কমলা-লেবুর গল্প

//১//
কমলা আর লেবু, পিঠাপিঠি দুই জন।জয়নুদ্দিন নূর-পুর এর দিন মজুর। বাস্তবিক অর্থেই দিন এনে দিন খেতে হয় জইনুদ্দিনের। গত আশ্বিনে কমলা আর লেবুর মা মারা যাবার পর কষ্ট টা আরেকটু বেড়েছে জয়নুদ্দিনের। অথচ বিয়ের ২০ টি বছর সে কতই না মার-ধর করেছে মিনারা কে। মিনারা মারা গেল পেটে বাচ্চা নিয়া। বাচ্চা টা থাকলে আজকে উঠানে হাটার চেষ্টা করত হয়ত।
কমলা আমার ছিলুম টা দে।
-আইতাসি আব্বা।

//১//
কমলা আর লেবু, পিঠাপিঠি দুই জন।জয়নুদ্দিন নূর-পুর এর দিন মজুর। বাস্তবিক অর্থেই দিন এনে দিন খেতে হয় জইনুদ্দিনের। গত আশ্বিনে কমলা আর লেবুর মা মারা যাবার পর কষ্ট টা আরেকটু বেড়েছে জয়নুদ্দিনের। অথচ বিয়ের ২০ টি বছর সে কতই না মার-ধর করেছে মিনারা কে। মিনারা মারা গেল পেটে বাচ্চা নিয়া। বাচ্চা টা থাকলে আজকে উঠানে হাটার চেষ্টা করত হয়ত।
কমলা আমার ছিলুম টা দে।
-আইতাসি আব্বা।
হুক্কা নিয়ে উঠানে আসে কমলা। মেয়েটা এর মাঝেই অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন ওর একটা বিয়ের ব্যাবস্থা করতে হয়, শরীর টাও ভাল যাচ্ছে না,মনে কেমন কু ডাক ডাকছে জয়নুদ্দিনের। নাহ! সামনের পৌষের মইধ্যে মাইয়াডার বিয়া দিতে হইব।
লেবু কই রে?
-কইতে পারি না আব্বা। ওই আজকাল খালি বেত্তমিজ পোলাপাইনের লগে ঘুরে। ইস্কুলেও যায় না,ঘরের কামও করাইতে পারি না।
আচ্ছা আহুক ও আইজকা। কাল থেইকা আমার লগে মাঠো যাইব। শরীর টা যুৎ লাগতাসে না। আমি অহন একটু ঘুমামু। বুকটা খালি ধরফর ধরফর করে।কাম করতে বহুত কষ্ট হয়।
-আইচ্ছা আব্বা।

//২//
লেবু খুব উশখুশ করছে। বাপ-মা মরলে নাকি ৩ দিনে মিলাদ দিতে হয়। লেবু এখন বসে আছে হুযুরের পাশে। মিলাদ হচ্ছে। হুযুর দোয়া করতে সময় নিচ্ছেন অনেক। কিন্তু লেবুর অত সময় নাই। বাজারের আযাদের ঘরে টেলিভিশনে বিপিএল দেখাইতেসে। ওই খেলায় ও বাজি ধরসে। আইজকা হারলে আযাদ রে ১০০০ টাকা দেওন লাগব।জিতলে ৫০০। আগের খেলার টাকা টা দিতে হইব। মিলাদ শেষে করিম চাচার টাকায় কেনা তবারক বিলিয়ে লেবু দৌড় দিল আযাদের ঘরে। খেলার শেষ ওভার। শেষ বলে দরকার ৩ রান। আহ! শান্তি! ৫০০ টাকার ফাঁড়া কাটল লেবুর।
আযাদ ভাই তোমার ৫০০ টাকা দুই দিন পরে দিমুনে। আব্বায় মরসে এইডা তো জানই।
-লেবু তুই ক, তরে আমি ট্যাকার লাইগা কিসু কহনও কইসি???? তুই দিস বুইঝা হুইনা। আইজকা নতুন একখান জিনিস আসে, একটু টেশ কইরা দেখ। পুরা গরম। মাথা নষ্ট মাল।
আযাদ ভাই! আইজকা না। আরেকদিন টেশ করুম নে। আইজ কিসু টের পাইলে বুজি মাইরা লাইব আমারে। আইজ যাই।
-বাইঞ্ছোদের নাতি। যা ভাগ, হালার বিলাই জানি কোনহানকার।
হাসতে হাসতে খিস্তি দিয়ে লেবু কে বিদায় জানায় আযাদ।
//৩//
কমলাঃ ভাই তুই যে এমন দিগগারি কইরা ঘুইরা বেড়াস, আব্বায় ও মরসে কইদিন হইল। এম্নে কইরা চললে খামু কি আর পিন্দমু কি??
লেবুঃ বুজি তুমি টেনশন নিয় না। একটা ব্যাবস্থা অইব নে।
কমলাঃ তুমি আমার কি ব্যবস্থা নিবা আমার জানা আসে। আইজকা রহিমা খালা আইসিল। হে কইসে শহরের সুতার মিলে কাম নেওয়ায় দিব তরে আর আমারে। ল শহরে জাইগা।
লেবুঃ বাড়ি ঘরের কি করবা?
কমলাঃ তালা মাইরা জামু। ছুটি ছাটায় আমুনে বাড়িত।
লেবুঃ বুজি তুমি কইলে আমি না করুম না, কিন্তু শহর রে আমার বড় ডর লাগে কেন জানি।
কমলাঃ পাগলা চিন্তা করিস না। দুই ভাই বইন মিল্লা ভালই চালাই লামু।
শহরের সব গুছিয়ে উঠতে উঠতে বেশ কিছু সময় লেগে গেল কমলা আর লেবুর। কমলা তার মত কাজ গুছিয়ে নিয়েছে আর লেবু লেবুর মত। কমলা দিন রাত খাতে ফ্যাক্টরি তে, আর লেবু বখাটে গুলোর সাথে জুটে জুয়া খেলে নিয়ম করে।চাকরি গেছে দুই দুই বার। কিন্তু রহিমা খালার সুবাদে শেষ এবং ৩ নাম্বার ফ্যাক্টরি তে একটা চাকরি দু এক দিনের মধ্যেই হয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। লেবুর অবশ্য চাকরি নিয়ে কোন চিন্তা নাই। আসলাম ভাই এর দলের একজন হিশেবে সে এর মাঝেই পরিচিতি পেয়ে গেছে কিছু জায়গায়। অপারেশন এও গেছে ৩ বার। প্রতিবার অপারেশনের পর টাকার ভাগ ও পেয়েছে সে। নতুন বলে কিছু কম পায় কিন্তু কাঁচা টাকা! ফ্যাক্টরির ২ মাসের রোজগার তার মাত্র ৬-৭ তা অপারেশনের মামলা। আস্লামের ৪ খলিফার একজন মিলনের সাথে ঘুরে লেবু। মিলনের যে জিনিসটা লেবুর সবচেয়ে ভাল লাগে তা হল মিলনের আলুর নেশা। প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে চায় মিলন। লেবুরও মাঝে মাঝে টেশ নেবার ইচ্ছা লাগে কিন্তু ভয়ে বলে না কিছু। আজ যে মেয়ে টা আসছে তাকে কই জানে দেখেছে লেবু। মনে আসি আসি করে আসছে না। এর মাঝে মিলন বের হয়ে আসলো।
মিলনঃ কিরে লেব্যা, তুই কি আলু টালু খাস না?
লেবুঃ উস্তাদ কি যে কন! পাইলে না খামু!
মিলনঃ দাড়া তোর লাইগা একদিন ব্যাবস্থা কইরা দিমু নে। ল হাসাইন্যা রে ক হোন্ডা ডা বাইর করতে।আইজকা অপারেশনে করুম শেখের নামায়।
মটরসাইকেলে উঠতে উঠতে লেবুর মেয়েটির মুখ মনে পরে। মেয়েটি লেবুর সাথেই ফ্যাক্টরি তে কাজ করত। মাগি অহন বেতনে পুষায় না বইলা ভাড়া খাটবার আইসে।থুঃ ঘৃণায় এক দলা থুথু ফেলল লেবু।

//৪//
এই জায়গা টা বড় নির্জন। রহিমা খালা কমলা কে পই পই করে বলে দিয়েছেন, খবরদার ইভিনিং ডিউটি র পর এই জায়গা দিয়া বাড়িত যাবি না। কিন্তু কমলা নাইট না থাকলে এই খান দিয়েই বাড়ি যায়। গা যে একটু ছমছম করে না তা না,বেশ ভয় লাগে তার।নিজের হাত ও ঠিক মত দেখা যায় না এমন অন্ধকার এই রাস্তা। কিন্তু ঘুর পথে যেতে হলে ৩০ মিনিট লাগবে তার বরং এই অন্ধকার রাস্তা টা উপকারই করে বেশি। এই রাস্তা ধরে এগুলে ২০ টা মিনিট বেশি বিশ্রাম নেবার সুযোগ তার আসে। কমলার একটু শীত শীত লাগছে। আজ চাদরটা আনে নি।গত সপ্তাহে দুইটা চাদর কিনেছে সে। দুইটার রঙ তাদের দুই ভাই বোনের নামের রঙ্গের সাথে মিলিয়ে। মনে মনে হাসতে থাকে সে, কত ঢং, খেতে পারছে না ঠিক মত অথচ মনে রঙের শেষ নেই। আচমকা ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পরে যায় কমলা। কয়েকটি হাত তার কাপর ছিরে ফেলছে টের পায় সে। প্রথমে একটু বাঁধা দেবার চেষ্টা করে কমলা,কিন্তু শক্ত হাতের কিল ঘুষি তাকে নিস্তেজ করে দেয়। মাটিতে মিশতে থাকে কমলার শরীর।
দুটি কণ্ঠস্বর শুনে কমলা, ইস্টিশন পার হয়ে যাওয়া ট্রেনের হইসেল এর মত।
– মাগির কাপর গুলা লইয়া ল।
-ঠিক আসে ভাই।
কমলা দেখতে থাকে তার সম্ভ্রমের শেষ আশ্রয় টুকুও নিয়ে নিচ্ছে শূয়রের বাচ্চা গুলা। হাতে করে নিয়ে দূরে নালায় ফেলে দিল। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে কমলার। নুর-পুরের বড় পুকুরের আম গাছ তলায় এরকম গভীর ঘুম দিয়ে কত শত দুপুর কাটিয়েছে সে,ভাবতে ভাবতে চোখ বুজল কমলা।
কতক্ষণ সময় পেরিয়েছে তা বুঝতে পারছে না কমলা, আসলে সে কোথায়,কি করছে এখানে এটা বুঝতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগল কমলার। ১১ টার ট্রেনের হইসেল শুনল। তার মানে ঘটনা ঘটার পর পাক্কা দেড় ঘণ্টা বেহুশ ছিল সে। কিন্তু এখন কি করবে ও। খুব কষ্টে উঠে বসল কমলা। গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হল ওর আসে পাসে কোন কাপড় নেই। যা হবার তা তো হয়েই গেছে, তাকে তো বাঁচতে হবে। এই অবস্থায় কমলা হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল। বড় রাস্তাটার দোকান গুলো খোলা আছে। সেখানে যেয়ে সাহায্য চাইবে সে। হাঁটতে শুরু করার পরপর কি যেন পায়ে ঠেকল কমলার। ওহ! একটা চাদর। বেজন্মা গুলার কোন একটা ফেলে গেছে। চাদর টা পেয়ে এই দুঃখের মাঝেও কিছুটা স্বস্তি পেল কমলা।চাদরটা গায়ে ভাল করে জড়িয়ে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগলো কমলা।
বড় রাস্তার ধারে প্রথম চায়ের দোকান টায় যেয়ে পানি চাইল সে। দোকান টা বন্ধ করার জন্য তৈরি হচ্ছিল দোকানি, সে বেশ অবাক হয়ে পানি দিতে গেল মেয়েটিকে। বুঝল কোন অঘটন ঘটেছে।
কমলার পা আর চলছে না। পানি চেয়েই সে ধপ করে বসে পরল দোকানে বেঞ্চি তে। দোকানে টিমটিমে আলো টা ঠিক সেই মুহুর্তে তার অবিশ্বাস্য লাগলো। ঠিক সেই মুহুর্ত টায় তার পৃথিবী কে অবিশ্বাস্য লাগলো। ঠিক ওই মুহুর্ত টায় তার বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাটার মৃত্যু হল। ঠিক সেই মুহুর্ত টা কে তার বিশ্বাসঘাতক মনে হল। ঠিক সেই মুহুর্ত টায় তার নিজেকে মিথ্যা মনে হল/
দোকানের টিমটিমে আলো তে চাদর টার রঙ চিনেছিল কমলা। লেবুর সতেজ সবুজ রঙটা মিথ্যা, ভাবতে চাইছিল কমলা।

১১ thoughts on “কমলা-লেবুর গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *