দেশপ্রেমিক

ক’দিন ধরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে,আকাশচ্যুত পানির দল নিচু উঠোনে হাঁটু অবধি জমে আছে,গ্রীষ্মের ধুলোর খেলাঘরে কাঁদার আগ্রাসন চলছে,নামার জো নেই।
দাওয়ায় বসে লাউমাঁচার ফাঁক দিয়ে উকিঁ মেরে পেঁপেগাছটা দেখার চেষ্টা করছে করিমন,ছোট-বড় কয়েকটা পেঁপে দেখা যাচ্ছে।পাশের হিন্দুবাড়ির বাচ্চাগুলোর যন্ত্রণায় গাছের ফল দেখার সৌভাগ্য তার কালেভদ্রে হয়।এবার বাচ্চাগুলো নেই,কিছুদিন আগে গ্রামের অন্য হিন্দু পরিবারগুলোর মত এদের পরিবারটাও সরে পড়েছে।কানাঘুষা চলছে,দেশে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
হোক,তাতে তার কি,ওসব রাজা-রাজড়া দের কারবার,করিমন ভাবে।

ক’দিন ধরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে,আকাশচ্যুত পানির দল নিচু উঠোনে হাঁটু অবধি জমে আছে,গ্রীষ্মের ধুলোর খেলাঘরে কাঁদার আগ্রাসন চলছে,নামার জো নেই।
দাওয়ায় বসে লাউমাঁচার ফাঁক দিয়ে উকিঁ মেরে পেঁপেগাছটা দেখার চেষ্টা করছে করিমন,ছোট-বড় কয়েকটা পেঁপে দেখা যাচ্ছে।পাশের হিন্দুবাড়ির বাচ্চাগুলোর যন্ত্রণায় গাছের ফল দেখার সৌভাগ্য তার কালেভদ্রে হয়।এবার বাচ্চাগুলো নেই,কিছুদিন আগে গ্রামের অন্য হিন্দু পরিবারগুলোর মত এদের পরিবারটাও সরে পড়েছে।কানাঘুষা চলছে,দেশে নাকি যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
হোক,তাতে তার কি,ওসব রাজা-রাজড়া দের কারবার,করিমন ভাবে।
তবু শোনা কথাগুলো সেলিমকে বলে সে,সেলিম পাত্তা দেয়না।সেলিম তার একমাত্র ছেলে,বাপ মারা যাওয়ার পর থেকে গঞ্জের দোকানটা সেই চালায়,বড় ভাল ছেলে তার।তবে,ইদানীং কি যেন হয়েছে সেলিমের,সারাদিন চেয়ারম্যানের ছেলে ইসহাকের সাথে কোথায় কোথায় বেড়ায়,দোকানটাও বন্ধ বেশ ক’দিন ধরে।সে আজকাল মাকে ধমক দেয়া শিখেছে,করিমনের সব কৌতূহল ঝামটাতেই মেটে।
শান্ত গ্রামটার পরিবেশ হঠাত্‍ই বদলে যাওয়া শুরু করে,জোয়ান বয়সী ছেলেছোকরাদের আর দেখা যায়না,বুড়োরা রেডিও ঘিরে বসে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়তে নাড়তে দেশের আসন্ন ধ্বংস ঘোষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে,বাতাসে এক অজানা ভয়,সবার কথাবার্তা ফিসফাসেই সীমাবদ্ধ।

দু’দিন পর সেলিম বাড়ি ফিরল।আজ তার মন ভাল,মায়ের সব প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্যেই যেন এসেছে।সেলিম মাকে বোঝায়,সারা দেশে ডাকাত পড়েছে,সব ছেলেছোকরারা গিয়ে ডাকাতদলে যোগ দিচ্ছে,দলটার নাম ‘মুক্তি’।এদের হাত থেকে দেশ বাঁচাতেই বড় শহর থেকে মিলিটারী এসেছে আর তার মত আরও দু’চার জন দেশপ্রেমিক তাদের সাধ্যমত খেদমত করছে।
করিমন অবাক হয়,তার চোখের সামনে বড় হওয়া ছেলেপিলেগুলো আজ ডাকাত!একই সাথে তার খুব গর্বও হয়,তার ছেলেটার জন্য,ছেলেটা নষ্ট হয়ে যায়নি।
সেলিম প্রতিদিন বাড়ি ফিরে মাকে সারাদিনের গল্প বলে,”আইজ এই কয়টা ডাকাত মারছি,এতগুলান ঘর জ্বালাইছি,এতগুলান ডাকাতির মাল উদ্ধার করছি,এতগুলান মাগীরে……’,বাকিটুকু আর বলেনা সে।
করিমন মৃদু গলায় প্রতিবাদ করে,”দোষ করছে ডাকাইতে,হেগো বাপ-মায় তো করেনাই”।তার দুর্বল প্রতিবাদ উড়ে যায় তার পুত্রের উন্মত্ত উচ্ছ্বাসে।
অবস্থা খুব বেশিদিন এরকম থাকেনা,সেলিমের কপালে ভাঁজের সংখ্যা ডাকাতদের সাফল্যের সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে,অনেক রাতেই সে বাড়ি ফেরে না,করিমন ভাত নিয়ে বসে থাকে তার দেশপ্রেমিক পুত্রের জন্য।

মাত্র শীত পড়া শুরু হয়েছে,চাঁদর গায়ে করিমন উঠোনে এসে দাড়ায়,সেলিমের চিন্তায় রাতে ঘুম হয়নি তার,ছেলেটা আজ ৭ দিন বাড়ি নেই
কারা যেন আসছে,আজকাল সে চোখে একটু ঝাপসা দেখে,তারওপর কুয়াশায় ঠিকমত বোঝা যায়না।কাছে আসার পর চিনতে পারে,৬-৭টা ছেলে,এই এলাকারই,ডাকাত হবে নিশ্চয়ই,ওইতো হাতে বন্দুক,করিমন স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে,নড়ার সাহস পায়না।একটা ছেলে এগিয়ে এসে বলল,’চাচী,এট্টু কথা ছেল,ভিত্রে আন’।করিমন ভয়ে ভয়ে ছেলেটির সাথে ভিতরে যায়,অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে তারা।ছেলেটি তাকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে;হানাদার বাহিনীর কথা বলে;রাজাকার,আলবদর দের কথা বলে,একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করে করিমন

পড়ন্ত বিকেল,আলো এখনও আছে,যদিও সে আলোতে তাপ নেই,হালকা বাতাস দিচ্ছে,কি একটা পাখি যেন ডাকছে,এসব কিছুই খেয়াল করছে না করিমন,তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে,”আন্নের পোলায় রাজাকার”
তবু সমগ্র চেতনা এক করে হাটতে থাকে সে,খালপাড়ের দিকে,ওইতো দেখা যায়,তার একমাত্র সন্তান,যে মাটির সাথে সে বেইমানী করেছে,সেই মাটিতেই মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে
করিমন এগিয়ে যায়,সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে মৃত সন্তানের গায়ে থুথু দিতে,কিন্তু অত মনের জোর যে তার নেই,হাঁটু ভেঙে পড়ে যায় করিমন,তার ঝাপসা চোখ আরও ঝাপসা হয়ে আসে……..

৯ thoughts on “দেশপ্রেমিক

  1. সবার মত আমি ভালো লাগলো বলবো
    সবার মত আমি ভালো লাগলো বলবো না আমার কাছে অসাধারন লেগেছে কারন আপনার এই লেখাটিতে মুল বক্তব্য এবং অনুভূতি ফুটে উঠেছে খুব সুন্দর ভাবে ।। ছোট গল্প হিসেবে একদম পারফেক্ট………… :তালিয়া:

  2. দারুণ.. . তবে আমার মনে
    দারুণ.. :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: . তবে আমার মনে হয় আরও ডেশিং হতে পারত!!
    একটু তাড়াহুড়ো ছিল বোধহয় পোস্টকর্তার…
    স্পিরিট ভাল না লেগে উপায় নায়!! :salute:

  3. ভালো লাগল। লিখতে থাকুন। আপনার
    ভালো লাগল। লিখতে থাকুন। আপনার ভালো লেখার ক্ষমতা আছে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *