নারী ক্ষমতায়নে ধর্মের বাধা ও আফগানিস্তানের ফাউজিয়া কোফির প্রতি শুভকামনা

২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই ভোট আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মধ্যে দিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইয়ের দীর্ঘ এক দশক ব্যাপী শাসনের অবসান হবে। এর চেয়ে বড় কথা কট্টর রক্ষনশীল আফগানে ধর্মীয় মৌলবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এক লড়াকু নারীর উত্থান ঘটেছে। তিনি ফাউজিয়া কোফি। সামনের নির্বাচনে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী।


২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই ভোট আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মধ্যে দিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইয়ের দীর্ঘ এক দশক ব্যাপী শাসনের অবসান হবে। এর চেয়ে বড় কথা কট্টর রক্ষনশীল আফগানে ধর্মীয় মৌলবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এক লড়াকু নারীর উত্থান ঘটেছে। তিনি ফাউজিয়া কোফি। সামনের নির্বাচনে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী।

কারজাইয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, ষড়যন্ত্র এবং হিরোইন বাণিজ্যসহ তালেবানদের সাথে সমাঝোতা করতে না পারার ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। তালেবানরা দেশটিতে জঙ্গি হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাধারণ জনগণ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ফাউজিয়া কোফি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ আলোচিত হয়েছেন ইতোমধ্য। তিনি আফগানিস্তানের জাতীয় সংসদের সদস্য এবং নারী অধিকার কর্মী। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরো আছেন রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইয়ের বড় ভাই কাইয়ূম কারজাই, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ।

ফাউজিয়া কোফি ইতোমধ্যে তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ এবং টুইটারের মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেছেন। পশ্চিমা মিডিয়া তার নির্বাচনী প্রচারণার ফলাও করে প্রচার করছে এবং তার সাম্প্রতিক প্রকাশিত বই ‘দ্য ফেভারিট ডটাস: ওয়ান উইমেনস ফাইট টু লিড আফগানিস্তান ইনটু দ্য ফিউচার’ এর প্রশংসিত হয়েছে।

কয়েক মাস আগে একটা ডেইলি শো-এ উপস্থিত হয়ে তার জীবনের সংগ্রাম, রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আফগানিস্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেন ফাউজিয়া কোফি :

এটা আমার পছন্দ। আমার সামনে অনেক সুযোগ ছিল। যেমন, আমি অন্যদের মতো ইউরোপে যেতে পারতাম কিংবা আমেরিকায় এসে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতাম। অথবা আমি দেশে ফিরে গিয়ে সামান্য পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারতাম। আমি দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছি। যদিও এটা মোটেও সহজ ছিল না।

আফগানিস্তানে ধর্মীয় ও জঙ্গিয় বলয়ে নারী রাষ্ট্রপতিকে মেনে নেয়ার অবস্থায় নেই। সেক্ষেত্রে ফাউজিয়া কোফিকে জীবন বাজি রেখেই লড়াইটা চালিয়ে জেতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফাউজিয়া কোফি ইতোমধ্যে কয়েকবার আলিবান আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছেন। তাছাড়া এর আগে যত মহিলা রাষ্ট্রপতি পদে লড়েছেন, তারা কেউ-ই প্রথম পাঁচজনের মধ্যে আসতে পারেন নি। কোফি ২০০৫ সালে নির্বাচনে একজন পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেশটিতে নারী পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তবে কোফি’র রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আগের সবার থেকে তাকে এগিয়ে রাখবে বলে অনেকে মনে করছে। তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে প্রাধান্য দিয়েছে। এ দুটোই আফগানদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কম আয়ের আফগান জনগণ এবং নারীদের ভোটে তিনি নির্বাচনে জিতে যেতে পারেন এমন মত দিয়েছেন অনেকে। অবশ্য এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তালেবানদের হাত থেকে তিনি নির্বাচন পর্যন্ত বেচে থাকতে পারবেন কিনা! ফাউজিয়া কোফিকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইটারে একজন লিখেছেন

তিনি যদি ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বেঁচে থাকেন, তাহলে তিনি আফগানিস্তানের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। আর তিনি হলেন ফাউজিয়া কোফি।

এক মার্কিন নাগরিক লিখেছেন,

ফাউজিয়া কোফি, আফগান মহিলা এমপি। তিনি ২০১৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে চাইছেন: আফগানিস্তান কি আমেরিকাকে পরাজিত করতে পারবে- প্রথম নারী নেতৃত্বে?


ফেসবুক ব্লগে অনেক জোরালো প্রচারনা চালাচ্ছেন তিনি। উপরের ছবিটি ফাউজিয়া কোফির নির্বাচনী প্রচারণার ছবি। এখানে লেখা আছে ‘আপনারা আমার পাশে থাকলে সবাই মিলেমিশে এই দেশ গড়বো’।

উপরের ছবিটি কোফি’র ফেসবুকে অনলাইন প্রচারণা একটি অংশ। অনেক মানুষই ছবিতে মন্তব্য করে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াকে সমর্থন দিচ্ছেন। আবার তালেবানদের বংশধর আর ধর্ম নামক ব্যাধিতে আক্রান্ত কিছু মানুষের মন্তব্য বেশ লক্ষনীয়।
আবদুলরহিম মুখলিস লিখেছেন:

দেশের পুনর্গঠনের দায়িত্বে যদি নারীরা থাকে, তাহলে পুরুষরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে।

শেষে, একটি উদ্বৃতির উল্লেখ করে তিনি তার মন্তব্যে আইনি বিধানের কথা বলেছেন:

নবী বলেছেন: একটি দেশের ভাগ্য যদি নারীর হাতে থাকে, সে দেশটির জন্য অপেক্ষা করছে ধ্বংস এবং দুর্দশা।

এবার আসি নবীর কথাতে। নবী বলেছেন, একটি দেশের ভাগ্য যদি নারীর হাতে থাকে, সে দেশটির জন্য অপেক্ষা করছে ধ্বংস এবং দুর্দশা। সেরকম কিছু ধ্বংস হয়ে যাওয়া জাতির নারী রাষ্ট্রপ্রধানের কথা তুলে ধরছি-
আমরা দেখেছি মার্গারেট থ্যাচারের মতো লৌহ মানবীকে। তার মতো রাষ্ট্রপ্রধান পেয়ে ইংল্যান্ড ধন্য হয়েছে। ১৯৭৪ সালে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইসাবেলা মার্টিনেজ দি পেরন। ১৯৮০ সালের আগষ্টের নির্বাচনে আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ভিগদিস ফিনবোগাতির। টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। এরপরের প্রেসিডেন্টও ছিলেন নারী ম্যারি রবিনসন। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্টও নারী ম্যারি মাক্যালিজ।

ফিলিপাইনে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন গ্লোরিয়া ম্যাকাপাগাল আরোয়ো। এই ফিলিপাইনেই ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন একুইনো কোরাজন। দুই মেয়াদের ৬ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। শ্রীলংকার চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা(১৯৯৪), সুইজারল্যান্ডের রুথ মেজলার আর্নল্ড(১৯৯৯), পানামার মিয়েয়া মস্কসো(১৯৯৯), ইন্দোনেশিয়ার মেঘবর্তী সুকর্নপুর্তি(২০০১), চিলির মিশেল বেশেট(২০০৬), ইসরাইলের দালিয়া ইতজিক(২০০৭), ব্রাজিলের দিলমা রোজেফ(২০১১), সাউথ কোরিয়ার পার্ক জুন হোয়ে (২০১৩) সবাই নারী রাষ্ট্রপ্রধান।

বর্তমান ও অতীতে বিভিন্ন দেশে কয়েকশো নারী রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন, রয়েছেন। যাদের ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে সে দেশের মানুষ ব্যাপক উল্লসিত। নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই দেশগুলো একটাও ধ্বংস হয়নি বরং এগিয়েছে অনেক। তাহলে এইসব নারীদের সামনে নবী মুহাম্মদকে তার বানী নিয়ে দাড় করিয়ে দিলে কি অবস্থা হতে পারে?

আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নারী, প্রধান বিরোধীদলের চেয়ারপার্সনও। আগামী ২০-২৫ বছরেও পালাক্রমে নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদেশে নারী নেতৃত্ব নিয়ে কারো সমস্যা নাই। সমস্যা তৈরি হয় ধর্মের প্রসংগ আসলেই। ধর্ম নিয়ে যারা ব্যাবসা করে তারা তো আছেই, ধর্ম মানতে গেলেই নারীর ক্ষমতায়নে সমস্যা তৈরি হতে বাধ্য। কারন ধর্ম মানতে গেলে নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী ধর্মের বানীগুলো আপনাকে তো মানতেই হবে!

জন্মগতভাবে আমি মুসলিম পরিবার থেকে এসেছি। একারনে ইসলাম ধর্মের সাথেই আমার বেশি ওঠাবসা। একজন নারী হিসেবে অন্যান্য ধর্মের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের নারী প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভবই না। আর কারো পক্ষে সম্ভব হলে আমি অবাক হই। হতাশ হই। ইসলাম ও তালেবান অধ্যুসিত অন্ধকারাচ্ছন্ন আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে আলো ফোটাবে ফাউজিয়া কোফি। এই শুভকামনা রইলো তার প্রতি।

১০ thoughts on “নারী ক্ষমতায়নে ধর্মের বাধা ও আফগানিস্তানের ফাউজিয়া কোফির প্রতি শুভকামনা

  1. ফাউজিয়া কোফির জন্য শুভকামনা।
    ফাউজিয়া কোফির জন্য শুভকামনা। আফগানিস্থান থেকে দূর হোক মৌলবাদ এবং মার্কিনী যৌথ আগ্রাসন। মানুষ মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাক।

  2. প্রথমে কিছুটা অবাক লাগছিল
    প্রথমে কিছুটা অবাক লাগছিল আফাগানে নারী নেত্রী র আবির্ভাব কিভাবে হয়, পরে উনার সাহসীকতা ও প্রচারণা দেখে আশার সঞ্চার হয়েছে কিন্তু ভয় হয় উনার পরিণতি যদি আবার বেনজীর ভূট্টোর মত হয়!!!!
    এনিওয়ে, আপ্নার ফেবু আইডি কি হ্যাক হইছে নাকি?

    1. আমার ফেসবুক আইডি অকেজো হয়ে
      আমার ফেসবুক আইডি অকেজো হয়ে গেছে। শকুনের দল ঝাপায় পড়ছে আইডি খাওয়ার জন্য। গণরিপোর্ট হচ্ছে সমানে। প্রথমে ২৪ ঘন্টা ছিলাম ব্লক। সেইটা শেষ হওয়ার দুইঘন্টার মাথায় ৩ দিনের জন্য ব্লক। স্ট্যাটাস, কমেন্ট, শেয়ার এমনকি লাইকও দিতে পারি না। এরপর নাকি আইডিই বাতিল হয়ে যাবে। এযাত্রায় মনে হয় না আইডিটা বাচবে।

  3. আফগানিস্তানের মতো দেশে নারী
    আফগানিস্তানের মতো দেশে নারী নেত্রীর অভ্যুত্থান, মৌলবাদীর মুখে চরম থাপ্পড়।
    আর নবীর বানীর উত্তরে যে উদাহরণ দিলেন সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. মুক্ত হোক পরাধীনতা শৃঙ্খল/
    মুক্ত হোক পরাধীনতা শৃঙ্খল/ এভাবেই যেন সব মৌলবাদিতা দূর হয়. .
    ফেবুতে আপনাকে মিস করছি.

  5. আপনার লেখায় ২ টি দিক ষ্পষ্ট ।
    আপনার লেখায় ২ টি দিক ষ্পষ্ট । প্রথমত: আফগানিস্থানে নারী নেতৃত্বে বিকাশ এবং দ্বিতীয়ত: নারীর ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্থ করতে ধর্মীয় অনুশাসন ব্যবহার ।
    আফগানিস্থানে নারীদের দুরাবস্থা আমরা বিভিন্নভাবে জানছি । “মাই ফরবিডেন ফেস” বইটাতে পড়েছি, তারেবান শাসনের ফলে সেইদেশের নারীদের উল্টোপথে হাঁটানো হচ্ছে । কান্দাহার সিনেমাতেও দেখেছি । আর যুগে যুগে পুরুষতান্ত্রিকতা নারীদের উপর চাপিয়ে দেয় নানা নিয়ম-কানুন । ধর্ম সেই আগুনে আরো বাতাস দেয় বৈকি ।

    ভালো লেগেছে আপনার লেখা ।
    শুভকামনা ফাউজিয়া কোফির জন্য ।

  6. বর্তমানে থ্যাইল্যান্ড এবং
    বর্তমানে থ্যাইল্যান্ড এবং দক্ষিন কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী গন কিন্তু নারী।
    থ্যাইল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ” ইনলোক সিনাওয়াত্রা “।
    কোরিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ” পার্ক গুয়ান হে ” ।
    কই তাদের দেশে তো কোন খারাপ প্রভাব পরে নাই। শুধু মাত্র এই মুসলিম শাষিত দেশ গুলাতে নারীর ক্ষমাতায়ন হলে অপরাধ কিসে ?

Leave a Reply to ডাঃ আতিক Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *