হিজ​ড়া: লিঙ্গবৈশম্যের করুনতর শিকার।

হিজড়া শব্দটির উৎপত্তি মোটামুটি সবারই অজানা। কিন্তু এটাকে গালি হিসেবে যে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হ​য় তা কারো অজানা না। কাউকে অক্ষম বোঝাতে হলেই গালি দেয়া হ​য়, হিজ​ড়া। আগে যেমন অবলা বলতে “নারী” বলে গালি দেয়া হত​। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য কত কষ্ট, কত ত্যাগ বহু মানুষ স্বীকার করেছেন। এত কিছুর মাঝে এই উভলিঙ্গ মানবগন সাইডবারে চলে গেছেন। ছোটবেলা থেকে রাস্তায় দেখতাম, অদ্ভুত কিছু পোষাক পরে তথাকথিত “হিজ​ড়া” নামক এই গোষ্ঠী ভিক্ষা করতেন। প্রক্রিয়া অদ্ভুত, প্রথমে একটি কানে তালা লাগানো হাততালি, এরপর গান এর সাথে টাকা চাওয়া। মানুষজন এদের ভ​য় পায়। যেহেতু ব​ড়রা ভ​য় পায় তাই ছোট অবস্থায় আমিও ভ​য় পেতাম।একটু ব​ড় হওয়ার পর বুঝলাম, এদের ভ​য় পাওয়ার আদৌ কোন কারন নেই। একবার ফটোর দোকানে বসে ছবি ওয়াশ করাচ্ছিলাম আমার পরিচিত দোকানিকে দিয়ে। মাঝপথে কিছু মানুষ এসে হাজির।”স্যার আফনে এত টাকা কামাইতেছেন আমাগরেও একটু দেন” বলে সে কি হাসি..।দোকানিকে দেখলাম বিতৃষ্নায় মুখ ছোট করে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। আমি মানুষটির দিকে তাকালাম। মেয়ে হলে হ​য়ত মডেল হতে পারতেন। অস্বাভাবিক সুন্দর চেহারা। আমি বললাম, কেন এমন করছেন?স্বাভাবিকভাবে চললে তো এসব করতে হত না আপনার! উনার চেহারাতে এরপর যেই দুঃখ দেখেছিলাম তা হ​য়ত আর ভুলবনা। তিনি বললেন, তুমি বাচ্চা মানুষ কিছুই জাননা আমাদের কি কষ্টের মাঝ দিয়ে যেতে হ​য়। এই বলে তিনি আর কিছু না বলে দলবল নিয়ে চলে গেলেন। এবং আমার কৌতুহল শুরু হল​।

বর্তমানে বাংলাদেশে ভাসমান উভলিঙ্গদের সংখ্যা ১৫ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু হিজ​ড়াদের এইরুপ আলাদা সমাজের উৎপত্তি হ​য় প্রায় দুইশ বছর পূর্বে। বাংলাদেশে হিজ​ড়া সমাজের উৎপত্তি নিয়ে প্রায় কোন গবেষনাই দেখা যায় না। http://i1.ytimg.com/vi/19FTNHkK0eo/hqdefault.jpg যেহেতু এশিয়া ছাড়া অন্য দেশে উভলিঙ্গদের এইরকম পার্থক্যকরন, নিচ চোখে দেখা হ​য় না তাই ধরা যেতে পারে যে বাংলাদেশ এর এলাকায় হিজ​ড়া সমাজের উৎপত্তি বেশিদিনের ন​য়।

ইংরেজ শাসনের পূর্বে উভলিঙ্গদের অবস্থা নিয়ে তথ্য পাওয়া যায় মুঘল শাসনামলে। সেই সময় মুঘল বাদশাহদের হারেমে উভলিঙ্গদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। এবং এক বিশেষ চাকর শ্রেনীর নাম পাওয়া যায়-খোজা। এই খোজারা নপুংসক ছিলেন এবং বাদশাহদের কিছু গুরুত্বপূর্ন কাজে তারা সাহায্যও করতেন। তবে ওইসম​য়ে আমরা আজকের চাঁদাবাজিমূলক হিজ​ড়া সমাজের কোন তথ্য পাই না। ধারনা করা যেতে পারে, বর্তমান হিজ​ড়া সংস্কৃতির উৎপত্তি হ​য় ব্রিটিশ আমল থেকে, যখন ব্রিটিশরা এই দেশ অধিকার করে শাসনকর্তা হ​য়ে বসে। এর পূর্বের বাদশাহ ও নবাবগন উভলিঙ্গদের চাকরিতে নিযুক্তকরন সহ কিছু কাজে সুযোগ করে দিতেন বিধায় এটা প্রকট আকার ধারন করেনি। উভলিঙ্গগন গ্রামের যাত্রা থেকে শুরু করে বাদশাহদের জরুরি কাজেও নিযুক্ত হতেন। তবে তাদের নিয়ে যৌনব্যাবসা হ​য় নি তা ন​য়। কিন্তু তখনো হিজ​ড়া নামের আলাদা সমাজ গ​ড়ে ওঠেনি। ইংরেজদের শাসন​অবস্থায় আর সেই রীতি থাকল না।তখন সাধারন বাঙালিরাই মানবেতর জীবন যাপন করেছে তাই উভলিঙ্গদের নিয়ে আলাদা কোন ব্যবস্থাও ইংরেজ সরকার নেয় নি। অবহেলা আর সুযোগসুবিধার বঞ্চনা থেকে উভলিঙ্গরা সংগঠিত হয়ে প্রথম হিজ​ড়া সমাজ তৈরি করে। এরা প্রথমে নিজস্বভাবে যাত্রা আর গানের দল তৈরি করলেও সাড়ার অভাবে পরে দস্যুবৃত্তি শুরু করে। জন্য কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা নেয় নি। সমাজে নারী অধিকার নিয়ে অনেক বচসা হয়েছে, নারীশিক্ষা সহ বহু অধিকার এসেছে। কিন্তু এই উভলিঙ্গ জনগোষ্ঠীদের যে শুধু অবহেলাতেই রাখা হ​য়েছে তাই ন​য়, বরং এদের কেউ মানুষ হিসেবে না, কোন অদ্ভুত প্রানী হিসেবে দেখে। সংখ্যায় যথেষ্ট কম হওয়ায় এদের নিয়ে আলাদা কোন সম্পদ বাটোয়ারা আইন নেই, কোন অধিকার আদায়ের সংস্থা নেই। অহর্নিশি এদের অবস্থা পরিত্যাক্ত আস্তাকুড়ে ঘেটে খাওয়া কুকুরের মত হ​য়েছে। এর জন্য সমাজের তথাকথিত কর্তাব্যাক্তি আর সুশীলরাই দায়ী।

৩৬ thoughts on “হিজ​ড়া: লিঙ্গবৈশম্যের করুনতর শিকার।

  1. গতকাল খবরে দেখলাম বাংলাদেশে
    গতকাল খবরে দেখলাম বাংলাদেশে মোট হিজড়াদের সংখ্যা নাকি সরকারি হিসেবে ১ লক্ষ কিন্তু এটা সত্য যে এই সংখ্যা অনেক বেশি ।। যদি সরকারের হিসাব মতে যদি ১ লক্ষ হিজড়া হয় তাদের কি পুনর্বাসন অথবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি ?? আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে এবং তাদের পৃষ্টপোষকতার ও ব্যবস্থা করা হয় ।। একবার ইত্যাদিতে দেখেছিলাম বাংলাদেশের কোন একটা অঞ্চলের একটা কারখানা সম্পূর্ণভাবে প্রতিবন্ধীদের দিয়ে পরিচালিত হয় তাহলে হিজড়ারা কি দোষ করলো ?? ওদের কেনো চাকুরীর ক্ষেত্রে বাঁধা আসে আর ওরা কেনইবা একটা সাধারন মানুষের মত জীবনযাপন করতে পারবেনা ?? সরকারি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও হয়তো সামাজিক সংগঠগুলো এগিয়ে আসলে হয়তো এর সমাধান সম্ভব কারন হিজড়ারাও কিন্তু ” সৃষ্টির সেরা জীব “………

    1. চাকরি থেকে শুরু করে সকল
      চাকরি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে উভলিঙ্গদের কোন সুযোগ নেই। সব যার যার ইমেজ নিয়ে ব্যস্ত​। উভলিঙ্গগন তাদের সহকর্মী হলে তাদের চুলকায়।হিজ​ড়া শব্দটিতেই আমার আপত্তি র​য়েছে।

      1. আসলে এটা একটা প্রথা হয়ে গেছে
        আসলে এটা একটা প্রথা হয়ে গেছে আর অনেকের মাঝে ঝগড়া হলে অনেকেই হিজড়া বলে গালি দেই কিন্তু একটি বারের জন্য চিন্তা করেনা বিধাতার সৃষ্টি সবাই কিন্তু মানুষ কার গায়ে লিখা নেই যে সে হিজড়া ।। আমার কিছু হিজড়া পরিচিত আছে কখনো সুযোগ হয়নি যদি সুযোগ হয় তাহলে ওদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে আর একটা কথা না বললেই নয় বর্তমান ।। য়ে কিন্তু হিজড়াদের কে নিয়ে অনেকেই ব্যবসা শুরু ও করেছেন অনেক ছেলেকেই দেখা যায় হিজড়া সেজে চান্দাবাজি করতে আবার মাঝে মাঝে কিছু মেয়েকেও চোখে পরে …………

  2. সচেতনতামুলক পোস্টটির জন্য
    সচেতনতামুলক পোস্টটির জন্য ধন্যবাদ ।
    ———————————
    আসলে আগে ব্যাক্তির মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন । আগে ব্যাক্তির মানসিকতার পরিবর্তন তারপর্ রাষ্ট্র । এ ব্যাপারে সবাই সচেতন হলে, নিজেদের নোংরা মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে পারলে এই সমাজ এমনিতেই বদলে যাবে । রাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিতে হবে না সুযোগ তারাই করে নিবে ।

    আপনার কথাই ঠিক, আমাদের ই এদের সাথে মিশতে ঘোর আপত্তি আছে ।

    1. কিন্তু আমাদের মানসিকতার
      কিন্তু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হলে তো! এইখানেই একহাজার মানুষ আছে যারা এই পোস্ট দেখে ছু ছু শব্দ করে বলবে, আহারে ওই মানুষগুলো আর কালকেই রাস্তায় উভলিঙ্গদের দেখলে সঙ্গীকে ডেকে হাসতে হাসতে বলবে, দেখো হিজ​ড়া।

  3. এতে তো সত্যিকারের উভলিঙ্গদের
    এতে তো সত্যিকারের উভলিঙ্গদের দোষ নেই। সমাজে এতরকম অধিকার আদায়ের সংস্থা আছে কিন্তু উভলিঙ্গদের জন্য কিছুই নেই। সামান্য প্র​য়োজনীয় নির্যাতন আইনটিও নেই।

    1. আমি উভলিঙ্গদের দোষ দিচ্ছিনা
      আমি উভলিঙ্গদের দোষ দিচ্ছিনা যারা এমন কাজ করে তাদের কে চিহ্নিত করার ব্যাপারে কথা বলছি এবং আয়নের আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছি আর অবশ্যই উভলিঙ্গদের ৫টি মৌলিক অধিকার আদায়ের ব্যাপারে কথা বলছি …………

        1. আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল
          আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমরা বাঙালীদের ৩ হাত ডান হাত বাম হাত এবং আর একটা হল অজুহাত যার দোহায় দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি এই অজুহাত না কাটা পর্যন্ত আমাদের মন এবং মানসিকতার উন্নতি আশা করা যায়না………

          1. আমরা নিজেরা নিজেদের দোষারোপ
            আমরা নিজেরা নিজেদের দোষারোপ করি, ভাব ধরি মুক্তমনার কিন্তু রাস্তায় এদের দেখে আবার নাক সিটিকাই।

  4. হিজরা সম্বন্ধে আসলে তেমন কিছু
    হিজরা সম্বন্ধে আসলে তেমন কিছু পড়ার সুযোগ হয় নাই ।তথ্যবহুল পোষ্টটার জন্য ধন্যবাদ

    1. বরং অনেকে জেনেশুনেও কিছু
      বরং অনেকে জেনেশুনেও কিছু লিখতে চায়না, পাছে তাকে হিজ​ড়া বলে আখ্যায়িত করা হ​য়। আজ হিজ​ড়া শব্দটি রুপোপজীবনীর সমার্থক হ​য়ে গেছে।

  5. ঠিক বলেছেন,আমাদের
    ঠিক বলেছেন,আমাদের সমাজতান্ত্রিক সিস্টেমে বিশাল গন্ডগোল আছে এই নিয়ে.নয়তো সমাজের অনেকক্ষেত্রেই বিচরণ করার মত যোগ্যতা তাঁদের আছে.পরিত্যক্ত অবস্থা থাকতে থাকতে মানুষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তাঁদের অতটা সুখকর নয়.
    নিজেই তো দেখছি যে এলাকার হিজড়ারা সমাজের অবজ্ঞার শিকার হতে হতে এখন কতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে!

  6. আমাদের সমাজে হিজড়ারা সংখ্যায়
    আমাদের সমাজে হিজড়ারা সংখ্যায় কম নয় ।এই বিপুল জনগোষ্টিকে সামাজিকভাবে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে মুল সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করা সম্ভব।বিশেষ করে এদের কাছে শিক্ষার আলো পৌছাতে হবা ।এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি এনজিও বা সামাজিক সংগঠনগুলোকেও ভুমিকা পালন করা প্রয়োজন ।

  7. হিজড়া শব্দটাই আপত্তিকর।
    হিজড়া শব্দটাই আপত্তিকর। জন্মগত ত্রুটির উপর একজন মানুষের কি হাত আছে? কবে আমাদের মানসিকতা বদলাবে? :মাথাঠুকি:

    1. আশেপাশে কেউ উভলিঙ্গদের দেখে
      আশেপাশে কেউ উভলিঙ্গদের দেখে হাসতে দেখলেই চ​ড় লাগাবেন কষে। কিছু মানুসের মানসিকতার পরিবর্তন হবে অবশ্যই।

  8. আপনি মানুষ, আমি মানুষ, হিজরাও
    আপনি মানুষ, আমি মানুষ, হিজরাও মানুষ। এই বোধ মানুষের মধ্যে জন্মালেই হিজরাদের প্রতি সন্মান বাড়বে।

    1. পুরুষও মানুষ… নারীও মানুষ
      পুরুষও মানুষ… নারীও মানুষ আর হিজড়াও মানুষ!!
      কিন্তু পুরুষতন্ত্রই সবাইকে বাতিল করে দেই!! কি করতাম :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি:

      1. ভাল হত তাহলে পুরুষ ছাড়া আর
        ভাল হত তাহলে পুরুষ ছাড়া আর কেউ না থাকলে। তখন পুরুষতন্ত্রের খ্যাতা পুড়ানো ছাড়া আর পুরুষদের কিছু করার থাকতো না।

    2. হুম আমিও মানুষ আপনিও মানুষ
      হুম আমিও মানুষ আপনিও মানুষ উভলিঙ্গগনও মানুষ। কিন্তু তারপরও মানুষই মানুষের বেঁচে থাকা অসহনীয় করে দেয়। যারা করে তারাও (অ)মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *