গ্রামাঞ্চলে হেফাজত জামায়াত : সরকার ও গনজাগরন মঞ্চের প্রতি সতর্কবার্তা

গত ২৮ জুন অনেকেই যখন ঢাকা অভিমুখী, বিশেষ করে শাহবাগ অভিমুখী, তখন আমি একটি বিশেষ কাজে প্রত্যন্ত গ্রাম অভিমুখী। পথে আসতে আসতে একটি জিনিস আমাকে আশ্চর্য ও আতঙ্কিত করলো। গ্রামের কাঁচা রাস্তার দুইপাশে দুইধরনের পোষ্টার, একটি জামায়াতের ব্যানারে, অন্যটি হেফাজতের। ঐদিনই লাগানো হয়েছে, একই ধরনের পোষ্টার আগেও লাগানো হয়েছিলো, বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ঐদিন আবার লাগানো হয়েছে। আপনারা আমরা আছি ঢাকাতে ও বিভিন্ন মফস্বল শহরে আর হেফাজত জামায়াত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। বুঝলাম, ওদের প্রচার কৌশলের কাছে আমরা শিশু। হেফাজতের পোষ্টারে ৫ মে’র ঘটনাকে গনহত্যা বলে প্রচার করা হচ্ছে এবং যে তথ্যগুলো দেয়া হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি অমূলক। জামায়াতের পোষ্টারটিতে দেখা যাচ্ছে জেলখানার ভিতর মোনাজাতরত অবস্থায় সাঈদি। অথচ জেলখানার বিশেষ সেলে থাকা অবস্থায় কারোরই ছবি তোলা সম্ভব নয়। এই ছবিটিও যে বানোয়াট তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লিফলেটও বিতরন করা হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে হেফাজত জামায়াত এখন পুরোপুরি তত্‍পর গ্রামাঞ্চলগুলোতে, অথচ সরকারের নেই কোনো মাথাব্যথা, চাইলেই সরকার এসব মিথ্যা ছবি ও তথ্য নিয়ে প্রচারনার বিপক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে বা বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রচারনা চালাতে পারে। গনজাগরন মঞ্চও শুধু সমাবেশ, কর্মী সম্মেলন ও মিছিলের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমিত রেখেছে। এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, হেফাজতের এই প্রচারনার সাথে গনজাগরন মঞ্চের সম্পর্ক কি। গনজাগরন মঞ্চের যদি লক্ষ্য হয় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করা তাহলে হেফাজত জামায়াত এর বিপরীত কাজটাই করে যাচ্ছে এবং টার্গেট করেছে গ্রামাঞ্চলের ধর্মভীরু মানুষদের, অনেকাংশে সফলও হচ্ছে। আপনারা যারা মনে করছেন এর সাথে শুধুমাত্র আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় পরাজয়ের সম্পর্ক তাদের এ ধারনা ভূল। একটা মানুষকে যতটা সহজে ধর্মান্ধ করা যায় ততটা সহজে সেই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনা যায় না, তদ্রুপ একটা জাতিকেও। এটা যে হেফাজত জামায়াতের দেশটাকে মৌলবাদীকরনের প্রচেষ্টা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
গ্রামাঞ্চলের মানুষগুলোকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তারা জানে, “হেফাজতের ‘আলেম’রা ঢাকাতে জড়ো হয়েছিলো ইসলাম ধর্ম রক্ষার্থে এবং ‘হাজার হাজার’ আলেমকে সরকার নির্বিচারে হত্যা করেছে, অতএব এই সরকার ইসলামবিরোধী নাস্তিক।” এদের কানে এটাই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানেও এই কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। অথচ এদের অধিকাংশই জানেনা হেফাজতের ঐদিনের সহিংসতা, শত শত কোরান পোড়ানোর ঘটনা। অধিকাংশই জানে “গনজাগরন মঞ্চের সবাই নাস্তিক এবং এটা আওয়ামীলীগের সাজানো, সরকার এদের মাধ্যমে নাস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।” রাজনৈতিকভাবে অসচেতন মানুষগুলোকে বুঝানো হচ্ছে সরকার যাদের বিচার করছে তারা কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়, বড় বড় আলেম। আস্তে আস্তে মানুষের মাথায় এই ধারনা ঢুকিয়ে দিলে পরবর্তিতে রায় বাস্তবায়ন করতে সরকারকে যে বেকায়দায় পরতে হবে এটা নিশ্চিত। হেফাজত জামায়াত এটাই চাইছে আর এজন্যই বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার পরও একই পোষ্টার বারবার লাগানো হচ্ছে।
আমি আবারো কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক গনজাগরন মঞ্চের কর্মীদের সতর্ক করে দেই, পোষ্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে এদের এই ধরনের প্রচারনা শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারই বাধাগ্রস্ত করবে না, ভবিষ্যতে এদেশে মৌলবাদের উত্থানও ত্বরান্বিত করবে যার পরিনতি হবে ভয়াবহ। তাই আপনাদের অনুরোধ, আপনারা এভাবে শহরে অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমেই আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ রাখবেন না, দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হলে গ্রামাঞ্চলের দিকে নজর দিন। শুধুমাত্র ঢাকা শহরে গনজোয়ার সৃষ্টি করলেই হবে না, গ্রামেও এর আঁচ লাগাতে হবে। দরকার হলে ফান্ড গঠন করে পোষ্টারিং, লিফলেটের মাধ্যমে প্রচারনা চালান, সাধারন মানুষের কাছে ওদের এই অপপ্রচারের বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরুন। শুধু মিডিয়াকে এই দায়িত্ব দিয়ে দিলে হবে না, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো এই তথ্য পায় না।
সরকারকেও এরকম নীরব ভূমিকা পালন না করতে কেউ অনুরোধ করুন। বিচারের রায় এখন যতই পিছিয়ে যাবে সরকারকে কিন্তু ততই বেকায়দায় পড়তে হবে। বিচার ঝুলিয়ে রেখে ক্ষমতায় যাওয়ার ধান্দা থাকলে শুধু হিতে বিপরীতই হবে।
এখন গনজাগরন মঞ্চের উচিত দুইটি কাজ করা,
১। পোষ্টার এবং লিফলেটের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রচারনা চালানো, এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলেই বেশি নজর দিতে হবে।
২। নিজেদের আন্দোলন সম্পর্কে, বিশেষ করে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে এই মানুষগুলোর মাঝে ধারনা তৈরি করা, সেটাও পোষ্টার এবং লিফলেটের মাধ্যমে।
আবারো বলি, দরকার হলে ফান্ড গঠন করুন। সরকারকেও একইভাবে প্রচারনা চালাতে বলুন। নইলে শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, ভবিষ্যতে এই দেশের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ ভবিষ্যত।

পুনরায় অনুরোধ, প্লিজ আস্তিক নাস্তিক, বাম ডান ক্যাঁচাল না করে মৌলবাদের হিংস্র থাবা থেকে এই দেশটাকে বাচান। ভবিষ্যতে ক্যাঁচাল করার বহু সময় পাবেন। কিন্তু একবার এই দেশটা মৌলবাদে পতিত হলে আর কিন্তু পূর্বে ফিরে যেতে পারবেন না।

৭ thoughts on “গ্রামাঞ্চলে হেফাজত জামায়াত : সরকার ও গনজাগরন মঞ্চের প্রতি সতর্কবার্তা

  1. ওরা ওদের কাজ করে চলেছে নীরবে,
    ওরা ওদের কাজ করে চলেছে নীরবে, আর আমরা নিজেরা পরস্পরের ইয়ে ছিঁড়ে চলেছি সরবে। লাভের গুঁড় কার ভাগে যাচ্ছে সেই ব্যাপারে কারো হুঁশ নেই।
    আমিও ভাই গ্রামের দিকেই থাকি, তাই সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দেখে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। এভাবে চললে সামনে মহাবিপদ। সেই বিপদ থেকে ডান, বাম, সেক্যুলার, মেক্যুলার কেউই বাদ যাবেন না। সুতরাং সাধু সাবধান।

  2. এসব মিথ্যাচারের জবাব
    এসব মিথ্যাচারের জবাব ব্যাপকভাবে দিতে হবে ।এজন্য প্রয়োজন ৩টি পদক্ষেপ।(ক)সবকটি মিথ্যাচারের জবাব একসাথে সুন্দর করে ভিডিও ও ইমেজ ফরমেটে একটি ডিভিডি ক্যাসেটে সংরক্ষন করে সারাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে।প্রতিটি ওয়ার্ড এবং বাজারে একদিন করে এই ভিডিও জনসাধারনকে দেখাতে হবে।বিটিভিতে যে ভাবে আবহাওয়ার খবর দেখানো হয় তেমনি প্রতিটা অংশ বুঝিয়ে বুঝিয়ে মানুষকে দেখাতে হবে।এ জন্য কর্মীদের ট্রেনিং দিতে হবে।প্রদর্শন শেষে এই ডিভিডি ক্যাসেট জনতার মাঝে বিনামুল্যে বিতরন ও করা যেতে পারে।(খ)প্রতিটি মিথ্যাচারের জবাব সঠিকভাবে বর্ননা সহ সচিত্র পদ্ধতিতে একটি ছোট্র আকারের বই প্রকাশ করে তা সারাদেশে বিনামুল্যে বিলি করতে হবে।প্রতিটি মাদ্রাসায় একশো দুশো করে কপি পাঠাতে হবে।উক্ত বইটিতে বিগত এবং হাল আমলের হত্যা নির্যাতনের বিভিন্ন ফটো ক্যাপশন ও পেপার কাটিং সংযোজিত করতে হবে।বইটিতে লীগের ধর্মীয় অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি বিরুধী জোটের ধর্মীয় অবমাননা সমুহ উল্লেখ করতে হবে।বিশেষ করে মসজিদের কার্পেট পোড়ানো, কোরান পোড়ানো ইত্যাদি।বইটির শেষের দিকে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি ও আগামী উন্নয়ন পরিকল্পনা উল্লেখ করা যেতে পারে ।(গ)দেশের প্রতিটি মসজিদে মিথ্যাচারের জবাব ১০মিনিটের একটি খুতবার মাধ্যমে ধর্মপ্রান মানুষকে জানাতে হবে।এজন্য দক্ষ আলেমদের প্রশিক্ষন দিয়ে সারা দেশের মসজিদ গুলোতে একবার করে প্রতি শুক্রবার পাঠাতে হবে।বয়ান শেষে ‘খ’ অংশে বর্নিত বইটির কয়েকটি কপি মুসল্লিদের মাঝে বিতরন করতে হবে।
    বিঃদ্রঃ এই কাজ গুলো করতে গেলে কোন কোন এলাকায় প্রশাসনিক ও দলীয় কর্মীদের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।

  3. শহরে থেকে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা
    শহরে থেকে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আঁচ করতে পারাটা কঠিন। আন্দোলন পরিকল্পনা সেভাবেই করা উচিত যাতে সেটা সব জায়গায় ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু গনজাগরন মঞ্চের আন্দোলনে সে ধরনের পরিকল্পনার ছাপ এখনো লক্ষ্য করিনি। সরকার তো ঢাকা শহরে বসে দিবাস্বপ্ন দেখছে।

  4. কোন গণজাগরণের কথা বলছেন?
    কোন গণজাগরণের কথা বলছেন? ফেব্রুয়ারি মাসের গণজাগরণ এখন আর নাই। এখন যেটা আছে সেটাতে শুধু কে কীভাবে কার পিছে লাগবে, কি কীভাবে কাকে গালি দিবে , কীভাবে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা! ধারী প্রমাণ করবে সেই নিয়েই ব্যস্ত।
    হেফাজত শিবিরের কার্যক্রমের সাথে এজন্যই গণজাগরণ পেরে উঠছে না। হেফাজত ভেতরে ভেতরে ঠিকই কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু গণজাগরণের কোন কার্যক্রমই নাই। হেফাজতের মধ্যে নিজেদের নিয়ে কোন ক্রন্দল নাই। ওদের একটাই চিন্তা কীভাবে উদ্দেশ্য সফল করবে। কিন্তু অন্যদিকে গণজাগরণ তার আসল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে দলাদলি নেতৃত্ব নিয়ে ব্যস্ত।
    মানুষকে হেফাজত জামাত সম্পর্কে সচেতন করার চেয়ে এদের কাছে প্রধান হচ্ছে গণজাগরণকে আস্তিক প্রমাণ করা, সকল নাস্তিকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, ডান বাম নিয়ে টানাটানি করা।
    এরা ভুলেই বসে আছে এদের এই নোংরামিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে হেফাজত জামাত শিবির। হেফাজতকে জায়গা বানানোর জন্য এরা নিজেরাই জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *