বাংলাদেশের পানিসম্পদ, বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ

“Everything originates in water
Everything sustained by water”
– Johann Wolfgang von Goethe (1749-1832)


“Everything originates in water
Everything sustained by water”
– Johann Wolfgang von Goethe (1749-1832)

পানি প্রাণের অস্তিত্বের অপর নাম। তাই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে পানির প্রাপ্তির সহজলভ্যতাকে আশ্রয় করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের আবাস গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পানিবাহিত পলিমাটি দিয়ে গঠিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ, যা পরাক্রমশালী নদী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (এইগ) বেসিন বা অববাহিকার সৃষ্টি। এর প্রবাহিত এলাকা প্রায় সাড়ে দশ লক্ষ বর্গকিলোমিটার যার ৭.৫% বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে গিয়ে সাগরে পড়েছে। বাংলাদেশের চার-পঞ্চমাংশ ভূখন্ড তৈরি হয়েছে গঙ্গা (পদ্মা)-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (বরাক) নদী সিস্টেমের মাঝে। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থা ৫টি দেশ যথা ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন ও বাংলাদেশ জুড়ে রয়েছে।

অববাহিকা-অঞ্চলে প্রায় ৩০০০ বছর বা তারও পূর্ব থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তার একটি অংশ ইতিহাসের নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে এসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শত শত নদীর হাজার বছর ধরে বয়ে আনা পলিমাটির উর্বর সবুজ-শ্যামল ব-দ্বীপে জড়ো হয়ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানাবিধ নৃগোষ্ঠীর মানুষ; বিচিত্র জাতের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্র জাতিগোষ্ঠী। নদীনালা, খালবিলসহ ভূ-উপরস্থ ও সহজলভ্য ভূ-গর্ভস্থ পানি এদেশের ভূমিপুত্রদের কল্যাণে ব্যবহৃত সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ যা তাদের জীবন-জীবিকা ছাড়াও এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে অবিকল্প ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত দ’ুটি প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি পেয়ে থাকে- (ক) নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুর তথা ভূউপরস্থ জলাশয় এবং (খ) ভূগর্ভস্থ পানি, যা গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। এছাড়া আরেকটি অপ্রধান উৎস হিসেবে রয়েছে বৃষ্টির পানি। এক্ষেত্রে দুটি প্রধান উৎসের প্রথমটির ওপর দ্বিতীয়টি স¤পূর্ণভাবে নির্ভরশীল।

দেশের প্রায় সর্বত্র দিয়ে বয়ে যাওয়া শিরা-উপশিরার মতো নদীনালাগুলো এদেশের ভূচিত্র রচয়িতা ও এদেশের প্রাণ। এ প্রাণের ধারায় গড়ে উঠেছে এদেশের মানুষের জীবনধারা, হাজার বছরের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ইতিহাস। আর এজন্যেই বাংলাদেশকে নদীমাতৃকদেশ বলা হয়। প্রতিটি নদীই নির্দিষ্ট অঞ্চলে তার নিজস্ব অবদানের ক্ষেত্রে স্বমহিমায় অভিষিক্ত। জীবনের জন্য অপরিহার্যতা বিবেচনায় ভালোবেসে নদ-নদীগুলোকে দেওয়া হয়েছে অসাধারণ সুন্দর সুন্দর নাম- আত্রাই, আড়িয়াল খাঁ, কপোতাক্ষ, করতোয়া, কর্ণফুলী, কাঁকন, কীর্তনখোলা, কীর্তিনাশা, কুশিয়ারা, খোয়াই, গড়াই, চিত্রা, জলঢাকা, ডাকাতিয়া, তিতাস, তিস্তা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, ধানসিঁড়ি, নাফ, পশুর, পদ্মা, পাহাড়ীয়া, পুণর্ভবা, ফেনী, বড়াল, ব্রক্ষ্মপূত্র, বাঙালি, বালু, বিরিশিরি, বুড়িগঙ্গা, ভৈরব, মধুমতী, মনু, মহানন্দা, ময়ূর, মাতামুহুরী, মুহুরী, মেঘনা, যমুনা, রূপসা, শঙ্খ, শিবসা, শীতলক্ষ্যা, সাঙ্গু, সুরমা, হালদা ইত্যাদি।

বাংলাপিডিয়া ও মাধ্যমিক ভূগোল গ্রন্থে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদনদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০টি; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান পকেট বুক ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর সূত্রমতে এ সংখ্যা ৩১০টি। তবে সংখ্যা যাইহোক, ২৪,১৪০ কিলোমিটার (বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এ নদীগুলো ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, সুরমা-মেঘনা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীসমূহ- এ ৪টি নদীব্যবস্থায় বিভক্ত। বাংলাদেশের অস্তিত্বের অপর নাম এদেশের নদীনালা। এসব নদ-নদীকে ঘিরেই এদেশের শহর-বন্দর-গঞ্জ-বাজার-ঘাট গড়ে উঠেছে। সহজে ও সুলভে মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের প্রধান পাথেয় নদী। বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম খাত কৃষি পুরোপুরি এদেশের সহজলভ্য নদীনালার পানির ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির অপরিহার্য খাত শিল্প-কলকারখানাগুলো তাদের পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনে নদীনালার ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে স্মরণাতীতকাল থেকে এদেশের মানুষের প্রাণীজ আমিষের প্রধান উৎস, বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার উৎস, অন্যতম রপ্তানীখাত মৎসসম্পদ এদেশের নদীনালার ওপর নির্ভরশীল। এসকল প্রত্যক্ষ বিষয়াদি ছাড়াও পরোক্ষভাবে এসকল নদীনালা দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষের পাশাপাশি হাজার প্রজাতির পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় প্রভৃতির জীবনযাত্রা নদীকে আশ্রয় করে। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানিতে মরণঘাতী আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের সুপেয় পানির প্রধান আধার হিসেবে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে এদেশের নদ-নদী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী পানির তীব্র চাহিদা বৃদ্ধি এবং এলক্ষ্যে শুরু হওয়া পানি-রাজনীতির শিকার হয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে নদীর সঙ্গে এদেশের অধিবাসীদের আচ্ছেদ্য সম্পর্কের ভারসাম্যে বিঘœ ঘটতে শুরু করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের পানি প্রবাহের শতকরা ৯০ ভাগ পানির উৎস বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত। এদেশের ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টির উৎস ভারতে এবং ৩টির উৎস মায়ানমারে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর সমন্বয়ে বাংলাদেশে স্বাদু পানির যে প্রবাহ বিদ্যমান, তা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম নদী প্রবাহ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা- কোনো কারণে এসকল নদ-নদী শুকিয়ে গেলে গোটা দেশটিই মৃত্যুমুখে পতিত হবে। আর এ আশংকা এদেশের মানুষের মনে এখন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা, প্রতিবেশীদেশ ভারত অভিন্ন নদী ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে এগুলোতে একের পর এক বাঁধ নির্মাণপূর্বক পানি প্রত্যাহার শুরু করেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং তাকে কেন্দ্র করে কৃষিকাজে ও সুপেয় পানির চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পানি-রাজনীতির ভয়াবহ বিস্তার ঘটাচ্ছে।

কেননা, পৃথিবীর মোট আয়তনের তিন-চতুর্থাংশ পানিবেষ্টিত হলেও মানুষের ব্যবহারযোগ্য পানির পরিমাণ খুব বেশি নয়। এক হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের মোট প্রাক্কলিত পানির পরিমাণ ১৩৮৬ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার। এর শতকরা ৯৬.৫ ভাগ তথা ১৩৪০ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানির উৎস সমুদ্র। সমুদ্রের এ পানি লবণাক্ত এবং মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ড ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী। অন্যদিকে মিঠাপানির পরিমাণ মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৩৫ মিলিয় কিউবিক কিলোমিটার। কিন্তু এরমধ্যে ২৪.৪ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার তথা পানযোগ্য এ সামান্য পরিমাণ পানির দুই-তৃতীয়াংশ আবার মানুষের ধরাছোয়ার বাইরে হিমবাহ এবং মেরু অঞ্চলে জমাট বরফ অবস্থায় রয়েছে। অবশিষ্ট ১০.৬ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানি সুপেয়, যা পৃথিবীর মোট পানিসম্পদের শতকরা ০.৭৬ ভাগ মাত্র। এরমধ্যে আবার উল্লেখযোগ্যঅংশ জনবসতি থেকে এতদুরে যে তার নাগাল পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পৃথিবীতে যত পানি রয়েছে তার মাত্র ০.০৮ শতাংশ পরিমাণ পানি মানুষের ব্যবহারের আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ পানি একটি সীমিত প্রাকৃতিক স¤পদ এবং কোনোভাবেই প্রকৃতির অন্তহীন দান হিসেবে পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের অবকাশ নেই। তাই বর্তমান শতকে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপর যে সমস্যাটি বিশ্ববাসীর সমুখে এসে দাঁড়িয়েছে, তা হচ্ছে নিরাপদ পানি।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে প্রচন্ড পানি সংকট দেখা দিবে। এসময় পৃথিবীর মোট ৯৩০ কোটি মানুষের ৭০০ কোটিই নিরাপদ পানির সমস্যায় পড়বে। এখনই বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ হয় পর্যাপ্ত পানি পায় না অথবা তাদের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছায় না। অন্যদিকে, অপরিশোধিত বা অনিরাপদ পানি প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ৩০ হাজার শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন উপভোগ করার আগেই পৃথিবী থেকে দুঃখজনকভাবে বিদায় নিচ্ছে।

পানি যেহেতু মানুষের জীবন, জীবিকা ও উন্নয়নের সকলক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক একটি উপাদান, সেহেতু নিরাপদ পানি প্রাপ্তি একটি মৌলিক মানবাধিকার। এই প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হওয়ার কারণে সারাবিশ্বে এটি এখন কৌশলগত প্রাকৃতিক উৎসে পরিণত হয়েছে। পানির প্রাপ্যতা ক্রমেই কমে যাওয়ায় এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তীকালে তেলের মত গুরুত্ব বহন করবে পানি। ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাজেল্ডিন বলেছিলেন- বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের মূল কারণ যদি হয়ে থাকে তেল, তাহলে একুশ শতকে যুদ্ধের কারণ হবে পানি।” কেননা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে পানির ব্যবহার বাড়বে, সুপেয় পানির অভাব সৃষ্টি হবে, যার ফলে উজানের দেশগুলো পানি ব্যবহারের ওপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করবে, নদ-নদীর পানি প্রত্যাহার করা শুরু করবে। এতে উপকূলীয় দেশগুলোতে লবণাক্ততার পরিমান বাড়বে। কিন্তু এ লবণাক্ত পানি ব্যবহার উপযোগী নয় বলে মিঠা পানি নিয়ে পাশাপাশি রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়বে।

অন্যদিকে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পানি-রাজনীতিতে শক্তিমত্তা ও বুদ্ধিমত্তায় প্রতিবেশিদেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি দেশটি তার অভ্যন্তরভাগে বিরাজিত জলাধারগুলো সংরক্ষণ ও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহারেও উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। নগরায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গিয়ে শহর ও উপশহরের চারিদিকে বিদ্যমান জলাধারগুলো অপরিকল্পিতভাবে ভরাট করে যেমন গড়ে উঠছে আবাসনপ্রকল্প, তেমনি একইরকম রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক কুপ্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ভরাট করে যাচ্ছে শহরগুলোর পার্শ্ববর্তী নদীনালার দুই পাড়। একইভাবে পরিবেশ সংরক্ষণের বিদ্যমান নীতিমালা ও আইন-কানুনকে পাত্তা না দিয়ে কলকারখানাগুলো তাদের শিল্পবর্জ্যরে ভাগাড়ে পরিণত করতে শহর-সন্নিকটের খাল-বিল নদী-নালাকে।

বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজধানীশহর ঢাকা তার নাগরিকদের মলমূত্র, আবর্জনা, ও শিল্প-রাসায়নিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করেছে নদীটিকে। ওয়াসার সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকার ৮২ শতাংশ মানুষের মলমূত্র মিশছে বুড়িগঙ্গায়। এর সঙ্গে রয়েছে গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক বর্জ্য। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের ৪৯ শতাংশ ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও শিল্প কারখানার বর্জ্য বহন করতে গিয়ে বুড়িগঙ্গা মারাত্মক দূষণের শিকার হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, প্রতিদিন হাজারীবাগ শিল্পাঞ্চল থেকে ১৬ হাজার ঘনলিটার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে ৩ হাজার ৭ শ’ ঘনলিটার দূষিত বর্জ্যমিশ্রিত পানি রাজধানীর নদীগুলোতে মিশ্রিত হচ্ছে। শিহরিত হওয়ার বিষয় যে, এই নদীর পানি এখন এতটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে যে এ পানিতে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকেই নাকি ১০ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর পড়েছে ! ঢাকার পার্শ্ববর্তী শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বালু আর তুরাগেরও প্রায় সমদশা। শুধু বুড়িগঙ্গা নয় তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং বালু নদীর তীর ধরে গড়ে উঠেছে বেশুমার শিল্প-কারখানা। শত শত কল-কারখানার শিল্পবর্জ্য আর কয়েকলাখ মানুষের নর্দমার ময়লায় শীতলক্ষ্যা ইতোমধ্যে বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বালু নদী একসময় রাজধানীর ঢাকার পূর্বপার্শ্বে প্রবাহিত হলেও এখন তা আর নদী হিসেবে নেই। এখন এর তীরে দাঁড়ালে চোখে পড়বে ময়লা পানিতে ভরপুর ডোবা। পানিশূন্য এ নদীর মাঝবরাবর রাস্তা নির্মিত হয়েছে, যা এসে মিলেছে আরেকটি সদ্যনির্মিত রাস্তার সঙ্গে, এ রাস্তাটি চলে গেছে বনশ্রী আবাসিক প্রকল্পের দিকে। তুরাগ আর ধলেশ্বরী নদীর অবস্থাও তথৈবচ। কখনো কখনো সরকারি তরফ থেকে এসকল নদী-নালাকেন্দ্রিক অবৈধ জবর-দখল উচ্ছেদকল্পে অভিযান চালানো হলে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকার পর পুণরায় বিপুল উদ্যোমে দখলপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে ২০০৭-এর জুন পর্যন্ত ১৩ দফায় বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-শীতলক্ষ্যা নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এতে কয়েক কোটি টাকা খরচ হলেও পরবর্তীতে নদী খেকোরা বেশিরভাগ উদ্ধারকৃত জায়গা আবার দখল করে নেয়। অন্যদিকে, কলকারখানার বর্জ্য আর মানুষসৃষ্ট বর্জ্যের ভয়াবহ দূষণে অত্যাধুনিক পানি-পরিশোধন প্লান্টেও এসকল নদীর পানি বিশুদ্ধ করা দূরহ হয়েছে; বিশুদ্ধ করার পরও পানিতে দুর্গন্ধ থেকে যায়। এমনকি পানির দুর্গন্ধে নদীর পাড়ে বাস করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

একইরকম না হলেও ভিন্নতর করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি ঢাকার বাইরের এবং সারাদেশের অধিকাংশ নদীগুলো। প্রবল প্রবহমানতার কারণে প্রমত্ত উপাধিধারী দেশের ২য় বৃহত্তম নদী পদ্মা। পদ্মা ও মেঘনার মিলিত প্রবাহটি মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা। কিন্তু বর্তমানে প্রমত্তা পদ্মার সেই প্রবাহ আর নেই। ক্রমাগত পলি জমে নদীর বিভিন্ন স্থানে (বিশেষকরে রাজশাহীতে) অনেক স্থায়ী চরের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে পানির প্রবাহ ও মাছের বৈচিত্র্যতা ও প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদীর বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ মাছ ধরার জাল (কারেন্ট জাল) ব্যবহার করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আহরণের ফলেও মাছের উৎপাদনের উপর ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রস্তাবিত ১ম ও ২য় পদ্মাসেতু নির্মিত হলেও যমুনার মতো নাব্যতা হ্রাসের ভয়াবহতা ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিস্তার পানি প্রবাহ এ এযাবতকালের মধ্যে সর্বনিন্ম পর্যায়ে নেমে এসেছে। তিস্তা ব্যারাজ থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী এখন স্রোত না থাকায় মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে তিস্তার উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার দূর্বার গতিকে থামিয়ে দেয়। বছরের পর বছর অববাহিকায় গড়ে ওঠা সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্মৃতি নিয়ে বয়ে চলা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রমত্ত চিত্রা নদীও আজ তার ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং যশোরের কপোতাক্ষ থেকে বের হওয়া নদীগুলো বর্ষার কয়েক মাস পানি থাকে, বাকি সময়গুলো শুকিয়ে যায়। আর নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ নদীর দু’তীরে দখল করে বসতবাড়ি-মার্কেট তৈরি করছে। কাপ্তাই লেকের পানি কমতে থাকায় ও অবৈধ দখলের কারণে হুমকিতে পড়েছে কর্ণফুলী। এসব নদীর উজানে বাধার কারণে বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটি অঞ্চলে।

বিআইডব্লিউটিএ নদী সংরক্ষণ বিভাগের হিসেবমতে, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল যা বিভিন্ন কারণে হ্রাস পেতে পেতে এখন প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে। শুষ্ক-মৌসুমে নদীপথের এ দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটারে। এ পরিমান ফি-বছর আরও কমে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কেননা গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (বরাক) এই তিনটি বড় এবং প্রধান নদ-নদীসহ যে ৫৪টি ছোট-মাঝারি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত রয়েছে, তারমধ্যে ৪৮টি নদীর পানি প্রবাহকে ভারত নানা প্রক্রিয়ায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। সীমান্ত নদীর উজানে পানি প্রবাহে বাধার কারণে বিপর্যস্ত ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো। পানির অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদ-নদী মরে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীগুলোতে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে এবং নাব্যতা হারানোর ফলে বছর বছর বন্যা দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে দেশের শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যস¤পদ, নৌপরিহন ও আবহাওয়া-পরিবেশে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলাশয় ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজ, চলমান টিপাইমুখ বাঁধ এবং প্রস্তাবিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৈষম্যমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীমাতৃক বাংলাদেশকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুকনো মৌসুমে গঙ্গা অববাহিকার নদ-নদী খালবিলগুলো ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে। প্রবাহশূন্য হয়ে পড়েছে মহানন্দা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, বেতনা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, ইছামতির মতো বড় বড় নদীগুলো। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্রে এখন পর্যন্ত কোনো বাঁধ নেই। কিন্তু শুকনো মৌসুমে চীন ও ভারত অসংখ্য পা¤প বসিয়ে এই নদীর পানি টেনে নেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ কমে আসে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাতে। তাই, যাদের হাতে এদেশের মানুষ ক্ষমতা তুলে দেয় তারা যদি দেশ ও দেশের মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নে উদাসীন থাকেন, তাহলে এদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে নদী দেখতে বইয়ের পাতা নয়তো ভারতে যাওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

ভূ-উপরস্থ পানির সহজলভ্যতার মতো ভূগর্ভেও সহজলভ্য মিঠা পানির দেশ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে আজকাল গভীর নলকূপও বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে পারছে না। কেননা, নদ-নদীর পানি সহজলভ্য না থাকায় মানুষ তার প্রয়োজনে দৈনন্দিন ব্যবহার ছাড়াও কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে আসছে। ফলে স্বভাবতই পানির স্তর নিচে চলে গেছে এবং সেখানে আর্সেনিকের উপস্থিতি পানির দূষণ ঘটাচ্ছে।

অন্যদিকে, সমূদ্র সমতল হতে গড়ে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বাংলাদেশের বিস্তৃত সমতল ভূমির নদ-নদীগুলোতে পানিস্বল্পতার কারণে সেখানে জোয়ার-ভাটার টানে বঙ্গোপসাগর থেকে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটছে। মিঠাপানির অভাবে হুমকিতে পড়েছে বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন। সুন্দরবনসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদী ও বর্ষায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।

অবশ্য আশার কথা হচ্ছে, প্রতিবেশিদেশ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারসহ নানাবিধ অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ ও সুশীল শ্রেণীর মতো রাজনীতিক নেতৃবৃন্দও উচ্চকন্ঠ হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি নদী বাঁচাতে সরকার কিছু কিছু নদী খননের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কুষ্টিয়ায় গড়াইসহ কিছু নদীর খননকার্য শুরু হয়েছে। তবে খনন করে নদী রক্ষা করা সম্ভব বলে সাধারণ অভিমত প্রচলিত থাকলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, পানির প্রবাহ না থাকলে খননের মাধ্যমে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। নদী খননের নামে অর্থ বরাদ্দ করে লুটপাটই করাই নদী খননের মূল উদ্দেশ্য। তাঁদের মতে, দেশকে বাঁচাতে হলে একাধারে নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে এবং নদ-নদীসহ দেশের অন্যান্য জলাশয় দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীই হচ্ছে দেশবাসীর প্রাণপ্রবাহ।

৩ thoughts on “বাংলাদেশের পানিসম্পদ, বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *