সেফান (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী)

আমি এখন একটা লোহার থামের সাথে বাধা আছি। যে শেকলটা দিয়ে আমাকে বাধা হয়েছে, সেটা ছিঁড়তে আমার মত তের জন লাগবে। তবুও আমাকে এটা দিয়ে বাধা হয়েছে কারণ, রডরিক কোন ঝুঁকি নিতে চায় নি। ওর ধারণা, আমার গায়ে অসুরের মত শক্তি এবং লোহার শেকল ছিঁড়ে পালানোর মত ক্ষমতা আমার আছে। ধারণাটা অবশ্য আংশিক সত্যি। ঘণ্টা দু’য়েক আগেই আমি আমার খাঁচাটার লোহার শিক বাঁকা করে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু, দরজার লক কোডটা ভাঙ্গতে পারি নি। দুর্ভাগ্য! রডরিক এসে আমাকে দেখে ফেলে, ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে দেয়। ঘুম থেকে জেগে আমি প্রথমে দেখলাম রডরিককেই। আমার সামনে বসে আছে। বেশ মোটা একটা রড হাতে ধরে। কয়েক সেকেন্ড পরে খেয়াল করলাম, আমি একটা লোহার থামের সাথে ইয়া মোটা শেকল দিয়ে বাধা। আমি জেগে উঠেছি খেয়াল করতেই রডরিক তার হাতের রডটা দিয়ে আমার বাম ঘাড়ের তিন আঙ্গুল উপরে শরীরের সব শক্তি দিয়ে আঘাত করল।

আমার মাথাটা এখন ডানদিকে বাঁকা হয়ে আছে। প্রথমবার দেখলে যে কেউ মনে করবে, মাথাটা বোধ হয় ঘাড়ের সাথে কোন মতে ঝুলে আছে। একটু পরেই টুপ করে খুলে পড়ে যাবে। মাথাটা সোজা করতে পারছি না বলে, রডরিককে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছি না। মাথাটা সোজা করতে পারলে, ও একটা শো কেস এর আড়ালে চলে যেত। কিন্তু, হচ্ছে না।

ওকে দেখলেই আমাদের কমিউনের সবার মাঝে প্রচণ্ড একটা ক্রোধ ভর করে। ঠিক কী কারণে এমন হয় জানি না, কিন্তু ওকে যদি একবার আমরা কেউ খালি হাতে পেতাম! কিংবা, দু’হাতের ব্যবধানে কোন কোন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ছাড়া… জানি এমন কখনও হবে না। ও নিজেও জানে আমরা ওকে কতটা ঘৃণা করি। তাই ও কখনও খালি হাতে আমাদের কাছে আসবে না। অবশ্য, ওকে ঘৃণা করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। আজকে ও আমাকে মেরেছে, কারণ আমি পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। আগামীকাল আমাকে ডেলিভারি করা হবে। আর আজকেই যদি আমি পালিয়ে যাই, ওদের কোম্পানির কি বিতিকিচ্ছিরা দশাটাই না হবে! কোম্পানির সুনামটাও তো এক লাফে অর্ধেক। শেয়ারে বিরাট দরপতন। সেই তুলনায় ও আমাকে কিছুই করে নি। রড দিয়ে বাড়ি দিয়ে ঘাড় ভেঙ্গে দিয়েছে। এখন ঘাড় সোজা করতে পারছি না। সোজা করতে গেলেই ভাঙ্গা হাড় মাংসে বিঁধছে। অসহ্য যন্ত্রণা! কিন্তু, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে চোখের সামনে রডরিককে দেখতে হচ্ছে।

ওকে দেখে এখন মনে হচ্ছে, ও বোধ হয় প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। কিন্তু, আমি বাজি ধরে বলতে পারি ও এখন ইন্টারনাল নেটওয়ার্কে কোন সুন্দরীর সাথে প্রেমালাপে মগ্ন। মাঝে মাঝে অবশ্য আমাদের কমিউনেরও কারও কারও পেছনে ঘুরেছে, কিন্তু পাত্তা পায় নি।

এখন বলতে গেলে, আমাকে মাথাটা ডান দিকে কাত করে রেখে থামের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। কিছু চিন্তা করা যায়। কী হতে পারে? আচ্ছা, আমাকে যে লোকটা কিনেছে সে কেমন হবে? সে কী মানুষের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞাকে বিশ্বাস করে না’কি সামাজিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞা? বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় তেইশ জোড়া ক্রমোজম দিয়ে অন্য কোন মানুষের সাথে মিলে মানুষ জন্মদানের ক্ষমতা থাকলেই হল। কিন্তু, সামাজিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞায়, ‘মানুষের নিজস্ব কমিউন থাকতে হবে। শোক, দুঃখ, আনন্দ, কষ্ট, লোভ ইত্যাদি অনুভূতি থাকতে হবে। ভালবাসা থাকতে হবে। সামাজিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে হবে।’ আরও কী কী যেন…।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, অধিকাংশ বিজ্ঞানীও মানুষের সামাজিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় আস্থা রাখেন। কারণ, সেটায় আস্থা রাখলে, আমদের আর মানুষ বলে স্বীকৃতি দিতে হয় না। আমাকে যে কিনছে সে কোন সংজ্ঞায় বিশ্বাস করে? ধুর! অবান্তর প্রশ্ন। সে যদি সামাজিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় বিশ্বাস করত তাহলে আমাকে কিনত না। পৃথিবীতে এখন অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করে মানুষের সামাজিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞায়। কিছু মানুষ অবশ্য ব্যতিক্রম আছে। অনেকেই কথা বলে আমাদের অধিকার নিয়ে। মাঝে মাঝে আন্দোলনও হয়। এই তো গেল বছর মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর একটা গবেষণা করতে গিয়ে প্রায় পাঁচশ ‘সেফান’ মারা গিয়েছিল। আরও প্রায় আড়াই হাজার গুরুতর অসুস্থ ছিল দীর্ঘদিন। ওহ! বলা হয় নি। সাধারণ মানুষ আমাদের ‘সেফান’ বলে ডাকে। ওরা Homo sapiens আর আমরা Homo sephun. যাই হোক, পাঁচশ মানুষের… ওহ! না, পাঁচশ সেফানের মৃত্যুর পর বড় ধরণের গোলমাল হয়েছিল। অনেক লোক আন্দোলন করে বলেছিল, ‘মানুষের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞাকে সংবিধানে গ্রহণ করে সবাইকে সমান অধিকার দিতে হবে। সব মানুষ সমান। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করা যাবে না।’ আরও কী কী যেন। পত্রিকায়ও বেশ লেখালেখি হল। অথচ, এক মাস পরে সব ঠাণ্ডা। যেন কিচ্ছু হয় নি। কিছু হবে না, জানতাম। কারণ, ওই কোম্পানির মালিক ছিলেন এখানকার কংগ্রেস মেম্বারের কিছু একটা। পৃথিবীতে ‘ক্ষমতাবানদের কিছু একটা’রও কখনও কিছু হয় না।

কতক্ষণ পার হল জানি না। একটু পরে কিংবা অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাবার পর, রডরিক ভেতরে ঢুকল। হাতে একটা লেজার বিম। এটা দিয়ে আমার পেছনের লোহার থামকেও গলিয়ে দেয়া যাবে। ঝুঁকি নেবার প্রশ্নই আসে না। বলল, ‘তোমার ডেলিভারির সময় হয়ে গেছে’।
ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকালাম। ও তার অর্থটা ধরতে পারল। ও বলল, ‘ঘুমিয়ে ছিলে আঠার ঘণ্টা সাঁইত্রিশ মিনিট’। কথাটার অর্থ আমি ধরতে পারলাম।

আমার কাছে আসার সাহস পেল না। দুর থেকেই লোহার থামে একবার লেজার বীম ফেলল। ওটা কেটে দু’ভাগ হয়ে পড়ে গেল। পিঠে বেশ বড় একটা ফোসকা পড়ল। ব্যাপার না। এসব আমাদের সাথে অহরহই হয়। আমি সেখান দিয়ে শেকলে বাধা হাত গলিয়ে বের করে আনলাম। আমার কমিউনের বাকিরা উৎসাহী চোখে তাকিয়ে আছে। সমাজ বিজ্ঞানের সংজ্ঞাটা বোধ হয় আসলেই ঠিক। আমাদের মাঝে কোন ‘বোধ’ নেই। জন্মের পর থেকে আমি এদের সাথে আছি। অথচ, এদের ছেড়ে যেতে আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না।

সত্যিই কি হচ্ছে না? হঠাৎ, আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আমি নিজেকেই বলছি, ‘আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। আমার এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না।’ আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, মাথাটা ডান দিকে খানিকটা এলিয়ে দিয়ে আমি সোজা তাকিয়ে আছি। কোন দিকে তাকাতে পারছি না। ঠিক করে বলতে হলে বলতে হয়, তাকানোর সাহস পাচ্ছি না।

ডানে তাকালেই হয়তো আমি এখন দেখতে পাব রোয়ানাকে। সেবার যখন আমার ম্যালেরিয়া হবার পর নিজের দেহের অসহ্য শীতলতায় আমি কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম, রোয়ানা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। তার বুকের উষ্ণতাটুকু দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। ঠিক মায়ের মত করে। শব্দটার ব্যবহার কতটা সঠিক আমি জানি না। কেমিক্যাল বেডে জন্ম নেয়া সেফানদের কোন বাবা-মা থাকে না। থাকে না ভাই-বোন, কিংবা কোন মমতা; কারও ভালবাসা। আমরা একটা কোম্পানির প্রোডাক্ট ছাড়া কিছুই না। যাদের কিছু হবে, গবেষণার গিনিপিগ, কিছু হবে দামী কৃত্রিম অঙ্গের পরিবর্তে সস্তা এবং একই সাথে অধিক কার্যকরী জৈব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উৎস, কিছু যাবে যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু, সবার মিল একটাই। কেউ স্বাভাবিক মৃত্যু পাবে না। সবাই মারা পড়বে মানুষের জন্য, মানুষের কারণে, মানুষের দ্বারা, মানুষের হাতেই।

বামে তাকালে হয়তো দেখতে পাব বৃদ্ধ নেফালকে। যে আমাকে মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে ইতিহাস শুনিয়ে পার করত তার নির্ঘুম রাতগুলো। তাকে তৈরির সময় কী যেন একটা বৈদ্যুতিক গোলযোগ হয়েছিল। তাই তার মাঝে কোন সৃজনশীলতা ছিল না। তাই তাকে কেউ কেনে নি। কিন্তু, তার মনে রাখার ক্ষমতা ছিল অস্বাভাবিক। বোধ হয় পৃথিবীর পুরো ইতিহাস তার মুখস্থ। সে আমাকে শোনাত কীভাবে মানুষ অন্যকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করে গড়ে তুলছে এই সভ্যতা। কীভাবে পৃথিবীর প্রতিটা সভ্যতা গড়ে উঠেছে মানুষের রক্তে। কীভাবে মিশরের সভ্যতা গড়ে উঠেছে দাসদের রক্তে! কীভাবে আফ্রিকা থেকে বয়ে আনা রক্তে প্রাসাদ তৈরি হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায়! কীভাবে শিল্পযুগে শ্রমিকদের রক্তে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাতেই কখনও ভবন-ধ্বস কখনও আগুনে পুড়েছে শ্রমিকরা! তাদের টাকায় অর্থের প্রাচুর্যে বাস করে কীভাবে মালিকরা তাদের বেঁচে থাকার নূণ্যতম নিরাপত্তাটুকুও দেয় নি। কীভাবে ২৪ ঘণ্টার দিতে ১৮ ঘণ্টাই কাজ করতে হয় একজন শ্রমিককে! সব বলত আমাকে বুড়ো নেফাল। বলে আমাকে সান্ত্বনা দিত। প্রেরণা দিত। তারা মানুষ হয়েও তো মানুষের হিসেবে বিবেচিত হয় নি। আর আমরা তো মানুষ নই।

তার একটু পেছনে তাকালে আমি দেখব রুহিকে। অবাক হলাম। হঠাৎ তার কথা মনে পড়ল কেন? তার কথা মনে পড়ার কোন কারণ আছে কী? হয়তো নেই। হয়তো কারণের থেকেও বেশি কিছু আছে। জানি না কিছু। সেফানদের জীবনে ভালবাসা থাকে না।

রডরিক আমার পায়ের আধ মিটার দুরে লেজার বিম ফেলল। একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণের মত হল। আমাকে সামনে এগোবার সংকেত। সামনে এগোলাম। সেফানের অনিশ্চিত জীবনকে পেছনে ফেলে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

৪ thoughts on “সেফান (বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী)

  1. ভালো লিখেছেন। ব্যাপারটা
    ভালো লিখেছেন। ব্যাপারটা সায়েন্স ফিকশনের আদলে লিখলেও অন্তর্নিহিত অনেক ম্যাসেজ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *