‘গণআদালতের গণজাগরন আজ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে’

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মৃত্যুবরন করেছিলেন ১৯ বছর আগে, ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে। দীর্ঘ ১৩টি বছর দূরারোগ্য কর্কট ব্যাধির বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন তিনি ঠিকই, কিন্তু তাঁর সূচীত স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি হেরে যাননি। বরং স্বাধীনতা পরবর্তি বিশাল আন্দোলনগুলোর মধ্যে জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সূচীত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনের বীরোচিত বিজয় নিঃসন্দেহে অন্যতম এবং অতুলনীয়। মৃত্যুর মাত্র আড়াই বছর আগে তাঁর নেতৃত্বে সূচীত হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে এক অভূতপূর্ব ও অবিস্মরনীয় নাগরিক আন্দোলন, যা আজ দীর্ঘ ২১ বছরের কন্টক পথ বেয়ে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। প্রজন্মের তরুনরা এই দায় কাধে তুলে নিয়েছেন আজ। বর্তমান সরকারের আমলে উচ্চ আদালতের এক ঐতিহাসিক রায়ে ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি পুনঃপ্রবর্তন রায় প্রদান করা হলেও, পঞ্চদশ সংশোধনীর পর জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ কর্তৃক জারিকৃত যে ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম’ সংবিধানে সংযোজিত হয়েছিল- তা অদ্যাবধি সংবিধানে রয়ে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সম্পূর্ন পরিপন্থী। তবুও আমরা আশাবাদি জয়ের লক্ষ্যে পৌছানোর। কোন বিজয়ই রাতারাতি হয়নি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে অনড় জাহানারা ইমামের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি অপেক্ষা করেছে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশী সময় কাল ধরে। আজ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যাকারীদের বিচার হচ্ছে। তরুন প্রজন্ম শহীদ জননীর দেয়া দায় আজ স্বপ্রণোদিত হয়ে কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সুতরাং জননীর বাকী দাবিগুলো তারাই আদায় করে ছাড়বে অবধারিত ভাবে। ইতিহাস অন্তত সে সাক্ষ্যই দেয়।

২১ বছর পূর্বে জাহানারা ইমামের আন্দোলনটি শুধু আন্দোলনই ছিল না, একাধারে তা ছিল বিচক্ষন রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনাও। তিনি এই আন্দোলনের সূচনাপর্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যৌক্তিকতা এবং তাঁর মৃত্যুর পরও এর প্রাসঙ্গিকতা সহ নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন- “আমরা কেন বিচার চাই? রক্তাক্ত বিয়োগ বিধুর এই প্রশ্নের উত্তর ও নারকীয় ঘটনাবলীর প্রমান ও সাক্ষী বাংলার ঘরে ঘরে আজও জাজ্বল্যমান। এমন কোন পরিবার নাই, যেখানে ৭১-এর ক্ষতচিহ্ন নাই। ভাই হারিয়েছে বোনকে, মা হারিয়েছে ছেলেকে, স্ত্রী হারিয়েছে স্বামীকে, কন্যা হারিয়েছে পিতাকে। যে ঘাতক দালালদের সহযোগীতায়, যোগ সাজশে মানব-ইতিহাসের নিকৃষ্টতম এই হত্যাযজ্ঞ করতে পেরেছে পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগী সেই জামাত শিবির আবারো সেই একই কায়দায় মাথা তুলে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা সেজন্য আরো বেশী করে বিচার চাই।” তিনি আরো লিখেছিলেন, “একটি অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শক্তির পূনর্বাসন বহাল রেখে একটি জাতির গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির ভবিষ্যত নির্মান করা কখনোই সম্ভব না। ঘরের মধ্যে সাপ এবং মানুষ এক সঙ্গে বাস করতে পারে না। এই অবস্থা জেনে-শুনে যদি কেউ শান্তিতে ঘুমানের উপদেশ দেয়, তাকে মূর্খ অর্বাচীন বলা যাবে না- সে আসলে ধূর্ত শয়তান। শান্তিপ্রিয় মানুষের সে বিনাশ চায় আসলে।” শহীদ জননীর এই কথাগুলো এখনো যেমন প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতের জন্যও তেমন নিস্কন্টক পথ-নির্দেশনার ইঙ্গিত বহন করে। যে কথা তিনি অনেক বছর আগে বলে গিয়েছিলেন, কালের আবর্তে প্রজন্মের তারুন্যেরা আজ তা বুকে ধারন করে এগিয়ে চলেছে। গণজাগরনের এই পথকে অচেনা মনে করছে না এই প্রজন্ম; বরং দ্বিধাহীনভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরনার উৎস মনে করছে- যা নিঃন্দেহে ইতিবাচক এবং ভরসার আশ্রয়াস্থল।

যেকোন দেশের সংস্কৃতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের সূতিকাগার মূলত দেশটির সিভিল সমাজই হয়ে থাকে। কিন্তু সে অর্থে আমাদের দেশের সিভিল সমাজের সংজ্ঞা বরাবরই বিতর্কিত এবং অনেকটা যেন ইচ্ছাকৃত ভাবেই অস্পষ্ট থেকে গেছে। ঐতিহাসিক ভাবে এই বিতর্কের গোড়াপত্তন হলেও স্বাধীনতা উত্তর এই অস্পষ্টতা যেন আরো বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সিভিল সমাজের সমর্থন নিয়ে বিভিন্ন দল ক্ষমতায় গেলেও পরবর্তিতে দেখা গেছে ক্ষমতাধররা এই সিভিল সমাজের ইচ্ছার বিপরীতেই কাজ করেছে। আবার অগণতান্ত্রিক ক্ষমতাধররা এই সিভিল সমাজকে ব্যবহার করেছেন তাদের ক্ষমতার বলয়ের ব্যপ্তিকে আরো প্রসারিত এবং শক্তিশালী করতে। যার কারনে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্বপ্নের একটি শক্তিশালী সিভিল সমাজ কখনোই এই দেশে এস্টাবলিশ হতে পারেনি। বরং একটা সচেতন-সুস্থ্য চেতনায় সমৃদ্ধ নতুন প্রজন্ম সৃষ্টিকেই বাধাগ্রস্ত করেছে বারবার।

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেন সামরিক সমাজের প্রতিনিধিদ্বয় জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে সামরিক সংস্কৃতির তথা আমলাতন্ত্রের প্রসার ঘটানো-যা আমাদের দেশের জনগনের মানষিকতা ও সংস্কৃতির সাথে আমূল সাংর্ঘিক এবং সম্পূর্ন বিপরিতধর্মী। এই জেনারেলদ্বয় দেশের শিল্প-সংস্কৃতি থেকে অর্থনীতি, সমাজ থেকে রাজনীতি- সর্বক্ষেত্রে বপন করেছে সামরিকায়নের বীজ। বদলে দিয়েছে একটা জাতির চেতনার মূল সংস্কৃতিকে। ভেঙ্গে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মূল ভাব এবং তার স্বপ্নকে। সোজা ভাষায় যাকে বলে “জাতির মেরুদন্ডে কুঠারাঘাত” তারা করেছে। জেনারেলদ্বয় তাদের এই হীনকার্য সম্পাদনে সাত সাতবার কুঠার চালিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্বিলিত সংবিধানে। কেটেছেটে বাদ দিয়েছে বাঙ্গালী জাতির চেতনার মূল স্তম্ভ “সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা”-কে। মুসলমানিত্বের লেবাস পরিয়েছে রাষ্ট্রের গায়ে, যা একাত্তরের মূল চেতনার সম্পূর্ন পরিপন্থি। গণতন্ত্রায়নের চর্চা নিমিত্তে খাল কেটে কুমির এনেছে; পুনর্বাসিত করেছে রাজাকার ও আলবদরদের। তৈরি করেছে এক নতুন ‘সিভিল সমাজ।’ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ভাষায় যাদের শুধু “মূর্খ-অর্বাচিন, ধূর্ত-শয়তান” হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। যাদের দৌরাত্বে আর বাচলামীতে গভীর রাতের ঘুমই শুধু নষ্ট হয় না, সেই সাথে শান্তিপ্রিয় বাঙ্গালীদের প্রতিদিন হতে হয় নিত্য নতুন পদ্ধতিতে প্রতাড়িত।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এই সামরিকায়ন শাসক গোষ্ঠিকে ঝাটাপেটা করে বিদায় করতে পারলেও, তাদের তৈরি সেই শয়তান-সম সিভিল সমাজ স্বঅবস্থানেই আছেন এবং দেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষের মূল সিভিল সমাজের চেতনাকেই বিঘ্নিত করছেন প্রতিনিয়ত। এক্ষেত্রেও জননী জাহানারা ইমামের সেই কথাই প্রতিয়মান হয় যে, “একটি অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শক্তির পূনর্বাসন বহাল রেখে একটি জাতির গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির ভবিষ্যত নির্মান করা কখনোই সম্ভব না। ঘরের মধ্যে সাপ এবং মানুষ এক সঙ্গে বাস করতে পারে না। এই অবস্থা জেনে-শুনে যদি কেউ শান্তিতে ঘুমানের উপদেশ দেয়, তাকে মূর্খ অর্বাচীন বলা যাবে না- সে আসলে ধূর্ত শয়তান। শান্তিপ্রিয় মানুষের সে বিনাশ চায় আসলে।”

১৯৯০ এর পর জোট ভিত্তিক হলেও পালা করে দেশের প্রধান দুটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং এই দুটি দলই মূলত স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। অথচ এই দুটি দলও ঘুরেফিরে সেই সামরিক সরকারগুলোর সৃষ্টি সিভিল সমাজ দ্বারা চালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। অন্তত তাদের ক্ষমতায় থাকাকালীন ক্রিয়াকলাপে তা-ই দেখা যায়। দলদুটোর ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় এই সিভিল সমাজই মূল ভূমিকা রেখে থাকে। তাহলে প্রশ্ন করা যেতে পারে, শক্তিশালি একটা সিভিল সমাজ গড়ার লক্ষ্যে যুগ যুগ ধরে জাতির যে প্রত্যাশা- তা কি সফল হবে, না-কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতা তা বার বার গ্রাস করবে? কেন একটা সৎ-সুস্থ্য সিভিল সমাজের প্রয়োজন? কি হবে তাঁদের রূপরেখা এবং কার্যপদ্ধতি? এই প্রশ্নের উত্তরগুলোর উপরই নির্ভর করে একটা সরকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট কি হবে তার নিরূপন করা।
আমাদের দেশের সিভিল সমাজ চালিত হয় মূলত দুইটি ধারায়। প্রথমত রাজনৈতিক ধারায়, দ্বিতীয়ত সামরিক গোয়েন্দাদের ধারায়। রাজনৈতিক ধারার সিভিল সমাজ আবার দুই ভাগে বিভক্ত। ক্ষমতাসীন আর বিরোধী পক্ষের হয়ে কথা বা কাজ করেন তাঁরা। আর সামরিক গোয়েন্দা কতৃক নিয়ন্ত্রিতরা একটা সুবিধাজনক স্থানে বসে রাজনৈতিক ধারার দুই পক্ষের সিভিল সমাজকেই নিয়ন্ত্রন করে। অর্থাৎ গনতন্ত্রের ধ্বজাধারী যে কোন দলই ক্ষমতায় অথবা বিরোধী দলে থাকুক না কেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের ছায়া হয় সামরিক সিভিল সমাজেরই প্রেতাত্নারা। আর এই কারনেই ’৭৫ এর পর থেকে অদ্যাবধি সামরিক-বেসামরিক কোন সরকারই একটা স্বাধীন-সৎ-সিভিল সমাজ আমাদের উপরহার দিতে পারেনি। আর একারনেই সামরিক সিভিল সমাজের গোপন ইচ্ছার প্রতিফলনই আমরা দেখতে পেয়েছি বার বার, তা রাষ্ট্রক্ষমতায় যে-ই থাকুক না কেন! সামরিক সরকারের করা পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী উচ্চ আদালতে বেআইনী ঘোষনার পরেও স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকারও যখন সংবিধানের গা থেকে ধর্মীয় চাদর সরিয়ে নিতে পারেনি, তখন বুঝবার আর বাকি থাকে কিছু? অথচ ২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আকাশচুম্বী বিজয়ের বীজ কি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বুনে জাননি ২১ বছর আগে? এর যত্ন না নিলে দায়ভার এই প্রজন্ম নেবে না। বরং ইতিহাস তার নিজ নিয়মেই মির্মম আঘাত করবে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সূচীত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনের ফসল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের নিমিত্তে গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ কি আদৌ করতে পারবে একাত্তরের গণহত্যাকারীদের বিচার? খোদ ট্রাইব্যুনালের ভিতরের অবস্থা এতো ভয়াবহ যে, এ প্রশ্নটি এখন সবার মুখে মুখে ফেরে। শুরু থেকে সেখানে যা হয়েছে, তা শুধুই “ছাগল দিয়ে লাঙ্গল টানা’-র সাথেই তুলনা করা যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তারপরেও কয়েকটি মামলার রায় দিয়েছে এই ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু আপিল বিভাগে ঝুলে থাকা মামলার ভবিষ্যত কি হবে, তা খোদ আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও জানেন না। ৩০ দিনের মধ্যে আপিল নিস্পত্তির বিধান করে সংসদে আইন পাশ হয়েছে খোদ এই আইনমন্ত্রীর মাধ্যমেই। সমন্বয়হীনতা ও অপরিপক্কতার কারনে কাদের মোল্লার ফাসির বদলে যাবজ্জিবন কারাদন্ডের রায় হয়েছে, যদিও আদালতে তার বিরুদ্ধে বেশীরভাগ অভিযোগই প্রমানীত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, শুধুমাত্র শিথিল প্রসিকিউশনের কারনেই বিজ্ঞ বিচারক যাবজ্জিবনের চেয়ে বেশি কিছু সাজা দিতে পারেননি। এরজন্য কি অপরিপক্কতা না অনিহা দায়ী? ট্রাইব্যুনালের সাথে যুক্ত অনেকের চালচলন দেখলে তাঁদের অনিহার দিকটাই স্পষ্টত চোখে পড়ে। তাহলে কি তারাও সেই বিশেষ শ্রেনীর সিভিল সমাজ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং পোষ্য?

কাদের মোল্লার ফাসির দাবিতে প্রজন্ম চত্বরে গড়ে ওঠা গণজাগরন ইতিহাসের সফলতম আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিশাল ক্যানভাসে আঁকা ছবির পাদদেশে জমায়েত হওয়া লাখো মানুষের ঢল জননী জাহানারা ইমামের কথাই বার বার স্মরন করিয়ে দেয়। অথচ সে আন্দোলনও কোন এক অদৃশ্য চাপে বা ইশারায় স্থিমিত হয়ে যায় বার বার। কথাটা হতাশার হলেও ফিরে দেখা দিনগুলোর দিকে তাকালে এই হতাশা থাকে না। গত একুশ বছরে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সূচিত আন্দোলনকেও অনেক চড়াই উতড়াই, ঘাত-প্রতিঘাত আর প্রতিবন্ধকতা পেরোতে হয়েছে। ধাবমান এই স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে সাময়িকভাবে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও অন্যান্য সব আন্দোলনের মত আপোসের সংস্কৃতিতে তলিয়ে যায়নি। এখানেও ছিল উল্লেখযোগ্য অনেক অনর্ঘাত, ছিল প্রতাড়না আর বিশ্বাসঘাতকতা। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তার গোয়েন্দারা বার বার অনুপ্রবেশ করেছে এই আন্দোলনকে স্থিমিত করে দিতে, দিয়েছে বিভিন্ন প্রলোভন আর জীবননাশের হুমকী। অত্যাচারিত হয়েছেন শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন স্যার সহ অনেকে। কিন্তু মা জাহানারা ইমামের সন্তানেরা ভেঙ্গে পড়েননি। যত বেশী আঘাত এসেছে, তত বেশী যেন শক্তি সঞ্চয় করে দ্বিগুন বেগে ধেয়ে গেছেন তাঁরা শত্রুর বিরুদ্ধে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিপক্ষ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের দোসর অন্যান্য মৌলবাদি দলগুলো সেক্যুলার মানবতাবাদী, সমানতন্ত্রী ও গণতন্ত্রকামীদের ভারত ও আওয়ামী লীগের চর হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রপাগান্ডা করেছে বিরামহীন ভাবে। সামরিক সিভিল সমাজের কূচক্রীদের কূটকৌশলে নির্মূল কমিটির কান্ডারী বন্ধুপ্রতিম শাহরিয়ার কবিরকে কারাবরন সহ নির্মম অত্যাচারের সম্মুখিন হতে হয়েছে একাধিক বার। দেশের প্রত্যান্তঞ্চলের নির্মূল কমিটির নিবেদিত প্রান নেতা-কর্মীরা মাসের পর বাড়ী ছাড়া থেকেছেন। অনেকে অত্যাচারিত এবং বিতাড়িত হয়েছেন নিজ ভিটামাটি থেকে। তবুও দমানো যায়নি এই আন্দোলনকে আর জননীর সব দামাল সন্তানদেরকে। নিজ গতিতেই এগিয়েছে তাঁরা। শহীদ জননীর শেষ আদেশ নির্মূল কমিটির নিবেদিত কর্মীরা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন একদিন। তারপর থেকে শহীদ জননী সূচিত আন্দোলনের স্রোতধারা সাময়িক স্থবিরতা বা মন্থরগতির পরও আবার বেগবান হয়েছে।নির্মূল কমিটি এই আন্দোলকে দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলের গন্ডি ছাড়িয়েও পৌছে দিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রতিপক্ষের নোংরা-আগ্রাসী প্রচারণায় অনেক সময় আন্দোলনের কর্মীরা বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে ঠিকই,তবে একদল তরুণের জায়গায় আরেক দল এসেছে। আন্দোলনের শাখা প্রশাখা ও শেকড় বিস্তৃত হয়েছে দেশের মাটিতে এবং দেশের বাইরে।জাগরন মঞ্চের তরুনেরা সেই জায়গা বদল করা জাহানারা ইমামের স্বপ্রণোদিত কর্মিরাই। তাঁদের ক্ষয় নাই। তারাও জামায়াতের আক্রমনের শিকার হচ্ছেন। তাদেরকে নাস্তিক, মুরতাদ, কাফের বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ঠিক একই ভাষায় যেমন বিষদগার করে জাহানারা ইমাম, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনদেরও বলা হয়েছে বিভিন্ন সময়। শাহরিয়ার কবিরকে যেমন হত্যা করার জন্য মৌলবাদী জামায়াতিরা হন্যে হয়ে খুজে ফিরে, ডাঃ ইমরান সরকারদের হত্যার জন্যও সেভাবে খোজে। এরই মধ্যে হত্যা করা হয়েছে রাজিবকে, যেমন করা হয়েছিল ডঃ হুমায়ূন আজাদ স্যারকে।

প্রজন্মের পালাবদল শুরু হয়েছে একটি আদর্শের ছায়াতলে। যে আদর্শের মূলমন্ত্র গেথে গেছেন ১৯ বছর আগে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ইমরান সরকারদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, যত বিপদই আসুক, আসুক যত ভয়ভীতি আর প্রলোভোনের ইশারা-আপনারা জানেন মায়ের নির্দেশিত সেই অভিষ্ট লক্ষ্য কোথায়। প্রজন্মের পালাবদলে যে আদর্শের জোয়াল আপনারা কাধে তুলে নিয়েছেন, দেখবেন-তা যেন লক্ষ্যে পৌছায়। আমরা আছি-থাকবো দেহে শেষ রক্তবিন্দুটি থাকা পর্যন্ত আপনাদের পাশে। মনে রাখবেন, আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছে একটা গোটা জাতি-আর তাঁর ভবিষ্যত। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন আমাদের জননী জাহানারা ইমাম। আকাশে, বাতাসে, প্রেরনায় মন্ত্রমুগ্ধের মত আসুন আমরা বিশ্বাস করি, “মৌলবাদী জামায়াত ইসলামের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে। গণআদালতের গণজাগরন আজ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে।“

৭ thoughts on “‘গণআদালতের গণজাগরন আজ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে’

  1. বাহ্যিকভাবে আমাদের মাঝে নানান
    বাহ্যিকভাবে আমাদের মাঝে নানান বিভক্তি দেখা গেলেও আমি বিশ্বাস করি এই প্রজন্ম তাদের মূল দাবীর জায়গায় অটল। এটাই আমাদের শক্তি। জননী জাহানারা ইমামের দেখানো পথে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনবই। কঠিন আঘাতে মুছে দেবো শেষ হায়েনাটার মুখের হাসিও। জননীর মৃত্যু দিবসে এই শপথে আসুন আবারও এক হই। জয় আমাদের হবেই।
    চমৎকার লেখার জন্য সাব্বির খানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। নিয়মিত লিখলে আরও খুশী হবো।

    1. আতিক ভাই এর সহমত পোষণ করছি
      আতিক ভাই এর সহমত পোষণ করছি /।সাময়িক দ্বন্দ্ব থাক্লেও এবং আপাত দৃষ্টিতে বিভক্ত হলেও – আসলে – প্রজন্মের চেতনা – লালিত স্বপ্নের কোন পরিবর্তন হয় নি ।

  2. আম্মার হাত ধরে যে চেতনার
    আম্মার হাত ধরে যে চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটেছে, তার বিজয় না দেখে তরুণেরা ঘরে ফিরবে না।

    সাময়িক দন্ধ, বিভক্তি হয়তো গতি স্লথ করে দেবে, তবু বিজয় ভিন্ন তরুণেরা শান্ত হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *