দূরত্বের আপেক্ষিক তত্ত্ব কিংবা একটি অপেক্ষার গল্প

আজকে ডে অফ। সাধারণত ছুটির দিনে অনেক বেলা করে ঘুম থেকে ওঠাটাই অনেক দিনের অভ্যেস। মধ্যবিত্তের মাপা বিলাসিতার মধ্যে এইটুকু মাগনা বিলাসিতা করাই যেতে পারে। আজ খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙার পর থেকেই মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। দীপাকে কি যেন একটা কথা বলাটা খুব প্রয়োজন। কিন্তু ঘুম ভেঙেই কেন এই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা অনেকক্ষন ভেবে ভেবেও কোন কূল কিনারা পাচ্ছি না। হতে পারে দীপাকে নিয়ে দেখা একটা দুঃস্বপ্নের কারনে ছুটির সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়াটা একটা কারন। কিন্তু মনের মধ্যে যেই পরিমাণ গুরুতর তাগাদা অনুভব করছি একটা দুঃস্বপ্ন সেটার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী এলিবাই বলে মনে হচ্ছে না। মাত্রই একমাস আগে আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর দীপাকে এমন কি প্রয়োজনীয় কথা বলার থাকতে পারে সেটা ঠিক মনে করতে পারছি না।

ছয় মাস হলো দীপার সাথে দেখা হয় না। বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় যেদিন প্রথম সম্পর্কে ভাঙনের ঢেউ উঠেছিল সেই রাতটার কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন রাতে দীপার ভয়ার্ত চেহারার একটা স্থায়ী ছাপ আমার মস্তিষ্কের মাঝে রয়ে গেছে।
-তুমি কি প্রেগন্যান্ট?
আমার হঠাৎ এইরকম আচমকা প্রশ্নে প্রথমে হতবিহবল ভাব ফুটে উঠলেও মুহুর্তেই সেখানে যায়গা করে নিয়েছিলো চরম আতংকিত একটা চেহারা। এরকম প্রশ্নের কি উত্তর হতে পারে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে না পারলেও আমার আচমকা করা প্রশ্নে হতবিহবল ও আতংকিত দীপার মুখ থেকেও সরল স্বীকারোক্তিটা বেরিয়ে আসে।
-বিশ্বাস করো আমি এই বিয়েটা করতে চাইনি। মা আর বড় মামার চাপে পড়ে রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। আর তখন এতোটাই বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলাম যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো শক্তিও আমার অবশিষ্ট ছিলোনা।
-কয় মাস চলছে?
-চার মাস।
আমি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বিয়ের পর থেকেই খুব কম কথা বলা দীপাকে আমার বরং বেশ চুপচাপ কিন্তু মানসিকভাবে গভীর একজন বলে মনে হয়েছিলো। সাধারণত হুট করে রেগে যাওয়া আমার স্বভাববিরুদ্ধ। কিন্তু বিয়ের দুই সপ্তাহের মাথায় এরকম একটা সংবাদের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। হুট করেই মাথায় আগুন চেপে যায়। মুখ ফসকে বের হয়ে যায়
-জাস্ট গেট আউট।
আমার চোখে এমন কিছু হয়ত দেখেছিল দীপা যে, সে আর কোন কথা না বাড়িয়েই চুপচাপ তার সুটকেস আর ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলো।

আজ সকালে হুট করে দীপার কথা কেন মনে হচ্ছে, কেনই বা খুব প্রয়োজনীয় কিছু একটা বলার এমন জোরালো তাগাদা অনুভব করছি ঠিক মেলাতে পারছি না। কাপড় পড়ে বের হয়ে উদ্দেশ্যহীন বেশ কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করে এক সময় আমি আবিষ্কার করলাম আমি দীপাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কলিং বেল টিপতেই কিছুক্ষন পর দরজা খুলে দীপার মা সামনে আমাকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে গেলেন মনে হলো। কিছুটা ভয় আর লজ্জাও মিশে ছিল চেহারায়।
-এসো বাবা।
-দীপা কি বাসায় আছে?

দীপার মা আরও একটু ভয় পেলেন বলে মনে হলো। মাত্রই ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর এভাবে হুট করে বাসায় এসে দীপার খোঁজ করব সেটা হয়ত উনার কল্পনাতে আসেনি।

-হ্যাঁ, বাসাতেই আছে। ভেতরের ঘরে। ওর শরীরটা বেশী ভালো নেই। শুয়ে আছে বোধ হয়। তুমি ওখানেই দেখা করতে পারো।

আমি ভেতরের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম বিছানায় শুয়ে থাকা দীপার পাশে কাঁথার পুটলির মধ্যে একটা বাচ্চা। দীপাকে বেশ বিবর্ন লাগছে।
-তুমি? এসো ভেতরে এসো।
দীপার মুখে আজকে কোন ভয়ের ছায়া দেখলাম না। বরং সেখানে একটা কৌতুহুল মিশে আছে।
-কবে হলো?
-আজকে ৮ দিন।

আমি আর কোন প্রশ্ন খুঁজে পাচ্ছিনা। অথচ খুব প্রয়োজনীয় কি একটা বলার জন্য হন্যে হয়ে ছুটে এসেছি। এখন আর মনে পড়ছে না। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো
-এরপর কি করবে?
-মানে?

নিজের প্রশ্নে নিজেকেই খুব বোকা বোকা লাগছিলো।

-তোমাকে খুব প্রয়োজনীয় কিছু একটা জিজ্ঞেস করার ছিল। হুট করে এই জন্যই চলে এলাম।
-আমি জানতাম তুমি একসময় জানতে চাইবেই। বাচ্চার বাবা কে? এটাই তো?
-না না, আমি আসলে ঠিক ওইটাও জানতে আসিনি। আচ্ছা তুমি কি আবার বিয়ে করবে?

আবারও বোকার মতো একটা প্রশ্ন মুখ ফসকে বের হয়ে গেলো।
-কে বিয়ে করবে আমায়?
-কেন তোমার প্রেমিক।

দীপা একদম চুপ হয়ে গেলো কিছুক্ষনের জন্য। এরপর খুব ধীরে ধীরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
-যেই মানুষটা নিজের সন্তানের অস্তিত্ব নির্বিকারভাবে অস্বীকার করে চলে যেতে পারে তাকে কি প্রেমিক বলা যায়?
-তাহলে?
-তাহলে কি?
-না কিছু না। কিন্তু তোমাকে খুব প্রয়োজনীয় কি একটা বলার ছিল কিছুতেই মনে পড়ছে না।
-থাক এখন মনে করবার দরকার নেই। যখন মনে পড়বে তখন বোলো। আচ্ছা তুমি কি আমার উপর খুব রেগে আছো?

দীপার এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। কিছুক্ষনের নীরবতায় দীপাই হয়ত নিজের মতো করে উত্তরটা বানিয়ে নিলো।
-আমি কিন্তু তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
দীপার এমন কথায় আরও খানিকটা বিহ্বলতা ঘিরে ধরে আমায়।
-কেন?
-বাচ্চাটার একটা পিতৃ পরিচয় অন্তত হলো।
-তুমি কি ওকে আমার পরিচয়ে বড় করবে নাকি?
-যদি তোমার আপত্তি না থাকে।
-না না আপত্তি নেই।
-কি যেন বলবে বলে এসেছিলে?
-কিছুতেই মনে পড়ছে না কি যেন খুব একটা প্রয়োজনীয় কথা বলার ছিল তোমাকে।
-থাক জোর করে মনে করার দরকার নেই। যখন মনে পড়বে বোলো।
-আচ্ছা আমি যদি মাঝে মাঝে তোমার কাছে আসি তোমার কি আপত্তি আছে? যদি কথাটা মনে পড়ে যায়…
-এসো।

এরপর আর কোন কথা খুঁজে পাইনা। প্রয়োজনীয় সেই কথাটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। অনেকক্ষন ভেবে ভেবেও মনে করতে পারছি না। হয়ত অপেক্ষা করলে মনে পড়ে যাবে। আমার যে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কথাটা দীপাকে বলতেই হবে। অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কিই বা করার আছে?

৪৯ thoughts on “দূরত্বের আপেক্ষিক তত্ত্ব কিংবা একটি অপেক্ষার গল্প

  1. আতিক ভাই !! এইরকম ভাবে
    আতিক ভাই !! এইরকম ভাবে পাঠকদের কৌতূহল তৈরি করে টা না বলা খুব অন্নায় রাগ করছি । 😀 😀 😀 😀 😀 😀

    জাস্ট অসাধারন ব্রো /।
    সাবলীল ভঙ্গিমার বেস্ট প্রয়োগ হল এখানে ।
    আর সাথে যুক্ত হবে পাঠক মনে – একটা প্রশ্ন?
    কি যেন বলার ছিল !!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!

    কিন্তু প্রশ্নের মধ্যে প্রশ্ন লুকিয়ে শেষ করে দিলেন ।

    ভাল্লাগছে । খুব।

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

      1. ভুল না পাইলে কি হ্যারিকেন
        ভুল না পাইলে কি হ্যারিকেন ধরাইয়া ভুল খুজুম নাকি আতিক ভাই !!!! :টাল: :টাল: :টাল: :টাল: :টাল:

  2. অন্যরকম!! অসাধারণ…
    গল্পের

    অন্যরকম!! অসাধারণ…
    গল্পের কনটেন্টই যথেষ্ট মুগ্ধাইতে :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি: :মুগ্ধৈছি:

    1. সতত লিঙ্কন ভাই । গল্পের
      সতত লিঙ্কন ভাই । গল্পের কন্টেন্ট আসলেই অন্যরকম । সাধারন এর গণ্ডির ভিতরে ভিন্নতা যারা বলে ।

  3. লেখাটা পড়তে পড়তে বুকে জানি
    লেখাটা পড়তে পড়তে বুকে জানি কেমন কেমন করছিলো। খুব ছোট পরিসরে সুন্দর একটি ভাবের প্রকাশ। ভালো হয়েছে বলা যায়। আরেকটুউ বড় হলে আরো ভাল লাগতো 🙂

    :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  4. অল্প কয়েকটি শব্দে জীবনের একটি
    অল্প কয়েকটি শব্দে জীবনের একটি বাস্তব উপাখ্যান ।
    সত্যিই অসাধারন ।

  5. এই জন্যই কইছি আপনি রেগুলার
    এই জন্যই কইছি আপনি রেগুলার গল্প লিখেন , হাত চিনতে ভুল হয় নাই 😀

    চমৎকার

        1. সব কথা মুখ ফুটে বলে দেওয়ার
          সব কথা মুখ ফুটে বলে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। জরুরী কথাগুলো নীরবতার মাঝেই বেশী প্রকাশিত হয়।
          আপনার বউয়ের কি হইল আবার? :মাথানষ্ট:

          1. বাপের বাড়ি গেছেগা গোসসা কইরা,
            বাপের বাড়ি গেছেগা গোসসা কইরা, আমি সারাদিন ফেসবুক বলগ, অফিস লইয়া থাহি , হেতিরে টাইম দেই না

          2. ঘরে ঘরে এক কাহানী
            শ্বশুর

            ঘরে ঘরে এক কাহানী 😀
            শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ভাবীরে নিয়ে আসেন। রথ দেখাও হইল, কলা বেচাও হইল। :পার্টি:

  6. একটা কৌতুহলের মধ্যে রেখে
    একটা কৌতুহলের মধ্যে রেখে গেলেন ।যাই হোক লেখার প্লট অসাধারণ লেগেছে ।কিছু অল্প শব্দে পরিপূর্ণ একটা ছবি গল্পতে পেলাম

  7. আতিক ভাই অসাধারন।এক টানে
    আতিক ভাই অসাধারন।এক টানে পড়ছি।অনেক ভাল পোস্ট :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  8. আতসি কাঁচ দিয়া খুঁত ধরিবার
    আতসি কাঁচ দিয়া খুঁত ধরিবার চেষ্টা করিলাম গল্পখানিতে কিন্তু পারলাম না। এই অপারগতায় আমি যথেষ্টই খুশি। 😀 মাঝে মাঝে হেরেও সুখ পাওয়া যায়। ঝাক্কাস লিখসেন বস :মুগ্ধৈছি: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

  9. চমৎকার লিখেছেন তো! লেখাটা পড়ে
    চমৎকার লিখেছেন তো! লেখাটা পড়ে বুকের ভেতর কেমন যেন খালি খালি লাগলো। পুরনো একটা প্রশ্ন মনে পড়ে গেল।
    আমরা কি আসলেই জানি আমরা কি চাই? নাকি কোন কিছু না বুঝেই অন্য কারো দেখানো পথে চলি?
    জানি না।

    প্রয়োজনীয় সেই কথাটা হয়তো একারণেই কিছুতেই আর মনে পড়ে না…

  10. বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহের
    বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় সম্পর্কটা ভাঙল, তার উপর আবার এমন ভাবে যে ছয় মাস আর কোন সংবাদ নাই। অথচ, আতিক ভাই, দুই চরিত্রের কথোপকথন কেমন যেন রোমান্টিক শোনালো না? আমার কাছে মনে হয়েছে…
    তবে গল্পটা বেড়ে হয়েছে। আরও একটু ঝাল হলে খাসা হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *