লোডশেডিং

মাসুদ মামা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসলেই ছোটদের মহলে একটা আনন্দের ধুম পড়ে যায়। তিনি আমাদের আপন কেউ না। কিভাবে কিভাবে যেন লতায় পাতায় মামা হন। বাড়ি শেরপুরের মুক্তাগাছায়। কিন্তু দূর সম্পর্কের এই আত্মীয়টিকে বাড়ির সবাই খুব পছন্দ করে। বছরে দু’একবার তিনি বিভিন্ন কারণে আমাদের এখানে বেড়াতে আসেন। গতবার এসেছিলেন ঢাকা ভার্সিটির জুনিয়র অধ্যক্ষ পদের জন্য পরীক্ষা দিতে। তা সে যে কাজেই আসেন না কেন, আমারা ছোটরা পারতপক্ষে তার পিছু ছাড়তে চাই না। তার ফুট ফরমাস খাটার জন্য আমাদের মধ্যে পাল্লা লেগে যায়। মামাকে আমাদের এতো পছন্দ হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- তিনি খুব সুন্দর করে গল্প করতে পারেন। বিশেষ করে ভুতের গল্প। রাতে যখন কারেন্ট চলে যায় তখন আমরা সবাই মিলে ছাদে পাটি বিছিয়ে মামাকে ঘিরে ধরি। আম্মুর ভাষায়- আমাদের লেখা-পড়া তখন ‘চাঙ্গে’ ওঠে।



মাসুদ মামা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসলেই ছোটদের মহলে একটা আনন্দের ধুম পড়ে যায়। তিনি আমাদের আপন কেউ না। কিভাবে কিভাবে যেন লতায় পাতায় মামা হন। বাড়ি শেরপুরের মুক্তাগাছায়। কিন্তু দূর সম্পর্কের এই আত্মীয়টিকে বাড়ির সবাই খুব পছন্দ করে। বছরে দু’একবার তিনি বিভিন্ন কারণে আমাদের এখানে বেড়াতে আসেন। গতবার এসেছিলেন ঢাকা ভার্সিটির জুনিয়র অধ্যক্ষ পদের জন্য পরীক্ষা দিতে। তা সে যে কাজেই আসেন না কেন, আমারা ছোটরা পারতপক্ষে তার পিছু ছাড়তে চাই না। তার ফুট ফরমাস খাটার জন্য আমাদের মধ্যে পাল্লা লেগে যায়। মামাকে আমাদের এতো পছন্দ হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- তিনি খুব সুন্দর করে গল্প করতে পারেন। বিশেষ করে ভুতের গল্প। রাতে যখন কারেন্ট চলে যায় তখন আমরা সবাই মিলে ছাদে পাটি বিছিয়ে মামাকে ঘিরে ধরি। আম্মুর ভাষায়- আমাদের লেখা-পড়া তখন ‘চাঙ্গে’ ওঠে।
তা চাঙ্গেই উঠুক আর টুইন টাওয়ারের ছাদেই উঠুক, তখন আমাদের পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখে কার সাধ্য? রাতে আমরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করি কখন কারেন্ট যাবে, কখন গল্প শুনতে পারব। আমাদের এলাকায় সারা বছরই প্রচুর লোডশেডিং হয়। বিশেষ করে গরমের দিনে, একবার কারেন্ট গেলে দুই-তিন ঘণ্টার আগে আর আসে না। কিন্তু মুশকিল হলো, মাসুদ মামা আমাদের বাসায় এলে কারেন্ট যেন আর যেতেই চায় না। গেলেও পনের-বিশ মিনিটের মধ্যেই এসে পড়ে। তোমরাই বল- কারেন্ট না গেলে আমরা কোন অজুহাতে পড়ার টেবিল থেকে উঠি!
তাই সাম্প্রতি আমরা একটা বুদ্ধি বের করেছি। রাত আটটা পর্যন্ত আমরা কারেন্ট যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। আটটার পরও যখন দেখি কারেন্ট যাবার কোন লক্ষণই নেই তখন রাজু মিহি সুরে বলে- রশিদ ভাই! একটু শুনে যাও তো।
এটা একটা বিশেষ কোড। এই কোড শোনার পর বুয়ার ছেলে রশিদ একটা টুল নিয়ে গিয়ে মেইন সুইচটা অফ করে দেয়। ছোটদের গ্রুপে ও-ই সবচেয়ে লম্বা। ও ছাড়া আমরা কেউই টুলে উঠেও মেইন সুইচ নাগাল পাই না। সে জন্য অবশ্য ওকে সারাদিন নানা রকমের ঘুষ দিতে হয়। আমরা তবুও রাজি।
আজকে অবশ্য আটটা বাজার অনেক আগেই কারেন্ট চলে গেল। তবুও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা স্বরূপ মেইন সুইচটাও অফ করে দিলাম। হঠাৎ করে গল্পের মধ্যে কারেন্ট চলে এসে যাতে কোন অসুবিধা না করতে পারে। তারপর বই-টই রেখে দল বেধে মাসুদ মামাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলাম ছাদে। আগেই সেখানে পাটি বিছিয়ে রাখা হয়েছে। মাসুদ মামা বসতেই আমরা হুড়োহুড়ি করে যে যতটা সম্ভব তার গা ঘেষে বসে পড়লাম।
এখন শুল্ক পক্ষ। আকাশের চাঁদটা আধখানা হলেও বেশ আলো। সেই আলোতে সবাই মিলে মামাকে ধরলাম, মামা গল্প বলেন, গল্প বলেন।
মামা মুখে কৃত্তিম বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন: আমি কি তোদের জন্য গল্পের কারখানা দিয়ে বসেছি? রোজ রোজ এতো গল্প পাব কোথায়?
আমরা তবুও ঘ্যাঁনর ঘ্যাঁনর করতে লাগলাম। মামা সবাইকে থামিয়ে বললেন: আচ্ছা বলছি শোন। এক দেশে ছিলো এক রাজা….
সাথে সাথে আমরা চেচিয়ে উঠলাম: এটা না, এটা না। পঁচা পঁচা রাজা-রানির গল্প শুনবো না।
মামা আরেকটি গল্প শুরু করলেন। আমরা সেটাতেও প্রতিবাদ জানালাম। এটা সেদিনও শুনেছি; এটাও না, আরেকটা বলেন।
মামা এবার একটা রাক্ষসের গল্প শুরু করলেন। আমদের তাতেও আপত্তি। রূপকথার রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প শুনবো না। আমরা কি এখনও ফিডার খাই নাকি যে রাক্ষসের গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ব! আমাদেরকে সত্যি ভুতের গল্প বলতে হবে।
মামা এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হলেন। ধমক দিয়ে বললেন: ভুতের গল্পের আবার সত্যি মিথ্যা কী? ভুত বলতে কিছু আছে নাকি দুনিয়ায়!
আমরা সমস্বরে চেচিয়ে উঠলাম: তবে যে সেদিন বললেন- আপনার জীবনের সত্যি ঘটনা। ঐযে আপনার বন্ধুর বাসার সেই গল্পটা?
আমাদের মধ্যে রশিদ আবার একটু দার্শনিক চিন্তা ভাবনা মাথায় রাখে। সে বিজ্ঞের মত বলল: এক্কেবারেই যদি কিচ্ছু নাই থাকে তাইলে সেইটা নিয়া এতো কিচ্ছা বানাইবো ক্যা? নিশ্চয়ই ভুত বইল্যা কিছু একটা আছেই। এহন না থাকলেও আগে আছিলো!
মামা এবার কৌতুকের ভঙ্গিতে হেসে বলল: তা অবশ্য যুক্তি সংগত কথা। হ্যাঁ, ভুত একেবারেই নেই তা অবশ্য ঠিক না। ভুত না থাকলেও প্রেতাত্মা বলে নিশ্চয়ই কিছু আছে। যেমন, আমাদের কালুর ব্যাপারটাই ধর।
গল্পের গন্ধ পেয়ে আমরা গা ঘেষাঘেষি করে বসলাম। তপু বলল: কালু কে মামা?
মামা বলতে লাগলেন: কালু হচ্ছে আমাদের পাড়ার একটা কুকুরের নাম। গ্রাম দেশে তো আর বেল্ট পড়িয়ে, শিকল দিয়ে বেঁধে কুকুর পোষা হয় না। কুকুরগুলো তাই পাড়া ভরে ঘুরে ঘুরে এর ওর বাড়িতে খায় আর রাত হলে পুরো পাড়াই পাহারা দেয়। কালুর নামটাও দেয়া হয়েছিল ওর গাছের রঙ কালো বলে। গ্রাম দেশে কালো কুকুরের নাম কালু, লাল কুকুরের নাম লালু অথবা অন্য কোন রঙের হলে ‘আতু’ বলে ডাকা হয়। শহরের মত এতো টমি-জিমি-র‌্যাপি রাখা হয় না।
তো কালু দেখতে খুব বড়সড় আর শক্তিশালী ছিল। ওর জন্য সেচরা চোরদের ছিল খুব অসুবিধা। এর গাছের কলাটা, ওর ক্ষেতের মুলোটা চুরি করতে এসে কালুর দাবাড় খায়নি এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। আর তাছাড়া ওর বিকট গর্জন শুনলেই চোরদের কলজে নড়ে উঠতো। সে কারণে পাড়ার সবাই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতো। কিন্তু বদমায়েস চোরদের তা সহ্য হলো না।
একদিন সকাল বেলা দেখা গেল কালু প্রচন্ড ব্যথায় কোকাচ্ছে। বাইরে থেকে কোন জখম চোখে পড়ল না। শুধু মুখের ভেতর থেকে রক্ত মেশানো লালা ঝরছে। ব্যথায়-রাগে কুকুরটা কাউকে কাছে ঘেষতে দেচ্ছে না। পাড়ার কয়েকজন সাহস করে ওকে ধরে হারুন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। হারুন ডাক্তার ভাল করে দেখে বললেন, কেউ একজন রুটি-টুটির ভেতর ভরে ওকে আলপিন খাইয়েছে। সেটা গলার ভেতর বিঁধে এই অবস্থা।
হারুন ডাক্তার ব্যথা কমানোর জন্য ঔষধ দিলেন। কিন্তু সেই ঔষধ ওকে খাওয়ানো গেল না। বাধ্য হয়ে পায়ের মধ্যে একটা ইনজেকশন পুশ করে দিলেন। তাতে কুকুরটা আরও ক্ষেপে গেলো। কাউকে আর ধারে কাছে ঘেঁষতে দিলো না। মানুষ হলে না হয় বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা কিছু করা যেত। কিন্তু কুকুরটা ব্যথায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ধারে কাছে কোন পশু হাসপাতালও ছিলো না। যদি কামড় দেয়- এই ভয়ে কেউ আর ধরতেও সাহস করেনি। কিন্তু ওর কষ্ট দেখে সবারই মায়া লাগতো। ছয় দিন সাত রাত অসহনীয় কষ্ট ভোগ করার পর কুকুরটা মারা গেল। মারা গেল বলতে গেলে না খেতে পেরে। খাবার অবশ্য দেয়া হত, কিন্তু ব্যথায় কিছুই খেতে পারতো না।
মারা যাবার পর সবাই মিলে দুপ চকের পুষ্কুনির পাড়ে নিয়ে মাটি চাপা দিয়ে আসলো। এবং প্রায় সেই রাত থেকেই শুরু হল চোরের উৎপাত। আজ এর গাছের নারিকেল নেই তো কাল ওর মাচার লাউ নেই। এর ঘরের সিঁধ কাটে তো ওর ঘরে ডাকাত পরে। মোটামুটি অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো সবাই।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই একদিন সব চুরি-ডাকাতি বন্ধ হয়ে গেল। শোনা যেতে লাগলো রাতে নাকি পাড়া ভরে কালো একটা কুকুর ঘুরতে দেখা যায়। হঠাৎ মাঝ রাতে খুব হইচই শুনে লোকজন ঘুম থেকে উঠে দেখে রমিজ উদ্দিনের ঘরের কোনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে এলাকার নাম করা চোর হারু মিয়া। সারা শরীরে কুকুরের কামরের দাগ। পাশেই পড়ে আছে কাপড়ের ঝোলায় বাঁধা সদ্য চুরি করা জিনিষপত্র। কিন্তু আশপাশে কোথাও কোন কুকুরের চিহ্নমাত্র নেই। অথচ রমিজ মিয়ার নাকি কুকুরের ডাক শুনেই ঘুম ভেঙেছে।
গ্রামের সবাই বলাবলি করতে লাগলো, কালু আবার ফিরে এসেছে। চোরদের ওপড় যে রাগ নিয়ে ধুকে ধুকে কষ্ট পেয়ে মরেছে তার প্রতিশোধ নিতেই ও আবার এসেছে।
এর পর থেকে মাঝে মাঝেই গভীর রাতে অনেকে কালুর সেই অতি পরিচিত ডাকও শুনতে পেতো। তাতে কেউ ভয় পেতো না; বরং আগের মতোই নিশ্চিন্তে ঘুমাতো। অনেকে আবার আগের মত রাতে খোরায় করে দুয়ারে কিছু খাবার কালুর জন্য রাখতে শুরু করল। দেখতে দেখতে এটা একটা রেওয়াজ হয়ে গেল। যদিও সেই খাবার কেউ খেতো না, পরদিন তা তেমনি পরে থাকতে দেখা যেত; তবুও রাতে ঘুমানোর আগে সবাই ভাবতো- কালু আছে। কোন চিন্তা নেই, নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।
এই পর্যন্ত বলে মামা একটু থামলেন। আমরা একটু নড়েচড়ে বসলাম। শিহাব বলল: কালু কি রাতের বেলা এখনও ঘুরে বেড়ায়?
মামা একটা হাই তুলে বললেন: দূর! কালু আসবে কোথা থেকে? ঘুরে বেড়াতো কালুর ছায়া। তাও অনেক দিন আগের কথা। কুকুরের একটা ধর্ম আছে- সাধারণত এরা বার বছর পর্যন্ত মালিকের খেদমত করে। তারপর হয় মারা যায় নয়তো পাগল হয়ে একদিন হঠাৎ অন্য কোথাও চলে যায়। ওটাকে আর কোন দিন দেখা যায় না। কালুর ছায়াটাকেও প্রায় বার বছর পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। তারপর থেকে রাতে আর ওর ডাক শোনা যায়নি। কিন্তু তোরা কেউ গ্রামে গেলে দেখিস- অনেকেই ঘরের সামনে খোরায় করে কিছু খাবার রাখে। জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে বলবে- কালুর জন্যে রাখছি।
রাসেল বলল: আচ্ছা মামা, কালুর খাবার অন্য কোন কুকুর-বিড়ালে খেয়ে ফেলে না?
মামা বললেন: এটা একটা মজার ব্যাপার। ওর খাবার অন্য কিছুতেই খায় না।
আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম: কেন মামা?
মামা জবাব দেবার আগেই ঘরের ভেতর থেকে আম্মুর গলা শুনতে পেলাম: তাইতো বলি- সব বাসায় লাইট জ্বলছে, আমাদের বাসায় কারেন্ট নেই কেন! এই, মেইন সুইচটা অফ করেছে কেরে?

———-০———-

– সফিক এহসান
(৫ নভেম্বর ২০০৭ইং)

১৪ thoughts on “লোডশেডিং

  1. ছোটবেলার গল্প শোনা এবং
    :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি: :হাসি:
    ছোটবেলার গল্প শোনা এবং শোনানোর স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। ছোট বেলায় আমরা যেই কলোনিতে থাকতাম সেখানে মাসে একবার দুইবার কারেন্ট যেতো, তাও মাত্র ঘণ্টা খানেকের জন্য। :মাথাঠুকি:

    1. তাই নাকি? টুইস্ট বলতে কি মিঃ
      তাই নাকি? টুইস্ট বলতে কি মিঃ টুইস্ট-এর কথা বোঝাচ্ছেন? স্বাদ-গন্ধের দিক দিয়ে কিন্তু পটেটো ক্যাকার্স-ই বেস্ট!
      😛
      :হাসি: :শয়তান:

  2. গল্প বলার ঢংটা বেশ ভালো লাগল
    গল্প বলার ঢংটা বেশ ভালো লাগল সফিক ভাই। (লাইন গুলোতে ফাঁক থাকলে পড়তে একটু আরাম হয়।)

    1. শুকরিয়া…
      লাইন তো “ফাঁক”

      শুকরিয়া… :ফুল:

      লাইন তো “ফাঁক” করেই দিয়েছিলাম! আর কত “ফাঁক” করুম??? :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :আমারকুনোদোষনাই: :হাহাপগে:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *