আমার বাবা

বাবা আমার চেয়ে মাত্র 20 বছরের বড়।বাবার সাথে এক বিছানায় সেই কবে শুয়েছি মনে নেই।বাবা আর আমি পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হবে আমরা ভাই।অনেকের কাছে পরিচয় দিলে তারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।আমরা বাপ ব্যাটা সেটা ইনজয় করি।বাবা পুলিশ অফিসার।বাসায় নিয়মিত আসার সময় পায় না।বাসায় আসলেও অনেক রাতে আসে সকালে আমি ঘুম থেকে ওঠার আগে চলে যায়।আমি বড় হয়েছি তাই হয়তো বাবার সাথে দুরত্ব টাও বেড়ে গেছে।দুই দিন এর জন্য ছুটিতে আসলে আমার সাথে সারাদিন লেগেই থাকবে।মানে বাপ ব্যাটা একেবারে দা-কুমরা সম্পর্ক।মাঝে মাঝে খুব রাগ লাগে।যেদিন খুব রাতে বাড়ি এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলে “বাবা দেখতো তোর জন্য মিষ্টি দই আনছি খেয়ে ঘুমা সকালে হয়তো আমার দেখা পাবিনা।” তখন সব রাগ চলে যায়।
বাবার সাথে কতদিন ঘুরতে যাই না।কতদিন মন খুলে গল্প করি না।বাবা যখন আমাকে কথায় কথায় বকে “ওই চুল এত বড় ক্যান?,এহ দাঁড়ি তো ছাগলের মত রাখছেন তা কোন রমনী আপনাকে এই ইশটাইলে দাঁড়ি রাখতে বলছে?,এগুলা পরীক্ষার নাম্বার? ছি ছি চল আজকেই একটা অটো কিনে দেই পড়াশুনা হবে না,এত ফোন টিপিশ ক্যান?দেখি ফোন টাদে।”ইত্যাদি ইত্যাদি তখন খুব রাগ লাগেআমার।আমিও মুখে মুখে তর্ক করি।কিন্তুযখন বাবা চলে যায় তখন আবার এগুলা মিস করি।যখন কোন প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার পাই বা আমার কোন লেখা কোথাও ছাপানো হয় তখন সেটা লজ্জায় বাবাকে দেখাই না।আমার ছোট বোন যখন বাবাকে আমার পুরষ্কার টা দেখায় তখন বাবা আমাকে ডেকে বলে “কিরে এগুলা কিসের পুরষ্কার?তুই আবার গান টান জানিস নাকি?বাবা আবার দেখি দেবদাস টাইপ লেখাও লিখিস।হইছে এগলা করে টাইম লস নাকরে যায়া পড়া পড়।”খুব কষ্ট লাগে তখন।আবার ঘরে গিয়ে চুপ করে যখন আম্মুকে বলে “কিগো হিমু গান পারে জানতাম নাতো,ওকে গান টান শেখাও নাকি?” তখন বাবার প্রতি খুব মায়া লাগে।বাবার সাথে ঝগড়া করে বাবা যখন বলে হইছে দেখতো ল্যাপটপ এর এইটা বুঝতেছি না ঠিককরে দে।তখন আবার খুব উত্সাহ নিয়ে ঠিক করে দেই।বাবাকে এক ঘন্টা ধরে বলতে বলতে তবুও বাইক এর চাবি টা না দিলে ঘর এর দরজা লাগিয়ে বসে থাকি।কিছুক্ষন পর ঠিকি এসে দরজায় টোকা দিয়ে বলবে “ঠিক আছে যা মাত্র আধাঘন্টা টাইম।বাইক এ কিন্তু তেল নাই।
আমরা মধ্যবিত্ত।বাবা আমাদের ভাইবোন দের সব চাহিদা হয়তো মেটাতে পারে না।তখন বাবা হয়তো নিজেকে অপরাধবোধ মনে করে।তখন আমার মায়া হয়।তবুও সবসময় চেষ্টা করে সব চাহিদা মেটানোর।ঈদ এ আমাদের সবাইকে জামাকাপড় কিনে দিবে কিন্তু যেদিন থেকে আমার বুঝ হয়েছে সেদিন থেকেই দেখেছি বাবা কোন ঈদে নিজের জন্য কোন নতুন জামাকাপড় কিনতো না।ছোট ভাইবোন দুটোকে মৌবন এ খাওয়াতে নিয়ে গেলে আমার জন্য ঠিকি রসমালাই নিয়ে আসতে ভুলবে না।
মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায় ছোট বেলার কথা।বাবা আমাকে সাইকেল এ করে ঘুরতে নিয়ে যেত।আমি যখন হইছি তখন বাবা সবে নতুন চাকরি তে ঢুকেছে।মাত্র 800 টাকা বেতন যা আমার দুধ কিনতেই অর্ধেক টাকা চলে যেত।অনেক ধার দেনা করে চলতে হতো।অনেক কষ্ট হইতো বাবার।যখন একটু বড় হইছি আমাকে অফিসের টেবিলে বসিয়ে নিজে লেখা লিখি করতো।কতবার যে বাবার কাগজপত্র হিসু করে ভিজাইছি আর কতবার যে কাগজপত্র মুখে ঢোকাইছি হাহা।বাবা অফিস থেকে যখন বাড়ি ফিরতো তখন 3 টাকা দিয়ে আমার জন্য চিজবল নামে একটা চিপস্নিয়ে আসতো।ঐটা নিয়েই আমি মহা খুশি।তারপর যত বড় হতে লাগলাম ততই বাবার সাথে আমার দূরত্ব বাড়তে থাকলো।এখন তো নিয়মিত দেখা বা কথাই হয় না।তবুও বাবা যে আমাকে কতটা ভালবাসে আমি জানি।ক্লাস এইটে রংপুর এসে কিছুদিন মেসে থাকতে হয়েছিল আমাকে।বাবা আমাকে মেসে রেখে যখন চলে যাবে তখন বাবা কেঁদে ফেলেছিল আমি সেদিন প্রথম বাবার কান্না দেখেছিলাম।বাবা চাকরির জন্য মাঝে মাঝে ঈদেও আসতে পারতো না।একা একা ঈদেরনামায পড়তে গিয়ে দেখতাম সবাই তাদের বাবার সাথে নামায পড়তে এসেছে।নামায শেষে সবাই তাদের বাবার সাথে যখন কোলাকুলি করতো তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসতো।
যাই হোক এখন অনেক বড় হইছি।তবুও বাবাকেবুঝতে পারি নাই।হয়তো বাবাকে খুব অল্প সময়ের জন্য কাছে পাই তাই বুঝতে পারি না।
বাবা জীবনে অনেক বড় একটা ভুল করেছিল।যার জন্য আমাদের এখনো সাফার করতে হচ্ছে।কিন্তু তবুও তো আমার বাবা।আমি মেনে নিয়েছি,বাবাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।অন্য কোন ছেলে হলে ক্ষমা করতে পারতো কিনা জানি না।বাট আমি ক্ষমা করেছি কারন বাবাকে খুব ভালবাসি।
বাবা আমি তো অনেক বড় হইছি তোমাকে লাভ ইউ বলার ক্ষমতা আমার নাই।সত্যি তুমি খুব ভাল।তোমার সাথে খুব খারাপ ব্যাবহার করি আমাকে মাফ করে দিও।আমি তোমার জন্য দোয়া করি তুমি ভাল থাক।তুমি যে ভুল টা করছিলা সেটার জন্যঅনেক কষ্ট পাও আমি জানি।কিন্তু বাবা সত্যি আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।তুমি খালি একটু দোয়া করো যেন তোমার হিমু ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার না হোক যেন মানুষ হয়।তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।
i love u…..
বাবা তুমি কি জানো তোমার হিমু এখন ভালো নেই।কখনো কি আমার মনের খবর রেখেছো?তোমার হিমু আর আগের মত নাই বাবা।দোয়া করিও।

৯ thoughts on “আমার বাবা

  1. আমি আপনার পোস্ট পড়ি নি । শুধু
    আমি আপনার পোস্ট পড়ি নি । শুধু দেখলাম বাবার প্রতি আপনার ভালবাসা !!! এটা অবশ্যই সম্মানের দাবিদার । :ফুল: :তালিয়া: :তালিয়া:

  2. বাবার প্রতি আপনার ভালোবাসা
    বাবার প্রতি আপনার ভালোবাসা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে গেলাম। আমার বাবাকে হারিয়েছি আজ প্রায় ১৭ বছর। বাবা জিনিসটা কি সেটা বুঝে ওঠার আগেই…

  3. কিন্তু বাবা সত্যি আমি তোমাকে

    কিন্তু বাবা সত্যি আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।তুমি খালি একটু দোয়া করো যেন তোমার হিমু ডাক্তার,ইন্জিনিয়ার না হোক যেন মানুষ হয়।তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।

    :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

  4. বাবা আমার।একটু থমকে
    বাবা আমার।একটু থমকে উঠলাম।কারন একই শিরোনামে আমিও লিখেছি। ভাবলাম আমার লিখা আবার উপরে আসলো কেন?পরক্ষনেই ভুল ভাঙল পিনিক বাবা দেখে। কি বলে মন্তব্য করব বুঝতে পারছি না।শুধু বলব।অসাধারন। :তালিয়া:

  5. আমার কাছে আপনার লেখাটা ভালো
    আমার কাছে আপনার লেখাটা ভালো লেগেছে কিন্তু একটা জায়গাই আমি ঠিক বুঝতে পারছি না…………

    বাবা তুমি কি জানো তোমার হিমু এখন ভালো নেই।কখনো কি আমার মনের খবর রেখেছো?তোমার হিমু আর আগের মত নাই বাবা।দোয়া করিও।

    একটু বুঝতে কষ্ট হচ্ছে ………………

Leave a Reply to ডাঃ আতিক Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *