অতিথি তিথি

পুরা শরীর রিক্সার হুডের ভিতরে নিয়ে নেওয়া গেলে তিথি নিয়ে নিত। শামুকের মত নিজেকে খোলসের ভীতরে গুটায়ে নেওয়া গেলে খুব ভাল হত। জল-ঝড়, ঠাণ্ডা- গরম খোলসের উপর দিয়ে চলে যেত। বৃষ্টির ছাট এসে বুক পর্যন্ত ভিজে যাচ্ছে। প্রবল বাতাসের সাথে মুষলধারে বৃষ্টির বিশালাকার ফোটা হালকা পলিথিনের পর্দায় মানাচ্ছে না। শাড়ি একটু একটু করে জল শুষে নিচ্ছে। একসময় কাপড় ভিজে কাক হয়ে যাবে। হুড খোলা রিক্সায় শীতল বৃষ্টিতে দেহের ধুলা ধোয়ার, ভার হয়ে থাকা মাথা হালকা করার, মনের ক্লান্তি ঝেড়ে স্নিগ্ধ শান্ত করার এমন সুবর্ণ সুযোগ হারাতে ইচ্ছে করছে না। তবু হারাতে হয় বারেবারে মনের বিরুদ্ধে যেতে হয় নিজেকে সমাজের বিরুদ্ধে যাওয়া রুখতে। আধা খাওয়া সিগারেটে মত আধাখেঁচড়া ভিজতে বিরক্ত লাগছে। বৃষ্টি ভেজা রিক্সা ভ্রমণ সুখ কল্পনা ছাড়া কিছু না।

বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব বেশী না আবার নেহাত কম না। স্থান থেকে গন্তব্যের পথে রিক্সা ছাড়া অন্য বাহনে যেতে হলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে যেতে হবে। দূরত্ব বেশী হওয়ায় রিক্সা পাওয়া দুষ্কর। প্রতিদিন সকালে চিন্তিত মুখে রিক্সার জন্য ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত, ফিরতে সময় অপরাধীর মত মুখ কাচুমাচু করে আবার খড়ের গাদায় সুচ খুঁজা। সুচ খোঁজা অভিযান থেকে তিথিকে মুক্তি দিতে একটা রিক্সা মাস ভিত্তিতে ঠিক করে দিয়েছে মামা।

-মা কিছু মনে নিও না একখান কথা কই, আমার কোন মেয়ে নাই। তোমারে পেরথম দিন থেকে আমার মেয়ে মনে করি। তোমারে নিয়ে পুলাপান গুলা কোন ফাউ কথা কোক সেইডা চাই না। একটু গোছগাছ হয়ে বসো মা। না হলে কেউ কিছু কইলে আমার বুকে শেলের মত হিংবো। খেমতা নাই থাকলে কাইটা গাঙয়ে ভাসায়ে দিতাম।

রিক্সাওয়ালার মা ডাক মাথার ভিতরে ঘুরছে। চিন চিন করে ব্যথা করছে বুকের বাম পাশে। মা সম্বোধনে রিক্সাওয়ালার মা হয়ে যাচ্ছি না তবু তো মা পরিচয়ে পরিচিত করেছে। অথচ সে এই রিক্সায়ালার কাছে শুধুই একজন যাত্রীর পরিচয়ে পরিচিত। একটা মানুষের কত গুলা ঠিক কতগুলা পরিচয় থাকে। একজন মানুষ কতগুলা সম্পর্কের সম্বোধন বহন করে চলে। এক জীবনে তাকে কি কি হতে হয়? কতগুলা সম্পর্কের বাঁধনে বেঁধে সম্বোধনের মূর্তির মুখোশ পড়ে পরিচিয় দিতে হয়, সম্মানিত করতে হয়- নিজেকে নিজের কাছে, সমাজের কাছে, মানুষের কাছে?

সন্তান জন্মের পরে লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে মা-বাবার কাছে সন্তান হয়ে যায় মেয়ে ছেলে। এইত শুরু পরিচয়ের পথ চলা। মা-বাবার মেয়ে, ভাইয়ের বোন, বোনের ভাই। বিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রি, পথের পথিক। চারপাশে ভিড় করে থাকে হাজারও পরিচয়ের মুখোসে ঢাকা মুখ। নানা-নানু, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, খালা-খালু, মামা-মামি, ফুপা-ফুপি। যতদিন যায় সম্বোধনের সুতা জাল বুনতে থাকে। সে জাল কত বড় হয়? কত সুতায় বুনা হয়? সে জালে মানুষ কতটুকু জড়ায়? সেটা কেউ হিসাবের খাতায় টুকে না রাখলেও ভুলে যায় না, বলা ভাল যেতে পারে না অতিক্রান্ত করে- সম্বোধনের ডাক। কখনও যাত্রী কখনও ভাড়াটিয়া আবার কখনও বাড়িওয়ালা। বিকি কিনির বাজারে কখনও খরিদ্দার কখনও বিক্রেতা। কিছু সম্বোধন বিড়ম্বিত করে, কিছু অবহেলা বাড়ায়, কিছু জীবনকে করে তোলে বিভীষিকাময় আবার কিছুর জন্য হয়ে ওঠে জীবন আনন্দময়। একই আমি কখনও বন্ধু কখনও বৈঠকখানায় অতিথি। আবার অন্দরমহলের বউঠান/জামাইবাবু। স্থান, কাল, পাত্র, পরিবেশ-পরিস্থিতির জন্য একই মানুষকে নানা রঙের, নানা গন্ধের ও বিভিন্ন বর্ণের পরিচয়ের খোলসের সম্বোধনে সাড়া দিতে হয়।

একটা সম্বোধনের সম্পর্ক শুধু মাত্র একটা সম্পর্ক যা তিথিকে দিতে পারে পরিচয়। যে সম্পর্ক বলে দিবে সে এতিম না, যে সম্পর্কের সম্বোধন এতিমের জায়গা দখল করে নেবে। কেউ আছে একজন তার জন্য। শুধু একটা সম্বোধন নিয়ে আসবে জীবনে- সেই সম্বোধনের জন্য একটা সম্পর্কের সুতা খুঁজে খুঁজে তিথি আজ ক্লান্ত-শ্রান্ত মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত । ক্ষণে ক্ষণে চমকে চমকে ফিরে ফিরে তাকাত পথের দিকে যদি কেউ এসে বলে মা আমি তোর বাবা। তোর পরিচয় আছে, সম্বোধন আছে- তোর কাছে, তোর বাপের কাছে এবং সমাজের আর দশজন মানুষের কাছে। তুই মেয়ে- তুই আমার মেয়ে, আমি তোর বাপ। আসেনি দীর্ঘ সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে ক্লান্ত বিকেলে নদীর পাড় রক্তিম করে সূর্য অন্ধকার রাতের কোলে আরও একা করে দিয়ে যেত তিথিকে। কেউ আসেনি বলেনি মা তুমি এতিম না। নানির কোলে পালিত হওয়া পালক না। মামাতো ভাই বোনেরা তার মা’র কোলে আশ্রয় খুঁজে নেয়। তিথি গুটিসুটি দিয়ে বুকের ফাঁকা জায়গা বন্ধ করে রাখে। অমুক অমুকের ছেলে মেয়ে আর তার পরিচয়- সে অমুকের ভাগ্নি। অমুক বাড়ির ভাগরাহালি!

মামাদের অন্যে প্রতিপালিত হওয়া তিথি জানে মায়ের বিয়ের পরে বাবা বিদেশে চলে যায়। তার জন্মের সময় মা মারা যায়। তাই বাবা রাগ করে আছে তার উপর। কোন একদিন অভিমান গলে জল হলে সে আসবে তাকে কোলে তুলে নিবে, জড়িয়ে ধরবে বুকের সাথে সবার বাবা যেমন ধরে। খেতে সময় প্লেটে খাবার তুলে দিবে। ঘরে ফিরতে সময় তিথির পছন্দের খাবার নিয়ে আসবে। আদর করবে মা বলে, মাথায় হাত বুলায়ে দিবে, জ্বরের সময় জল পট্টি দিবে। মেলায় নিয়ে যাবে হাত ধরে। কোন এক বিকালে নিয়ে যাবে মায়ের কবরের কাছে সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে নদী পাড়ে এসে সন্ধ্যা কাটায়ে দিবে দুজনে গল্প করে।

তিথি ব্যাকুল হয়ে থাকে বাবা নামক অদেখা বস্তুর জন্য। বাবার মেয়ে হয়ে ওঠার জন্য, বাপ-মেয়ের সম্পর্কের সুতায় বুনা জালে মেয়ে নামক সম্বোধনে জড়াতে মন কাঁদে তার। সে আর কোন সম্বোধন চায় না। যতগুলা পেয়েছে এইখানে সম্পর্কের জাল বুনা বন্ধ করতে পারলে খুশি হত। কিন্তু সেটা সম্ভব না। সে না চাইলেও আরও অনেক সম্পর্কে তাকে জড়াতে হবে। অতিক্রম করতে হবে ছোট বড় অনেক সম্পর্কের সম্বোধন। সে সবসময় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আমি নতুন কোন সম্পর্কে জড়াব না। হব না কারও প্রেমিকা, বউ, মা, চাচি, শাশুড়ি, নানী। যেটা নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা নেই সেটার জালে জড়ায়ে হয়ে গেছি খালা, ফুফু, নাতনি, ভাগ্নি, বন্ধু, ক্রেতা, যাত্রী, ছাত্রী, শিক্ষক আরও কতশত জানা অজানা পরিচয়ের ধারক বাহক। যেটা আমার হাতের নাগালে আছে তাকে আমি নিয়ন্ত্রন করব। সে মানুষের সমাজে জন্য একটা পরিচয়ই মনে প্রাণে চায়- জন্মদাতার পরিচয়। যার জন্য এই অতিথিশালায় আগমন তার ভালবাসা, নৈকট্য, সম্বোধন।

তিথি জানে এই পৃথিবীর সরাইখানায় তার একমাত্র পরিচয় অতিথি। পৃথিবীতে অতিথি হয়ে এসেছে অতিথি হয়ে চলে যাবে। প্রকৃতির কাছে সে প্রকৃতির আর দশটা অতিথির মত অতিথি। তার অতিথি পরিচয়ের চেয়ে বেশী পরিচয়ের দরকার নেই প্রকৃতির। এই প্রকৃতির অতিথিশালায় সময় অতিবাহিত করতে তারও দরকার নেই অন্য কোন পরিচয়ের। বৈঠকখানার অতিথি সে- অন্দরমহলে যেতে চায় না। প্রকৃতির কাছে একটাই পরিচয় একটাই সম্বোধন অতিথি। হাজার লক্ষ্য পরিচয়ের কোন প্রয়োজন প্রকৃতির নেই, নেই কোন মুল্য। প্রকৃতির কাছে না সে কারও ভাগ্নি, না সে রিক্সাওয়ালার যাত্রী, না সে কোনো দোকানদারের খরিদ্দার, না সে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, না সে ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় তিথি ম্যাম। সে কিছুই না। পৃথিবীর সরাইখানায় তিথি অতিথি শুধুই অতিথি।

১১ thoughts on “অতিথি তিথি

  1. কাব্যিক লেখা… আবেগ আছে, তবে
    কাব্যিক লেখা… আবেগ আছে, তবে মেসেজটা ঠিক ধরতে পারলাম না!

    তাতে অবশ্য লেখকের কিছু এসে যাওয়ার কথা না!
    😀
    শুভকামনা রইল… :ফুল:

    1. কে বলেছে ম্যাসেজ ধরতে না
      কে বলেছে ম্যাসেজ ধরতে না পারলে আমার কিছু যায় আসে না। লেখার কষ্ট টাই বৃথা যায়। -একজীবনে কত সম্বোধন পায় মানুষ দরকারি অদরকারি। কখনও ভেবে দেখেছেন কি? বাপ মায়ের ছেলে আপনি এক এক স্থানে এক এক সম্বোধনে পরিচিত হচ্ছেন। ডাক্তারের কাছে রোগী, রিক্সায়া যাত্রী, ক্রেতা- বিক্রেতা, বাপ, চাচা, খালু, নানা, জামাই, পথিক, চোর, ডাকাত, রাজনীতিবিদ আরও হাজারও সম্বোধনের মুখোশ। পৃথিবীতে অতিথি হয়ে আসা আপনি একটা সময় সম্বোধনের সকল মুখোশ ফেলে যে অতিথি সেই অতিথি হয়ে বিদায় নিবেন।

    1. পড়ার জন্য ধন্যবাদ। মূল
      পড়ার জন্য ধন্যবাদ। মূল বক্তব্য টা এমন—” একজীবনে কত সম্বোধন পায় মানুষ দরকারি অদরকারি। বাপ মায়ের ছেলে আপনি এক এক স্থানে এক এক সম্বোধনে পরিচিত হচ্ছেন। ডাক্তারের কাছে রোগী, রিক্সায়া যাত্রী, ক্রেতা- বিক্রেতা, বাপ, চাচা, খালু, নানা, জামাই, পথিক, চোর, ডাকাত, রাজনীতিবিদ আরও হাজারও সম্বোধনের মুখোশ। পৃথিবীতে অতিথি হয়ে আসা আপনি একটা সময় সম্বোধনের সকল মুখোশ ফেলে যে অতিথি সেই অতিথি হয়ে বিদায় নিবেন।”

  2. ক্ষনিকের সম্পর্ক অনেক সময়
    ক্ষনিকের সম্পর্ক অনেক সময় জীবনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও রাখতে পারে।মনে হতে পারে আমি কারো কিংবা কেউ আমার।

    ভাল লিখেছেন ।শুভ কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *