আম উৎসব ও একটি আবেগী প্লেন

– আপনি কোথায়? আমাদের হাতে সময় খুব কম। চলে যাব কিছুক্ষণের মধ্যে।
– আসছি। একটু।
– হুমম…আসেন।
মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মাইশা। পেছনে নুজহাত মাইশার সাথে তাল মিলিয়ে আগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না।
– তুই তো আমাকে ফেলেই চলে যাচ্ছিস।
– না। সরি। আয়।

– আপনি কোথায়? আমাদের হাতে সময় খুব কম। চলে যাব কিছুক্ষণের মধ্যে।
– আসছি। একটু।
– হুমম…আসেন।
মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মাইশা। পেছনে নুজহাত মাইশার সাথে তাল মিলিয়ে আগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না।
– তুই তো আমাকে ফেলেই চলে যাচ্ছিস।
– না। সরি। আয়।
পথশিশুদের আম উৎসবের ট্রাকটা দেখা যাচ্ছে। ঐখানেই কোথাও সাইফ আছে। আরেকটু কাছাকাছি যেতেই সাইফকে দেখতে পেল মাইশা। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ট্রাকে থাকা একজনের সাথে কথা বলছে। গায়ে বৃষ্টিতে ভেজা আম উৎসবের টি-শার্ট, ধূসর প্যান্ট আর কোমরে বাঁধা কাল আরেকটা শার্ট। মাইশা এতজনের সামনে সাইফের মুখোমুখি হতে চাচ্ছিল না। তাই ট্রাকের পেছনের দিকে চলে গেল। নারায়নগঞ্জ এক্সপ্রেস ছাড়ার স্থান থেকে কিছুটা সামনে। ‘কমলাপুর পথশিশু স্কুল’। অনেকগুলো পথশিশু বসে আছে। মাইশার চেয়ে বয়সে বড় দু’জন আপু ওদের হাতে দু’টো করে আম দিচ্ছে। সবাই আম পায়নি এখনো, যারা পেয়েছে তারা খুব খুশি হয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে। কয়েকজন আবার শুণ্য হাত দেখিয়ে আবার আম নেবার কুটবুদ্ধিতে আম পায়ের নিচে লুকিয়ে রাখছে। কয়েকজন আম ছিলে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। যারা পায়নি তারা চেঁচামিচি করছে। মাইশা চোখ ফিরিয়ে নেয় ট্রাকের দিকে। সাইফকে খুঁজতে থাকে। পাশে থাকা নুজহাতের কথা তার মনে থাকে না। হঠাত মাইশাকে দেখতে পেয়ে সাইফ হাত উচিয়ে ইশারা করে। লম্বা হাতের দিকে নজর দিতেই মাইশা সাইফকে দেখে। ওর ঠোঁটের কোণে মৃদ্যু হাসি। সাইফ এগিয়ে আসে।
– এই আমাদের প্রোগ্রাম।
– হুমম… দেখছি।
আমাকে একটা আম দিতে দিও।
– অবশ্যই।
সাইফ ফিরে যায় ট্রাকের দিকে। মাইশা এবার নুজহাতের দিকে তাকায়। নুজহাত অবাক চোখে পথশিশুদের আম নেওয়া দেখছে।
– এই নিন।
মাইশা পেছন ঘুরতেই দেখে সাইফ দু’টো আম এগিয়ে দিয়েছে মাইশার দিকে।
– যাদের হাত খালি তাদের দিবেন।
– নুজহাতকেও দিও।
সাইফ নুজহাতের দিকে তাকায় একবার। এরপর দু’টো আম নুজহাতের হাতে দেয়। মাইশা সামনে শুণ্য হাতের এক শিশুকে পেয়ে তার হাতে দু’টো আম গুঁজে দেয়। এরপর স্পটের একটু পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর নুজহাত এসে পাশে দাঁড়ায়। নুজহাতের পিছন পিছন এক শিশু আসে।
– আপা, আম দুইডা পচা। পাল্টায়া দেন।
নুজহাত আম দু’টো ফেরত নেয়।
– কি করব? সাইফ ভাইয়াকে বলব।
– বল। জানি না।
নুজহাত নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিশুটা নুজহাতকে বারবার এক কথা বলে চলেছে। কিছুক্ষণ পর সাইফ নিজেই হাজির হয়। মাইশাই বলে,
– নুজহাত তো একজনের হাতে আম দিয়েছে, ও এখন পালটে চাচ্ছে।
– না, এমন সিস্টেম নাই। যে যেটা পাইসে ঐটাই।
মাইশা নুজহাতকে বলে আম দু’টো ফিরিয়ে দিতে। নুজহাত ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু শিশুটা এবার আরো বেশি চিতকার করছে।
– আপা, বদলায়া দেন না ক্যান? ঐ দেহেন উনি কোছাত চাইরটা নিসে। আমারে দুইডা ভালা দেন।
মাইশা এক বড় আপুকে দেখিয়ে বলে- ওনাকে বল।
শিশুটা চলে যায়। মাইশা অন্য শিশুদের দেখতে থাকে। একটু পর সাইফের দিকে তাকায়। সাইফ বেশ ব্যস্ত। আশেপাশে অনেক মহিলা সাইফকে ঘিরে ধরেছে। তারা আম চাচ্ছে। সাইফ তাদের কিছু একটা বলে; মাইশা শুনতে পায় না। মহিলাগুলো তবু সাইফকে ছাড়ছে না। উলটাপালটা অনেক কথা বলছে। সাইফ এবার কিছু বলে না, নিজের কাজ করে। কিছুক্ষণ পর হঠাত সাইফের গলা শুনতে পায় মাইশা। ‘ আপনাদের বললাম না, এটা বাচ্চাদের জন্য? এখানে শুধু বাচ্চাদের আম দেওয়া হয়। আপনারা যান।’
– ভাই, আমার বাসায় বাচ্চা আসে।
– বাচ্চা নিয়ে আসেন। তারপর।
– ভাই আমার বাচ্চা ঘুমায়া আসে।
– বাচ্চা না আইলে আম নাই।
– ভাই দেন না।
– যাইবেন আপনারা?
সাইফ খুব রেগে গেছে দেখে মহিলারা ধীরে ধীরে সরে যায়। সাইফ নিজের কাজ চালিয়ে যায়। মাইশা সাইফকে দেখতে থাকে। হঠাত মাইশার সাথে সাইফের চোখাচোখি হয়। মাইশা চোখ ফিরিয়ে নেয়। সাইফ ট্রাকের একজনকে কিছু একটা বলে মাইশার দিকে এগিয়ে আসে।
– এখানে আমাদের কাজ প্রায় শেষ।
– ও! তোমরা কি ট্রাকে যাবে?
– হুমমম… আপনারা যাবেন?
– কোথায় যাবে?
– আমরা এখন শাহাবাগ যাব।
– শাহাবাগ? না। তোমরা না মতিঝিল যাবে বলেছিলে?
– না, যাব না। মতিঝিল, গোপীবাগ সব এখানেই কভার করে তাই যাব না।
– ও। ঠিক আছে।
সাইফ চলে যায়। মাইশার খুব যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু শাহাবাগ? এত দূর নুজহাতকে নিয়ে যাবে? নুজহাত ভয় পাবে। এমনিতেই ও ট্রাকে উঠতে চাচ্ছিল না। ওর আবার কোচিং আছে। বাসায়ও জানেনা কিছু। এগুলো ভেবে মাইশা আর সাহস করে না। ফেরার জন্য পা বাড়ায়। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। সাইফকে শেষবারের মত বিদায় জানাবে। সাইফ মাইশাকে দেখে আবার হাত নাড়ায়। মাইশা আগের মত মৃদ্যু হেসে বিদায় দেয়। কিছু দূর যেতেই নুজহাত বলে- ওদের সাথে যেতে খুব ইচ্ছে করছে রে।
– যাবি?
– ভাইয়ারা উঠে গেছে।
মাইশা পিছন ফিরে তাকায়। এখনো কয়েকজন আছে।
– না সবাই উঠেনি। চল।
মাইশা নুজহাতের উত্তর না শুনিয়ে ট্রাকের দিকে আগায়। সাইফ ততক্ষণে ট্রাকে উঠে গেছে। মাইশা নিচে দাঁড়িয়ে অন্য একজনকে বলে সাইফকে ডেকে দিতে। সাইফ নিচে তাকায়।
– যাব।
– যাবেন। দাঁড়ান।
টুলটা রাখেন। ওনারা উঠবে।
অন্য একজনকে উদ্দেশ্য করে বলে সাইফ। মাইশা তাকিয়ে আছে। নুজহাতের মাইশার পেছনে। ও কি বলবে ভাবছে। ও এখানে কাউকেই চেনে না। মাইশা তো তবু একজনকে চেনে। একটু পর সাইফ উঠতে বলে। মাইশারা ট্রাকে ওঠে।

মাইশার খুব ভাল লাগছে। এই প্রথম খোলা ট্রাকে এভাবে কোথাও যাওয়া। অন্য রকম এক অনুভূতি। মাইশার অনেকদিনের স্বপ্ন। মাইশা এখনো পুরোটা বিশ্বাস করতে পারছে না। অবশ্য একটু ভয় ভয়ও লাগছে। ২টা বাজে। বাসায় ৩টার সময় ফেরার কথা। নুজহাতের কোচিংও ৩টায়। এই সময়ের মধ্যে ফেরা হবে না হয়ত। সমস্যা বাঁধতে পারে। তখন বাসায় কি বলবে ভাবতে থাকে মাইশা। হঠাত পিছন থেকে সাইফ ডাক দেয়। মাইশা ডাক শুনে নুজহাতের হাত ধরে এগিয়ে যায় সাইফের দিকে।
– ঐ যে পথশিশুটাকে দেখছেন না? পায়ে শিকল বাঁধা? ও মানসিক প্রতিবন্ধী পথশিশু।
– হুমম দেখছি।
মাইশা অবাক চোখে দেখছে। নুজহাতকেও দেখাল। পাশ থেকে একজন বলল, ‘এর আগেরবারও ছিল না?’
-‘হ্যাঁ’
ষোল সতের বয়সের একটি মেয়ে। পায়ে শিকলা বাঁধা। হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নাড়ছে। কিছু বলছে। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে না কি বলছে। দেখলে বোঝা যায় প্রতিবন্ধী। ওর সামনে একটা চাদর বিছানো আছে। ওখানে একটা আম রাখা।
– যান এখন। ওকে দেখাতে ডাকসিলাম।
মাইশা চলে যায়। ট্রাকের সামনের দিকে বড় আপুদের সাথে দাঁড়ায়। মাইশার মাথায় প্রতিবন্ধী পথশিশুর ছবিটা ভাসছে। শিশুটার সামনে একটা আম কেন? সবাইকে তো দু’টো করে দেওয়া হয়েছে। হঠাত পাশ থেকে এক আপু বলল- দেখ, আমাদের সাথে আরো দু’জন আপু যুক্ত হয়েছে। আপু, আপনারা কি এখান থেকে অ্যাড হলেন?
– হ্যাঁ।
– কি নাম?
– ওর নাম নুজহাত। আমি মাইশা।
– ও কিসে পড়েন?
নুজহাত- আমরা অনেক ছোট আপু। আমরা কেবল কলেজে উঠলাম।
– ও ভালোই তো।
নুজহাত আপুদের সাথে কথা বলতে থাকে। মাইশা রাস্তা দেখছে। মাথায় এখন অন্য চিন্তা। ‘সাইফ ভাইয়া কেন আলাদাভাবে দেখতে ডাক দিল?’ উত্তর জানা নেই ওর। কেন জানি খুশি খুশি লাগছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ট্রাকের মানুষদের কথা শুনছে। ওরা বেশ মজার মজার কথা বলে। সবাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছে। মাইশা কিছু বলছে না। মাঝে মাঝে কিছু কথা শুনে হাসছে। এখানে নুজহাত আর মাইশাই সবার চেয়ে ছোট। নুজহাত অবশ্য বড় আপুদের সাথে একটা ভাব করে ফেলেছে। কিন্তু মাইশা কিছু বলতে আরছে না। এই মুহূর্তে ওর মাথা খালি। কি বলবে বুঝতে পারছে না। মাইশা ঘাড় ফিরিয়ে কয়েকবার সাইফকে দেখতে চেষ্টা করেছে। দেখা মাত্রই আবার চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
– বাসায় ফোন দিয়ে আম্মুকে বলতে হবে আজকে কোচিং-এ যাব না। নয়ত কোচিং-এ ফোন দিয়ে আম্মু চিন্তা করবে।
– দিস। আমি যে কি বলব কে জানে?
– যাওয়াটা কি ভুল করছি?
– জানি না।
– পথশিশুদের আম দিব, কোন খারাপ কাজ তো আর না? মানুষ প্রেম করে মিথ্যা বলে আর আমরা তো শুধু আমই দিব। অনন্যা ধানমন্ডি গেসল তখন কিছহু হয় নাই তাহলে এইখানে হবে ক্যান?
– আল্লাহকে তো সেটাই বললাম।
– হুমম…
রাস্তা তো শেষই হয়া না রে! আঙ্কেলের সাথে যখন আসচিলাম কত তাড়াতাড়ি আসচিলাম। এখন এত দূর লাগে ক্যান?
– এটা অন্য রাস্তা।
শিশুপার্কের সামনে জ্যামে আটকে আছে ট্রাক। শিশুপার্কের রেলগাড়িটাকে দেখছে মাইশা। ছোটবেলায় কত চড়া হত! ট্রাকের মানুষদের এখন কথা বলার বিষয় এই ট্রেন। মাইশা ঘাড় ফিরিয়ে আরেকবার সাইফকে দেখে। সাইফ বিলবোর্ডের মডেলকে নকল করছে। বিলবোর্ডের মডেলকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি হচ্ছে। মাইশার ঠোঁটের কোণেও হাসি। কিছুক্ষণ পর ট্রাক স্পটে পৌঁছে গেল। ট্রাক থেকে প্রায় সবার শেষে নামল মাইশা। নিচে সাইফ দাঁড়িয়েছিল। ট্রাক থেকে টুলে পা দিয়ে নামতে হয়। মাইশা টুলে পা দিতেই সাইফ বলল,
– পারবেন?
– হুমম…
মাইশা নিচে নেমে এক বড় আপুর পিছন পিছন যেতে লাগল।
লালন পট্টির বিশাল ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। মাত্র তিনজন পথশিশু। অন্য পথশিশুরা দুপুরের খাবার খেতে গেছে। মাইশাদের সাথে অল্প কিছু গ্রুপ মেম্বার এই স্পটে নেমেছে। সাইফ নেমে ফোনে কথা বলতে বলতে কোথায় জানি চলে গেছে। ছাউনির নিচে এই কয়েকজন অপেক্ষা করছে অন্য পথশিশুদের জন্য। ‘মজার ইস্কুলের’ দু’জন শিক্ষক খোঁজ করছেন পথশিশুদের। জায়গাটা নিরিবিলি। এখানে নাকি লালন চর্চা বসে মাঝে মাঝে। মাইশা এর আগে কখনো এখানে আসে নি। ওর জায়গাটাকে পছন্দ হয়। বেশ কিছুক্ষণ পর পথশিশুরা আসতে শুরু করে। আস্তে আস্তে ২৫-৩০ জনের মত শিশু জমাট হয়। একজন একজন করে বসতে বেশ সময় নেয়। মাইশার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বড় আপু এদের একজনকে নাম জিজ্ঞেস করে। মেয়েটা বলে,
‘ আমার নাম সুমাইয়া,
দিনে থাকি ঘুমাইয়া,
রাইতে থাকি জাইগগা,
মাতাব্বরের মাইয়া।’
ওর এই উত্তর শুনে সবাই হাসতে থাকে। আরেক পথশিশু হঠাত গান ধরে। এর মধ্যে সাইফ ফিরে আসে। আম দেওয়া শুরু করে দিতে বলে। কিছুক্ষণ পর আম দেওয়া শুরু হয়। মাইশা এক কর্নারে দাঁড়িয়ে আছে। সাইফ পেছনে এসে বলে- মাইশা যান। ওদের সাথে আম দেন।
মাইশা একটু সাহস পায়। ও এগিয়ে যায়। ওর সাথে নুজহাতও এগিয়ে যায়। এবার ওরা ঠিকমত আম দেয়। এক এক করে সবাইকে আম দেওয়া হয়। শিশুগুলো সবাই হাতের আম তুলে ধরেছে। মাইশার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। এতক্ষণ বাসায় ফেরার কথাটা মাইশার মনে ছিল না। হঠাত মনে হয়ে ওর মন খারাপ হয়ে গেল। মোবাইলটা বের করে সময় দেখল। এরপর নুজহাতের দিকে এগিয়ে দিল।
– বাসায় না ফোন দিবি?
– ও হ্যাঁ। আম্মুকে বলতে হবে।
– ৩টা ২৩ বাজে।
– এখনই বলছি।
সবার সাথে একসাথেই ট্রাকের দিকে ফিরছে মাইশারা। নুজহাত কথা শেষে মাইশাকে মোবাইল ফেরত দিয়ে বলল
– ভাইয়াকে বলে যাবি না?
– হু।
– ভাইয়া কোথায়? ঐখানে অনেককে দেখা যাচ্ছে।
– না ঐখানে দেখলাম। নেই।
– ও! তাহলে?
– ট্রাকের ওখানে আছে মনে হয়।
ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে একজনের সাথে কথা বলছিল সাইফ। মাইশা পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই সাইফ ফিরে তাকায়।
– চলে যাই এখন।
– লাঞ্চ খেয়ে যান।
সাইফ মুখ ফিরিয়ে নেয়। মাইশা হঠাত থতমত খেয়ে যায়। যাওয়ার তাড়া আছে। কিন্তু সাইফ যেভাবে মুখের উপর খেয়ে যেতে বলল তাতে কিছু বলার সাহসই হচ্ছে না। সাইফ আবার ফিরে তাকায়।
– দেরি হয়ে যাবে।
– হবে না।
– বাসায় জানে না।
– আধাঘন্টা অপেক্ষা করলে খুব সমস্যা হবে?
– হুম… আজকে না প্লিজ।
– আচ্ছা। বাসায় পৌঁছে একটা ফোন দিয়েন।
– দিব।
মাইশা নুজহাতকে নিয়ে এগিয়ে যায়। পেছনে ফিরে তাকায় না আর। মাইশার মাথায় একটা কথাই ঘুরছে, ‘বাসায় পৌঁছে একটা ফোন দিয়েন’। এর আগে মাইশার অচেনা মানুষদের সাথে দেখা হয়েছে, নিজের খুব আপন একজনো ছিল। কিন্তু কেউ মাইশাকে এভাবে যত্ন নিয়ে কিছু বলেনি। মাইশার চোখের সামনে দিয়ে দু’টো সিএনজি চলে যায়, মাইশা ডাক দেয় না। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। কিছুক্ষণ পর মাইশার ঘোর কেটে যায়। ও সিএনজি খুঁজতে থাকে। শেষটায় সিএনজি না পেয়ে রিক্সা নেয়। মোবাইল বের করে সময় দেখে। ৩টা ৩৬। ৪টার মধ্যে বাসায় পৌঁছানো যাবে? বাসায় পৌঁছে কি বলবে? মাইশার মাথায় সেই পুরনো চিন্তাগুলো ভিড় করতে থাকে। মাইশা চিন্তাগুলো মাথা থেকে সরিয়ে নুজহাতের সাথে গল্প করা শুরু করে। নুজহাতের সাথে কথা বলার ফাঁকে মাইশার মনে হয় সাইফের কথা। সাইফের জন্য আজকে এই সুযোগটা পাওয়া। সাইফের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করে। বাসায় ৪টার মধ্যে পৌঁছে যায় মাইশা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সাইফকে ফোন দেয়।
– হ্যালো।
– মাইশা বলছিলাম। থ্যাঙ্কস। বাসায় পৌঁছে গেছি।
– ওয়েলকাম। পরে কথা হবে, আচ্ছা?
– ঠিক আছে।
মাইশা ফোন কেটে দেয়। এবার মাইশার মাথায় ‘পরে কথা হবে’ কথাটা গেঁথে যায়। মাইশা আবার কথা হবে ভেবে খুব খুশি হয়। বাসায় ফিরে কোন সমস্যা হয় না। মাইশা ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে যায়। কিন্তু ঘুমাতে পারে না। মাইশার চোখের সামনে সাইফের চেহারা ভাসছে। সাইফের কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে। ফোন দিয়ে মাইশার খোঁজ নেওয়া, আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী শিশুকে দেখানো, টুল থেকে নামার সময় ‘পারবেন’ বলা, পৌঁছে ফোন দেবার কথা, আবার কথা বলার কথা- এগুলো সব মাথায় ঘুরছে। মাইশা বুঝতে পারছে এগুলো খুব স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেনা। মাইশা স্বল্প সময়ের আবেগ ভেবে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে, কিন্তু তাও পারছে না। অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে মাগরিবের আজানের পর উঠে পড়ল। ওর খুব সাইফকে ফোন দিতে ইচ্ছে করছে। মোবাইল বের করে সাইফের নম্বরটার দিকে তাকিয়ে আছে। না, ও ফোন দিবে না। প্রয়োজন ছাড়া সাইফকে কখনো ফোন দেয়নি ও। আজকে ফোন দিলে সাইফ যদি আবার দূর্বলতা ধরে ফেলে।
হঠাত মাইশার ভয় লাগতে শুরু করে। মাইশার মনে হয়, সাইফ ওর চেয়ে ৮/৯ বছরের বড়। সাইফের সাথে ওর কখনোই মিলবে না। ওর পরিবারের সাথে সাইফের পরিবারে বিশাল এক ফারাক। মাইশার উচ্চপদস্থ বাবা কখনোই সাইফকে মেনে নিবে না। তাছাড়া সাইফ একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং-এ পড়েছে। এ নিয়েও মাইশার বাবার বাঁধ সাধবেন। সাইফের ভাল কোন চাকরি ছাড়া মাইশা কিছু ভাবতে পারবে না। মাইশার মনে পড়ে সাইফের সেই অন্ধকার সময়ের কথা। সাইফের অসুস্থতার কথা। তিন্নির কথা। সাইফ সাত বছর ধরে তিন্নিকেই ভালবাসে। সাইফ কি আজকে লালন পট্টি থেকে আড়াল হয়ে তিন্নির সাথে কথা বলছিল? মাইশার মনে পড়ে সাইফ বলেছিল এগুলো সব ভাবের কথা, আবেগের বশে বলা। সাইফ তো ওর আবেগ সম্পর্কে কিছুই জানে না। মাইশা জানে সে এখনো অনেক ছোট। একদিন হয়ত উদ্বায়ী হয়ে উড়ে যাবে এই আবেগ। কিন্তু এই আবেগ হারিয়ে ফেলাকেও মাইশার ভয় লাগছে। মাইশার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে। পানির ফোঁটাগুলো পড়ছে মোবাইলের স্ক্রীনে উঠে থাকা সাইফের নাম্বারের উপর। সেদিকে নজর দিতেই মাইশা মোবাইলটা হাত থেকে নামিয়ে রাখে। দু’হাত দিয়ে চোখ মুছে। কিন্তু লাভ হয় না। মাইশা ওর ডায়রীটা বের করে। সাইফকে একটা চিঠি লিখবে। সাইফেরও এই স্বভাব আছে ভেবে মাইশার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। মুহূর্তেই তা আবার মিলিয়ে যায়। কি লিখবে ভেবে পায় না। আজকের সারাদিনের কথা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। অনেকক্ষণ পেন আর ডায়রী হাতে নিয়ে বসে আছে। কিন্তু লেখার মত কিছুই মাথায় আসছে না। শেষটায় ডায়রীর এক পৃষ্ঠা ছিঁড়ে শুধু লেখে, ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি।’ পৃষ্ঠাটা ভাঁজ করে কাগজের প্লেন বানায়। চোখের একফোটা পানি কাগজের প্লেনটার উপর পড়ে। মাইশা ফু দেয় সেখানে। এরপর জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেয় প্লেনটা। রাতের আকাশে মিলিয়ে যায় আবেগের প্লেনটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মাইশা।

১২ thoughts on “আম উৎসব ও একটি আবেগী প্লেন

  1. আমরা খাঁটি গরিবের পক্ষ থেকে
    আমরা খাঁটি গরিবের পক্ষ থেকে পথশিশুদের জন্য আম উত্‍সবের আয়োজন করা হয়েছিলো কিছুদিন আগে ।

  2. চমৎকার লাগল লেখাটা !!! আপনার
    চমৎকার লাগল লেখাটা !!! আপনার লেখনির পরিচয় আগেও পেয়েছিলাম , আবার পেলাম । চালিয়ে যান । :ফুল: :ফুল:

  3. আমরা খাটি গরীব- কে ধন্যবাদ…
    আমরা খাটি গরীব- কে ধন্যবাদ… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: ও :bow: :bow: :bow:
    পোস্ট কর্তাকেও ধন্যবাদ তার সাবলীল বর্ণনার জন্যে!! :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
    তবে শেষের দিকটা মনে হল একটু ঝুলে গেছে…

  4. ভাল লিখেছেন।এই উত্‍সব
    ভাল লিখেছেন।এই উত্‍সব সম্পর্কে জানতাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  5. “সাইফ বলেছিল এগুলো সব ভাবের
    “সাইফ বলেছিল এগুলো সব ভাবের কথা, আবেগের বশে বলা। সাইফ তো ওর আবেগ সম্পর্কে কিছুই জানে না। একদিন হয়ত উদ্বায়ী হয়ে উড়ে যাবে এই আবেগ” আবেগ উদ্বায়ী হতে সময় লাগে না। আরো একটা আম উৎসব চলে এসেছে। সেই আবেগ এখন আর নেই… 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *