বিজয় দিবস

রাতে ভাল ঘুম হয়নি। বার বার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ভোর পাঁচটার দিকেও একবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মোবাইলে পাঁচটা চৌচল্লিশে এলার্ম দেয়া আছে। তাই আর তেমন ঘুম হল না। সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে পড়লাম। ওজু করে আজ ফজরের নামাজটা পড়ে ফেললাম। সব দিনতো আর ভোরে ওঠা হয় না!
নামাজ শেষে পোষাক পাল্টে রওয়ানা হলাম। এতো সকালে বোধহয় রিক্সা পাব না। বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত লম্বা পথটা হাঁটবার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম মনে মনে। কিন্তু ভাগ্য ভাল- বুরুজের পুকুর পাড়ের পাকা রাস্তায় আসতেই একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম।
: রিক্সা, যাবে?
: কই যাবেন?
মনে মনে ভাবলাম, এতো সকালে আবার বাস পাব কিনা কে জানে? তাই বললাম: নবীনগর?

রাতে ভাল ঘুম হয়নি। বার বার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ভোর পাঁচটার দিকেও একবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। মোবাইলে পাঁচটা চৌচল্লিশে এলার্ম দেয়া আছে। তাই আর তেমন ঘুম হল না। সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠে পড়লাম। ওজু করে আজ ফজরের নামাজটা পড়ে ফেললাম। সব দিনতো আর ভোরে ওঠা হয় না!
নামাজ শেষে পোষাক পাল্টে রওয়ানা হলাম। এতো সকালে বোধহয় রিক্সা পাব না। বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত লম্বা পথটা হাঁটবার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম মনে মনে। কিন্তু ভাগ্য ভাল- বুরুজের পুকুর পাড়ের পাকা রাস্তায় আসতেই একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম।
: রিক্সা, যাবে?
: কই যাবেন?
মনে মনে ভাবলাম, এতো সকালে আবার বাস পাব কিনা কে জানে? তাই বললাম: নবীনগর?
রিক্সাওয়ালা ঘাড় কাত করতেই আমি উঠে পড়লাম। হালকা কুয়াশার মধ্যে ঝিরঝিরে বাতাস হচ্ছিল। আমি মাফলারটা আরেকটু ভালভাবে জড়িয়ে নিলাম। মোটামুটি ভালই শীত পরেছে। রিক্সাও চলছিল খুব জোরে। কিন্তু বাইপাইল ব্রিজ পর্যন্ত আসতেই হঠাৎ রিক্সাওয়ালার ওপড় আতর্কিত আক্রমন! আমি মারাত্মক চমকে উঠলাম। কারণ, আক্রমনকারী স্বয়ং পুলিশ! ছিনতাইকারী আক্রমন করলে পুলিশ ডাকতে হয়। পুলিশ আক্রমন করলে কাকে ডাকব?
এর উত্তর আমার জানা নেই, তাই অবাক চোখে চেয়ে রইলাম। পুলিশটি রিক্সাওয়ালাকে অকথ্য গালাগাল করতে করতে গোটা কয়েক লাঠির বাড়ি বসিয়ে দিয়ে বলল: দেখতে পাস না, রাস্তা বন্ধ!
আমি এবং রিক্সাওয়ালা দু’জনেই অবাক হয়ে দেখলাম বাইপাইল ব্রিজ থেকে নবীনগরগামী মহাসড়কটি কোন বিশেষ কারণ ছাড়াই যানবাহন শূন্য। কোন যানবাহনই নাকি যেতে দেয়া হচ্ছে না।
কারণটা একটু পরে জানতে পারলাম। রাষ্ট্রপতি সহ দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নাকি কিছুক্ষণের মধ্যেই এই রাস্তা দিয়ে যাবে। সে কারণে কোন যানবাহনই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। মনে মনে হাসলাম। ঢাকা থেকে এতোটা পথতো তারা আর সব সাধারণ গাড়ির সাথেই এসেছে। আর এইটুকু পথ তাদেরকে আবার বিশেষভাবে সম্মান দেখানোর জন্য রাস্তা ফাঁকা করার প্রয়োজন পড়লো! হায়রে ভি.আই.পি! কোন দিন কি তোমরা অনুভব করতে পারবে, তোমাদের এই বাড়তি সম্মানটুকু দেখাতে গিয়ে জনসাধারণকে কত দুর্ভোগ পোহাতে হয়?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিক্সা থেকে নামলাম। পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে রিক্সাওয়ালাকে বললাম: কত দেব?
রিক্সাওয়ালা কোন জবাব দিলো না। বাম হাতটা দিয়ে ডান হাত চেপে ধরে সে ফোপাচ্ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যাচারা! এই শীতের মধ্যে নিশ্চয়ই ভীষণ ব্যাথা পেয়েছে। এতোটুকু রাস্তার ভাড়া দশ-বার টাকার বেশি না। তবু দুইটা দশ টাকার নোট লোকটার পকেটে গুঁজে দিয়ে আমি চলে এলাম।
কাউকে সান্তনা দেবার ভাষাটা আমার ঠিক আসে না। কেন যেন মনে হয়, সান্তনা মানেই মিথ্যা আশ্বাস। বাচ্চাদের কান্না থামানোর মত- ‘সেরে গেলেই দেখবে ভাল হয়ে গেছ!’ কিছুটা গোমড়া মুখে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। আমি একা নই। আমার সাথে আরও অনেকেই হাঁটছে। এখান থেকে নবীনগরের দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। অর্থাৎ, কমপক্ষে আধা ঘণ্টার পথ। মোবাইলে এফ.এম রেডিও শুনতে শুনতে হাঁটতে লাগলাম। হালকা কুয়াশার আদর মাখা সকাল আর সুন্দর সুন্দর গানে কিছুক্ষণের মধ্যেই মন ভাল হয়ে গেল। রেডিওতে এখন বাজছে- “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না….”
হাঁটতে ভালই লাগছিল। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম কিছুক্ষণ আগের কথা। কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ বাস স্টপেজে আসতেই আবারও বাধা পড়ল। এবার পুলিশ নয়, মিলিটারী! সবাইকে পাকা রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষুণি ভি.আই.পি দের গাড়ি আসতে শুরু করবে।
আমরা তাড়াতাড়ি রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালাম। মোটা মোটা লাঠি হাতে মিলিটারী পুলিশেরা নিষ্ঠার সাথে লাইন কন্ট্রোল করছে। একটা লোকও যেন পীচ ঢালা রাস্তার ধারে কাছে ঘেঁষতে না পারে! আমরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কোন গাড়ির দেখা নেই। প্রায় পাঁচ মিনিট পর প্যাঁ-পো আওয়াজ তুলে প্রথমে দু’টি মোটর সাইকেল, আর্মি জীপ; তারপর দফায় দফায় প্রাইভেট কার-পাজেরো-প্রাডো আর আর্মি জীপের বিরাট কনভয়।
অন্তহীন সেই গাড়ির মিছিলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল: একই কাজে যাচ্ছি আমরা সবাই। গন্তব্যস্থলও একই। তবু কী বিরাট ব্যবধান! ওরা যাচ্ছে গার্ড অব অনারের সাথে কড়া নিরাপত্তার মাঝে শত শত মানুষকে দাঁড় করিয়ে রেখে আরামদায়ক গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে। আর আমরাও যাচ্ছি সেই একই স্মৃতি শৌধে; আজ এই বিজয় দিবসে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে। গাড়ি চলাচল বন্ধ, তাই পায়ে হেঁটে।
আচ্ছা, কাদের ত্যাগটা এখানে বড়? শহীদদের প্রতি ভালবাসাটা কাদের বেশি? আরাম করে দামি গাড়িতে বসা ঐ ভি.আই.পি দের? নাকি মিলিটারী পুলিশের মোটা লাঠির ভয়ে রাস্তার পাশে গাঁদাগাঁদি করে দাঁড়িয়ে থাকা এই সব জনমানুষের?
ভেবে দেখলাম- ঐ সব ভি.আই.পি দের ত্যাগটাই বেশি। কেননা, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদেরকে একটু সম্মান জানানোর জন্য ওরা দামি গাড়িতে সরকারী টাকার অকটেন পোড়াচ্ছে! সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে দামি পুষ্পস্তবক!
আর এরা! সামান্য দুইশ’ টাকার সেন্ডেল পায়ে হেঁটে শরীরের বিনে পয়সার ঘাম ঝড়াচ্ছে! কার না কার বাগান থেকে হাতে করে নিয়ে এসেছে সামান্য গাঁদা ফুল!
সত্যিই তো; স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন বিসর্জন দেয়া সেই সব মহান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর যোগ্যতা বা সামর্থ কি আর এই সব সাধারণ লোকজনের আছে। ওরা স্মৃতি শৌধে গেলেই কী আর না গেলেই কী? শুধু শুধুই কেন যে এরা এসে ভিড় বাড়ায়!
———- ০ ———

বিঃদ্রঃ এটি একটি সত্য ঘটনা, লোকের মুখে শোনা কোন ঘটনা নয়। এই লেখাটি সকল ভি.আই.পি দের উৎসর্গকৃত!

– সফিক এহসান
(১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ইং)

১৪ thoughts on “বিজয় দিবস

  1. কিহু বলার নাই ভাই । নির্মম
    কিহু বলার নাই ভাই । নির্মম বাস্তবতা কটূক্তি আর হালকা ব্যাঙ্গ ভরে উপস্থাপন করলেন । অনবদ্য

    সামান্য দুইশ’ টাকার সেন্ডেল পায়ে হেঁটে শরীরের বিনে পয়সার ঘাম ঝড়াচ্ছে! কার না কার বাগান থেকে হাতে করে নিয়ে এসেছে সামান্য গাঁদা ফুল!

    এরাই সম্মান দিতে জানে , দিয়ে আসছে । জাতির জন্য দেশের জন্য কিছু করলে এরাই করবে

  2. নির্মম বস্তবতা… কিছু লোক
    নির্মম বস্তবতা… কিছু লোক সরকারি প্রোটোকল-কে অপব্যবহার করছে!!
    অথচ বিল ক্লিনটন ভুল যায়গায় গাড়ি পার্ক করে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় জরিমানা গুনেছিল… সবই আমাদের জনগনের দোষ! আমরা কোন ভালকে সানন্দে গ্রহন করি না…
    আমরা সবাই নাচতে নেমে গুমটা টানার জনগন! তাই পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে!!

  3. ৭৫ এর পর আর কোন নেতা সাহস
    ৭৫ এর পর আর কোন নেতা সাহস করেনি জনগণের সাথে মিশে একাকার হতে। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর বোকামি (?) থেকে নেতারা ভালোই শিক্ষা নিয়েছে।
    সাধারণ জনগণ জাতীয় দিবসে হাজারো কষ্ট স্বীকার করে শহীদদের সম্মান জানাতে যান, আর ভিআইপিরা যান নিয়ম রক্ষার জন্য। এটাই বাস্তবতা।

    1. সাধারণ জনগণ জাতীয় দিবসে

      সাধারণ জনগণ জাতীয় দিবসে হাজারো কষ্ট স্বীকার করে শহীদদের সম্মান জানাতে যান, আর ভিআইপিরা যান নিয়ম রক্ষার জন্য। এটাই বাস্তবতা।

      সহমত আতিক ভাই

    2. আচ্ছা আতিক ভাই! আপনি সব সময়
      :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

      আচ্ছা আতিক ভাই! আপনি সব সময় আমার মনের কথাগুলো কিভাবে বলেন?
      আপনি কি আসলেই ডাক্তার? মনের ডাক্তার নিশ্চয়ই? থট রিডিং করেন বুঝি!
      :bow:

  4. তাদের পরিস্থিতির কথাও আপনাকে
    তাদের পরিস্থিতির কথাও আপনাকে ভাবতে হবে! তারা এতটুকু যগ্যতা অর্জন করেছে তাই এটা তাদের প্রাপ্য।

    আর ভাই তাদের উপর যেকোন সময় হামলা হতে পারে আর সেটা নয়ে অনেক রাজনৈতিক প্যচ।

    পক্ষান্তরে আমাদের ই বড় ক্ষতি হত!

    1. হুম… ঠিকই বলেছেন।
      “তাদের

      হুম… ঠিকই বলেছেন।
      “তাদের উপর যেকোন সময় হামলা হতে পারে আর সেটা নয়ে অনেক রাজনৈতিক প্যচ।
      পক্ষান্তরে আমাদের ই বড় ক্ষতি হত!”

      ক্ষতি মানে! রিতিমত নতুন করে কিছু লোককে সততা-আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিতে হতো!
      :থাম্বসআপ:

      1. হুম ভাই। আমরা বাঙ্গালিরা বলেই
        হুম ভাই। আমরা বাঙ্গালিরা বলেই খালাস কি হবে ভবিষতে তা নিয়ে ভাবি না!
        উন্নত দেশ সমূহ ও আমাদের দেশের উন্নয়ন প্রকল্প দেখলেই বুঝা যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *