বীরের জাত বাঙালি : জ্বলে পুড়ে মরে ছারখাড়, তবু মাথা নোয়াবার নয়

তারিখঃ ৭ অক্টোবর, ১৯৭১
স্থানঃ ভারতের মানিকগঞ্জ বি.ও.পি. ক্যাম্প।


তারিখঃ ৭ অক্টোবর, ১৯৭১
স্থানঃ ভারতের মানিকগঞ্জ বি.ও.পি. ক্যাম্প।

পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় তখন গেরিলারা হাইড আউটে লুকিয়ে থেকে পাকি আর্মির জীবন ওষ্ঠাগত করে ফেলেছে। গেরিলারা তখনও মুজিব নগর সরকারের আন্ডারে আসেনি। গেরিলাদের একেক ইউনিট ভারতীয় সেনাবাহিনীর একেক অফিসারের আন্ডারে অপারেশন পরিচালনা করছে। প্রতি তিন দিন পর পর গেরিলা ইউনিট গুলোর বিভিন্ন স্কোয়াড এর হাইড আউটের কাছাকাছি বিএসএফ এর কোন বি.ও.পি অফিসে এসে গেরিলা স্কোয়াডের দায়িত্বে নিয়োজিত স্ব স্ব অফিসার ইন চার্জ ভারতীয় সেনা অফিসারের কাছে তিন দিনের যাবতীয় ঘটনা ও অপারেশনের রিপোর্ট দিতে হতো স্কোয়াড কমান্ডারের। মানিকগঞ্জ বি.ও.পি এর তেমনি একদিনের ঘটনা- সেদিন দুটি ইউনিটের তিনটি দল রিপোর্ট করতে এসেছে। চাউলহাটি ইউনিট বেসের দুটি দল এবং হেমকুমারী ইউনিট বেসের একটি দল। চাউলহাটি ইউনিটবেসের একটি দল নেতৃত্ব দিচ্ছে অহিদার ও বদিউজ্জামান এবং আরেকটি দল নেতৃত্ব দিচ্ছে মাহবুব আলম। মাহবুব আলমের দলটি পঞ্চগড়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গেরিলা গ্রুপ হিসেবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আর ওপর আরেকটি দল হচ্ছে হেমকুমারি ইউনিট বেসের মালেকের দল। গতকাল মালেকের দলের বিশৃঙ্খলার কারনে এবং পাক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে একজন সেকশন কমান্ডার সহ কোম্পানি কমান্ডার মালেক নিহত হয়। আর সম্পূর্ণ দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে সীমান্তের এপারে পালিয়ে এসে গোলাপ আর আকবরের নেতৃত্বে রিপোর্ট করতে আসে তাদের অফিসার ইন চার্জ মেজর সিং এর কাছে। আর মাহবুব আর অহিদারের দলের অফিসার ইন চার্জ হলেন ক্যাপ্টেন নন্দা। গেরিলাদের দল একপাশে বসে আছে মাঝখানে টেবিল আর টেবিলের ওপাশে বসে আছে মেজর সিং আর ক্যাপ্টেন নন্দা। মেজর সিং রাগে গড়গড় করছেন। চিড়িয়াখানার খাঁচায় আবদ্ধ রাগি বাঘের মত লাগছে তাকে। এখন এই মুহূর্তে, একনাগাড়ে গালাগালের তুবড়ি ছুটিয়ে চলছে তার অধীনস্থ ইউনিটের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া দলের গেরিলাদের উদ্দেশে। পাশাপাশি সব ইউনিটের গেরিলাদের উপরেই রাগ ঝারছে সে। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেজর সিং বলে চলছে,‘শালে বাস্টার্ড, কেয়া কিয়া তুমনে? এবাউট থ্রি হান্ড্রেড স্ত্রেংথ থা তুমহারা। আউর লোগ কুছ কারনে নেহি সাকা? শালে লোক নিদ যাতা থা? পাক আর্মিজ কেম ইজিলি, দে টেক ইউরপজিশন উইদাউট এনি রেজিস্টেন্স, ইয়ে ক্যায়সা হো সাকতা? দে ক্যাপচারড অল অব ইউর আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনেশনস, কিল্ড ইউর কোম্পানি কমান্ডার আউর ওয়ান সেকশন কমান্ডার। হাউ ইট ক্যান বি? কিউ তুম শালে লোগকা রোখনে নেহি সাকা? শালে ডারফুক, লাড়াই কারনেকে লিয়ে আয়া? ফ্রিডম ফাইটার বানা হ্যায়। আভি আয়া হ্যায় খালি হাত মে। বোলতা হ্যায় সাব হাতিয়ার লে গিয়া। কোই অ্যামুনেশন্স নেহি হ্যায়। ইউ বাস্টার্ড, নাউ গো অ্যান্ড ফাইট উইথ দেম খালি হাত ম্যায়’

মেজর সিং এর শপাং শপাং চাবুক মারা গালিগালাজ চলতেই থাকে। মাহবুব তাকায় ক্যাপ্টেন নন্দার দিকে। তিনি চুপচাপ শুনছেন সব। মেজর সিং তখনো বলে চলছে, ‘কিধার সে হাম আভি তুমলোগকা হাতিয়ার আউর অ্যামুনেশন্স দেগা? হাউক্যান আই যাস্টিফাই অ্যান্ড রিপ্লাই ইট টু মাই হেড কোয়ার্টার? শালে বাঙ্গাল, শালে ডারফুক নেশন। তুমলোগ রিফুজি বানকার আয়া হ্যায় খালি খানেকে লিয়ে, লড়নে কে লিয়ে নেহি। কুছ নেহি হোগা। তুমলোগ কাভি তুমহারা কান্ট্রি লিবারেট করনে নাহি সাকোগে।
মেজর সিং এর শেষ কথাটা শুনে হঠাৎ করেইকমান্ডার মাহবুব এর মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠে। বারবার ‘বাস্টার্ড’ ‘বাস্টার্ড’ বলে গাল দেওয়ার পাশাপাশি সিং এখন অভিযোগ তুলেছে, তারা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছেনা, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেনা। ‘এক্সকিউজ মি’ বলে উঠে দাঁড়ায় মাহবুব। মাহবুবের উঠেদাঁড়ানো দেখে সিং তার কথা থামিয়ে রাগি গলায় এবার খেঁকিয়ে উঠে মাহবুবের দিকে-
– ইউ বাস্টার্ড, তুম কেয়া বোলে গা?
আবার বাস্টার্ড, এবার মাহবুবের হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হবার অবস্থা। শক্ত গলায় মাহবুব বলে উঠে-
– ইউ ইউথড্র ইউর ভেরিওয়ার্ড ‘বাস্টার্ড’
– কেয়া বোলা? এবার উঠে দাঁড়ান মেজর সিং।
– ইউ ইউথড্র ইউর ওয়ার্ড। ডু ইউ নো হোয়াট ইজ দা মিনিং অফ বাস্টার্ড? দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠে মাহবুব।
থমকে যান মেজর সিং। ক্যাপ্টেন নন্দাও অস্বস্তি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। মাহবুব বলে চলে-
– হামলোগ আপকা কান্ট্রি মে আয়া হ্যায় ইট ইজ ফ্যাক্ট। বাট বেড়ানে ঘুমনে কে লিয়ে নেহি আয়া। হামলোক দেশ ছোড়কে আয়া হ্যায়, আপকা গভর্নমেন্ট হামকো শেলটার দিয়া হ্যায়, ইট ইজ দা পলিটিকাল ডিসিশন অব ইউর গভর্নমেন্ট। ইউ আর গিভিং আর্মস ট্রেনিং সাপ্লাইং আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনেশন্স অ্যান্ড রেশনস ইট ইজ অলসো এ পলিটিকাল ডিসিশন। আওর আপলোক ইন্ডিয়ান আর্মিকা অফিসার হোনেসা বাদ সে ভি হেমকুমারী ইউনিট বেস কা কমান্ডিং অফিসার বনা হ্যায় ইয়ে ভি তো এক পলিটিকাল ডিসিশন। হামলোক জয় বাংলা কে লিয়ে লাড়তা হ্যায়, আব লোক মোদাদ দেতা হ্যায় পিছমে সে, ইউর এফ.এফ(ফ্রিডম ফাইটার) কোম্পানি ফেইলড টু রেজিস্ট পাক আর্মিজ অ্যাটাক, ইট ইজ ইউর ফেইলিয়র অলসো, বিকজ ইউ আর দেয়ার কমান্ডিং অফিসার, গালতি আভভি কিয়া আপকা এফ.এফ. ইউনিট ভি কিয়া। বাট ডোন্ট কল আস বাস্টার্ড। উই আর নট বাস্টার্ড,হামারা ফাদার-মাদার হ্যায়। উই আর ফাইটিং ফর আওয়ার কান্ট্রিজ ফ্রিডম অ্যান্ড ইট উইল বি কন্টিনিউ আপ টু দ্য লাস্ট গোল। জয় বাংলা হামলোগ কায়েম কারেগাই।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে মাহবুব বসে পড়ে নিজের জায়গায়। মেজর সিং কিছুক্ষণ স্থির নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, কি বলবেন সহজে বুঝে উঠতে পারছেনা। ক্যাপ্টেন নন্দা তাকে বলেন, বইঠিয়ে স্যার। নন্দার কথায় সম্বিৎ ফেরে যেন তার। বসার পর জিজ্ঞেস করেন হোয়াট ইজ ইউর নেম? মাহবুব তার নাম বলে। মেজর সিং মুখের কাঠিন্য বজায় রেখে বলেন, তুম লোগ কেয়া লড়াই কারতা হ্যায়? রাতমে ইধার উধার যাতা হ্যায়, এনিমি সে দূর রাহকার ফুটফাট কারতা হ্যায়, আওর দৌড়কে চালা আতা হ্যায়। আ কার হামকো রিপোর্ট দেতা হ্যায়, পাকিস্তান আর্মিকা দাঁত তোড় দিয়া, উসকো গামছা ফাড় দিয়া গুলিসে।
– নেহি স্যার বলে উঠে দাঁড়ায় মাহবুব, উস দিন হামলোগ মালেককা কোম্পানিকো কভার দিয়া। পাকিস্তান আর্মিকো কাউন্টার অ্যাটাক কিয়া আউর উসকো পিছা লিয়াতো, উও লোগ ভাগতে লাগা। নেহি তো আপকো ইউনিটকো আউর ম্যাসাকার হোতা।
মেজর সিং বলেন, কাহা থা তোমহারা পজিশান?
– করতোয়া কি পাড়, অ্যাবাউট টু মাইলস ফার ফ্রম মালেক কোম্পানি। হামলোগ তো বাঁচায়া চার লাড়কোকা। নেহি তো উও সাব জ্বালকে মার যাতা।

মেজর সিং এবার কিছুক্ষণ থম ধরে থাকেন। ক্যাপ্টেন নন্দা তখন বলেন, স্যার দোজ বয়েজ আর ডুইং ওয়েল। দে আর ভেরি মাচ কারেজিয়াস অ্যান্ড ফাইটিং এভরিডে উইথ পাক এনিমিজ। সিং হাত নেড়ে বলেন, কোই এভিডেন্স হ্যায়, এনি ডকুমেন্ট?
আবার উঠে দাঁড়ায় মাহবুব। এগিয়ে যায় শ্ত্রুর কাছ থেকে দখল করা হাতিয়ার,গোলাবারুদ, ব্যাজ আর কাগজপত্র ইত্যাদিসহ। সব কিছু রাখা হয় টেবিলের ওপর। মেজর সিং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সব কিছু। তারপর বলেন, ঠিক হ্যায় বয়েজ, লেকে যাইয়ে। আই এম এমকনভিন্সড, ইউ আর ডুইং সামথিং গুড। থ্যাঙ্ক ইউ ক্যাপ্টেন নন্দা, ইউ আর লাকি টু হ্যাভ কমান্ড অফ এ ব্রেভ ইউনিট। তারপর তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বলেন, ওকে, দেন বয়েজ। আই এম সরি এন্ড উইথড্রয়িং মাই ওয়ার্ডস। তার ইউনিটের ছেলেদেরকেও লক্ষ্য করে সিং বলেন, ঠিক হ্যায়, ওয়ার মে হার-জিত তো হোতাই হ্যায়। লেট আস অরগানাইজ অ্যান্ড ট্রাই এগেইন। সিং তার কথা শেষ করেই তার ছেলেদের নিয়ে আলাদা ব্রিফিং-এ বসেন। আর ক্যাপ্টেন নন্দা তার অধীনস্থ মাহবুবদের নিয়ে আলাদা বসেন। নন্দা অসম্ভব খুশি, মেজর সিং কে উচিত কথা বলার জন্য তিনি মাহবুব এর পিঠ চাপড়ে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন এভাবেই তোমরা তোমাদের দেশের মাথা সবসময় উঁচিয়ে রাখবে।

যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত এই অকুতোভয় গেরিলা কমান্ডার নিজের গেরিলাকম্পানিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দৃঢ়তার সাথে। যুদ্ধের শেষের দিকে তার সম্পূর্ণ কোম্পানি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন ফ্রন্টলাইনে পাকবাহিনীর সাথে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধ করার জন্য। দেশের এই মহান বীরের প্রতি জানাই হাজার সালাম।

ছবিঃ ১৯৭১ এর নালাগঞ্জ হাইড আউটে ১৯৯২ সালে ভ্রমনের সময়কার ছবি। ডানে কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব আলম এবং সাথে তার বিশ্বস্ত সেকেন্ড ইন কমান্ড পিন্টু।

৭ thoughts on “বীরের জাত বাঙালি : জ্বলে পুড়ে মরে ছারখাড়, তবু মাথা নোয়াবার নয়

  1. অনেক ভাল লাগলো লেখেটা অনেকদিন
    অনেক ভাল লাগলো লেখেটা অনেকদিন পর যুদ্ধ নিয়ে পড়লাম কিন্তু কিছু কিছু শব্দ বুঝতে বেশ বেগ পেতে হল ।। যদিও ভালোয় লাগছিলো কারন নতুন কিছু জানার মাঝে অন্যরকম আনন্দ থাকে এবং সাথে থাকে আকর্ষণ ……… :তালিয়া:

  2. কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব
    কোম্পানি কমান্ডার মাহবুব আলমের লেখা “গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে” বইটা কতবার যে পড়েছি। অসাধারণ একটা বই। এসএসসিতে ভালো ফল করায় জেলা পরিষদ থেকে দেওয়া সম্বর্ধনায় পেয়েছিলাম দুই খণ্ডের বইটি। পড়ার সময় মনে হয় যেন সেই সময়ের উত্তাল দিনগুলোর মাঝে কখন ঢুকে গেছি। সবার পড়া উচিৎ। লেখাটার জন্য বাকের ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা।

    1. শুধু অসাধারন না অসাধারণের
      শুধু অসাধারন না অসাধারণের উপড়ে অসাধারন। একেবারে বাস্তব যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে গেছে যতবারই বইটি পড়েছি ততবারই। হাজার পৃষ্ঠার বই পড়তে পড়তে একটু সময়ের জন্যও মনোযোগ নষ্ট হয়নি। কি এক অনন্য বই, এ এক অনন্য দলিল।

  3. অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা ।
    অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা । ভাল লাগল । আর কিছু বলার পাচ্ছি না এই পোস্ট এ ।

Leave a Reply to অমিত লাবণ্য Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *