চায়? তাঁরা কি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে? না করে না?
সাম্প্রতিক এই ভুমিধ্বসের পরে, এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আওয়ামী লীগ কি তাঁদের ভুল বুঝতে পেরেছে? না পারে নি? তাঁরা কি এখনও মনে করে, বিএনপি আমলের গল্প বলে ২০০৯ স্টাইলে জয় আসবে? আর এতগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন করে যে বোঝাতে চাইছে ‘দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব’, তা বোঝার মানসিকতায় কি আছে দেশবাসী? নির্বাচন গুলোর ফলাফল দেখে কি মনে হয়? ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার নেই’ কথাটা কি দেশবাসী গিলেছে? কিংবা তাঁদের নিজেদের দলের লোকেরা?

১১ thoughts on “‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার নেই’ কথাটা কি দেশবাসী গিলেছে?

  1. ফলাফলের পরে কি বলবে, দুই দলই,

    ফলাফলের পরে কি বলবে, দুই দলই, তাঁর জন্য দুটো করে রেকর্ড রেডি রেখেছিল। বিএনপি এর জয় আর পরাজয়ের জন্য রেকর্ড দুটি চার সিটি কর্পোরেশান নির্বাচনের সময়েই শোনানো হয়, ‘কারচুপি’ আর ‘জনগণের প্রত্যাখ্যান’। এখানেও একটা সময় তাঁরা ভেবেছিল বোধহয় হারছে, তাই পরাজয়ের রেকর্ড চালু করে দিয়েছিল। কোথায় কোথায় কারচুপি হয়েছে এমন সব কথাবার্তা শুরু করেছিল। ফলাফলের প্রাথমিক নমুনা দেখে সুর পাল্টেছে। এখন ‘জামানত বাজেয়াপ্ত’ সুরে কথা বলবে হয়তো। আওয়ামী শিবির এখন গনতন্ত্রের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একটা দল হিসেবে নিজেকে প্রমানে ব্যস্ত। কত সুন্দর নির্বাচন তাঁরা উপহার দিতে পারে, সেই প্রশংসা করতে তাঁরা মুখে ফেনা ওঠাচ্ছে। ‘দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব’ প্রায় বছর তিনেক ধরে এই তত্ত্ব প্রমাণ করেই যাচ্ছে।

    এতটুকুন যখন লিখেছেন,আপনার পর্যবেক্ষণে কি মনে হয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠ হয়েছে কি হয় নাই?

    গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী শিবির ছিল দারুণ রকমের আত্মবিশ্বাসী। ‘বত্রিশ’ থেকে যদি বাড়েই কতই আর বাড়বে? বড়জোর একশ? ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তাঁর ওপর বিএনপির যা অবস্থা, বড় কোন মিছিল বের করতেই পারে না। তাঁর ওপর নেতা কর্মীদের ওপর যেসব কেস ১/১১ এর সরকার করেছিল, সেসবের ভয়ে তাঁরাও প্রকাশ্যে কাজ করছে না। এমন একটা নড়বড়ে দলকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তাঁরা বরং বেশী মনোযোগী হল, জামাতের সঙ্গে ভাঙ্গন তৈরির দিকে। এমন অবস্থা তৈরি করল, যেন বিএনপি প্রকাশ্যে জামাত কে সমর্থন দিতে না পারে। এমনটা হোলও। যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে বিএনপি বেশ ঝামেলায় ছিলও। বিরুদ্ধে কোথাও বলতে পারছে না, আবার সমর্থনও দিতে পারছে না।

    ভারত সফরে নেত্রী নিজেই জামাতের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকরনের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে আসেন।আবার অদৃশ্য প্ররোচনায়,দেশে প্রনব বাবুর সাথে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন নিরাপত্তার অজুহাতে।এ থেকে নেত্রীর কুন চরিত্রের প্রকাশ পায়?বিএনপির দাবী বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার দল।সুতরাং,যুদ্ধাপরাধের মত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমর্থন দেয়া না দেয়া নিয়ে দোটানা থাকবে কেনে?

    1. আমি কি তাই বলেছি? বলেছি, এই
      আমি কি তাই বলেছি? বলেছি, এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ভাবে করে প্রমাণের চেষ্টা হচ্ছে সংসদ ইলেকশান ও এই সরকার সুস্থুভাবে করবে। এই তথ্যটা কি দেশবাসী গিলেছে?
      আর বিএনপি মুখে যাই বলুক যামাতের সঙ্গে আঁতাত ছাড়বে না। এ ব্যাপারে আগে দোটানা থাকলেও এখন আর নাই।

  2. শিরোনামটা কেমন যেন হয়ে গেল!
    শিরোনামটা কেমন যেন হয়ে গেল! দেশবাসী’র পর ‘কে’ লাগালে শেষেরটা হওয়া উচিৎ গিলিয়েছে ।আর ‘কে’ বাদ দিলে বাকীটা ঠিকাছে ।

    দেশবাসী গিলে কি হবে? বিদেশী প্রভুরা গিলেছে কিনা সেটাই দেখার বিষয়!

    1. আমি কি তাই বলেছি? বলেছি, এই
      আমি কি তাই বলেছি? বলেছি, এই নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ভাবে করে প্রমাণের চেষ্টা হচ্ছে সংসদ ইলেকশান ও এই সরকার সুস্থুভাবে করবে। এই তথ্যটা কি দেশবাসী গিলেছে? মনে হয় না। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে যত বেশী গোঁয়ার্তুমি হবে ভোট তত কমবে।

  3. আপনি পুরা লেখায় শুধু প্রশ্নই
    আপনি পুরা লেখায় শুধু প্রশ্নই রেখে গেছেন! নিজের কোন মতামত প্রদান করেননি.,… ্ আপনার মতামত কি?

    1. মতামত আছে সাব টেক্সটে। তারপরও
      মতামত আছে সাব টেক্সটে। তারপরও বলছি, আমার মতে আপাততঃ তত্ত্বাবধায়ক জরুরী। এই নিয়ে যত গোঁয়ার্তুমি করবে তত ভোট কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *