সেন্টুর মা

– ডাঃ নাজনীন ইসহাকের রুমের ডিউটিতে যিনি রয়েছেন তাকে একটু ডেকে দিবেন?
– আমি চিনি না। সামনে যে মাইয়াগুলা আসে, তাদের ঐখানে খোঁজ করেন।

– ডাঃ নাজনীন ইসহাকের রুমের ডিউটিতে যিনি রয়েছেন তাকে একটু ডেকে দিবেন?
– আমি চিনি না। সামনে যে মাইয়াগুলা আসে, তাদের ঐখানে খোঁজ করেন।
১৭ নম্বর রুমের সামনে বসে থাকা তিনজন মহিলাকে দেখিয়ে ভদ্রলোক নিজের কাজে চলে গেলেন। এর আগে আরো দু’জন এভাবে বিভিন্নজনকে দেখিয়ে চলে গেছে। অনেকক্ষণ ধরেই বহির্বিভাগের টিকিট হাতে নিয়ে ফুলির মায়ের খোঁজ করছি। অন্য সময় হলে বিরক্ত হয়ে চলে যেতাম, নয়ত মুখের উপর দু’চারটা কথা শুনিয়ে দিতাম। বিপদে পরায় এখন যে যেভাবে বলছে সেভাবেই লাফালাফি করছি। ঠ্যাকায় পরলে মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে চায়- প্রবাদটার মর্ম এখন ভাল মত বুঝতে পারছি। আমি দূর থেকেই ১৭ নম্বর রুমের সামনে বসে থাকা মহিলাদের দেখলাম। না, ফুপি সেদিন যাদের দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল তাদের একজনও ওখানে নেই। তবু এগিয়ে গেলাম, যদি তাদের কেউ ফুলির মায়ের খোঁজ দিতে পারে।
– ফুলির মাকে দেখেছেন?
– না।
– ডাঃ নাজনীন ইসহাকের রুমের ডিউটিকে কে আছেন বলতে পারবেন?
– না।
এভাবে কোন প্রয়োজনে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরার অভ্যাস আমার খুবই কম। তাই অল্প একটু ঘুরেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। আমি বাবাকে ফুপির রুমের সামনে থাকা বেঞ্চের উপর বসে পড়লাম। ফুপিকে ফোন দিতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে এখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে বাসায় গিয়ে একরাশ কথা শুনিয়ে দিতে। সে আশার গুড়ে বালি। ফুপি নিজেই ফোন দিল।
– হ্যালো।
– পেয়েছ ফুলির মাকে?
– না।
– আর কেউ নেই? বল আমি ডাঃ নাজনীনের ভাঝতি।
– অপারেশন করাবে যে ডাক্তার তার নাম কি? ওনার নাম ভুলে গেছি।
– ডাঃ সাদিয়া। ওর সাথে দেখা করনি?
– ওনার রুমে গেসলাম। বন্ধ দেখে কোরিডোর থেকেই ফিরে এসেছি।
– ও! তুমি এখন কোথায়?
– তোমার রুমের সামনে বসে আছি।
– আরে! ওখানে কেন? ফুলির মাকে দেখ, আশেপাশেই পেয়ে যাবে।
– ফুপি ফোন রাখো। ভাল লাগছে না।
উত্তর না শুনেই আমি ফোন কেটে দিলাম। তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে আবার ফুলির মায়ের খোঁজ করা শুরু করলাম। ও.টি.-র সামনে এক মহিলাকে দেখে মনে হল ‘এনাকে জিজ্ঞেস করি, জানলেও জানতে আরে।
– ফুলির মাকে কোথায় বলতে পারেন?
মহিলা কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। পিছন থেকে একজন লোক ওনার হয়ে উত্তর দিল।
– উনি তো ওয়ার্ডের না। উনি রোগী।
– ও! আপনি জানেন?
– এইখানে পাইবেন না।
– ও!
আমি আবার ফুপির রুমের সামনে গিয়ে বসলাম। এইসময়ে আমার পাশে আরেকজন মহিলা বসে ছিল। ওনাকে দেখে দেখে আমি রোগী ভেবেছিলাম। তাই কিছু জিজ্ঞেস করিনি। হঠাত উনি নিজেই জিজ্ঞেস করলেন।
– কারে খুঁজো?
– ডাঃ নাজনীনের রুমের ডিউটি বয়কে।
– ক্যান?
– আমি ওনার ভাঝতি হই। আজকে অপারেশন করাব, তাই।
– ও! আমিই। আফা তো ছুডিতে।
– জানি। ডাঃ সাদিয়া-র কাছে নিয়ে যেতে বলেছে।
– চল নিয়া যাই।
– আপনি ফুলির মা?
– না, আমি সেন্টুর মা। ওপারেশনে আফার লগে যে থাকে অয় আমার ছেলে।
– ও!
– তয় তুমি এতক্ষণ ধরে ঘুরতেস আমারে জিগাইবা না? আমিই তো তোমারে ডাইকা আনলাম। না ডাইকলে পাইতা?
– আমি আসলে আপনাকে রোগী ভেবেছিলাম। বুঝতে পারিনি।
– পাশে বয়া আস, জিগাইলে কি? আমারে কি রোগী লাগে?
আমি কিছু না বলে মুচকি হাসলাম। ও.টি-র সামনে এসে তিনি আমার হাত থেকে টিকিটটা নিলেন।
– ও, মা! তুমি তো জমাও দাও নাই। খাড়াও। এত দেরী করে জমা দিলে আফা টাইম পাইব তো! আমি দেইখা আহি।
সেন্টুর মা ও.টি-র ভেতরে চলে গেল। আমি ও.টি-র সামনের রুমে বসে হাসপাতালটা দেখছি। অনেক পুরনো হাসপাতাল। বড় বড় রডে ঝোলানো ফ্যানগুলো মাথা ছুই ছুই করে ঘুড়ছে। একটা এনার্জী বাল্ব জ্বলছে। রুমে একটা বেড আছে কিন্তু তাতে ফোম, গদি কিচ্ছু নেই। এই ঠনঠনা বেডেই বসে আছি। ও.টি-র রুমের সামনে একগাদা জুতো অগোছালোভাবে আছে। ও.টি-র দরজাটার দিকে তাকাতেই সেন্টুর মা বেরিয়ে এলো।
– আফায় ডাকব। একটু খাড়ান। মুসলমানি চলে।
– আচ্ছা।
– কিছু লাগলে আমারে কইয়েন। আমি এখন যাই গা।
– ঠিক আছে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমাকে ও.টিতে নিয়ে গেল। ডাঃ সাদিয়া ল্যাপটপ খুলে বসে আছেন। খুব সম্ভবত কোন সিনেমা দেখছেন। আরেকজন আয়া আমাকে বেডে নিয়ে শুইয়ে দিল। সবুজ এপ্রোন পরা একজন পায়ের ক্ষতটা দেখে নিল।
– ডানে কাত হয়ে শোন।
ম্যাডাম। আমি স্টার্ট করব?
ডাঃ সাদিয়া- হুমম… ফার্স্টের ক্লিন করে নাও। আমি আসছি।
কিছুক্ষণ পরই ডাঃ সাদিয়া এসে অপারেশন শুরু করলেন। অপারেশন শেষে আমি বের হয়ে সরকারী কার্মচারী হাসপাতালের ফার্মেসীতে ঔষধ নিতে এসেছি। সেখানে সেন্টুর মায়ের সাথে আবার দেখা।
– অপারেশন হইসে?
– হ্যাঁ।
– ঔষধ নিছো?
– নিচ্ছি।
– যাইবা ক্যামনে?
– বাবা আসবে।
– কখন আইব?
– সময় একটু লাগবে, কতক্ষণ জানিনা।
– তুমি এইখানে বহ। এইখান থেকে আইলে লগে লগে দেখবার পারবা।
– আচ্ছা।
আমি সেন্টুর মায়ের দেখানো জায়গায় বসে আছি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় বিশাল জ্যাম। এই জ্যাম ঠেলে কখন বাবা আসবে আর কখন বাসা ফিরব- ভাবছি, এমন সময় আবার সেন্টুর মা আসল।
– আমার কবে আসবার বলসে?
– ১৪ দিন পর।
– ক্যান?
– সেলাই খুলবে।
– হেইদিন আইসা আমারে কাউরে সেন্টুর মা রে খুঁজি কইলেই আমারে দেখায়া দিব। এইখানে হগগলে আমারে চিনে। আমার পোলা অপারেশনের কাম করে তো! দেখসো না?
– সবুজ এপ্রোন পরা যিনি ছিলেন উনিই আপনার ছেলে?
– হ। ঐ-ই। বড় কষ্ট কইরা বড় হইসে।
– আপনার কি এখন কাজ আছে? কাজ না থাকলে বসেন। গল্প করি।
– না কাম নাই। নাজনীন আফায় তো ছুডিতে। আমার আবার কিয়ের কাম? গল্প করবা? কিয়ের গল্প করবা?
– আপনার ছেলের কথাই বলুন।
– ও! অর কথা! আমার পোলায় ম্যালা কষ্ট কইরা বড় হইসে। ডাক্তার হইসে। অপারেসন করে। কি যে ভাল্লাগে! পোলার জন্যই হগগলে আমারে চিনে। এই পোলারে বড় করবার লাগি কত যে খিদমত করা লাগসে বইল্বার পারুম না। অয় যহন নয় বসর অর বাপে চইলা গেসে। কই গেসে? কার লগে গেসে? ক্যান গেসে? কিচ্ছু কইবার পারিনা। পোলারে লয়া তহন পরসি বেবাক মসিবতে। আমি তো বাইরের কাম কিছহুই জানি না। আমার পাশের বাড়ির মাইঝা তহন গার্মেন্টসের চাকরী করতে কয়। ঢুকসিলামও একটা গার্মেন্টসে। কিত্নু পোলারে রাইখা অমনে ঘোরোনের মন চায় না। তহন বাসা বাড়ীত কাম কইরতাম। পোলাও আমার লগে লগে যাইত। গরীবের পোলা বড় লোকের ছাওরে কিছহু খাইতে দেখলে দু’একডা লয়া খাইত। এমনে কইরা বহুত আকাম করসে। তহন আমারে বাইর কইরা দেয়। এক আফায় এইহানে চাকরী করত। হ্যায় আমারে এইখানে ঢুকায়া দেয়। পোলারে লয়া এইখানকার চাকরিখান ছিল সবচাইতে ভালা। এইখানে উইও আফাদের হেলেপ করত। পোলারেও দেখা হইত এক্সটেরা লাভও হইত। অনেকদিন পর এক আফা অরে লয়া যায় তার বাড়িত আফয়েন্টমেন্টের কাম দেখবার লাইগা। ঐখানে বাড়ির পাশে ইস্কুলে ভর্তি করায়া দেয়। আমার পোলা আর আফার পোলায় এক কেলাসে পড়ত, তয় ইস্কুল আলাদা। আমার পোলায় আবার বেরেইন মাশাল্লাহ আসিল। তাই সেন্টু আর আফার পোলার মইধ্যে কাইজা লাগত। হেভি কাইজা। কিন্তু আফা সেন্টুরে ছাড়ে নাই। আফা কইত সেন্টুরে দেইখা নাকি হ্যার পোলাও বেশি পইড়ত। ওলারে ছাইড়া থাকবার মন চাইত না। আমি তাই পোলারে নিয়া আইতে চাই। আফায় দেয় না। তহন আমি আফার বাড়ির কাজে লাইগা যাই। দিনে এইহানে কাম কইরতাম রাইতে আফার বাড়িত থাকতাম, রান্না করতাম, পোলাপান দেখতাম। এম্নে কইরা পনরো বসর আফার বাসায় ছিলাম। আমার পোলায় ঐখান হইতেই পাশ করসে। পরে আফার পোলা বিদেশ চইলা যায় বইলা আফারাও যায় গা। আমি পোলারে লয়া তহন আগের বস্তিতে ফিরা আসি। হেরপর ঐ আফা এইহানে কারে কারে কয়া দেয়। ওনারা আমার পোলার পড়ালেখার খরচ দিত। আবার এইহানে ওরে শিখাইতনও। এমনে কইরা পোলা এহন এইহানে ও.টির কামে ঢুইকা গেসে। সার্জারি বেবাক যা আসে অরে লগে লইয়াই করে আফারা। অর হাত দিয়াই অহন কত মাইনষের চিকিৎসা হয়। মাইনষে আগে আইলে আমার হাতোত দশ ট্যাকা বিশ ট্যাকা ধরায়া দিত। তহন ঐ ট্যাকা পাইলে খুব খুশি লাগত। অহন গরীব কাউরে দেখলে আমি ট্যাকা দেই কি যে আনন্দ লাগে! কয়া বুঝাইতে পারুম না। আগে যে অভাব ছিল তার বেবাক গেসে গা উইড়া। আল্লায় চাইলে কি না হয়?
– এইখানে তাহলে আর চাকরী করেন কেন?
– ২৩ বসর ধইরা এইহানে আসি। মায়ায় পইরা গেসি। ছাড়বার পারিনা। মাইঝখানে ভাবসিলাম ছাইড়া দিমু। কিন্তু বাসায় বয়া থাকবার পারি নাই। একা একায় কি করুম? এইহানে এমনে দিন যায়। ভালাই লাগে। তাই চাকরীখান করি।
– ও! ভালোই তো। জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন দেখছি।
– হ। জীবন তো না য্যান সিনেমা।
– হুমম…সেরকমই।
– বাপে আইব কখন?
– জানি না। অপেক্ষা তো করছিই।
আসলে অপেক্ষা করছিলাম না। সেন্টুর মায়ের গল্পে বেশ মজে গিয়েছিলাম। গল্পের মাঝে বাধ সেজে বাবা নিতে আসবে কথাটা ক্ষনিকের জন্য ভুলেই গিয়েছিলাম। সময়টা ভালই কাটছিল সেন্টুর মায়ের সাথে। অনেকদিন এরকম তৃপ্তি নিয়ে কারো জীবনকে জানা হয় না। তাছাড়া এরকম নিম্নবিত্তদের মানুষদের সাথে উঠবসও কম। তাই আজকে সেন্টুর মায়ের গল্প শুনতে অন্যরকম এক ভাললাগা অনুভূত হচ্ছিল।
– এরপর আইলে আমারে ডাকবা কিন্তু। এইখানে হগগলেই চেনে। আমার পোলার জন্যই চেনে।
– হাসপাতাল বিল্ডিং নাকি পালটে ফেলবে? নতুন বিল্ডিং-এ থাকবেন না?
– না, বিল্ডিং প্পাল্টাইলেও আমার ডিউটি এইহানেই থাকব। এই বিল্ডিং-এরও মায়ায় পইরা গেসি। তাই আফারা কইলেও যাইবার চাই নাই।
– আপনার ছেলে?
– অয়, নতুন বিল্ডিং-এ যাইব।
– আলাদা থাকবেন?
– পাশেই তো। এম্নেও এইহানে সারাদিনে তেমন দেখা সাক্ষাত হয় না। সকালে এক লগে আহি বিকালে যাই গা। মাইঝখানে অয় ও.টি থাইকা কখন বাইর হয় কখন কই যায় খোঁজ রাখবার পারিনা।
– থাকেন কোথায়?
– তাঁতীপাড়ায়। ভাড়া বাসা নিয়া থাকি।
– আপনি আর আপনার ছেলে?
– হ, পোলার অহনও বিয়া দিবার পারি নাই। বিয়া করবার চায় না।
হঠাত আমার ফোন বেজে উঠল। মোবাইলে স্ক্রীনে তাকিয়ে দেখলাম বাবা ফোন দিয়েছে।
– কই তুই?
– এই তো, ভেতরে। তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।
– হাঁটতে পারিস?
– হ্যাঁ।
– তাহলে গেটে চলে আয়।
– হুম…
আমি ফোন রেখে দিয়ে সেন্টুর মায়ের দিকে তাকালাম।
– আইসে?
– হুম…
– যাও গা তয়লে। সাবধানে যাইয়ো।
– ঠিক আছে। আপনি ভাল থেকেন
– হ, আল্লাহর রহমতে ভালই আসি। দোয়া কইর।
– অবশ্যই।
আমি চলে আসলাম। বাবার সাথে বাসায় ফিরছি। আনেস্থেশিয়ার ঘোরটা এখনো কাটেনি, পায়ের ব্যাথা নিয়েও তাই চিন্তা হচ্ছে না। মাথায় এখন সেন্টুর মায়ের কথা ঘুরছে। সেন্টুর কথা ঘুরছে। সেন্টুর মায়ের ছলছল চোখদুটো মনে পড়ছে। ছেলের কথা বলার সময় উজ্জ্বল হওয়া মুখটা চোখে ভাসছে। আন্তরিকতার ভারে নুয়ে পরা কন্ঠটা কানে বাজছে। কী পরিতৃপ্ত জীবন তাদের!

৬ thoughts on “সেন্টুর মা

  1. পড়তে বেশ মজা লাগল। লেখার
    পড়তে বেশ মজা লাগল। লেখার মাঝেও মহিলার সরলতা স্পষ্ট হয়েছে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. ধন্যবাদ। লেখায় কিছু ভুল ছিল।
      ধন্যবাদ। লেখায় কিছু ভুল ছিল। তখন একটু অসুস্থতায় খেয়াল করিনি পরে দেখলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *