স্বপ্ন

ঘুম থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলো শ্রাবন্তি। ঘামে শরীর ভিজে গেছে। অথচ মাথার ওপড় ফুল স্পীডেই ঘুরছে সিলিং ফ্যানটা। এখনও তার বুক ধুক ধুক করছে। হৃদপিন্ডের আওয়াজ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শ্রাবন্তির বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো বুঝতে যে ওটা আসলে টেবিল ঘড়িটার আওয়াজ।
বেড সুইচ টিপে বাতি জ্বালালো সে। পাশেই রাসেদ মরার মত পড়ে ঘুমোচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, অথচ শ্রাবন্তির এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে ওটা স্বপ্ন ছিল। সবকিছুই কেমন যেন অশরীরি মনে হচ্ছে। প্রতিবারই এমন হয়। শ্রাবন্তি টি-টেবিলের ওপরে রাখা জগ থেকে থেকে পানি ঢেলে খেল। তাতে তার তৃষ্ণা মিটলো না। এই তৃষ্ণা এক কলসি পানি খেয়ে ফেললেও মিটবে না।

ঘুম থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলো শ্রাবন্তি। ঘামে শরীর ভিজে গেছে। অথচ মাথার ওপড় ফুল স্পীডেই ঘুরছে সিলিং ফ্যানটা। এখনও তার বুক ধুক ধুক করছে। হৃদপিন্ডের আওয়াজ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শ্রাবন্তির বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো বুঝতে যে ওটা আসলে টেবিল ঘড়িটার আওয়াজ।
বেড সুইচ টিপে বাতি জ্বালালো সে। পাশেই রাসেদ মরার মত পড়ে ঘুমোচ্ছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, অথচ শ্রাবন্তির এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে ওটা স্বপ্ন ছিল। সবকিছুই কেমন যেন অশরীরি মনে হচ্ছে। প্রতিবারই এমন হয়। শ্রাবন্তি টি-টেবিলের ওপরে রাখা জগ থেকে থেকে পানি ঢেলে খেল। তাতে তার তৃষ্ণা মিটলো না। এই তৃষ্ণা এক কলসি পানি খেয়ে ফেললেও মিটবে না।
কোথায় যেন একটা টিকটিকি ডাকলো। শ্রাবন্তি তাতেও দারুণ চমকে উঠলো। ওটা যেন টিকটিকির ডাক নয়, কোন এক ভয়ঙ্কর অশুভ সংকেত। প্রচন্ড ভয় লাগছে তার। নিজের ঘরেও নিজেকে দারুণ আশ্রয়হীন মনে হচ্ছে। শ্রাবন্তি ভয়ে ভয়ে রাসেদের দিকে তাকালো। স্বাভাবিক ভাবেই ঘুমোচ্ছে সে। অথচ মনে হচ্ছে এর মধ্যেও কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা আছে। হয়তো এখনি লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসবে। তারপর বালিশের নিচ থেকে প্রকান্ড একটা ছুরি বের করে তাড়া করবে তাকে। ঠিক স্বপ্নের মত!
শ্রাবন্তির সারা শরীরে ভয়ের ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেল আরেকবার। জগ থেকে পানি ঢেলে মুখে ছিটিয়ে দিল। বাথরুমে গিয়ে ঘাড়ে পানি ঢালতে পারলে হতো। কিন্তু বিছানা থেকে নামতেও ভয় লাগছে তার।
চোখে আলো পড়ায় রাসেদ জেগে উঠলো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল: কী হয়েছে? লাইট জ্বালিয়েছো কেন?
খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন; অথচ তা শুনেও শ্রাবন্তি ভয় পেলো। রাসেদ উঠে বসল: কী হয়েছে? স্বপ্ন-টপ্ন দেখেছো নাকি কিছু?
: হুঁ।
: সেই স্বপ্নটা?
: হুঁ।
: কী যে অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখো না তুমি? দেখবে নাই বা কেন; সারা দিন আজেবাজে সিরিয়াল দেখ, ফালতু সব গল্পের বই পড়। মাথার ভেতর তো খালি এসব জিনিষই ঘুরে। এসো, শুয়ে পড়।
শ্রাবন্তি কথা বলল না। অদ্ভুদ দৃষ্টিতে রাসেদের দিকে তাকিয়ে রইল।
: আজকাল খুব ঘন ঘন দেখছো, তাই না?
শ্রাবন্তি নিরবে মাথা ঝাকালো।
: ডাক্তার-টাক্তার দেখানো দরকার। রোজ রাতে এভাবে ভয় পাবার কোন মানে হয় না। ভয়ে তোমার মুখ সাদা হয়ে গেছে। কাল বিকেলে অফিস থেকে এসে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।
শ্রাবন্তি সুবোধ বালিকার মত মাথা কাত করে শুয়ে পড়লো। রাসেদ ঘড়ি দেখলো, রাত বাজে আড়াইটা। বাতি নিভিয়ে দিয়ে সে শ্রাবন্তিকে জড়িয়ে ধরলো। এটা তার ঘুমানোর স্বাভাবিক ভঙ্গি। শ্রাবন্তিকে জড়িয়ে না ধরে সে ঘুমাতে পারে না। আশ্চর্য! সাথে সাথে শ্রাবন্তির সব ভয় কেটে গেল। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে। কেয়ামত হয়ে গেলেও এখন আর কোন ভয় নেই। সাধারণতঃ এই স্বপ্নটা দেখার সারা রাতে শ্রাবন্তির আর ঘুম হয় না। অথচ আজ ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মায়ের কোলে শিশু যেমন নিশ্চিন্তে ঘুমায় তেমনি নিশ্চিন্ত ঘুম। বিছানায় শুয়ে নির্ঘুম রাত কাটানোর মত দুঃসহ যন্ত্রণা আর কী হতে পারে?

ডাক্তারের নাম মোতাহার হোসেন। বয়স অল্প; চেহারায় কেমন একটা চেংরা চেংরা ভাব। সবে মাত্র পাশ করে বেরিয়েছে, এখনও খুব একটা প্রসার হয়নি। রাসেদ ভ্রু কুচকে তাকালো তার দিকে। ডাক্তারকে তার মোটেই পছন্দ হয়নি। এই ছেলে কিছু করতে পারবে বলে তার মনে হচ্ছে না। ভালকথা, এই ছেলে আসলে ডাক্তারের কম্পাউন্ডার নাতো?
মোতাহার হোসেনের হদিশ দিয়েছে অফিসের ক্যাশিয়ার বজলুল সাহেব। এই লোকটা আজ পর্যন্ত কোন মানুষকে কোন ভাল পরামর্শ দেয়নি। তবুও যেচে পড়ে মানুষকে পরামর্শ দেয়ার আগ্রহের কোন কমতি নেই। ওনার হাব ভাবে মনে হয় দুনিয়ার সব তথ্য তার নখদর্পণে!
মোতাহার হোসেন শ্রাবন্তির সাথে অনেক্ষণ বক বক করলো। কাজের চেয়ে অকাজের কথাই বেশি। যেন ক্লাসমেটের সাথে আড্ডা দিচ্ছে! এক পর্যায়ে সে জিজ্ঞেস করলো: মিসেস শ্রাবন্তি! আপনি স্বপ্নে দেখেন- আপনার স্বামী বিরাট একটা ছুরি নিয়ে আপনাকে খুন করতে আসছে। এম আই রাইট?
শ্রাবন্তি একবার রাসেদের দিকে তাকালো। তারপর মাথা নিচু করে বলল: জ্বি।
: কবে থেকে দেখছেন স্বপ্নটা?
: ঠিক মনে নেই; তবে অনেক দিন ধরেই দেখছি।
: প্রতিবারই কি একই ব্যাপার ঘটে?
: জ্বি।
: আচ্ছা প্রতিবারই কি একই ছুরি নিয়ে তাড়া করেন, নাকি কখনও কখনও অন্য কিছু নিয়েও করেন?
: জ্বি; প্রতিবারই ঐ একই ছুরি।
: আচ্ছা আপনাদের বাসাতেই তো ঐ ছুরিটা আছে তাই না?
: জ্বি না, আমাদের বাসায় ঐ ধরনের কোন ছুরি নেই।
মোতাহার হোসেন ভ্রু কুচকে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন: ভাল করে মনে করে দেখুন তো- স্বপ্নে দেখা ছুরিটি বাস্তবে কোথায় দেখেছেন। কিংবা ছোটবেলার কোন ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে পড়ে কিনা যা এই স্বপ্নটার সাথে রিলেটেড।
শ্রাবন্তি এক মুহূর্ত ভেবে বলল: মনে করতে পারছি না।
: আচ্ছা, যে রাতে এই স্বপ্নটা দেখেন সেদিন কি আপনাদের মধ্যে কোন ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে?
: জ্বি না।
মোতাহার হোসন এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রাশেদকে বলল: আপনি কাইন্ডলি একটু বাইরে যান। আমি ওনার সাথে কিছু প্রাইভেট কথা বলতে চাই।
রাসেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। এর কাছে দ্বিতীয়বার আসার কোন মানে হয় না। এই ছেলে জীবনে কয়েকটা গোয়েন্দা কাহিনী ছাড়া আর কিছু পড়েছে কিনা সন্দেহ। সার্টিফিকেটটা একবার দেখতে চাইলে হতো।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে শ্রাবন্তি বের হল প্রায় পাঁচ মিনিট পর। অথচ রাসেদের মনে হল যেন পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। রিক্সায় উঠে রাশেদ জিজ্ঞেস করলো: ঐ ব্যাটা এতোক্ষণ কী বলল?
: বলল, কয়েকদিন দূরে কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসতে। যেমন ধর, সিলেট-কুয়াকাটা-কক্সবাজার।
: তাতো বলবেই। সব ডাক্তারদের একটা একটা কমন সমস্যা হচ্ছে- এরা ভাবে, এদের কাছে যত রোগী আসে তারা সবাই কোটিপতি। বলল আর কালই প্লেনে করে কক্সবাজার চলে গেলাম। অফিসে ছুটি পাওয়া লাগবে না আর টাকা পয়সাও লাগবে না। তোমাকে একটা কৌতুক বলি শোন-
“এক রিক্সাওয়ালা সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে গেছে বিনা ভিজিটে চিকিৎসা করাতে। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা-টরীক্ষা করে বলল: আপনার তো শরীরে ভিটামিনের বিরাট অভাব। বেশি করে শাক-সব্জি খাবেন, সকালে ডিম আর ফল-টল খাবেন। মাছ-মাংস, খাসির কলিজা এসব একটু বেশি বেশি খাবেন। রাতে অবশ্যই একগ্লাস গরুর দুধ খাবেন। আর ঘুমানোর আগে এই ভিটামিন ট্যাবলেটটা একটি করে খাবেন। একমাসের মধ্যেই দেখবেন আপনার সব ভিটামিনের অভাব পূরণ হয়ে যাবে।
রোগী তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: ছার, আমার ভিটামিনের চাইতেও বেশি অভাব হইল ট্যাকার। পারলে ট্যাকার অভাব ক্যামনে পূরণ হইব তার পেরেসকিরিপশন দ্যান। ট্যাকা থাকলে কোন ভিটামিনের অভাবই সমস্যা না।”
শ্রাবন্তি হেসে বলল: প্রেসক্রিপশন ইনিও দিয়েছেন। হাই পাওয়ারের ঘুমের ঔষধ। বলেছে রাতে ঘুমানোর আগে একটা করে খেয়ে ঘুমাতে।
একটা কথা শ্রাবন্তি চেপে গেল। ডাক্তার কিছু দিন তাকে মায়ের সাথে থেকে আসার পরামর্শ দিয়েছিলো। কিন্তু শ্রাবন্তির সেটা পছন্দ হয়নি। কেননা এর পেছনে কোন যুক্তি নেই। সে চলে গেলে রাসেদের একা থাকতে কষ্ট হবে। রান্না-বান্না করবে কে আর সংসারই বা দেখবে কে? আর তাছাড়া দিনের বেলায় স্বপ্নটা মোটেই ভয়ঙ্কর মনে হয় না। বরং ছেলেমানুষি করার জন্য রিতিমত লজ্জ্বা করে। সমস্যাটাই হচ্ছে কেবল রাতের বেলায়।
ডিস্পেন্সারী থেকে ঔষধ কেনার সময় মোতাহার হোসেনের প্রতি রাসেদের আরেকবার মেজাজ খারাপ হল। প্রেসক্রিপশনে লেখা ঔষধটা সব ডিস্পেন্সোরীতে পাওয়া যায় না। চার পাঁচ দোকান ঘুরে যা পাওয়া গেল তার একপাতা ঔষধের দাম সত্তর টাকা। শার্টের বোতামের সাইজ এক একটা ঔষধের দাম সাত টাকা! কোন মানে হয়? কেন বাবা; দু’এক টাকার ঔষধ খেয়ে কি লোকের ঘুম হয় না?

*** *** ***

প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে শ্রাবন্তি। বুকের হৃদপিন্ডটা পাঁজর ভেঙ্গে বের হয়ে যেতে চাইছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। অথচ খুব একটা এগুতে পারছে না। মাটিও যেন তার সমান গতিতে পেছন দিকে সরে যাচ্ছে। আরও জোরে দৌড়াতে লাগলো সে। পেছন থেকে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে রাশেদ। হাতে তার চকচকে একটা ছুরি। চোখে খুনের উন্মাদনা। কাছে এসে পড়েছে সে। আরও কাছে, আরও কাছে… ধরে ফেলল শ্রাবন্তিকে। লম্বা ছুরিটা সজোরে ছুটে আসছে শ্রাবন্তির দিকে।
চিৎকার করে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো শ্রাবন্তি। চিৎকার শুনে রাসেদও ‘ওরে বাবারে’ বলে লাফিয়ে উঠে বসল।
ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল: কী হয়েছে?
শ্রাবন্তি জবাব দিতে পারলো না; ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।
রাসেদ বুকে জড়িয়ে ধরলো তাকে। গভীর মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো। স্বাভাবিক হতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগলো শ্রাবন্তির।
রাসেদ নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল: ওষুধ খেয়ে ঘুমাও নি?
শ্রাবন্তি কী জবাব দিলো বোঝা গেল না। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। রাসেদ এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো ওর দিকে। পানি খেয়ে শ্রাবন্তি বলল: ওষুধ তো খেয়ে ছিলাম, কিন্তু…।
রাসেদ রাগের সুরে বলল: কাল গিয়ে যদি ঘুসি মেরে ডাক্তার হারামজাদাটার সব ক’টা দাঁত ফেলে দিয়ে না আসি… এই হলো ব্যাটার সত্তর টাকা দামের হাই পাওয়ার ওষুধ!
শ্রাবন্তি কথা না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। নিজের ওপড় প্রচন্ড রাগ লাগছে তার। কেন সে প্রতিদিন এই বাজে স্বপ্নটা দেখে। এমনতো নয় রাসেদ তাকে ভালবাসে না, কিংবা কোন কারণে তার ওপড় রাগ করে কোন দিন কিছু নিয়ে তাড়া করেছিলো। ওকে নিয়ে তো তার মনে কোন ভয় বা দুর্বলতাও নেই। তাহলে কেন সে বারবার এই অদ্ভুদ স্বপ্নটাই দেখবে! তাছাড়া সে যে ভুতের ছবি দেখে, আজেবাজে বই-টই পড়ে তাও ঠিক নয়। টিভিই খুব একটা দেখে না। আজেবাজে বইও সে পড়ে না। মাঝে মাঝে রবী ঠাকুর, শরৎচন্দ্র কিংবা সমরেশ মজুমদার পড়ে।

পরদিন রাসেদ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দুপুরেই বাসায় চলে আসলো। হাতে একগুচ্ছ রক্তলাল গোলাপ। অজুহাতের সুরে বলল: একটা পিচ্চি এগুলো নিয়ে বাসে উঠেছিল, কমদামে পেয়ে সবগুলো কিনে ফেললাম।
কথাটা আসলে সত্য নয়। এই ফুল কেনার জন্য তাকে শাহবাগে নেমে ঝাড়া পঞ্চাশ মিনিট ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। মনের মত সুন্দর-সতেজ বড় বড় রক্তলাল গোলাপ যে ঢাকা শহরে এতো অভাব তা আগে জানা ছিল না। কিন্তু একথা শ্রাবন্তিকে বলা যাবে না। ভালবাসার কথা আহামরি করে বলে বেড়ালে নাকি ভালবাসার ওজন কমে যায়।
শ্রাবন্তি ফুলগুলো হাতে নিয়ে একটু হাসল। কিন্তু তবুও অন্য দিনের চেয়ে আজকে তাকে যেন একটু গম্ভীর মনে হচ্ছে। সারাক্ষণই কিছু একটা নিয়ে যেন চিন্তিত। বিকেলে রাসেদ প্রস্তাব করলো: চল, একটু বাইরে থেকে বেড়িয়ে আসি। আসবার সময় মনে করে ডাক্তার ব্যাটার দাঁতগুলো ফেলে দিয়ে আসতে হবে। একটা প্রতিজ্ঞা করে তা ভঙ্গ করা ঠিক না।
বিকেলটা খুব ভালই কাটল ওদের। সাভারের দিক থেকে ঘুরে আসলো। স্মৃতিশৌধটাও দেখে আসলো আরেকবার। আইসক্রিম খাওয়া, ফুচকা খাওয়া সবই হল। একটা ছিমছাম থাই রেস্টুরেন্টে ডিনার করে বাসায় ফিরল রাত সাড়ে দশটায়। সারা বিকেল ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত লাগছিল রাসেদের। বাসায় এসেই শুয়ে পড়ল সে।
তখন অনেক রাত। শ্রাবন্তির ডাকে ঘুম ভাঙলো তার। শ্রাবন্তি কানের কাছে ফিসফিস করে বলল: আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
রাসেদ বিরক্ত স্বরে বলল: যন্ত্রণা তো! ঘুম পেলে ঘুমাও!
: খুব গভীর ঘুম। মনে হচ্ছে আর কোন দিন এ ঘুম ভাঙবে না।
: কি সব আজেবাজে কথা যে তুমি বল। বলতে বলতে রাসেদ একটা হাত রাখলো শ্রাবন্তির গায়ে। সাথে সাথে চমকে উঠলো সে। কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেছে শ্রাবন্তির শরীর।
ঘুমন্ত মানুষের শরীর কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু রাসেদের কাছে কেন যেন একটু অস্বাভাবিক মনে হলো। অবচেতন মন বলছে- কিছু একটা ঘটতে চলছে। উঠে বসে বাতি জ্বালালো সে। শ্রাবন্তিকেও টেনে তুলল। উদ্বিগ্ন স্বরে বলল: কী হয়েছে তোমার! সত্যি করে বল তো- কী করেছো তুমি?
শ্রাবন্তি ঢুলুঢুলু চোখে বলল: ঘুম আসছিল না। তাই…
: তাই! কী করেছো তুমি? বল কী করেছো?
শ্রাবন্তি টেবিলের ওপর কী যেন দেখালো। রাসেদ সে দিকে তাকিয়ে প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না। তারপর হঠাৎ চোখ পড়লো ঘুমের ঔষধের পাতাটির ওপর। একটি ঔষধও নেই!
দু’হাত দিয়ে শ্রাবন্তিকে ঝাকুনি দিয়ে বলল: ওষুধ খেয়েছো! সবগুলো! কিন্তু কেন?
শ্রাবন্তি জবাব দিলো না। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুতেই চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছে না। রাসেদ কী করবে ভেবে পেল না। প্রচন্ড ঝাকুনি দিলো শ্রাবন্তিকে।
: তুমি ঘুমাতে পারবে না; বল, কেন খেয়েছো এতোগুলো ওষুধ?
শ্রাবন্তি ঘোরলাগা কণ্ঠে অনেক কষ্টে বলল: ঐ স্বপ্নটা আর দেখতে চাইছিলাম না। আমি ঘুমুতে চাই; নিশ্চিন্ত ঘুম, শান্তির ঘুম, দুঃস্বপ্নমুক্ত ঘুম। হোক তা জীবনের শেষ ঘুম…
কথাগুলো শেষ করার আগেই শ্রাবন্তি আবার ঢলে পড়ল। রাসেদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। উন্মাদের মত বার দুই ডাকলো শ্রাবন্তির নাম ধরে। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে উপুর করে ঢেলে দিলো ওর মুখে। একটুখানি চোখ মেলে তাকালো শ্রাবন্তি। কিন্তু বেশিক্ষণ চোখ মেলে রাখতে পারলো না।
এম্বুলেন্স! একটা এম্বুলেন্স দরকার রাসেদের। মোবাইলটা থেকে অনেক কষ্টে খুঁজে বের করলো হাসপাতালের নাম্বার। দ্রুত একটা এম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিতে বলল। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা বলতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলল। দুই তিন বার ভুল-ভাল বলার পর ঠিকঠাক মত ঠিকানা বলতে পারলো। ফোন রেখে আবার শ্রাবন্তিকে ডেকে তুলল সে।
দু’হাতে ওর মুখ তুলে ধরে বলল: তোমাকে জেগে থাকতে হবে শ্রাবন্তি, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। আমার জন্য হলেও তোমাকে জেগে থাকতে হবে।
শ্রাবন্তি আধো ঘুম আধো জাগরনেই মুচকি হাসলো। রাসেদ ওকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরলো। ছোট্ট শিশু যেমন প্রিয় খেলার পুতুল বুকের সাথে চেপে ধরে রাখে হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে। যেন আজরাইল এর নাগাল থেকে আড়াল করতে চাইছে ওকে। এক আকাশ ভালবাসায় টইটম্বুর সেই বুক। এই বুক থেকে শ্রাবন্তিকে কেড়ে নেয় কার সাধ্য!?
দূর, বহুদূর থেকে রাতের নিস্তব্ধতা চিঁড়ে একটা সাইরেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এম্বুলেন্সের সাইরেন!

———- ০ ———-

– সফিক এহসান
(২০ জুন ২০০৭ইং)

১১ thoughts on “স্বপ্ন

  1. এহসান ভাই বেশ ভাল লিখেছেন ।
    এহসান ভাই বেশ ভাল লিখেছেন । :থাম্বসআপ:
    কিন্তু এক খান কমপ্লেন আছে – আপনি মিয়া গপ্প এত্ত বড় লেখেন ক্যা?আর একটু ছোট্ট কইরা লিখবেন :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য:

      1. ভাই- আমি তো এটা “ছোট গল্প”
        ভাই- আমি তো এটা “ছোট গল্প” বিভাগে দেই নাই!
        “গল্প” বিভাগে তো কোন ওয়ার্ড লিমিটেশন দেয় নাই… 😛

        তবে “বৃহৎ গল্প” বিভাগ থাকলে ভালোই হইতো!!!
        :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *