সাইজি দর্শন- মৌলিক অবতারনা

লালন! নিছক একটি নাম নয়।
লালন একটি ধারা, লালন একটি দর্শন, লালন একটি প্রথা, লালন একটি জ্ঞান।

শুধু ‘লালন’ শব্দটির আবিধানিক অর্থই ব্যাপক দর্শনের সূতিকাগার। ‘লা’ শব্দের অর্থ- ‘শূন্য’, আর ‘লন’ শব্দের অর্থ লওয়া বা ধারণ করা। সুতরাং লালন শব্দের অর্থ শূন্য তথা অসীমকে ধারণ করা।


লালন! নিছক একটি নাম নয়।
লালন একটি ধারা, লালন একটি দর্শন, লালন একটি প্রথা, লালন একটি জ্ঞান।

শুধু ‘লালন’ শব্দটির আবিধানিক অর্থই ব্যাপক দর্শনের সূতিকাগার। ‘লা’ শব্দের অর্থ- ‘শূন্য’, আর ‘লন’ শব্দের অর্থ লওয়া বা ধারণ করা। সুতরাং লালন শব্দের অর্থ শূন্য তথা অসীমকে ধারণ করা।

লালন দর্শনের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হল গুরুবাদ। গুরুর প্রতি অপরিসীম ভক্তি নিষ্ঠা হল লালন দর্শনের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ধ্যান বা সাধনা ছাড়া শূন্য তথা অপরিসীম জ্ঞানকে ধারণ করা সম্ভব নয়, আর প্রকৃত সাধনার পূর্বশর্ত হল বিশুদ্ধ আত্মা। গুরুর প্রতি অসামান্য ভক্তি ছাড়া অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয়না, এই হল লালন তত্ত্বের প্রাথমিক নিয়ামক। মানুষের প্রতি ভালবাসা, জীবে দয়া, সৎ কর্ম, সৎ উদ্দেশ্য এই হল গুরুবাদী মানবধর্মের মূল কথা। মূলত ভক্তিতেই মুক্তি। এ প্রসঙ্গে মহামতি লালন বলেন-
‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার’

যারা শূন্য তথা হাওয়ার সাধনা করেন তারাই মুলত বাউল। বাউল দর্শনে সাধনার চারটি স্থর বিদ্যমান। ১-স্থুল, ২-প্রবর্ত, ৩-সাধক, ৪-সিদ্ধ। প্রথম পর্যায়ের সাধনা হল- স্থুল, দ্বিতীয় পর্যায়ের সাধনা হল- প্রবর্ত, তৃতীয় পর্যায়ের সাধনা হল- সাধক, এবং চতুর্থ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের সাধনা হল- সিদ্ধ।

মহামতি লালন তার অসংখ্য রচনায় পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন। তার গান ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট। যেমন এক রচনায় তিনি বলেন-
‘আপনার আপনি চেনা যদি যায়
তবে তারে চিনতে পারি সেই পরিচয়’

লালনের ভাবশিস্যরা বিশ্বাস করে যে শারীরিক প্রেম ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃত শান্তি নেই। প্রকৃত শান্তি আছে স্বর্গীয় ভালোবাসায়।

খেলাফত অর্জন লালন দর্শন তথা লালন অনুসারীদের একটি সম্মানজনক পর্যায়। গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর সাধনার বিশেষ স্তরে পৌঁছালেই কেবল শিস্যকে খেলাফত প্রদান করা যায়। লালনের অনুসারীরা বিবাহ বা স্ত্রী সম্ভোগ করতে পারেন, তবে তাদের বিশ্বাস সন্তান উৎপাদনের ফলে আত্মা খণ্ডিত হয়, আর খণ্ডিত আত্মা নিয়ে শূন্য তথা অসীম জ্ঞান তথা মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। সে কারণেই তারা সন্তান উৎপাদন থেকে বিরত থাকেন। তাছাড়া সন্তান উৎপাদনকে তারা সিদ্ধি অর্জনের পথে বেদনাদায়ক বোঝা হিসেবেও বিবেচনা করেন। লালন দর্শনে খেলাফতের ধারণাটি এসেছে ইসলামী সুফিবাদ থেকে, যার মূলকথা হল আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা।

সুফিবাদে সাধনার দুটি পর্যায়, এগুলো হল-১- বাকাবিল্লাহ, ২- ফানাফিল্লাহ। বাকাবিল্লাহ মানে হল সৃষ্টিকর্তার প্রতি অসীম ভালোবাসা, আর ফানাফিল্লাহ মানে হল আত্মার মধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে ধারণ করা। বাকাবিল্লাহ ও ফানাফিল্লাহ অর্জন করার জন্য প্রয়োজন আত্মার যথার্থ পরিশুদ্ধি। মূল এই পরিশুদ্ধি অর্জনের জন্যই লালন দর্শনের অনুসারীরা নিজেদের মত করে পন্থা অবলম্বন করেন। খেলাফত অর্জনের পর একজন সাধক সকল পার্থিব বিষয় থেকে নির্মোহ হয়ে উঠেন। পুরুষরা সাদা আলখাল্লা এবং সাদা লুঙ্গি পরেন। অন্যদিকে খেলাফত অর্জনকারী নারীরা সাদা শাড়ি পরেন। এই সাদা পরিচ্ছদকে বলা হয় ‘খিলকা’। খিলকা হল কাফন সদৃশ পোশাক, যা তাদের ভাষায়- জিন্দা দেহে মুর্দার পোশাক। লালনের মৃত্যু পরবর্তীকালে খেলাফত প্রদানের সময় খেলাফত গ্রহণকারীকে চোখে সাদা কাপড় বেঁধে খিলকা গায়ে লালনের সামধিকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। এ সময় তারা লালনের একটি বিশেষ গান গাইতে থাকেন-
কে তোমারে এ বেশ-ভূষণ পরাইল বল শুনি
জিন্দাদেহে মুর্দার বেশ,
খিলকা তাজ আর ডোর কোপনী।

দুইশত বছরেরও বেশি সময় আগে জন্ম নেয়া অক্ষরজ্ঞানহীন কিন্তু বিদগ্ধ এক মহাপুরুষ ও দার্শনিক লালনের দর্শন সম্পর্কে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের মানুষের কৌতূহল ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এক সময়ের অবহেলিত, সমাজবঞ্চিত লালন আজ নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। লালনের মূল ভাব ও তার দর্শন মূলত তার গান সমূহেই নিবিড়ভাবে প্রকাশিত। সে কারণেই লালনের গান যত নিবিড় করে শুনা হবে, বিশ্লেষণ হবে, আত্নস্থ করা হবে, অনুসরণ করা হবে ততই জানা যাবে মানব তত্ত্বের নিগুঢ় রহস্য, খুঁজে পাওয়া যাবে সত্যের পরশমণি। সৃষ্টিকর্তা যুগে যুগে কিছু কালউত্তীর্ণ মহা মানবের জবানীতে, কর্মে, দর্শনে তার অবারিত জ্ঞানের ভাণ্ডার কিছুটা প্রকাশিত করেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

১৪ thoughts on “সাইজি দর্শন- মৌলিক অবতারনা

  1. লালনের তত্ত্ব কি কোন ধর্মের
    লালনের তত্ত্ব কি কোন ধর্মের নাম? এই বিষয়ে জ্ঞ্যান কম তাই জিজ্ঞেস করলাম।

    1. নারে ভাই। লালন কোন ধর্ম
      😀 নারে ভাই। লালন কোন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, তিনি কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠাও করেননি।

  2. লালন দর্শনের উপর বৌদ্ধ ধর্মের
    লালন দর্শনের উপর বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বেশি বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, এ বিষয়টা আসলে ভাল হত। সুফীবাদ নিয়ে বিস্তারিত লেখা পাওয়ার আশায় থাকলাম ।

    1. এটি একটি বৃহৎ পোস্ট এর
      এটি একটি বৃহৎ পোস্ট এর খণ্ডাংশ। পোস্ট এর শিরোনামই হল- মৌলিক অবতারনা। একটি একক পোস্টে বিষদ লালনকে উপস্থাপন অসম্ভব কল্পনা। ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে নানান আঙ্গিক থেকে সাইজিকে দেখার।

      আপনার জন্য শুভকামনা

  3. আমার মতে লালন সাই তার সময়ের
    আমার মতে লালন সাই তার সময়ের অন্যতম সেরা দার্শনিক। তার দর্শন তথাকথিত মৌলবাদী সমাজে মূল্যহীন। কিন্তু সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য এ দর্শন আপনাকে অনেক সাহায্য করবে। ধন্যবাদ আপনার এ লেখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *