কপাল গুণে বিধাতা নাম কিনেছে ভাগ্যদাতা

চাল ডাল তেল নুনের অভাবে রান্না না হলেও মুখ কিন্তু থেমে থাকে না নাহিদের বাড়ির লোকজনের; সারাদিন মুখ চলে পুরোদমে। তাই নাহিদের বাড়ির কান্নাকাটি বা কোলাহল- কোনো কিছুতেই আর উৎসাহ দেখায় না প্রতিবেশীরা। তবুও গ্রাম বাংলার প্রতিবেশী বলে কথা! ঝগড়ার সময় পক্ষে-বিপক্ষের মুখে কথা যোগান দেয় কেউ, কেউ বা আবার ঝগড়ার সময় উপস্থিত থেকে গোপন খবরে নিজের ভাঁড় সমৃদ্ধ করে পরে সুযোগ মতো ব্যবহার করার জন্য- এরাই হলো শত্রুপক্ষ; আর একদল আছে নীরব দর্শক।

এই তিন দলের কোনোটারই সদস্য আমি নই। আজ কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি- শুধু কৌতূহল বশে নয়, মানবতাবোধ থেকে।


চাল ডাল তেল নুনের অভাবে রান্না না হলেও মুখ কিন্তু থেমে থাকে না নাহিদের বাড়ির লোকজনের; সারাদিন মুখ চলে পুরোদমে। তাই নাহিদের বাড়ির কান্নাকাটি বা কোলাহল- কোনো কিছুতেই আর উৎসাহ দেখায় না প্রতিবেশীরা। তবুও গ্রাম বাংলার প্রতিবেশী বলে কথা! ঝগড়ার সময় পক্ষে-বিপক্ষের মুখে কথা যোগান দেয় কেউ, কেউ বা আবার ঝগড়ার সময় উপস্থিত থেকে গোপন খবরে নিজের ভাঁড় সমৃদ্ধ করে পরে সুযোগ মতো ব্যবহার করার জন্য- এরাই হলো শত্রুপক্ষ; আর একদল আছে নীরব দর্শক।

এই তিন দলের কোনোটারই সদস্য আমি নই। আজ কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি- শুধু কৌতূহল বশে নয়, মানবতাবোধ থেকে।

দোলোনীর কান্না শুনে ভেবেছিলাম- ওর বাবা বুঝি মারা গেলো। গিয়ে দেখি, না, এখনও দম আছে, কেবল জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে মাটিতে, একেবারে উনুনের কাছে। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিনের বালতিতে পানি নিয়ে দোলনী বদনা দিয়ে তার বাবার মাথায় ঢালছে আর চিৎকার করে সুর তুলে কাঁদছে- মরে গ্যাছে রে আমার আব্বা মরে গ্যাছে, তারে মাইর‌্যা ফেলাইছে, ওরে দেইখ্যা যান আপনেরা, নাহিদ আমার আব্বারে মাইর‌্যা ফেলাইছে। বিয়া দিয়া কাল নাগিনী আনছে ঘরে, কাল নাগিনী।

নাহিদের মা বারবার বলছেন- ও দোলোনী, চুপ কর মা, চুপ কর।

এই মহিলাকে আমি কখনও বিচলিত হতে দেখেনি। হাজার অভাবেও মহিলার হাসি মুখ, গোছানো পরিষ্কার শুদ্ধ বাংলায় কথোপকথন, পড়নের কাপড়ের সাথে পরিপাটি করে বাঁধা চুল। আর হাত-পা দেখে মনে হয় যেনো মাত্র মেনিকিউর-পেডিকিউর করে এসেছেন।

নাহিদ এনায়েত মুন্সীর চতুর্থ ছেলে, বছর দু’এক হলো বিয়ে করেছে। বউ দেখতে বেশ সুন্দর, সামাজিকভাবে চলনসই। তবে তার সবচেয়ে বড়ো গুণ হলো- একটা তীক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি রয়েছে মেয়েটার। এই তো চার মাস হলো একটা ছেলে হয়েছে। আর্থিক অনটন সংসার জীবনের এক ট্র্যাজিডি; সংসারের বিচিত্র জালে আবদ্ধ সম্বন্ধগুলো ছিন্ন হয় অভাবের কারণেই, শুরু হয় অশান্তি, চির ধরে সম্পর্কে। এটা জীবন খাতার নিয়মের তালিকায় যোগ হয়ে গেছে । টুকটাক অশান্তি ঝগড়া হতেই পারে কিন্তু কী এমন হলো যে নাহিদ তার বাবার গায়ে হাত তুলেছে?

উঠোন ভর্তি মানুষ। এদের মাঝেই এসেছে তারা- একেবারে নাহিদদের ‘মালিক পক্ষ’, মানে যাদের খবরদারিতে নাহিদদের গোটা পরিবার উঠে আর বসে। এ পরিবারের মেয়ে রূপালি। সে হঠাৎ নাহিদের বউয়ের দিকে হেঁটে গেলো। আমি ঐদিকটায় তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, তারপর স্বভাবের নিয়মশুদ্ধ শিকল ছিঁড়ে কান পাতলাম, ঘটনা উদঘাটনের জন্য।

রুপালি- এ সুমা খানকি, তোর জাইরো দামান ডা কোথায় গেছে, শুয়ারটার দোজখেও ঠাঁই হবে না, এমন ছাওয়াল জবাই করে কুত্ত দিয়ে খাওয়ান দরকার।

সুমা- মুখ ঠিক করে কথা কও।

রুপালি- কি মুখ ঠিক করে কথা কব। পাশের খাটে শ্বশুর-শাশুড়ি মুরব্বি মানুষ থাকে তা মাথায় থাকে না? রাত নাই দিন নাই কাতাকেতি মেতামেতি কর লজ্জা শরম বলে কিছু নাই! তারপর আবার এমন কাজ ক্যামনে করালে বরে দিয়ে।

সুমা- এ দেহ কি কতা, আমি কি তারে শিহেই দিছি? সে ঘর উঠাবে জায়গা চেয়েছে, আব্বা কয় আমার জায়গায় ঘর তুলতে পারবি না, এই নিয়া কথা কাটাকাটি করতেছে, খুঁটি পোতার জন্য বাঁশ ধরেছে আব্বা সে বাঁশ দিবে না- তাই নিয়ে টানাটানি করতে করতে উনি পরে গেছে এইহানে আমার দোষ কই?

রুপালি-তোমাগে কুরকুরি উঠছে আলাদা ঘর লাগবে, জায়গা কিনে ঘর তুলে নেও। এইটুকু একটু ভিটে এর ভিতরে আর এক সংসার পাতার দরকার কি?

সুমা-জায়গা কিনবে মানে কি? টাকা পাবে কই? আর বাপের জায়গাতে তার হক আছে না।

রুপালি- হক মারাতে আইস না। ছেলে মেয়ে পালে মানুষ তাদের কামাই করে খাওয়াবে সেইজন্য মাইর খাওয়ার জন্য না। হাঁটতে পারে না বন্দুক ঘাড়ে। টাকা নাই ঘর দিবা না।

সুমা-ঘর বানানোর জায়গা নাই সে ছাওয়াল মাইয়া বানায়েছে কেন? ছাওয়াল মাইয়া বানয়েছে তো জায়গা বানায় নাই কেন? নাহিদের যা কামাই তাতে সে জায়গা কিনতে পারবে না।

রুপালি-কামাই নাই রোজগার নাই বিয়ে মারায়েছে কেন? কত বড় কথা! আল্লাহ সহ্য করবে না। তুমি ছাও ফুটোয়েছ কেন?

সুমা- আমার সমার্থ নাই আমি এখান ফুটায়েছি। খাওয়া পড়া দিতে পারব না, লেখা পড়া করার খরচ দিবার পারব না, শুধু ফুটাতে পারব। কি আমার কথা!

রুপালি- ছুঁচতে আঙ্গুল গুদে পায় না। মানুষ কিষান বুয়ায়ে খায় তবুও মা-বাপ নিয়ে এমন কথা চিন্তাও করে না, আর তোমারা কি কথাবার্তা বলতেছে। আল্লাহর ভয়ডরও কি নাই?

সুমা-ও উনি বাপ বিধায় সত্যি কথা কওয়া যাবে না। ছাওয়াল মাইয়া ভালবেসে বানায় নাই তো নিজের চাহিদা মিটাতে গিয়ে জন্মাইয়েছে তো জন্মায়েছে।

রুপালি- ওরে আমার সত্যিবাদী বাজারি।

অনেক আগেই বুঝে গেছি ঘটনা কি; তবু সুমা, মানে নাহিদের বউ এর সাথে রুপালির বাকবিতণ্ডা শুনতে ভালোই লাগছিলো। মহিলার চিন্তা চেতনাটা কোথায় যেনো খোঁচা মারছিলো আমায়। এরই মধ্যে অনেক সময় হয়ে গেলো। আর থাকা যাবে না, মা জানতে পারলে রাগ করবেন।

রুপালির বাবার আর্থিক সচ্ছলতা আছে। রূপালি স্কুলে গেছে, বাইরের দশ জনের সাথে মেলামেশার সুযোগও ছিলো তার; অথচ তার মধ্যে সামাজিকতা-মানবিকতা কিংবা রুচিবোধের কোনো বালাই নেই, বেয়াদপের এক শেষ এই মেয়ে! ঘটনার আকষ্মিকতায় সে যতোটা না বিচলিত, তার চেয়ে বরং খুশিই বেশি; খুশি কারণ দুটো কথা শোনানোর সুযোগ পাওয়া গেছে। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার মেয়ে রূপালি না। কিন্তু নাহিদের বউ নিরক্ষর, অজো পাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত মেয়ে, গরীব ঘরে জন্মেছে, সামাজিকীকরণ-মানবিকতা-ব্যবহার এগুলো সবই তার কাছে হয় খালি সানকি না হয় আধপেট খাওয়া। রূপালির অসভ্য আচরণেও সে খুব শান্তভাবে কথা বলেছে- আমার বেশ ভালোই লেগেছে নাহিদের বউকে।

এনায়েত মুন্সীর বাড়ি থেকে বের হবার পর আমার মনে হতে লাগলো- নাহিদের বউয়ের মতো করে তো কখনও চিন্তা করিনি। সুমা মিথ্যে তো কিছু বলেনি। এনায়েত মুন্সীর বংশ গৌরব সকলেরই জানা। মলিন শতছিন্ন নকশী কাঁথার মতো সে এই গৌরব বয়ে বেড়াতো, মলিন হোক, নকশী কাঁথা তো! মুন্সী বাড়ির ছেলে কোনো ছোটো কাজ করতে পারে না- এই অহংকারবোধ থেকে কখনও কোনো কাজ করেনি। কিন্তু ছেলে মেয়ে সাতটা। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়াতেই পারে না, লেখাপড়ার খরচ তো চিন্তার বাইরে। নাহিদের মা নানাজনের কাছে হাত পেতে কোনো রকমে সংসারের ঘানি টেনেছেন।বাবার দায়িত্ব কতোটুকু পালন করেছে এনায়েত মুন্সী? স্বামী হিসাবেও সে কিচ্ছু করেনি ফোটনের জন্য। তবে একেবারে কিছু দেয়নি বলা যাবে না। দুধ দেয়া অবস্থায় গাভী যেমন বাছুর (বাচ্চা গরু) নিয়ে গাভীন হয় তেমন ফোটন বছর ঘুরতে না ঘুরতে পোয়াতি হয়েছে, একটা কোলে, একটা হাতে, একটা কাপড়ের আঁচলে নিয়ে। ভালোবাসার অভাব ছিলো কিন্তু সন্তান প্রসবের বেদনার অভাব কখনও ফোটন অনুভব করেনি।

আমি যখন গভীর নিমগ্নতায় চারপাশে তাকাই, দেখি, নাহ শুধু নাহিদের বাপ একা এনায়েত মুন্সী না, এ রকম শত এনায়েত মুন্সীতে আমার চারপাশটা লোকারণ্য হয়ে গেছে। যা কিছু স্বাভাবিক তা-ই সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্রষ্টার বিনা হুকুমে গাছের পাতাও নাকি নড়ে না, মানুষ নাকি তার নিয়মের নিয়ামক- তাই যদি হয়, তাহলে এনায়েত মুন্সীরাই ঠিক আর সুমারাই দোষী; শুধু স্বভাব দোষেই দোষী না, জন্ম পাপেও দোষী।

কেনো জন্ম নিলো আজন্ম পাপ হিসাবে? কাকে রেখে কাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। কাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিবো? সুমাকে? না, এনায়েত মুন্সীকে? সুমার ভাগ্য লিখেছে যে বিধাতা দায়ভার তো তার হবার কথা। না, তাকে দোষ দেয়া যাবে না, সে হচ্ছে ভাগ্যদাতা। সে অনেক বড়ো কাজ করেছে, সুমাদের জীবন দান করেছে, এই সুন্দর পৃথিবীর রুপ-রস-গন্ধে বাঁচিয়ে রেখেছে। মৃত্যুর পর বেহেশতের লোভে তাই তাকে রাতদিন সিজদা করা। বাবা জন্মদাতা, তার মাধ্যমেই এই দুনিয়ায় এসেছো; তাই তাকে পূজা করো অহরাত্রি। সব দোষ তোমার, তোমাদের। সুমারা কেনো তোমারা চিৎকার করো ‘অধিকার, অধিকার, … ’ করে? ভালোবাসা পাবার কাঙাল হয়ে বাঁচার মতো ‘বাঁচবো, বাঁচবো, … ’ করে?

সব দোষ তোমাদের সুমা, সব দোষ তোমাদের। নাহিদদের কোনো দোষ নেই। কারণ, আজকের নাহিদরাই হয়তো আগামীকালের এনায়েত মুন্সী।

১৯ thoughts on “কপাল গুণে বিধাতা নাম কিনেছে ভাগ্যদাতা

  1. চমৎকার। একজন পরিপক্ক
    চমৎকার। একজন পরিপক্ক গল্পকারের মেধা আছে আপনার। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. প্রশংসা শুনে ভাল লাগল তবে এত
      :ধইন্যাপাতা: প্রশংসা শুনে ভাল লাগল তবে এত হাততালি না দিয়ে একটু সমালোচনা করলে বেশী খুশি হতাম।

  2. ভালো লাগল। যদিও আপনি এই কথাটা
    ভালো লাগল। যদিও আপনি এই কথাটা শুনতে না চেয়ে সমালোচনা চেয়েছেন, তারপরেও এটাই বললাম। কারণ এই গল্পের সমালোচনা করার সামর্থ্য আমার নেই।

  3. আপনার লেখার মধ্যে বাস্তবতা কে
    আপনার লেখার মধ্যে বাস্তবতা কে চমৎকার ভাবে ছুঁয়ে যাওয়া ভাব পরিলক্ষিত , যে বিষয়টা চিলেকোঠায় আচল মেলে ধরার গল্পে দেখেছি ।
    :ফুল: :ফুল: :ফুল:

  4. চিরাচরিত বাঙ্গালীর রূপ তুলে
    চিরাচরিত বাঙ্গালীর রূপ তুলে ধরেছেন খুব চমৎকার ভাবে।
    সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলে পুরোপুরি আঞ্চলিক ব্যবহার করবেন। :ফুল:

    1. আঞ্চলিক ভাষাতে চলিত মিশ্রণ
      আঞ্চলিক ভাষাতে চলিত মিশ্রণ দিয়েই অনেক মানুষ কথা বলে। আমি যে এলাকার মানুষের চিত্র তুলে ধরেছি সেখানে ভাষাটায় তেমন আঞ্চলিকতা আমি পাই নাই তাই এমন লেখা হয়েছে। ধন্যবাদ বিষয়টা বলার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *