একলা দোকার দোলাচল

যখন রেহানার বিয়ে হয় তখন আমারা ক্লাস থ্রিতে। কি অবাক হলেন! আর ওর যখন বাচ্চা হয় সেদিন আমাদের ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষার অংক পরীক্ষা ছিল। কোন ভাবেই হিসাব মিলল না আমার সেদিন। না অংকের না রেহানার মা হওয়ার। মা হতে তো শাড়ি কাপড় পড়তে হয়, পান খেতে হয়, রান্না জানতে হয় এবং অবশ্যই বুদ্ধি থাকতে হয়। ওর কি বুদ্ধি হয়েছে? যদিও ও আমার চেয়ে অনেক বড়। শুধু ও না আমার চেয়ে বয়সে কম বেশী বড় অনেকেই আছে একই ক্লাসে। ও না হয় সবার চেয়ে একটু বেশী বড় তবু তো ও সবার চেয়ে সরল। খেলার নিয়মগুলা তাই জানে না ঠিকমতো। সবাই ওকে ঠকায়। মা’কে বলতে শুনি সংসার করা অনেক কঠিন কাজ- বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে হয়। ও পারবে তো এই কঠিন কাজ করতে? ও পেড়েছিল কিনা জানি না।

দিন যত গড়াতে লাগল কঠিন কাজে মানুষেরা তাদের মেয়েদের তত অধিক পরিমাণে নিয়োজিত করতে লাগল। একে একে লাল শাড়ি পড়ে পুতুল পুতুল বউ হয়ে গেলো হাসিনা, রুমা, সেলিনা, নিপা, রিমা, নাদিরা, হিরা। একদিন নাদিরার সংসার দেখে ভয়ে শিউরে উঠলাম। সে রান্না করতেছে ওর বাচ্চা ময়লা মুখে দিচ্ছে। রান্না রেখে উঠতে পারছে না ভাজি পুড়ে যাবে- ওদিকে বাচ্চা ময়লা খাচ্ছে। ওরে বাবা কি ঝামেলা! আহা রে বেচারা! যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের কি কষ্ট। কল্পনায় দেখতাম তাদের কষ্ট আর ভয়ে ফাটা বেলুনের মত চুপসে যেতাম। মনে বিয়েতে ভীতি চলে আসলো। আমার অন্তত্য কলেজে উঠার আগে বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবু মনে মনে পণ করলাম যেমন করে হোক বিয়ে ঠেকাতে হবে- যতদিন না আমার মনে হবে আমি এই ঝামেলা সামলানোর যোগ্য।

মাধ্যমিকের শেষে এসে লুনার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ে হতে না হতে লুনা বলল সে তালাক দিবে। সমস্যা কোথায়? এখন আমি বুঝি মনের টান, মান অভিমানের সাথে রাগের তফাৎ, মন ও মননের চেতনার কাছে চাওয়া পাওয়ার মুল্য, ভালবাসার দাবির কাছে শারীরিক চাহিদা, শুধু সংসারের জন্য বাচ্চা নয় আবার বাচ্চার জন্য সংসার নয়। একের সাথে অন্যের বিশ্বাস, শুধু ভালবাসার খুঁটি নয় থাকে নির্ভরতা। লুনা আধা পোড়া ইট হয়ে গেছে। চাহিদা ছিল ভালবাসার এসে দাঁড়ায়েছে ভরসার ছাঁদনাতলায়। বিয়েটা টিকলো না। এবার কেনো যেনো চাহিদার সাথে আতংকের নৌকা ভাসল আমার বুকের নদীতে। শুরু হল ভীষণ তোলপাড়। ঢেউয়ের দোলায় নৌকার সে কি দুলুনি! শুধু যোগ্য না আমাকে মন মিলিয়ে নিতে হবে। বর আলু খায় তো আমি পটল, আমি জিন্স টিশার্ট তো সে শাড়ি, আমার রবিবাবু তার হিপ হিপ হুররে, বৃষ্টিতে আমার মন ময়ূরী উল্লাসিতো তো তার কাছে কাঁদার উপদ্রব্য।উহু! এমন হওয়া চলবে না।

অনার্সের শেষ বর্ষে। অনেকদিন পরে বাড়ি গিয়ে মামা বাড়ি যেতে সময় এক মহিলা পথ আগলে বলছে -কেমন আছিস? চোখে অচেনা কৌতূহল নিয়ে মুখে হাসি নিয়ে মাথা কাত করে বললাম -ভাল আছি আপনি ভাল আছেন তো? মহিলা হেসে খুন। আরে হাসে কেনো? আমি অনেককে চিনি না তারমানে হাসবে! আজব! পাশ থেকে সমবয়সী মামাতো বোন বলল -আরে চিনিস না রেহানা! আমাদের সাথে পড়ত। মুখ হাঁ হয়ে গেল। সেটা দেখে রেহানা বলল- হাঁ করে আছিস কেনো? আমি মেয়ে বিয়ে দিয়েছি আর কয়েকদিন পর নানী হবো। আতংকে আমি জমে গেলাম, মনে হল আমার শিকড় মাটির অনেক গভীরে- আমার নড়াচড়া করার শক্তি নেই। বলে কি? এ কি চক্র? এ কি খেলা?

ভালবাসা খুঁজে খুঁজে আমি ক্লান্ত শ্রান্ত বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত। বুঝে গেছি হৃদয়ের মরুতে ভালবাসার মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝড়বে না। ভালবাসা নাটক-সিনেমা, গল্প উপন্যাসের কাল্পনিক শিল্পকর্ম। ভালবাসা আমার জন্য রূপকথার পক্ষিরাজ ঘোড়া। অতএব সংসারে সংসাজার কোন দরকার নেই। উটকো ঝামেলা। উফ! বাবা বাঁচা গেছে। সুমা রুমাদের মত আমার বিয়ে হয়ে গেলে এই চক্রের চাকায় পিষ্ট হয়ে আজ পানের লালা গড়িয়ে পড়ত মুখ থেকে।

চাকুরীজীবী মানুষ আমি। বেশ ভাল আছি। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি। কেউ কিছু বলার নেই। সীমার মাঝে অসীম স্বাধীনতা সবটাই আমার। পোস্টিং হল ভাগ্নির বাড়ির পাশে। খালা ভাগ্নি একসাথে থাকি। ভাগ্নির মেয়ে হল। বাহ! আমি নানী হয়ে গেছি। রাত জেগে পটি পাল্টাই, গোসল করাই, হালুম হুলুম করে খেলা করি। বাচ্চাটা কেমন গুটি গুটি পা ফেলে হাটে। আধো আধো আপি ডাকে আমাকে। কেমন এক অদৃশ্য মায়ার জালে জড়ায়ে গেলাম। অফিসে যেয়ে ছটফট করি কখন বাসায় আসব। জান্নাতির মুখ দেখবো, কোলে নিবো, খাওয়ায়ে দিবো। বদলির চাকুরী- মায়ার বাঁধন কেটে চলে আসতে হলো জান্নাতির কাছ থেকে।

বিগত ছয় মাস জান্নাতির মুখ দেখি সব জায়গাতে। বাচ্চা অপছন্দ করতাম আমি। বাচ্চা মানে কান্না, রাত জাগা, হিসু পরিষ্কার করা- অসহ্য। সেই অসহ্য কাজ করতে না পেরে মাথা ব্যথা করে, দম বন্ধ লাগে। এ আমাকে কোন সুখের বেঅসুখে ধরল! আমি কি ভুল করেছি? আজ আমার একটা বাচ্চা থাকতে পারত কি? যাকে হালুম দিতাম? একা লাগলে বুকের মাঝে টেনে নিতাম? রাজকন্যা-রাজকুমারের গল্প বলতাম। বেশী দুষ্টামি করলে কপট রাগে খুব রেগে যাওয়ার ভান করে বলতাম- মেড়ে হাড্ডি গুড়া করে দিব। সত্যি রেগে গেলে দিতাম দুই এক ঘা।

ভালবাসা না হোক নির্ভর করা যায় এমন কাউকে না কাউকে তো চাইলেই পাওয়া যেতো হাত ধরে বিছানায় যাওয়ার জন্য। উহু যাকে ভালবাসি না শুধু নির্ভর করে তার সাথে কাটায়ে দেওয়া যায় না এক জীবন। যাকে ভালবাসি না তার সন্তানের মা হওয়া যায় না। ধুর- এসব তো শুধুই আমার ভাবনা, চাওয়া, মনের পাগলামি। এসব সত্যি না, সত্যি হলে সুমা, হাসিনা, রুমা, সেলিনা, নিপা, রিমা, নাদিরা, হিরা এরা পারত না। ওরা তো মন মিলিয়ে বিয়ে করে নেই, খুঁজে দেখে না নির্ভরতা না ভালবাসা। ওরা যে দিব্যি সংসার করে জীবন পাড় করে দিলো। ওদের চলছে না? তবে আমার কেনো চলতো না? ওরা হয়তো জানেই না এমন কিছু আছে। মন বলে কিছু আছে। সেখানে মাছের বাচ্চার মতো ক্ষনে ক্ষনে নানা বোধের চোখ, ভাবনার মুখ, ইচ্ছের ঘুড়ি জলের উপর মুখ ভাসায়। বুদ্বুদ ছেড়ে অক্সিজেন নিয়ে বেড়ে ওঠে।

রেহানাদের কথা মনে হলে দম বন্ধ লাগে হাঁপিয়ে উঠি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। মুখে বলি বাবা বেঁচে গেছি। মন বলে এই ভাল আছি। আমি চেয়েছি যাযাবর স্বাধীন জীবন- পেয়েছি। পর মুহূর্তে আনমনা মন বলে -হুম তা পেয়েছি সাথে অসীম শুন্যতার একাকী জীবন। ভাল হত একজন কেউ থাকলে। রেহানাদের মত কিছু বুঝে ওঠার আগে বিয়ে হয়ে গেলে, সংসার হয়ে যেতো। জীবন তো চলেই যেতো- নির্ভেজাল ভালবাসা হীনতায়, নির্বোধ নির্ভরতায় বা ভরসা হীনতায় যে ভাবে হোক। তাতে লাভ কি হতো? ক্ষতিই বা কি হতো? আসলেই কি ভাল হতো? সে থাকলেও কি আমি একা না? রেহানারাও কি একা না? ওরা জানেই না ওরা একা। জানলেও বলতে বুঝে না, আমার মত হা হুতাশ করতে শিখে নেই। বোধের শিকড় পোক্ত হওয়ার আগেই গলা টিপে খুন করেছে চারা গাছ।

একলার একা আমি নিজেকে দোলাই একলা দোকার দোলাচলে।

১৭ thoughts on “একলা দোকার দোলাচল

  1. দিল্লীকা লাড্ডু… হা হা হা।
    দিল্লীকা লাড্ডু… হা হা হা। লেখা ভালো হয়েছে। বিশেষ করে এই লাইনগুলো নাড়া দিলো-

    ওরা হয়তো জানেই না এমন কিছু আছে। মন বলে কিছু আছে। সেখানে মাছের বাচ্চার মতো ক্ষনে ক্ষনে নানা বোধের চোখ, ভাবনার মুখ, ইচ্ছের ঘুড়ি জলের উপর মুখ ভাসায়। বুদ্বুদ ছেড়ে অক্সিজেন নিয়ে বেড়ে ওঠে।

  2. ওরা পারলে আপনি পারবেন না কেন?
    ওরা পারলে আপনি পারবেন না কেন? অবশ্যই পারবেন! আপনি না চাতে বাঙালী নারী?

    নারীরা আজ কাল সব পারে! হরতাল গাড়ী ভাংচুর মিছিল … সব।সত্যি নারীরা এগুচ্ছে।

  3. আমার কাছে একটু বেশি ভালো
    আমার কাছে একটু বেশি ভালো লেগেছে।
    আপনি আমার ভবিষ্যৎ লিখেছেন।
    ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ। :salute: :salute:

  4. অসম্ভব ভাল লেগেছে! শেষ অংশের
    অসম্ভব ভাল লেগেছে! শেষ অংশের আগ-পর্যন্ত বুজতে পারিনি মূল চরিত্রের শান্তনা কি হবে! কোন বিশ্বাস বা যুক্তিতে বাকি জীবন পাড় করবে?

    জীবন তো চলেই যেতো- নির্ভেজাল ভালবাসা হীনতায়,
    নির্বোধ নির্ভরতায় বা ভরসা হীনতায় যে ভাবে হোক।
    তাতে লাভ কি হতো? ক্ষতিই বা কি হতো? আসলেই কি ভাল
    হতো? সে থাকলেও কি আমি একা না? রেহানারাও কি একা না?
    ওরা জানেই না ওরা একা।

  5. আমার ক্লাসের কমপক্ষে দশটা
    আমার ক্লাসের কমপক্ষে দশটা মেয়ের বিয়ে হ​য়ে গেছে। অনেকের বিয়ে আবার আমার কলেজের টিচাররা দিয়েছে। মানুষের এত বাজে ধারনা মেয়েদের ব্যাপারে কবে পাল্টাবে? কেন মেয়েটিকে আগে আগে বিয়ে দিতে হবে? মেয়েটি কি মানুষ না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *