চেঞ্জ

– স্যার আপনি কোন বিষয় নিয়ে পড়েছেন?
– ত্রয়ী, তোমার আব্বু কখন আসবেন?
– চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। ৬টার দিকে চলে আসে। আপনার কি দেরি হচ্ছে?
– না। আমি সময় নিয়েই এসেছি। তো? তোমার পড়ালেখা কেমন চলছে?
– এইতো মোটামোটি।
– এখন মনযোগ দিয়ে পড়ালেখা করা দরকার। এটাই প্লাটফর্ম। এখানে যত পরিশ্রম করবে ততই নিজের প্লাটফর্ম শক্ত হবে।
– হুম… দোয়া করবেন।
– দোয়া তো আছেই। ভাল করবে ইনশাল্লাহ।
– স্যার আপনি কোন বিষয় নিয়ে পড়েছেন জানা হল না।

– স্যার আপনি কোন বিষয় নিয়ে পড়েছেন?
– ত্রয়ী, তোমার আব্বু কখন আসবেন?
– চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। ৬টার দিকে চলে আসে। আপনার কি দেরি হচ্ছে?
– না। আমি সময় নিয়েই এসেছি। তো? তোমার পড়ালেখা কেমন চলছে?
– এইতো মোটামোটি।
– এখন মনযোগ দিয়ে পড়ালেখা করা দরকার। এটাই প্লাটফর্ম। এখানে যত পরিশ্রম করবে ততই নিজের প্লাটফর্ম শক্ত হবে।
– হুম… দোয়া করবেন।
– দোয়া তো আছেই। ভাল করবে ইনশাল্লাহ।
– স্যার আপনি কোন বিষয় নিয়ে পড়েছেন জানা হল না।
– দেখ ত্রয়ী, পরিস্থিতির স্বার্থে আমাদের অনেক সময় অনেক কিছু বলতে হয়। তোমাদেরকেও অনেক সময় বলতে হয়েছে। আমি কাউকে সাধারণত বলিনা কিন্তু তোমাকে বলছি তুমি কি মনে করবে জানিনা কিন্তু এটাই বাস্তব।
– আমি কিছু মনে করব কেন? আমি আসলে মনে করতে পারছি না আপনি কোচিং-এ পড়ানোর সময় বাংলায় পড়েন বলেছিলেন নাকি ইংলিশ।
– না আসলে আমি হিস্ট্রির স্টুডেন্ট। কিন্তু তুমি তো দেখেছই আমি ইংরেজী, বাংলা, সমাজ পড়াতাম। স্টুডেন্টরা আমার কাছে পড়তে চাইত, পড়া বুঝত তাই আমাকে পড়াতে হত। আমি বলতে চাইতাম না কিন্তু তোমাদের প্রতিষ্ঠান আমাকে খুব রিকোয়েস্ট করেছিল তাদের স্বার্থে বলতে যে আমি ইংরেজী নিয়ে বা বাংলা নিয়ে পড়ি।
– ও! কিন্তু স্যার এটা ঠিক না।
– আমি জানি ঠিক না কিন্তু আমাদের গার্ডিয়ানরা চায় ঢাবি, বুয়েটের ভাল বিশয়ে পড়া টিচার তা না হলে টিউশনি দেয় না। আমি এভাবে কতজন ভাল টিচার দিয়েছি। এখন কতজন বুয়েটের স্টুডেন্ট না তবু বুয়েট বলে চালাচ্ছে। কিন্তু তারা যে খারাপ পড়ায় তা না। অনেক সময় এমন হয় বুয়েটের স্টুডেন্ট বুঝাতে পারেনা, পড়াতে পারেনা কিন্তু ন্যাশনাল ভার্সিটির এক স্টুডেন্ট বুঝাতে পারছে। তখন চালাতেই হয় এভাবে।
– স্যার আপনারা এভাবে চালান বলেই গার্ডিয়ানরা এভাবে চায়। আপনি যদি ন্যাশনাল ভার্সিটি বলেই প্রমাণ করতে পারতেন যে বুয়েটের স্টুডেন্টের চেয়ে ভাল পড়াতে পারছে তাহলে আর এমন হত না।
– তা ঠিক না। তুমি বাস্তবতা বুঝ না। আমার কাঁধের উপর ভর করে আছে আমার পরিবার। আমার হাতে কোন চাকরি নেই। এই টিউশনি দিয়েই চালাতে হবে। আর বড় কথা; তোমাকে একটা ঘটনা বলি, আমি তখন প্রথম ঢাকায় এসেছি। ইংরেজী পারি কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের মত ভাল না। তো একটা বাসায় আমাকে ইংলিশ মিডিয়ামের স্টুডেন্ট পড়াতে হবে। যেহেতু ঢাবির ছেলে তাই ওরা আমাকেই দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল সব কিছু ইংরেজীতে বলতে হবে। আমি তখন প্রোফিসিয়েন্টের মত ইংলিশ বলতে পারি না। তো একটা ভুল হয়েছিল। কথায় কথায় ‘কুড’ এর জায়গায় ‘ক্যান’ বলেছিলাম। এরপর ওরা আমাকে বাজেভাবে অপমান করে বের করে দেয়। আমার মাথায় তখন জেদ চেপে বসে যেভাবেই হোক ইংরেজীতে প্রোফিসিয়েন্ট হতেই হবে। এরপর কিন্তু আমি পেরেছি। আমি তোমাদের ইংরেজী পড়িয়েছি। তোমরা আমার কাছে পড়তে চাইতে বুঝতে কিন্তু আমি ছিলাম হিস্ট্রির স্টুডেন্ট। বাট আমি যদি হিস্ট্রির বলতাম তাহলে তোমরাও আমাকে পেতে না আমিও পড়াতে পারতাম না।
– স্যার আমি আমার বাবা-মাকে দেখেছি, তারা কখনো টিচার কিসে পড়ছে তা নিয়ে ব্যস্ত ছিল না। আমি কোচিং পরে ছেড়ে দিয়েছি এই কারণেই যে আমি ওভাবে প্রেসারে থাকতাম না, বুঝতাম না। আমার মত ফাঁকিবাজের জন্য কোচিং না। কোচিং-এ আপনাদের মত টিচাররা ছিল। কিন্তু আমি পরে পড়েছি লেদারের এক স্টুডেন্টের কাছে। কারণ উনি আমার কাছে আদায় করত। আমি ওনার কাছেই পড়তে চেয়েছি আমার প্যারেন্টস কিছু বলেওনি। সুতরাং আপনারাও যদি স্টুডেন্টদের মনে এই ব্যাপারটা ঢুকাতে পারেন তাহলে স্টুডেন্টই আসবে গার্ডিয়ানরা কিছু করবে না।
– হুম… সেটা ঠিক। আমি ভেবেছি আমার বিসিএসটা হয়ে গেলে আমার সব স্টুডেন্টদের একটা লেকচার দিব। তারা যাতে বুঝতে পারে কোনটা ঠিক।
– স্যার এক লেকচারে কিছু চেঞ্জ হয় না। তাছাড়া আপনি নিজেই চেঞ্জ হননি। আপনি নিজেই এই ভুলটা ধরে আছেন।
– ত্রয়ী, লুক আমি যদি একটা পজিশনে পৌঁছাতে পারি তাহলে আই উইল ব্রিং আ চেঞ্জ।
– স্যার পারবেন না।
– আই প্রমিস পারব। তুমি দেখ।
– স্যার যে আপনি প্রতিষ্ঠানে স্বার্থে ভুল বলেছেন সেই আপনি যখন বড় ক্ষেত্রে যাবেন স্বার্থ তখন অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের, তাছাড়া ওরকম ক্ষেত্রে কি হয় সে ধারনা আমার আছে, পরিবারের মানুষদের দেখেছি। তাই বলছি আপনি পারবেন না।
– চেষ্টা করব। দেখা যাক আসলে আমাদের সিস্টেমটাই এমন হয়ে গেছে।
– আমরা জেনেশুনেই এই সিস্টেম মেনে নিয়েছি।

অনেক আগে আমার এক স্যারের সাথে আমার এই কথোপকথন হয়েছিল। সেদিন বাবার কাছে বিসিএস-এর কাগজ সত্যায়িত করতে এসেছিলেন। অনেকদিন পর তার সাথে ক’দিন আগে আবার দেখা হল। কালো A15 allion new shape- এর উপর পরা রোদের আলোর ঝলকানিতে আমি প্রথম ধাপে স্যারকে দেখতেই পারিনি। একটু পর পেছন থেকে যখন ডাকলেন, ‘ত্রয়ী না?’ আমি পেছন ঘুরে দেখি স্যার। বিশাল চেঞ্জ! সেদিনের সেই ভীত চোখজোড়া দিয়ে আজকে আত্মবিশ্বাসের অমৃতধারা ঝড়ে পড়ছে। বাবার সামনে থরথর করে কাঁপা সেই হাত আজকে আগ বাড়িয়ে বাবার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করছে। পরনে সদ্য ইস্ত্রিভাঙ্গা আকাশী শার্ট, কালো প্যান্ট । পায়ে ইটালিয়ান সোল শু। গ্রহ নক্ষত্রের নামে থাকা আংটির বদলে হাতে Sony Xperia Z. পেছনে থাকা ড্রাইভার স্যারের ব্যাগ আর ল্যাপটপ বহন করছে। স্যারকে দেখে মনে হল ইস্ত্রিবিহীন মলিন শার্টের বুকপকেট থেকে বিড়ি বা নেভীর বদলে ফাইভ-ফাইভ হয়ে বেরিয়ে এলেন। স্যারের সেই চাকচিক্যের মাঝে আমি খুঁজে পাই চেঞ্জ। আমি সেদিনের কথার সাথে মিলিয়ে নিতে থাকি। না, স্যার ভুল বলেননি সেদিন। আসলেই তিনি চেঞ্জ এনেছেন। তিনি তার প্রমিস রেখেছেন। শুধু আফসোস! আমার ‘চেঞ্জের’ অর্থ তিনি ধরতে পারেননি।

২১ thoughts on “চেঞ্জ

  1. চেঞ্জ হওয়া সম্ভব, কিন্তু
    চেঞ্জ হওয়া সম্ভব, কিন্তু চেঞ্জ করাটা খুব কঠিন। সবাই পারে না। ভালো লাগল আপনার অভিজ্ঞতা পড়ে।

  2. ভাল্লাগছে । আপনি বরাবর এর মত
    ভাল্লাগছে । আপনি বরাবর এর মত ভাল একজন গল্পকার । ব্যক্তিগত কথাকাব্য টাও ভাল্লাগছে

  3. অধ্যবসায় মানুষকে অবশ্যই চেঞ্জ
    অধ্যবসায় মানুষকে অবশ্যই চেঞ্জ করে দিতে পারে।তাতে শিক্ষক হোন কিংবা যে কোন পেশাজীবিই হোন।কিন্তু আপনি যে চেঞ্জের কথা বলে আফসুস বোধ করেছেন, সেটা সবার ক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে ।ইহাই স্বাভাবিকতা ।

  4. ভাল লেগেছে! তবে কেন জানি
    ভাল লেগেছে! :থাম্বসআপ: তবে কেন জানি মনে হচ্ছে আরও চমৎকার হতে পারত!!!
    আরেকটু যত্ন নিয়ে লিখলে বা পোস্টটা দিতে তাড়াহুড়ো না করলে আরও অনবদ্য হত হয়ত!

    1. ধন্যবাদ। শেষ অংশে এসে কেমন
      ধন্যবাদ। শেষ অংশে এসে কেমন জানি এলমেলো হয়ে যায়। এর পরেরবার চেষ্টা করব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *